• শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২, ১৮ আষাঢ় ১৪২৯  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

একঘণ্টার গল্প

  কেট চপিন (অনুবাদ : শারমিন ইদ্রিস)

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:০৫
কেট চপিন
কেট চপিনের প্রতিকৃতি। ছবি : সংগৃহীত।

মিসেস ম্যালার্ডের হৃৎপিণ্ডের সমস্যার কথা সবাই জানতো, তাই তার স্বামীর মৃত্যুসংবাদ অনেক রয়ে সয়ে আস্তে ধীরে তাকে জানানো হলো।

এই খবর তাকে জানালো তার বোন জোসেফাইন; আকারে ইঙ্গিতে, রেখে ঢেকে, ভাঙা ভাঙা কথা দিয়ে, যা প্রকাশ করার চেয়ে লুকোলো বেশি। পাশে তার স্বামীর বন্ধু রিচার্ডও ছিলো। সে সেই খবরের কাগজের দফতরে ছিলো, যেখানে প্রথম রেল দুর্ঘটনার সংবাদ এসে পৌঁছেছিলো, সাথে এসেছিলো হতাহতের তালিকা- যার শুরুতেই ছিলো ব্রেন্ডলি ম্যালার্ডের নাম। দ্বিতীয় টেলিগ্রামের মাধ্যমে খবরটার সত্যতা নিশ্চিত করেই সে অতিদ্রুত ম্যালার্ডদের বাসায় চলে আসলো, যাতে অসাবধানী কম সহানুভূতিশীল কেউ আগে এসে এই দুঃসংবাদ দিয়ে বিপদ না ঘটায়।

অকস্মাৎ বড় ধরনের খারাপ খবর শুনে মেয়েরা যেমন ঘটনার অবিশ্বাস্যতায় হতভম্ব ও বিহ্বল হয়ে পড়ে, মিসেস ম্যালার্ডের প্রতিক্রিয়া তেমন হলো না। খবর শোনার সাথে সাথে সে তার বোনকে জড়িয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো। কান্নার দমক কিছুটা কমে আসার পর ‘কেউ যেন তাকে অনুসরণ না করে’ এই নির্দেশ দিয়ে সে নিজের রুমে গিয়ে দ্বাররুদ্ধ করলো। রুমে খোলা জানালার পাশে একটি বড় সড় আরামদায়ক চেয়ার। চেয়ারে বসে সে হাতের ভিতরে মাথা গুঁজলো। প্রচণ্ড ক্লান্তি তাকে চেপে ধরেছে, শরীর ছেড়ে দিয়ে যেন আত্মার ভিতরে প্রবেশ করেছে।

খোলা জানালা দিয়ে তাকিয়ে সে দেখতে পেলো বাসার সামনের জায়গাটায় নবজীবনের ছোঁয়া পাওয়া সদ্যস্নাত গাছগুলির মাথা। বাতাসে বৃষ্টির পাগল করা সোঁদাগন্ধ। নিচে রাস্তায় এক ফেরিওয়ালা চিৎকার করে তার জিনিস বিক্রি করছে। অনেক দূর থেকে একটি গানের ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে, আর ভেসে আসছে আশপাশের ঝোঁপ থেকে অসংখ্য চড়ুইপাখির কিচিরমিচির। জানালার সামনে আকাশে মেঘগুলো হুমড়ি খেয়ে একে উপরের উপর পড়ছে, আর তার ফাঁকে ফাঁকে ঘন নীল আকাশের ঝলক দেখা যাচ্ছে।

সে চেয়ারের উপর মাথা এলিয়ে দিয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চল হয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকলো; শুধুমাত্র মাঝে মাঝে কান্নার দমক এসে তাকে কাঁপিয়ে যেতে লাগলো, অনেকটা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়া সেই শিশুর মতন- যে স্বপ্নের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ ফুঁপিয়ে উঠে। তার বয়স খুব একটা বেশি না, চেহারাটা শান্ত ও সুন্দর, চেহারার রেখাগুলোতে ফুটে আছে অবদমন ও কিছুটা শক্তিমত্তার চিহ্ন। কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে তার দৃষ্টি ছিলো প্রাণহীন এবং অনেক দূরে আকাশের নীলে আটকানো। এই দৃষ্টি গভীর চিন্তার দৃষ্টি নয়, বরং চিন্তাবিবর্জিত বোধশক্তিহীন দৃষ্টি। একটা কিছু তার কাছে আসছিলো, আর সেটার জন্য সে আশঙ্কার সাথে অপেক্ষা করছিলো। কী সেটা? সে জানে না, এই সূক্ষ্ম ও অস্পষ্ট কিছুর নাম দেওয়ার ক্ষমতা তার ছিলো না। কিন্তু রন্ধ্রে রন্ধ্রে সেটা সে অনুভব করছিলো, নীল আকাশ থেকে ধীরে ধীরে নিঃসৃত হয়ে রঙিন বাতাসের শব্দ ও গন্ধের উপর ভর করে সেটা তার দিকে ধেয়ে আসছিলো।

প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে তার বুকে উথালপাথাল ঝড় উঠছিলো। যে অনুভূতি তাকে ছেয়ে ফেলার, গিলে ফেলার চেষ্টা করছিলো, তা সে শনাক্ত করতে পেরেছিলো আর তার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সে তার সমস্ত ইচ্ছাশক্তি দিয়ে যুঝে যাচ্ছিলো। কিন্তু তার ফর্সা শীর্ণ হাত দ্বারা প্রতিরোধের চেষ্টার মতোই অক্ষম, দুর্বল, ব্যর্থ সে চেষ্টা।

অবশেষে সে হাল ছেড়ে দিলো। তার ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে নিঃশ্বাসের সাথে অস্ফুট বেরিয়ে এলো, ‘মুক্তি! মুক্তি! মুক্তি!’ এ কথা উচ্চারণের সাথে সাথে তার চোখে যে শূন্যদৃষ্টি ও মনে যে আতঙ্কের সৃষ্টি হলো, তা মিলিয়ে যেতে বেশি সময় লাগলো না। তার চোখের ঔজ্জ্বল্য ও তীক্ষ্ণতা বেড়ে গেলো, শিরা ধমনী নাচানাচি করতে লাগলো, শরীরের প্রতিটি অংশে রক্তকণিকা সঞ্চালিত হয়ে তাকে উষ্ণতায় ভরিয়ে দিলো। এই আনন্দ পৈশাচিক, নাকি না- এ প্রশ্ন মনে আসার কোনো অবকাশ সে দিলো না। দ্বিধাহীন চিত্তে এই ভাবনাকে সে অহেতুক বলে উড়িয়ে দিলো। সে এটা জানে, যখন যত্নবান কোমল হাতগুলো লাশের উপরে ভাঁজ করা অবস্থায় দেখবে, তখন তার নির্ঘাত চোখে পানি আসবে; যে চেহারা কখনো ভালোবাসা ছাড়া তার দিকে তাকায়নি, সে চেহারা হবে নিশ্চল, ধূসর, মৃত। কিন্তু সেই কষ্টের মুহূর্তকে পেরিয়ে পরবর্তী লম্বা জীবনটা সে দিব্যচোখে দেখতে পেলো, যা একান্ত তারই হবে। দুই বাহু প্রসারিত করে হাত বাড়িয়ে সেই সময়টুকুকে সে স্বাগত জানালো।

সামনের বছরগুলোতে আর কারো জন্য তাকে বাঁচতে হবে না; সে বাঁচবে নিজের জন্য। প্রবল ইচ্ছাশক্তির অন্ধ প্রচণ্ড জিদ- যা পুরুষ বা নারীদের এই ধারণা দেয় যে, নিজেদের ইচ্ছা স্বজাতির অন্যান্যর উপর চাপিয়ে দেওয়ার পূর্ণ অধিকার তাদের আছে।

তার ইচ্ছাকে আর বশীভূত করে রাখবে না। সেই আলোকিত ক্ষণে সে বুঝতে পারলো যে, অভিপ্রায় খারাপ হোক বা ভালো, এ ধরনের কাজ সবসময়ই অপরাধ।

তারপরও সে ব্রেন্টলি ম্যালার্ডকে ভালোবেসেছিলো- কখনো কখনো। বেশিরভাগ সময় বাসেনি। কিন্তু এসব জিনিসে এখন কীবা আসে যায়? নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা এখন তার প্রবলতম আবেগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে- তার সামনে প্রেমের মতো দুর্জ্ঞেয় রহস্যময় আবেগ বড় তুচ্ছ। স্বাধীন! দেহ ও আত্মা দুটোই স্বাধীন! স্বাধীন! স্বাধীন! স্বাধীন!

জোসেফাইন বন্ধ দরজার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে বার বার রুমে ঢোকার জন্য অনুনয় করছিলো, “লুইসা, দরজাটা খোলো। পায়ে পড়ি তোমার। নিজেকে নিজে অসুস্থ বানিয়ে ফেলবে তো! কী করছো তুমি ভিতরে লুইসা? খোদার দোহাই দরজাটা খোলো!’’ “চলে যাও জোসেফাইন, আমি নিজেকে অসুস্থ করছি না।”

না, সে তো সেই খোলা জানালা দিয়ে জীবনের অমৃতসুধা পান করছিলো।

আগামী দিনগুলোর জন্য তার পরিকল্পনাগুলো লাগাম ছেড়ে দৌড় দিচ্ছিলো। সামনের বসন্তের দিন, গ্রীষ্মের দিন, সব ধরনের দিন এখন তার নিজস্ব দিন। নিঃশ্বাসের সাথে প্রার্থনা বেরিয়ে এলো, যেন তার জীবনটা অনেক লম্বা হয়। মাত্র গতকাল সে শিউরে উঠেছিলো এই ভেবে- যদি তার জীবনটা অনেক লম্বা হয়! তার বোনের কাকুতি মিনতির মুখে অবশেষে সে গিয়ে দরজা খুললো। তার চোখে জ্বলছে বিজয়ের এক অস্থির বিকারগ্রস্ত উন্মত্ততা, নিজের অজান্তেই তার পদক্ষেপ ছিলো যুদ্ধজয়ী দেবীর মতো। বের হয়ে সে তার বোনের কোমর জড়িয়ে ধরলো এবং একসাথে সিঁড়ি বেয়ে নামা শুরু করলো। সিঁড়ির গোড়ায় রিচার্ড অপেক্ষা করছিলো।

কেউ একজন বাইরে থেকে চাবি ঘুরিয়ে দরজাটা খুললো। প্রবেশ করলেন ব্রেন্টনি ম্যালার্ড, কিছুটা ভ্রমণক্লান্ত অবস্থায় হাতে ছাতা ও ব্যাগ নিয়ে। দুর্ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে তিনি ছিলেন, এই দুর্ঘটনা সম্বন্ধে তিনি কিছুই জানতেন না।

জোসেফাইনের গগনবিদারী আর্তনাদ শুনে ও রিচার্ডের দ্রুতগতিতে তাকে তার বউয়ের কাছ থেকে আড়ালের চেষ্টা দেখে তিনি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন।

ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে রায় দিলেন- মিসেস ম্যালার্ডের মৃত্যুর কারণ হার্টফেল, খুব সম্ভবত অতিরিক্ত খুশিতে।

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড