• শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২, ১৮ আষাঢ় ১৪২৯  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

আমার রবীন্দ্রনাথ

  তৌহিদ ইমাম

২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:০০
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতি। ছবি : সংগৃহীত

আসমুদ্রহিমাচল যখন দর্পিত বামনগণ রাজত্ব করছে, তখন শুধু একজন মনীষার দিকেই আমার বিস্ময় নিয়ে চেয়ে থাকা। যখন চারিদিকে নাগিণীর বিষাক্ত নিঃশ্বাস পড়ছে, তখন একজনই সবুজের সমারোহে জেগে থাকেন, জাগিয়ে রাখেন। তিনি রবীন্দ্রনাথ। আমাদের এই ক্ষুদ্রদের দেশে যে ক’জন শৃঙ্গসম মানুষ জন্মেছেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁদের মধ্যে উচ্চতম। নামের প্রতি সুবিচার করেই তিনি আজও নিরন্তর আলো ও তাপ দিয়ে যাচ্ছেন।

বলা হয়ে থাকে, জাতির শ্রেষ্ঠ মানুষগুলো নাকি সেই জাতিরই বিরুদ্ধে জ্বলন্ত, মূর্তিমান প্রতিবাদ। রামমোহনের আধুনিকতা, বিদ্যাসাগরের পাণ্ডিত্য ও তেজস্বিতা, অক্ষয়কুমার দত্তের বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদিতা, মাইকেলের ঔদ্ধত্য, রবীন্দ্রনাথের সর্বময় সৃষ্টিশীলতা, নজরুলের তারুণ্য ও দ্রোহ, তিরিশের পঞ্চপাণ্ডবের পাশ্চাত্যমুখিনতা, শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও নেতৃত্বদক্ষতা কখনোই বাঙালির স্বভাবজ হতে পারে না। এরা সবাই বাঙালির অপরিসীম ক্ষুদ্রতা, সংকীর্ণতা আর ভীরুতার বিরুদ্ধে অসীম আকাশ ছোঁয়ার দুঃসাহস। জাড্য, স্থবিরতা আর কর্মহীনতা এ জাতির জাতীয় চরিত্র বলেই এ পর্যন্ত সমস্ত অর্জনই ব্যক্তিপর্যায়ে সীমাবদ্ধ; একমাত্র মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া আমাদের জাতীয় অর্জন বলতে নেই প্রায় কিছুই। হয়ত এ জন্যই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাকে বাইরের কোনো গ্রহ থেকে আবির্ভূত ব্যক্তিমনীষা হিসেবে বিবেচনা করেছেন, বাঙালি জাতির ভেতর থেকে উঠে আসা কেউ হিসেবে বিবেচনা করার সাহস পাননি। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আলোচনায় অগ্রসর হতে চায়লে রবীন্দ্রনাথেরই অনুসৃত পথ অনুসরণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

আগেই বলেছি রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন সর্বময় সৃষ্টিশীল মানুষ। এ সৃষ্টিশীলতার তৃষ্ণা আমৃত্যু তিনি বুকের গহীন গোপনে লালন করেছেন। একমাত্র মহাকাব্য ছাড়া সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তার ঐন্দ্রজালিক কলম কর্ষণ করেনি। প্রায় আশি বছরের আয়ুষ্কালে তিনি গড়ে তুলেছিলেন যে বিপুল সৃষ্টিসম্ভার, তারই জোরে হয়ত সমালোচকগণ বলতে সাহস পান যে, রবীন্দ্রনাথ একাই বাংলা সাহিত্যকে একশ বছর এগিয়ে দিয়েছেন।

শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, সমগ্র বিশ্বসাহিত্যেই তিনি এক অপরিহার্য লেখক-ব্যক্তিত্ব। সাহিত্যের এক একটি বিশেষ ক্ষেত্রে হয়ত কেউ কেউ তার চেয়ে মহত্তর; রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বড় কবি বিশ্বসাহিত্যে হয়ত খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে না, রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বড় কথাসাহিত্যিকও হয়ত দুর্লভ নয়, রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বড় নাট্যকার নিশ্চয়ই আছেন; কিন্তু সাহিত্যের সবগুলো শাখাকে সমন্বিত করলেই রবীন্দ্রনাথের ঔজ্জ্বল্য ও শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সৃষ্টিশীলতার উদ্যমে, মৌলিকত্বে, বিপুলতায় এবং সাফল্যে রবীন্দ্রনাথ সমগ্র বিশ্বসাহিত্যেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী। অথচ এই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অধিকাংশ বাঙালিরই কোনো সংস্রব নেই- না চিন্তাচেতনায়, না জীবনচর্যায়। রবীন্দ্রনাথের একটি রচনাও সারাজীবনে পড়েননি এমন বাঙালিও দুর্লভ নয়। সাধারণ মানুষ তো সাধারণ মানুষ, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি উচ্চকিত যারা, সেই মহামান্য বুদ্ধিজীবীগণেরও রবীন্দ্রবীক্ষণ সংকীর্ণ ও তীর্যক। তাদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যে রবীন্দ্রনাথকে পাওয়া যায়, সেই রবীন্দ্রনাথ কোনো পূর্ণায়ত ও স্বতঃসিদ্ধ রবীন্দ্রনাথ নন, হয় খণ্ডিত, না হয় অতিমানবীয়।

একটি ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ দশটি শান্তিনিকেতনের চেয়ে চিরায়ত। শান্তিনিকেতন একটি প্রতিষ্ঠান, একটি স্থাপত্য, ঝড়ে কিংবা ভূমিকম্পে ভেঙে পড়তে পারে এর দেয়াল কাঠামোগুলো। কিন্তু ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ খোদিত হয়ে থাকবে মানুষের হৃদয়পটে। শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করে রবীন্দ্রনাথ মিটিয়েছেন যুগ ও দেশের চাহিদা, কিন্তু বিপুল রবীন্দ্রসাহিত্য রচিত হয়েছে অন্তর মানুষের দাবির প্রয়োজনে। শান্তিনিকেতন তৈরি না হলে রবীন্দ্রনাথের কোনো ক্ষতি হতো না; রবীন্দ্রনাথ নিজের জীবনেই তো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে অস্বীকার করেছেন, কিন্তু হয়ত ক্ষতি হতো ভারতীয় উপমহাদেশের। যেমনিভাবে নোবেল পুরস্কার পাওয়া রবীন্দ্রনাথের কোনো দরকার ছিলো না, দরকার ছিলো বাঙালির। তিনি নোবেল পুরস্কার না পেলে সাম্প্রদায়িক বাঙালি কখনো তাকে সহজে পুরোপুরি গ্রহণ করতো না। বাঙালি মুসলমান তাকে দূরে সরিয়ে রাখতো ‘রবীন্দ্রনাথ হিন্দু সম্প্রদায়ের কবি’ বলে, আর বাঙালি হিন্দুরা ‘রবীন্দ্রনাথ অভিজাত সামন্তবর্গীয় ব্রাহ্ম’ বলে কাছে ঘেঁষতেই দিতো না। রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠতেন সন্দেহের, সংশয়ের, উপেক্ষার। ‘আমি তোমাদেরই লোক’ বলে রবীন্দ্রনাথ যতই বাঙালির নিকট স্বজন হতে চান না কেন, নির্বোধ বাঙালি তাকে দূরে অনাত্মীয় করে রেখেই স্বস্তিবোধ করতো। তাই এ কথা বলতে প্রলুব্ধ হই যে, রবীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠা প্রকারান্তরে বাঙালিরই প্রতিষ্ঠার্জন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার নোবেল বক্তব্যের এক অংশে বলেছেন-

‘আমি জানি পুরস্কার প্রাপ্তির প্রশংসাকে একান্ত আমার নিজের বলে গ্রহণ করা সঙ্গত নয়। এ হচ্ছে আমার ভেতরকার প্রাচ্য, যা আমি পাশ্চাত্যকে দিলাম। প্রাচ্য কি অধ্যাত্মবাদী মানুষের মাতৃরূপা নয়? পাশ্চাত্যের শিশুরা যখন খেলাধুলায় ব্যথা পায়, শ্রান্তিতে-ক্ষুধায় যখন তারা অবসন্ন হয়ে পড়ে, তারা কি তখন স্নেহশীলা প্রাচ্যমায়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকায় না? তারা কি সেই মায়ের কাছ থেকে খাদ্য প্রত্যাশা করে না? কর্মদিবসের ক্লান্তির পর তার কাছে কি তারা বিশ্রাম প্রত্যাশা করে না? প্রাচ্যমাতা কি কখনও তাদের হতাশ করেন? সৌভাগ্যবশত আমি এমন এক সময় এখানে এসেছিলাম, যখন পাশ্চাত্য পুনরায় তার মুখ প্রাচ্যের দিকে ফিরিয়েছে। পাশ্চাত্য প্রাচ্যের কাছ থেকে জীবনীশক্তি প্রত্যাশা করেছে। যেহেতু আমি প্রাচ্যের প্রতিনিধি, প্রাচ্যবান্ধবরা আমাকে পুরস্কৃত করেছেন।’

রবীন্দ্রনাথ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভাবাদর্শন, মানবতাবাদ, একতা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে অবগত ছিলেন। সারাজীবন কাজ করেছেন এই যুগল ঐতিহ্যের মিলনসেতু রচনায়। আর তাই তো নিজের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশ্চাত্যের পণ্ডিতদের আমন্ত্রণ জানিয়ে শিক্ষা দেবার ব্যবস্থা করেছিলেন প্রাচ্যের শিক্ষার্থীদের। রবীন্দ্রনাথ অনুভব করেছিলেন-

‘শতাধিক বছর ধরে আমাদের দেশের ছাত্ররা এমনভাবে শিক্ষিত হচ্ছে, যেন তাদের সুপ্রাচীন সভ্যতা সম্পর্কে কোনো ধারণাই গড়ে উঠতে পারছে না। ফলে যে মহান সভ্যতার উত্তরাধিকারী আমরা, তার সংস্পর্শ থেকেই যে শুধু বঞ্চিত হচ্ছি তা নয়, মানব সভ্যতায় কিছু অবদান রাখার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছি। আমাদের যে সম্পদ আছে তার কিছুই আমরা দিতে পারছি না, বরং অন্যের কাছ থেকে ভিক্ষা গ্রহণ করছি; সংস্কৃতির ব্যাপারেও আমরা ভিক্ষুক সেজেছি, আমরা চিরকালীন স্কুলবালকে পরিণত হয়েছি।’

রবীন্দ্রনাথের এই যে বার বার ঐতিহ্যের কাছে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা, একে কোনোক্রমেই পশ্চাৎপদতা বলার উপায় নেই। আসলে আগামি বিনির্মাণের প্রয়োজনেই চেয়েছেন অতীতের উজ্জীবন। কে-ই না জানে রবীন্দ্রনাথ চির-অগ্রসর!

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আই.বি.এস. আয়োজিত রবীন্দ্র-সেমিনারে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য পবিত্র সরকার যখন বলেন, ‘এ বঙ্গে না আসলে রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠতেন না’, কিংবা পরবর্তী কোনো এক সেমিনারে প্রাবন্ধিক গোলাম মুরশিদ কিংবা গবেষক আবুল আহসান চৌধুরী প্রদানকৃত সাক্ষাৎকারে যখন পবিত্র সরকারের কথারই প্রতিধ্বনি তোলেন, কিংবা কবি আসাদ মান্নান যখন স্বভাবগত গর্বিত উচ্ছ্বাসে বলেন- ‘রবীন্দ্রনাথকে তো আমরাই রবীন্দ্রনাথ বানিয়েছি’, তখন বক্তব্যটির যথার্থতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে ভাবতেই হয়।

আমাদের জানা আছে, অভিজাত সামন্তবংশে জন্ম নেওয়া কনিষ্ঠ উত্তরাধিকার রবীন্দ্রনাথ পিতৃ-আদেশ মোতাবেক জমিদারি দেখাশোনার জন্য পঁচিশ বছর বয়সে চলে আসেন এই বাংলায়; জীবন অতিবাহিত হতে লাগলো অতীব নির্জনে গঙ্গানদীর তীরবর্তী বাংলার অখ্যাত গ্রামে, নৌকায়। শরতে হিমালয়ের হ্রদগুলো থেকে যখন ঝাঁকে ঝাঁকে বুনোহাঁস নেমে আসতো, তারাই হতো তার সজীব সঙ্গী। সেই গহীন নির্জনে তাকে যেন নেশায় পেয়ে বসতো, যেন উদার প্রকৃতির দিগন্তবিস্তৃত খোলা অঙ্গনে অবারিত সূর্যালোক থেকে তিনি সুধা পান করতেন। নদীরা তার সঙ্গে কথা বলতো, প্রকৃতির গোপন রহস্য জানিয়ে দিতো। ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরাকে লিখিত এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- ‘বাস্তবিকই পৃথিবীটা যে কী আশ্চর্য সুন্দরী কলিকাতায় থাকিলে ভুলিয়া যাইতে হয়।’ সেই আশ্চর্য সৌন্দর্যে ও নির্জনতায় স্বপ্নবিভোর হয়ে রবীন্দ্রনাথ তার দিন কাটাতেন; সেই স্বপ্ন প্রকাশ পেতো কবিতায় ও অন্যান্য নানান লেখায়। কলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে পাঠক সমাজে এইসব রচনা উপস্থাপিত হতো। তখনও রবীন্দ্রনাথ অধিকাংশ দেশবাসীর কাছে ছিলেন প্রায় না-জানা এক মানুষ। এই সীমিত প্রচারে সম্ভবত তিনি খুশিই ছিলেন। জনতার অকারণ কৌতূহল নিভৃতিচারী রবীন্দ্রনাথের জন্য কোনো বিঘ্ন ঘটাতে পারতো না। এরপরে একটা সময় এলো যখন তার মনে হলো এই নির্জনতা, জনবিচ্ছিন্নতা ত্যাগ করে বেরিয়ে এসে সহজীবী মানুষের জন্য তার কিছু একটা করা উচিৎ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- ‘এ শুধু স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়া কিংবা জীবনসমস্যা সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করা নয়, এমন কিছু কাজ করা, নির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে এমন কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা, যার সাহায্যে মানুষকে সুনির্দিষ্ট সেবা প্রদান করা যায়।’ রবীন্দ্রনাথ উঠে এলেন সাধারণ মানুষের কাতারে, সমাজ-সভ্যতা-দেশ নিয়ে যা ভাবতেন এতদিন, তার বাস্তব প্রয়োগ করতে লাগলেন। বাঙালির প্রধানতম সাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতিমান তো হলেনই, সেই সঙ্গে উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংকট ও সমাধানের সঙ্গে জড়িয়ে গেলেন নিবিড়ভাবে। ঘুরলেন প্রায় সারা পৃথিবী, ডব্লিউ. বি. ইয়েটস, রোটেনস্ট্যাইন, বার্ট্রান্ড রাসেল, আলবার্ট আইনস্ট্যাইন, জ্যাঁ পল সার্ত্রে, আলবেয়ার কাম্যু, রোমাঁ রোলাঁর মতো মনীষী চিন্তাবিদদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো, অর্জন করলেন একটা বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি। সেই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই অনুভব করলেন- পৃথিবী একটা উন্মত্ত জন্তুর মতো এগিয়ে যাচ্ছে মহাসমরের দিকে। ‘মানুষের কর্তব্য অন্য মানব সম্প্রদায় বা ব্যক্তিসমূহের সঙ্গে যুদ্ধ করা নয়, মানুষের কর্তব্য প্রীতি ও শান্তির বাতাবরণ রচনা করা এবং বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার সম্পর্ককে পুনরুজ্জীবিত করা। মানুষ তো কলহপ্রবণ পশু নয়!’ মানুষ আসলে পশুর চেয়েও পাশবিক; নইলে এক বিশ্বযুদ্ধের বিভৎসতা ও ভয়াবহতা দেখার পরও কীভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হতে পারে?

বর্তমানকালে আত্মসর্বস্বতা আমাদের প্রধান প্রবণতা হয়ে উঠেছে; এই আত্মসর্বস্বতা থেকেই আসছে বিচ্ছিন্নতা, বিচ্ছিন্নতা থেকে জন্ম নিচ্ছে যন্ত্রণা, ঈর্ষা ও ঘৃণা, সে থেকেই উৎপন্ন হচ্ছে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন- ‘এইসব বিভ্রান্তি একমাত্র তখনই অপসৃত হবে, যখন আমরা মানব মন্দিরের অন্তরতম প্রদেশে পৌঁছাবো, অর্থাৎ মানবপ্রেম ও মানব-ঐক্যকে অনুধাবন করতে সমর্থ হবো।’ কিন্তু মানবজাতি আদৌ কি সেটা অনুভব করবে? এমন সংশয়ে সান্ত্বনা দেন আবার রবীন্দ্রনাই- ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ।’

রবীন্দ্রনাথ এখনো বাঙালির প্রধানতম চিন্তাবিদ। এখনো তিনি আছেন আমাদের সকল সংকটে ও তা থেকে উত্তরণের আশ্রয়স্থল হিসেবে। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর পেরিয়ে গেছে প্রায় সাত দশক, এই সময়প্রবাহে অজস্র পরিবর্তন ঘটে গেছে বাংলা সাহিত্যে, ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতিতে, বিশাল বৈশ্বিক অঙ্গনে। এখন আর কেউ রবীন্দ্রনাথের মতো লেখেন না; রবীন্দ্রনাথের রোম্যান্টিসিজমকে অস্বীকার করে শুরু হয়েছিলো বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ, এখন চলছে উত্তরাধুনিক যুগ। তাই বলে এটা ভাবার কোনো উপায় নেই, রবীন্দ্রকাব্যের মতো সমাজ-সংস্কৃতি-সভ্যতা নিয়ে তার দর্শন ও ভাবনাও বিগত হয়ে গেছে। বরং দিন দিন রবীন্দ্রনাথ আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন। যত বেশি রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক সংঘাত সৃষ্টি হচ্ছে, যত বেশি বাড়ছে ধর্মীয় সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, সংখ্যালঘু নির্যাতন, ততই রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠছেন মুক্তিপথের দিশারী; আর তাই তো তার কাছেই ভক্তিভরে শিখে নিতে চাই সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতা আর প্রেমের পাঠ। এ পাঠের জন্য অনিবার্য হয়ে ওঠে বিপুল রবীন্দ্রসাহিত্যের গলি-ঘুঁপচি অন্বেষণ। ক্লান্তিহীন পরিব্রাজকের মতো অন্বেষণে অন্বেষণে ফিরি।

প্রায় আশি বছরের আয়ুষ্কালে রবীন্দ্রনাথ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সৃষ্টিশীল ছিলেন। এ সুদীর্ঘ সৃজনশীল পথপরিক্রমায় রবীন্দ্রনাথের চিন্তার বিবর্তন ঘটেছে অনেকবার। পাষাণ জড়বস্তুর মতো তিনি এক জায়গায় আটকে থাকেননি। অনিবার্য পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তিনি নিজেকে ভেঙেছেন, গড়েছেন। তবে পরিবর্তন গ্রহণে আবেগের আতিশয্য কিংবা হঠকারিতা ছিলো না, প্রত্যেকটি পরিবর্তনকে অত্যন্ত ধীর, শান্ত আর সুচিন্তিতভাবে তিনি গ্রহণ করেছিলেন। অবশ্য কিছু পরিবর্তন ছিলো স্বতঃস্ফূর্ত। ১২৮৮ বঙ্গাব্দে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে ‘মরণ’ নামে যে কবিতাটি লিখলেন, সেখানে কী দার্শনিক স্থৈর্যে মৃত্যুকে তিনি স্বাগত জানাচ্ছেন-

“মরণ রে,

তুঁহুঁ মম শ্যামসমান।

মেঘবরণ তুঝ, মেঘজটাজুট,

রক্ত কমলকর, রক্ত অধরপুট,

তাপবিমোচন করুণ কোর তব

মৃত্যু-অমৃত করে দান।

তুঁহুঁ মম শ্যামসমান।।”

[মরণ : ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী]

অথচ মাত্র পাঁচ বছর পরে ‘প্রাণ’ নামে যে কবিতাটি লিখলেন, সেখানে তার চিন্তার স্বতঃস্ফূর্ত বিবর্তন সুস্পষ্ট হয়ে উঠলো-

“মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,

মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।

এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে

জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই!

ধরায় প্রাণের খেলা চিরতরঙ্গিত,

বিরহ মিলন কত হাসি-অশ্রুময়-

মানবের সুখে-দুঃখে গাঁথিয়া সংগীত

যদি গো রচিতে পারি অমর-আলয়!”

[প্রাণ : কড়ি ও কোমল]

অর্থাৎ এই ক’বছরেই রবীন্দ্রনাথের জীবনতৃষ্ণা বেড়ে গেছে বহুগুণ!

আমাদের প্রাচীন সাহিত্য আদিরসাত্মক, শৃঙ্গাররস বা যৌনতার নিঃসঙ্কোচ ও পর্যাপ্ত ব্যবহার হয়েছে সেখানে। ‘বৈষ্ণব পদাবলী’র কবি জ্ঞানদাসের বিখ্যাত আসঙ্গলিপ্সু কাব্যপঙ্ক্তি- ‘রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর, প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর।’ রবীন্দ্রনাথের প্রথম দিকের কিছু কবিতায় দেহাত্ম আকুলতাই প্রকাশ পেয়েছে, যেমন-

“অধরের কানে যেন অধরের ভাষা,

দোঁহার হৃদয় যেন দোঁহে পান করে-

গৃহ ছেড়ে নিরুদ্দেশ দুটি ভালোবাসা

তীর্থযাত্রা করিয়াছে অধরসংগমে।

দুইটি তরঙ্গ উঠি প্রেমের নিয়মে

ভাঙিয়া মিলিয়া যায় দুইটি অধরে।

ব্যাকুল বাসনা দুটি চাহে পরস্পরে-

দেহের সীমায় আসি দুজনের দেখা।

প্রেম লিখিতেছে গান কোমল আখরে-

অধরেতে থরে থরে চুম্বনের লেখা।

দুখানি অধর হতে কুসুমচয়ন-

মালিকা গাঁথিবে বুঝি ফিরে গিয়ে ঘরে!

দুটি অধরের এই মধুর মিলন

দুইটি হাসির রাঙা বাসরশয়ন।”

[চুম্বন : কড়ি ও কোমল]

অথবা-

“কাহারে জড়াতে চাহে দুটি বাহুলতা-

কাহারে কাঁদিয়া বলে, ‘যেয়ো না, যেয়ো না!’

কেমনে প্রকাশ করে ব্যাকুল বাসনা,

কে শুনেছে বাহুর নীরব আকুলতা!

কোথা হতে নিয়ে আসে হৃদয়ের কথা,

গায়ে লিখে দিয়ে যায় পুলক-অক্ষরে।

পরশে বহিয়া আনে মরমবারতা,

মোহ মেখে রেখে যায় প্রাণের ভিতরে।

কণ্ঠ হতে উতারিয়া যৌবনের মালা

দুইটি আঙুলে ধরি তুলি দেয় গলে।

দুটি বাহু বহি আনে হৃদয়ের ডালা,

রেখে দিয়ে যায় যেন চরণের তলে।

লতায়ে থাকুক বুকে চির-আলিঙ্গন,

ছিঁড়ো না, ছিঁড়ো না দুটি বাহুর বন্ধন।”

[বাহু : কড়ি ও কোমল]

কিন্তু খুব দ্রুতই রবীন্দ্রনাথের প্রেমচেতনা দেহাত্মবাদী স্তর থেকে দেহাতীত স্তরে উঠে গেলো। পরবর্তী ‘মানসী’, ‘সোনার তরী’, ‘চিত্রা’, ‘চৈতালি’, ‘কল্পনা’ কিংবা ‘মহুয়া’ কাব্যের কবিতাগুলো দেহবাদী প্রেমের প্রকাশ নয়, বরং দেহাতীত এক আধ্যাত্মিক প্রেমচৈতন্যেরই বলিষ্ঠ উদ্ভাস। ‘চতুরঙ্গ’ বা ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে যে প্রেম, ‘একরাত্রি’, ‘সমাপ্তি’, ‘নষ্টনীড়’, ‘রবিবার’ কিংবা ‘ল্যাবরেটরি’ ছোটগল্পে যে প্রেম, মানবিক প্রেমের সঙ্গে মরমিয়াবাদ সংমিশ্রণের গূঢ়ৈষণা ছাড়া আর কিছু নয়। রবীন্দ্রনাথের সমগ্র কথাসাহিত্যে প্রেমের জৈবিক প্রকাশ শুধু চুম্বনেই সীমাবদ্ধ। ‘চতুরঙ্গ’ উপন্যাসে দামিনীর আসঙ্গলিপ্সার ব্যাকুলতার প্রত্যুত্তরে শচীশের নিস্পৃহতা, ‘শেষের কবিতা’য় অমিত ও লাবণ্যের প্রেমতত্ত্বের বাগাড়ম্বর, কিংবা ‘একরাত্রি’ গল্পে দুর্যোগের রাতে উঁচু টিলার উপর হারানো প্রেমিকার সঙ্গে সারারাত নির্বাক কাটিয়ে দেয়া- কথাসাহিত্যিকের একধরনের ঋষিসুলভ ঔদাসীন্য ও নৈর্ব্যক্তিকতারই পরিচায়ক। রবীন্দ্রনাথের এ প্রবণতা বোধ করি তার স্বভাবের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ নয়; হয়ত এ জন্যই সমালোচকরা সন্দেহ করেন, সমসাময়িককালে ভিক্টোরিয়ান ইউরোপে যে রোম্যান্টিক আন্দোলন চলছিলো, রবীন্দ্রনাথের প্রেমচেতনা ছিলো তারই বঙ্গদেশীয় সংস্করণ। ড. হুমায়ুন আজাদ ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রধান কবিতা’র ভূমিকায় যে দুঃসাহসী মূল্যায়নটি করেছেন এই বলে যে- ‘ইউরোপের শ্রেষ্ঠ পাঁচ রোম্যান্টিক কবি- শেলী, কীটস, কোলরিজ, বায়রন, ওয়ার্ডসওয়ার্থ-এদের যে সম্মিলিত সাফল্য, রবীন্দ্রনাথের একার সাফল্য তার চেয়ে বেশি’; বিতর্ক থাকতেই পারে মূল্যায়নটির যথার্থতা নিয়ে, কিন্তু বাংলা সাহিত্যের রোম্যান্টিক ধারার সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ কবির অভিধা রবীন্দ্রনাথেরই প্রাপ্য।

আজ যখন একবিংশ শতাব্দীর এই দ্বিতীয় দশকে বসে একটিও সফল আধুনিক কবিতা লেখার জন্য বিনিদ্র রাত্রিযাপন করি, সেই রোম্যান্টিক রবীন্দ্রনাথের কাছেই আমাকে বার বার ফিরে যেতে হয়, যে রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করার স্পর্ধাতেই শুরু হয়েছিলো বাংলা কবিতার আধুনিক যুগ। এর সবচেয়ে বড় কারণ বোধ করি এই বঙ্গ-ভূখণ্ডের প্রতি তার শেকড়সংলগ্নতা। যে পাঁচ মহারথীর হাত ধরে আধুনিক কাব্যযুগের সূচনা, তাদের বিরুদ্ধে একটি প্রতিষ্ঠিত অভিযোগ তো এই যে, তারা ছিলেন শেকড়বিচ্ছিন্ন, উন্মূল ও উন্নাসিক। অথচ কবির একটি দেশ থাকতে হয়, দাঁড়াবার জন্য নিজস্ব একটি ভূখণ্ড থাকতে হয়। আধুনিক পঞ্চকবির কাব্যভাষাটাই শুধু ছিলো বাংলা, এছাড়া উপমা-উৎপ্রেক্ষা-রূপকের বেশিরভাগ অংশই ইউরোপীয় ধাঁচের। কিন্তু শেকড় কেটে বেরোতে চায়লে কেবল রক্তাক্তই হতে হয়। হয়ত এ জন্যই এদেশে এখন যারা উত্তরাধুনিক কবিতার একটি তাত্ত্বিক দর্শন দাঁড় করাতে চান, তারা বার বারই শেকড় ও মৃত্তিকাসংলগ্নতাকেই মৌল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। নতুন এ তত্ত্বের প্রতি আমার অনাস্থা থাকতেই পারে, কিন্তু আমিও তো নিজস্ব ভূ-ভাগেই দাঁড়াতে চাই। ‘বিহঙ্গ’ বলতে আমি তো আমার দেশের দোয়েল পাখিটাকেই বোঝাতে চাই, মহাসাগরের জলীয় আকাশে উড্ডীন অ্যালবাট্রসের প্রতি আমার কোনো পক্ষপাত নেই। কবিতায় মিথের ব্যবহার করতে চায়লে আমার দেশীয় পুরাণের যে বিপুল সম্ভার সেটা ইউরোপীয় বা আফ্রিকান মিথের ভাঁড়ারে চুরি করার অপমান থেকে আমাকে বাঁচিয়ে দেয়। না, রবীন্দ্রনাথের মতো করে রবীন্দ্রনাথের ভাষাতে আজ আমি আর লিখবো না, কিন্তু যে জনপদ থেকে, যে জনমণ্ডলী থেকে রবীন্দ্রনাথ তার শিল্পসৃষ্টির উপাদান ও প্রেরণা সংগ্রহ করেছিলেন, সে জনপদ ও জনমণ্ডলীতে রয়েছে অধিকার আমারও।

রবীন্দ্রনাথের শিল্পসৃষ্টির আকুলতা ছিলো বিস্ময়কর। শুধু সাহিত্যেই নয়, চিত্রকলাতেও তার অপরিমেয় আগ্রহ ছিলো। শেষ জীবনে তার আঁকা প্রায় দু’হাজারের মতো চিত্রকর্ম তার প্রমাণ হয়ে আছে। কী একটা শিল্পঘোরের ভেতরে জীবন কাটিয়ে গেছেন রবীন্দ্রনাথ। দুঃখ-শোক, বিবাদ-বিসম্বাদ, প্রেম ও বিষাদ কোনোকিছুই রবীন্দ্রনাথের ঘোর কাটাতে পারেনি। কী এক অনির্দেশ্য তাড়নায় নিরঙ্কুশ শিল্পে সমর্পিত রবীন্দ্রনাথের শিল্পসত্য জীবন। তাহলে শিল্পসৃষ্টির একসমুদ্র তৃষ্ণা কি তার মিটেছিলো? বোধ হয় না, না হলে জীবনের সায়াহ্নকালে এসে কেন লিখলেন-

“তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছো আকীর্ণ করি

বিচিত্র ছলনাজালে

হে ছলনাময়ী!

মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছো নিপুণ হাতে

সরল জীবনে!

এই প্রবঞ্চনা দিয়ে মহত্ত্বেরে করেছ চিহ্নিত;

তার তরে রাখ নি গোপন রাত্রি।

তোমার জ্যোতিষ্ক তারে

যে পথ দেখায়

সে যে তার অন্তরের পথ,

সে যে চিরস্বচ্ছ,

সহজ বিশ্বাসে সে যে

করে তারে চিরসমুজ্জ্বল।

বাহিরে কুটিল হোক, অন্তরে সে ঋজু

এই নিয়ে তাহার গৌরব।

লোকে তারে বলে বিড়ম্বিত।

সত্যেরে সে পায়

আপন আলোকে-ধৌত অন্তরে অন্তরে।

কিছুতে পারে না তারে প্রবঞ্চিতে,

শেষ পুরস্কার নিয়ে যায় সে যে

আপন ভাণ্ডারে।

অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে

সে পায় তোমার হাতে

শান্তির অক্ষয় অধিকার।”

[তোমার সৃষ্টির পথ : শেষ লেখা]

কোনো শিল্পীরই হয়ত শিল্পসৃষ্টির পিপাসা মেটে না, এ পিপাসা মিটবার নয়!

যে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন ‘গতিই জীবন’, যে রবীন্দ্রনাথ নিরন্তর গতিশীলতায় মুহুর্মুহু নিজেকে অতিক্রম করে গেছেন, শিল্প-সাহিত্য-সংগীতের ত্রিবেণী সঙ্গমে বাঙালির শ্রেষ্ঠতম কর্মিপুরুষ যে রবীন্দ্রনাথ, সেই রবীন্দ্রনাথ আমার কাছে জীবনতৃষ্ণাসায়র। যাকে সামনে রেখে আমি বড় হতে শিখি, মহত্ত্ব শিখি, প্রেম শিখি, দুঃসাহস শিখি। বাঙালির শ্রেষ্ঠ স্বাপ্নিক রবীন্দ্রনাথ আমাকে আকাশের সমান স্বপ্ন নিয়ে প্রতিষ্ঠার প্ররোচণা দেন। একই সঙ্গে শেখান মাটি ও মানুষলগ্ন জীবন গড়ে তুলতে। রবীন্দ্রসাহিত্য, রবীন্দ্রসংগীত, রবীন্দ্রচিত্রকলা আমার মনোগহনে শিল্পপিপাসার জন্ম দেয়, অনুভব ও সংবেদনশীলতায় আমাকে মানবিক করে তোলে। আমি সৌন্দর্য চিনতে শিখি, সৌন্দর্য উপভোগ করতে শিখি, সৌন্দর্যকাতর হতে শিখি। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সৌন্দর্য, প্রভাত ও সন্ধ্যার সৌন্দর্য, রংধনুর সৌন্দর্য, কুয়াশার সৌন্দর্য, নারীর সৌন্দর্য- আগ্রাসী ক্ষুধার মতো আমাকে অপ্রকৃতিস্থ করে তোলে। আমি যখন বিষাদে বিপন্ন হই, প্রেম হারানোর যন্ত্রণায় ছটফট করি, রবীন্দ্রনাথ তখন আমার পাশে বসে সান্ত্বনা দেন। যখন চারপাশের ক্লেদ, ক্লিন্নতা, সংকীর্ণতা, প্রতিহিংসা আমাকে আক্রান্ত করে, রবীন্দ্রনাথ তখন হাত ধরে সে পাঁক থেকে আমাকে বের করে নিয়ে আসেন। বিশ্বপ্রকৃতিতে আমার অস্তিত্ব প্রাণিকুলের অস্তিত্বের সঙ্গে বাঁধা, অ্যানশিয়েন্ট ম্যারিনারের মতো সে সমন্বিত অস্তিত্বের স্পন্দন আমাকে অনুভব করতে শিখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। তার কাছেই শিখেছি প্রকৃত পাঠ- প্রকৃতিকে, মানুষকে, জীবনকে, গ্রন্থকে। যে পাঠের নিরন্তরতাই আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী মানুষ হওয়ার পথে। বিরুদ্ধ সময় ও প্রেক্ষাপটের ঘূর্ণিজল ও চোরাবালিতে কবেই তলিয়ে যেতাম, যদি রবীন্দ্রনাথ আমার সহায় না হতেন। এই প্রায় অনুদ্ধারণীয় ধ্বংসবিন্দুতে দাঁড়িয়ে পূর্ণরিক্ত অস্তিত্বের পুনরুজ্জীবনে রবীন্দ্রনাথই আমার চিরায়ত উদ্ধার!

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড