• শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২, ১৮ আষাঢ় ১৪২৯  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কবি ও ছোটকাগজ সম্পাদক মাসুদার রহমান-এর সাথে আলাপচারিতা (দ্বিতীয় পর্ব)

  তৌহিদ ইমাম

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১১:৪৮
কবি-সম্পাদক মাসুদার রহমান
মাসুদার রহমানের প্রতিকৃতি (ছবি : সংগৃহীত)

তৌহিদ ইমাম : আজন্ম সোনাপাড়ায় কাটিয়ে দিলেন। তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়), ছিলো আপনার উচ্চতর শিক্ষাক্ষেত্র। শিক্ষাজীবন শেষ করে সেই যে সোনাপাড়ায় ফিরলেন, আপন আলয় থেকে আর বেরুলেন না। কী নীরবে এখনো সৃষ্টিশীলতাকে যাপন করে যাচ্ছেন! এই যাপনের পেছনে বিশেষ কোনো দর্শন কি কাজ করেছে আপনার?

মাসুদার রহমান : হ্যাঁ, ফিরেছি ইচ্ছে করেই। অস্বীকার করবো না, নগরজীবন থেকে অনেক কিছু শিখেছিলাম। গ্রামে ফিরে সাহিত্য করবার সাহসও পেয়েছিলাম সে জীবন অভিজ্ঞতা থেকেই। দুটো জীবনধারার মিলমিশেই বোধ করি একটি আধুনিকতা দাঁড়িয়ে যায়। প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিকতাকেও যেমন এড়িয়ে যাওয়া যায় না, আবার প্রকৃতিকে ভুলে গিয়ে শিকড়কে বাদ দিয়ে আধুনিকতা সম্পূর্ণ হবার নয়। শিল্পের জন্য কবিতার জন্য যাপন অনিবার্য। মনে করি, ‘কবিতা লিখে এখন আর কেউ সেলিব্রেটি হবে না’- এই বিশ্বাস ধারণের পরও যদি কাউকে কবিতা তাড়িত করে, কবিতা তাকে বেঁচে থাকার অক্সিজেন যোগায়, তাহলেই কবিতা তার জন্য অনিবার্য।

তৌহিদ ইমাম : কেমন ছিলো আপনার তারুণ্যের কবিতাযাপন?

মাসুদার রহমান : যে সময় সাগর নদীর প্রত্যাশা, সেই তারুণ্যে আমাদের সামনে ডোবানালাও ছিলো না। আর খুব বেশি বইপত্র তো হাতের কাছে ছিলোই না। স্কুল লাইব্রেরি থেকে প্রতি সপ্তাহে বই নিতাম। বেশিরভাগই নভেল। দু’তিনদিনেই পড়ে শেষ করে ফেলতাম। সপ্তাহের বাকি চার-পাঁচদিন বৃহস্পতিবার কবে আসবে তার অপেক্ষা করতাম। নেশা হলো। খোঁজ করে নিজ বাড়িতেও বই পেয়ে গিয়েছিলাম। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বাংলা প্রকাশনার বইপত্রিকাও কিছু পেয়েছিলাম। অসামান্য ছাপা কাগজ আর সরল গদ্যভাষা টেনে নিতো। স্কুলজীবনে দু’একটি পত্রিকায় লিখেছিলাম। বলাবাহুল্য, নিতান্ত কাঁচা হাতে অপরিণত লেখা। সে সময়েই কবিতা লিখতে আসা। সমসাময়িক একঝাঁক তরুণের সঙ্গে চিঠিপত্রে যোগাযোগ গড়ে উঠেছিলো। তাদের চিন্তা ও সামর্থ্য মতো ছোট ছোট কাগজ প্রকাশও করতো তারা। যেমন, কবি মুজিব ইরম তখন মুজিবুর রহমান মুজিব নামে পরিচিত ছিলো, ও সম্পাদনা করতো ‘কল্পতরু’ নামে একটি পত্রিকা। কবি শোয়াইব জিবরান পরিচিত ছিলো শোয়াইব আহমেদ শোয়েব নামে, ও সম্পাদনা করতো ‘ঊর্মি’ নামে একটি পত্রিকা। মির্জা তাহের জামিল সম্পাদনা করতো ‘নুন’ নামে একটি কাগজ। এসব কথা যখন বলছি, তখন একটি মজার ঘটনা মনে পড়ে গেলো। আমি তখন বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে ইন্টারমিডিয়েট পড়তে গেছি। মাস পরে বাড়ি ফিরে গেলে দেখতাম, বাড়ির ঠিকানায় তরুণদের প্রকাশিত কিছু কাগজ/পত্রিকা ডাকে এসেছে। আমি ফিরলে আব্বা তার ড্রয়ারে সংরক্ষিত সেই পত্রিকা চিঠিপত্র আমাকে দিতেন। একবার কোনো ছুটির পর বাড়ি ফিরে গিয়ে ৫/৭টি পত্রিকা ও চিঠি পেলাম। একটি ছোট্ট চিঠি খোলা খামে। আব্বা এবং মা দু’জনেই দেখিয়ে বললেন, ওটা ঝিনাইদহ থেকে এসেছে। বুঝলাম, খামের মুখ খোলা পেয়ে উনারা চিঠিটি হয়ত পড়ে নিয়েছেন। চিঠির প্রেরক জনৈক অশ্রু মিত্র, কলেজ রোড, ঝিনাইদহ। তেমন কিছুই নয়, দু’তিনটি লাইন। একদম উদ্দেশ্যহীন একটি চিরকুট। কিন্তু অশ্রু মিত্র নামটি বোঝায় প্রেরক একজন নারী। সব পত্রপত্রিকা টেবিলে থাকলেও চিরকুটটি সেদিনই উধাও হয়ে যায়। পরে বুঝেছি, আমার অভিভাবকদের কেউ তা সরিয়ে নিয়েছিলেন। হয়ত ভেবেছিলেন, একজন মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগের পরিণতি অন্য কিছুতে না গড়ায়। আসলে সেই ‘অশ্রু মিত্র’ ছিলো আজকের কবি টোকন ঠাকুর। ও পর পর অনেকগুলো নামে লিখেছে, যেমন- আকতারুজ্জামান টোকন, সাগর সৈকত, আরো দু’একটি; তো পরে এসে টোকন ঠাকুরে স্থির হয়েছে।

তৌহিদ ইমাম : বাংলা একাডেমিতে একসময় ‘তরুণ লেখক প্রকল্প’ চালু ছিলো। আমরা জানি, আপনি নিজেও সেই প্রকল্পের কোনো এক ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। কারা ছিলো আপনার সতীর্থ? সে সময়ের অভিজ্ঞতা কেমন? কারা ক্লাস নিতেন? একটু স্মৃতিচারণা কি করবেন?

মাসুদার রহমান : সবেমাত্র পড়াশুনা শেষ করে কাঠ-বেকারজীবনে অল্প সময়ের জন্য হলেও এক আর্থিক সাপোর্ট ছিলো সেই প্রজেক্ট। বাংলা একাডেমির ওই প্রজেক্টে আমরা এক এক ব্যাচে প্রায় ৪০ জন করে ছিলাম। আমাদের চতুর্থ ব্যাচ। তার আগে মুজিব ইরম, শোয়াইব জিবরান, শাহনাজ মুন্নি, রাখাল রাহা, বায়তুল্লাহ কাদরী, বদরুজ্জামান আলমগীর, চঞ্চল আশরাফ, রবিউল করিম, সাইমন জাকারিয়া, মির্জা তাহের জামিলসহ অজস্র কবি/লেখক কাজ করেছেন। আমাদের সময় টোকন ঠাকুর, আলফ্রেড খোকনের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। আমি গ্রাম থেকে আসা তরুণ, বাংলা একাডেমির ওই সময় অনেক সমৃদ্ধ সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। শওকত ওসমান, সরদার ফজলুল করিম, শামসুর রাহমান, অন্নদাশঙ্কর রায়, সেলিম আল দীন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ শামসুল হক, রফিক আজাদ, সেলিনা হোসেন, হায়াৎ মামুদ, রশীদ হায়দার, মমতাজ উদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, মুস্তফা নূর-উল ইসলাম, শওকত আলী, আব্দুল কুদ্দুস বয়াতী, ফরহাদ খান, বিশ্বজিৎ ঘোষ, আবদুল্লাহ্ আল মুতী প্রমুখ চিন্তক কবি সাহিত্যিকদের জীবনদর্শন কাব্যবোধ সাহিত্যচিন্তা সরাসরি তাদের থেকে জানতে পেরে ঋদ্ধ হয়েছিলাম। অনেকেই বলতে পারেন, এভাবে সাহিত্য হয় নাকি? হয়ত হয় না। তবে পড়া-জানার বিকল্প তো আর নেই। অস্বীকার কেন করবো, সে ক্ষেত্রে সুবিধা হয়েছিলো আমার।

তৌহিদ ইমাম : আপনার কী মনে হয়, সময়ই মূলত একজন লেখককে তৈরি করে, নাকি তার ভেতরের সংগুপ্ত সৃষ্টিশীলতার প্রেরণা?

মাসুদার রহমান : দুটোই। ধরলাম সময় একজনকে সুকান্ত ভট্টাচার্য বানিয়ে দিলো, কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে আরো কোটি মানুষ জীবনকে বয়ে নিয়েছে, তারা তো সবাই কবি/লেখক হয়ে উঠতে পারেনি। তাই মনে করি, ‘সময় এবং ভেতর থেকে পাওয়া সৃষ্টিশীলতার প্রেরণা’ দুটো মিলেই লেখক তৈরি হয়।

(ক্রমশ...)

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড