• শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২, ১৮ আষাঢ় ১৪২৯  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কবি ও ছোটকাগজ সম্পাদক মাসুদার রহমান-এর সাথে আলাপচারিতা (তৃতীয় পর্ব)

  তৌহিদ ইমাম

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:০৬
কবি-সম্পাদক মাসুদার রহমান
মাসুদার রহমানের প্রতিকৃতি (পোর্ট্রেট : শিল্পী মৌমিতা ভট্টাচার্য)

তৌহিদ ইমাম : আপনার কাছে কবিতা কী? ব্যাখ্যা শুনতে চাইছি না, উপলব্ধিটুকু শুনতে চাই।

মাসুদার রহমান : কবিতা কী, কেন, কীভাবে- এই প্রশ্নমালার কোনো নির্দিষ্ট উত্তর কবির হাতে নেই। তাই বোধ করি, প্রশ্ন করা আর উত্তর খোঁজা এক কবিজীবন। এক একটি দিন এক একরকমভাবে আসে প্রশ্নগুলো। কোনো দিন সমুদ্রের শান্ত সেই অঞ্চলের মতো কেবল অতলতা আলস্য বিছিয়ে রাখে, আবার কোনো দিন উত্তাল এক সমুদ্র, আছড়ে পড়ে প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন। কিন্তু উত্তর? উত্তর সে যাই হোক, প্রশ্ন করতে পারাটাই মুখ্য; উত্তর হয়ত গৌণ। নতুন লিখতে আসা তরুণের কাছে এটি খুব স্বাভাবিক, তার যথেষ্ট অগ্রজ সামান্য অগ্রজ কিংবা সমসাময়িকরা পর্যন্ত তাকে শেখাতে থাকেন- কী লিখতে হবে কী লেখা উচিত। এমনকি কী পড়তে হবে কী পড়া উচিত তা নিয়েও বলতে থাকেন। ধারণা তৈরি করে দিতে থাকেন কবিতা কী। অনেক ক্ষেত্রে চাপিয়ে দেবার মতো। তারপরও একজন কবির কবিতা নির্মাণ কিংবা কবিতাকেন্দ্রিক চিন্তা-ভাবনা অন্যজন থেকে সামান্য হলেও আলাদা হবেই। বিস্তরও হতে পারে। প্রকাশ্য কবিত্ব কবিতার বড় শত্রু। সেটি এক অদেখলাপনা ও মূর্খতা ছাড়া আর কী হতে পারে? শব্দ বাক্য ধরে কবিতার অর্থ খোঁজা লোকজনের প্রসঙ্গে আদিবাসীদের বন্যপশু শিকারের একটি দৃশ্য মনে পড়ে। ধান কাটা-মাড়াইয়ের পর শীতকালে যখন হাতে তেমন কাজ থাকে না, দল বেঁধে প্রতিবেশী বিধুয়া টপ্পদা তীরধনুক বল্লম সুড়কি হাতে বেরিয়ে পড়েন শিকারে। সেবার গ্রামের পাশে শুকনো খালের পাড়ে ওদের এক অদ্ভুত শিকারকৌশল দেখেছিলাম। পাড়ের উপর থেকে নিঃশব্দে খালের তলদেশ পর্যবেক্ষণ করে সরে এসে পজিশন নিলেন বিধুয়া টপ্প। আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সতর্ক পজিশনে বিধুয়ার শিকারী দলবল। বিধুয়া ধনুকে তীর লাগিয়ে টার্গেট করলেন আকাশের দিকে। সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে আমরা যারা এই শিকারপর্ব উপভোগ করতে এসেছিলাম, তারা বুঝতে চেষ্টা করলাম উড়তে থাকা কোন পাখি নিশানা করছে বিধুয়া টপ্প। তীর ছুঁড়লেন বিধুয়া। দেখছি তীর উঠে যাচ্ছে আকাশের দিকে; কিন্তু কোথায় (?) তীর কোনো কিছুকেই বিদ্ধ না করে ফিরে আসছে। তীরটি গিয়ে পড়লো খালের তলদেশে। এবার খালের নিচে একটা গোঙানির শব্দ। একটা ছটফটানি। সেদিকে দৌড় লাগালো বিধুয়া টপ্পর শিকার সহযোগীরা। দেখি হইচই আনন্দ করে টেনে আনছে তীরবিদ্ধ একটি ধাড়ি শেয়াল। তাহলে কি শেয়াল পাখা মেলেছিলো আকাশে? আকাশে তীর ছুঁড়ে একটি শেয়ালে বিদ্ধ করা কীভাবে? কীভাবে? কবিতার পাঠকমাত্র জানেন, কবি তো ওই বিধুয়া টপ্প!

তৌহিদ ইমাম : পোয়েট্রি ইজ দ্য সুপ্রিম ফর্ম অব আর্ট- দাবিটি মূলত কবিরাই করেন। আপনার কী মনে হয়, এ কি নিছকই অহংবোধ, নাকি এর বাস্তবসম্মত ভিত্তি আছে?

মাসুদার রহমান : ‘এমন দাবি একজন কবিই করেন’- তোমার এই কথার মধ্যেই এর উত্তর অনেকটা রয়ে গেছে। কবিতার দুর্বোধ্যতা নিয়ে অভিযোগ প্রায় চিরদিনের। সেখানে একজন সাধারণ মানুষ, যে কোনোভাবেই কবিতার পাঠক নয়, তার নিকট থেকে কবিতা নিয়ে এমন অভিমত প্রত্যাশা করার কোনো অর্থই হয় না, উচিতও নয়। কবি বা কবিতাবোদ্ধা ‘পোয়েট্রি ইজ দ্য সুপ্রিম ফর্ম অব আর্ট’ বললে অবাক হবার কিছু নেই। তার উপলব্ধি থেকেই হয়ত তিনি বলছেন। পাহাড়ের উপরের থেকে কোনো দৃশ্য বা বস্তুকে পাহাড়ের মালভূমি কিংবা দূরের সমতলে দাঁড়িয়ে অবলোকন করা সম্ভব? কবিতাকে উপলব্ধি করতে হলে একজন পাঠককে তার জন্য একটা প্রস্তুতিপর্ব পেরিয়ে আসতে হয়। পাহাড়ে উঠে পাহাড়ের উপরের দৃশ্য দেখার মতোই। কবিতা কম মানুষই পড়েন, সেও বোধ করি খারাপ কিছু না। সবাই কবিতা পড়বেন, এমনটি চাওয়া মোটেও ঠিক না। সার্বজনীন যা কিছু তা সহজ হবার কথা। তারপরও ‘সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা’ তাকেও শতভাগ সার্বজনীন করা গেলো কি?

তৌহিদ ইমাম : আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হাটের কবিতা’, বেরিয়েছিলো ২০১০ সালে, ঢাকার পাঠসূত্র প্রকাশনী থেকে। সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘চাঁদের বই’ বেরিয়েছে ২০২০ সালে, কলকাতার ঐহিক প্রকাশনী থেকে। মাঝখানে প্রায় আটটি কাব্যগ্রন্থ বেরিয়ে গেছে। কিন্তু প্রথম বই প্রকাশের পূর্বেও প্রায় দেড় দশক আপনি একটানা লেখালেখি করে গেছেন। সব মিলিয়ে এই যে আড়াই দশকের পোয়েটিক জার্নি, আপনি কি মনে করেন, একটা স্বতন্ত্র কাব্যস্বর আপনি অর্জন করেছেন?

মাসুদার রহমান : আমার সবকিছু একটু দেরিতেই হয়, বইয়ের ক্ষেত্রেও ঘটেছিলো বিষয়টি। আড়াই দশকের কবিতা জার্নির ভিতর দিয়ে নিজস্ব কাব্যস্বর অর্জন করতে পেরেছি কিনা তা পাঠক জানেন। তুমি নিজেও বলতে পারো। কিংবা কখনো সখনো যারা আমার কাব্যভাষা স্বতন্ত্র বলেছেন/বলছেন, তাদের জিজ্ঞেস করে দেখো, কেন তারা এমনটি বলছেন?

তৌহিদ ইমাম : শিশুসাহিত্যেও আপনি বেশ স্বচ্ছন্দ। কাব্যগ্রন্থের পাশাপাশি তিনটি ছড়াগ্রন্থও বেরিয়েছে আপনার। কবিতার মতোই আপনার ছড়াগুলোও বেশ ম্যাচিউরড। সেগুলো আমার ঠিক শিশু উপযোগী মনে হয় না। কিশোরসাহিত্য বলতেই আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবো। আপনার কী মনে হয়?

মাসুদার রহমান : ঠিকই বলেছো, তিনটি বই হয়েছে এ পর্যন্ত। আমি মনে করি, সকল কবি সাহিত্যিকের উচিত শিশুকিশোরদের জন্য কিছু কাজ করা। আজ শিশুকিশোর পাঠ-উপযোগী সাহিত্যকর্ম যা হচ্ছে তা নগণ্য, মানহীন। তারুণ্যের বিকাশে সাহিত্যের এই শাখাকে অস্বীকার করা যায় না। বিগত প্রজন্মের প্রায় সকল খ্যাতিমান কবিসাহিত্যিক ছোটদের সাহিত্যে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করেছেন। তরুণ সমাজ উচ্ছন্নে গেছে বলে গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছি; কিন্তু ওদের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য কী কী করছি আমরা? আবার সাহিত্যে ঢের ঢের পাঠক প্রত্যাশা করছি, তার জন্য তো শিশুকিশোরদের শিল্পসাহিত্যের আনন্দের পৃথিবীতে টানতে হবে। ছোটদের জন্য লেখা সত্যি কঠিন। হয়ত ঠিকই বলেছো, আমার এই কাজগুলো কিশোরপাঠ্য উপযোগীই।

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড