• সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫  |   ১৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

গল্প

প্রতিবিম্ব

মোহাম্মদ জসিম

  সাহিত্য ডেস্ক ১৩ অক্টোবর ২০১৮, ০০:৫৮

গল্প: প্রতিবিম্ব


ক'দিন থেকে শেষরাত অব্দি ঘুম হয় না-ভোররাতের দিকে একটু ঝিমুনিমতোন আসে, তারপর বেমালুম ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভাঙতে ভাঙতে সেই আটটা ন'টা। অফিসে দেরি হবার ভয়ে প্রতিদিন অ্যালার্ম দিয়ে রাখতে হচ্ছে ঘড়িতে। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। আটটায় অ্যালার্ম বাজলো-পড়িমড়ি করে উঠেই বাথরুমে দৌড়। অফিসে মাসিক মিটিং আছে আজ। কোনমতেই দেরি করা যাবে না। গোসলের আগে বেসিনের সামনে দাঁড়ালো তমাল-শেভ করবে। দেয়ালে লাগানো আয়নায় তাকালো-তাকিয়েই হতবাক! আয়নার ভেতরে তার এতদিনের পরিচিত প্রবিবিম্বটি হাসছে। মুখ গোমড়া করলো তমাল। যদিও সে নিশ্চিত-তার মুখে কোন হাসি ছিলো না। কিন্তু তাজ্জব হয়ে তমাল দেখলো তার প্রতিচ্ছায়াটি এখনো হাসছে।

ঘুমটুম ভাল না হলে মাথায় প্যাচ লেগে যায়,ইলিক বিলিক স্বপ্ন দ্যাখে চোখ- বাস্তবও স্বপ্নের মতো লাগে। ভাবলো তমাল। মুখের ভঙ্গি পাল্টালো,মাথা কাত করলো-চোখ কচলে আবার তাকালো। সেই একই দৃশ্য-না কোন হেরফের নেই। তার অঙ্গভঙ্গি নকল করছে ঠিকই হারামজাদাটা কিন্তু তার ঠোঁটের রহস্যময় হাসিটা মুছে যাচ্ছে না।

আপাদমস্তক বিবস বৃক্ষের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো সে-আয়নার সামনে, নিজেরই প্রতিবিম্বের মুখোমুখি। তারপর নিঃশব্দে শেভ করার সরঞ্জামাদি বেসিনের ওপর এলোমেলো ফেলে রেখেই বেরিয়ে এলো-শেভ করলো না,গোসলটাও করা হলো না আর।
ভয় পেয়েছে সে।

তড়িঘড়ি তৈরি হয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো তমালবাবু। মনের মধ্যে কেমন এক খচখচানি। অস্বস্থি তাড়ানোর সব চেষ্টাই ব্যর্থ-কিছুতেই মন থেকে তাড়াতে পারলো না নিজের হাসিমুখ ছবিটিকে। অদৃশ্য ইঁদুরের মতো কে যেন কেটেকুটে সাবাড় করছে ভেতরটা তার। তমাল অন্যকিছু নিয়ে ভাবতে চেষ্টা করলো। গলির মুখে বিপ্লবের সেলুন। সেলুনের সামনে থেকেই রিক্সা ধরতে হয়। সেলুনের দিকে চোখ পড়তেই তমাল দ্রুতপায়ে ভিতরে ঢুকে যায়-দেয়ালজোড়া বিশাল আয়নার সামনে দাঁড়ায়। না কোন পরিবর্তন নেই। আয়নার ভেতরের আমিটি হুবহু নকল করছে তাকে। সেই একই চোখ নাক চুল, সবই ঠিক আছে শুধু মুখভঙ্গিটি আলাদা। আয়নার তমালবাবু মিটিমিটি হাসছে, গা জ্বালা ধরা হাসি। সে হাসিটি অন্য রকম, খুনিদের মতো, শিকারীর কাছ থেকে উপহার পাওয়া।

আজ নাস্তা করা হয়নি, কাজেও মন নেই একদম। তমালের মাথায় ভেতরে গেঁথে আছে আশ্চর্য এক হাসির নমুনা। নিঃসঙ্গ মোমের মতো, নিষ্পলক। জ্বলছে তো জ্বলছেই। সকাল থেকে বহুবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছে তমাল। মোবাইল স্ক্রিনে বারবার নিজের চেহারা দেখেছে, বাথরুমে, বাসের জানালায় -জানালার কাঁচে। সব জায়গায়ই তার প্রতিবিম্বটি তার সাথে বিট্রে করছে।

মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে তার! ডিপ্রেশনে ভুগছে! নাকি হ্যালুসিনেশন? তমাল ভাবতে ভাবতে মাথার চুল টেনে ছেঁড়ে-অনবধানে। যে করেই হোক এই অস্বস্তিকর খুনে হাসিটির কবল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।


-তুবার সাথে ঝগড়া হয়েছে, জানিস?

-জানি।

-অনেক টাকা ঋন আছি...

-জানি।

-বাবা অসুস্থ।

-জানি।

-প্রমোশনের জন্য দেড়লাখ টাকা ঘুষ চাচ্ছে।
-জানি।

-ঘুম হচ্ছে না ইদানিং, শরীরটা ভেঙে পড়ছে দিনে দিনে...

-সবই জানি।

-সবই জানিস তাহলে তোর মুখে হাসি কি করে বেরোয় শুয়োরের বাচ্চা!

-হাহাহা। 

আয়নাটা ঝমঝমিয়ে ওঠে, আয়নার শরীর জুড়ে তমালের ছবিটি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। 

-তমালবাবু তমালবাবু! আপনাকে দেখে কেউ কোনদিনই বলবে না আপনি কষ্টে আছেন টেনশনে আছেন ডিপ্রশনে ভুগছেন। প্রতিদিনই তো দেখি, যার সাথেই দেখা হয় কথা হয় বেশ হাসিমুখে করমর্দন করেন কথা বলেন আন্তরিকতা নিয়ে। আমি শুধু আপনাকে নকল করে যাচ্ছি মাত্র।

তমাল অধৈর্য হয় আরো। রেগে যায়।

তমাল ঘরে ফিরেছিলো রাত করে। অফিস থেকে দুপুরের পরপরই বেরিয়ে পড়েছিল। তার পর থেকে রাস্তায় রাস্তায় হেঁটেছে-পারতপক্ষে কোন আয়নার সামনে দাঁড়ায়নি। সারাটা দিন একরকম না খাওয়াই বলা যায়। খাওয়ার মধ্যে কাপের পর কাপ চা আর সিগারেট। এই মূহুর্তেও আঙুলের চিপায় ধরানো সিগ্রেটে টান দিতে দিতে আয়নার সামনে বসে আছে। এই খুনে হাসির অত্যাচার সইতে পারছে না আর। একটা এসপার ওসপার করেই ছাড়বে এরকম ভাব নিয়ে প্রতিবিম্বের সাথে সংলাপে বসেছে।

-হাসিমুখে কথা বলি এতে দোষের কি আছে। এটাই নিয়ম। সৌজন্যবোধ না থাকলে সভ্য সমাজে মিশবো কি করে।

-না দোষের কিছু আছে বলিনি তো তমালবাবু। আমি তো আপনারই প্রতিচ্ছায়া,তাই নই কি! তাহলে? আপনাকে নকল করে যাচ্ছি মাত্র।

-বালের নকল করছো আমাকে! কই আমি তো হাসছি না এখন। হাসছি? তাহলে তুই হাসছিস কেনো? কেন?

চিৎকার করতে থাকে তমাল। সে চিৎকারে উপচে পড়া রাগ ক্ষোভ বিদ্রোহ...

-আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন তমালবাবু! ঠান্ডা মাথায় ভাবুন। আপনার হাজার কষ্টের মাঝেও আপনি হাসেন। এটাই আপনার পার্সোনালিটি। আপনার ভেতরে একধরনের ক্ষোভ আছে আমি জানি,আপনার কাছসম্পর্কের মানুষগুলো আপনাকে বোঝে না, বুঝতে চেষ্টাও করে না। তবু আপনি কাউকে কষ্ট দেন না বরং হাসিমুখে সবার সাথে মেশেন।
তমালেল প্রতিবিম্বটি বিরতি নেয় একটু। এখন মধ্যরাত। নৈঃশব্দ। তমালের আগুলের ফাঁকে সিগ্রেট পোড়ো। ঠিক একই ভঙ্গিমায় আয়নার ভিতরে বসা তমালের হাতেও একই ব্রান্ডের সিগারেট পুড়ছে।

-আপনার কষ্টগুলো আমারও তমালবাবু। আপনার অভ্যাসও আমি পাই টু পাই নকল করে যাচ্ছি।

-তাই বলে কুত্তার বাচ্চা আমার সাথেও নকল হাসি নিয়ে মিশবি তুই! 

-আপনার সারাদিনের নকল হাসির অভিনয়টি আমি নকল করে যাচ্ছি আর কিছু না।

-তাই বলে আমি কি নিজের সাথেও কৃত্রিম হাসি নিয়ে মিশবো। একা হয়ে গেলে নিজের সাথেও কি প্রতারনা করে মানুষ? কৃত্রিম হাসি নিয়ে ভাল থাকার অভিনয় করে যায়!

-আপনি কদিন থেকে তাই করে যাচ্ছেন তমালবাবু। শুধু এটা বোঝানোর জন্যই আমার মুখে চিরস্থায়ী হাসি ঝুলিয়ে রেখেছিলাম।

এসব কথা তমালের বিশ্বাস হয় না। রাগ হয় বরং। আমি কি সত্যিই নিজের সাথে অভিনয় করে যাচ্ছি? ভাল থাকার অভিনয়?
 
নাকি বিভ্রান্ত হচ্ছি আয়নার জগতে লুকিয়ে থাকা খুনে হাসির চতুর ষড়যন্ত্রের কাছে। তমাল হার মানতে চায় না, কোনদিনই হারতে চায়নি সে...

টেবিলের কোনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা ফুলদানিটি অকস্মাৎ ছুড়ে দিলো সে,ঠিক আয়নার বুক বরাবর। ভেঙে পড়া আয়নার ঝনঝনানি তার কাছে অট্টহাসির মতো লাগলো। দিগন্তজোড়া অট্টহাসি মুখে নিয়েই মরে গেল তমালের প্রতিবিম্বটি।
সে রাতে খুব ভাল ঘুম হলো তার।

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড