• শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২, ১৮ আষাঢ় ১৪২৯  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

হুমায়ূন আহমেদ  লিখলেন, ‘আজ আমি কোথাও যাবো না’

  ইফতেখার মাহমুদ

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১৩:১৭
হুমায়ূন আহমেদের প্রতিকৃতি। ছবি : সংগৃহীত

১.

হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাসের নাম রাখলেন আজ আমি কোথাও যাবো না প্রায় ১৩ বছর আগে, ১৯৮৯ সালে, ‘হোটেল গ্রেভার ইননামের ভ্রমণগাথা গুলতেকিনকে উৎসর্গ করে পরের পাতায় কবি নির্মলেন্দু গুণের জীবনের প্রথম বরফকবিতাটির কয়েকটি লাইন উল্লেখ করেন। শেষ দুলাইন হল- “... আজ আমি কোথাও যাবো না আজ শুধু বরফের সাথে খেলা।

প্রায় ১৩ বছর পর ২০০২ সালের লেখা উপন্যাসের নাম রাখলেন- আজ আমি কোথাও যাবো না লেখক হিসেবে হুমায়ূন আহমেদকে কিছুটা কবিতানুরাগী এবং এবং কিছুটা সংযমী হয়ত মানা যেতে পারে।

উপন্যাসটির মূল গল্পে জয়নাল নামের একজন অতিরিক্ত লম্বা, অতিরিক্ত রোগা মানুষ আমেরিকা যাবার প্রাণান্তকর চেষ্টা করতে থাকে। শামসুদ্দিন নামের একজন প্রবীণের সাথে এই আমেরিকা যাওয়া নিয়েই তার পরিচয় হয়। দুই বয়সী দুজনের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এদের আশ্চর্য মায়াভরা সম্পর্কই এই উপন্যাসের সবকিছু।

শামসুদ্দিন সাহেব তার অনাপন বোন রাহেলার বাসায় থাকেন। এখানে আরেকটি পোক্ত শাখাগল্প তৈরি হয়। ইতি নামের অপরূপ মেয়েটির সাথে জয়নালের প্রেমময় বিয়ের দিকটি হলো ভালোবাসাভরা আরেক শাখাগল্প।

উপন্যাসের শেষ দৃশ্যে একজন মৃত্যুশয্যায় পৌঁছুলে, সেই মৃত্যুকে নিজের সবচে প্রিয় জিনিসের বদলে আরেকজন বদলে নিতে চায়- এই রকম অতি অবাস্তব এক নাটকীয় গল্পের নাম- আজ আমি কোথাও যাবো না কোথাও না যাওয়ার প্রতিজ্ঞার গল্প। পরিশিষ্টে গল্পকে মনভুলানিয়া রোমান্টিক হতে দেখে সিরিয়াস পাঠক বিরক্তই হয়ত হবেন, অগভীর অন্যদের হয়ত গভীর আনন্দে চোখে জল এসে যাবে।

আজ আমি কোথাও যাবো নাযখন আমি পড়ি তখন আমার বয়স বাইশ। ভালো করে জীবন দেখার চেষ্টা করছি। নানারকম করে। এই অতি সাধারণ লেখাটা আমার মনের মধ্যে ঢুকে গভীরে প্রোথিত হয়ে গেলো।

চিরদিনের জন্য আমার একটা বদল ঘটে গেল। জীবনের মানে বুঝতে পারার দিকে এগুলাম। নিজের জানালা নিজেই খুলে নিজের আকাশটা দেখে নিলাম। এখনও দেখি।

আজও আমি আজ আমি কোথাও যাবো না’- গভীর শক্তিকে মনে টের পাই। ভালো করেই। হুমায়ূন আহমেদের কালে জন্ম নেয়া এই জীবনটাকে মাঝে মাঝে আমার আরো ঐশ্চর্যময়, আরো বিপুল মনে হয়। বইয়ের শুরুতে দুটো অদ্ভুত লাইন লেখা আছে- অনেকেরই হয়ত মনে আছে, তবুও উল্লেখ করছি- “Man’s main task in life is to give birth to himself, to become what he potentially is. The most important product of his effort is his own personality”. – Erich Fromm (Man for himself)

পুরো উপন্যাস জুড়ে গল্পে গল্পে এই কথাটাই বলা হয়েছে। হৃদয়ের শোন, হৃদয়ের ভুল নেই কোন।

২.

আরেকটু বিস্তারিত করে দুএকটা কথা বলা যাক। উপন্যাসটিতে রাহেলার মনস্তাত্ত্বিক দিকটি লক্ষ্যণীয়। রাহেলা সন্তানসম্ভবা। তীব্র অর্থকষ্টের সংসারে আশু দুঃখমোচনের কোন লক্ষণ নাই। এহেন পরিস্থিতিতে মুক্তির স্বাদ পেতে কল্পনার জগতের সাথে বাস্তবের ভেদ ঘুচিয়ে দেয় সে। অনবরত মিথ্যা গল্পকথা বলা শুরু করে।

যে কথা সে ভাবে, যে কথা অন্যেরা ভাবতে পারে, যে গল্প তার আকাঙ্ক্ষার বা আশংকার- সব কিছু মিহি সুতোয় গেঁথে মিথ্যের থালায় করে পরিবেশন করা শুরু করে। তার স্বামী রাতে বুয়ার ঘরে গিয়েছিল, সে গিয়ে দেখে দরোজা ভেতর থেকে বন্ধ করা- এইসব কথা যেমন তার ভাই শামসুদ্দিনকে বলে, আবার স্বামী রফিককে বলে এই ভাই আসলে তার ভাই না, তার সাথে ছোটবেলায় রাহেলার বিয়ে হয়েছিল, তাই শামসুদ্দিন আসলে তার ভাইয়ের চেয়েও আলাদা কিছু।

সংসারে অভাবের নমুনা দিতে গিয়ে জানায় যে টিভি সারানোর নাম করে তারা বিক্রি করে দিয়েছে, অথচ কদিন পর ঠিকই টিভি ফিরে এলে পাঠক বুঝতে পারে রাহেলার মনের করুণ অসহায়ত্ব। নিঃসঙ্গতা তাকে হীন করে দিয়েছে। দারিদ্র্য করেছে কোণঠাসা।

সন্তান পেটে নিয়ে আরেক আগত সদস্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই শহরে হাজার নিম্নবিত্ত তরুণী মায়েরা এইরকমই হয়ত করে। হুমায়ূন আহমেদ তাত্ত্বিক নন, তাই বইয়ে তত্ত্বকথা নেই। কিন্তু শহরের সংকট দারিদ্র্যের কালিতে শুধু লেখা হয় না, নিউক্লিয়ার পরিবারগুলোর নির্মম নিঃসঙ্গতা সেই লেখায় ঘিচিমিচি করে কাটাকুটি করে দুর্বোধ্য করে দিয়ে যায়।

রাহেলা তার বড় ছেলে পৃথুর সাথে, রফিকের সাথে, বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়ে রাতে থাকতে যাওয়া বান্ধবীর সাথে যে আচরণ করে, রাহেলা অচেনা থাকে না আর। গভীরের মধ্যে যে অধরা গভীর থাকে, পাঠক অনেকক্ষণ সেখানে দিকশূন্য অবশ পড়ে থাকে- অচেনা মানব চরিত্র তাকে থিতু করে রাখে। চমকে ওঠার জীবন তো সে আরো আগেই পার করে এসেছে।

৩.

শামসুদ্দিন সাহেবের মত আর কি কোন চরিত্র আছে বাংলা সাহিত্যে, যিনি এই রকম অনবরত হাঁচি দেন? দিতেই থাকেন। হাঁচি দেয়া এই উপন্যাসের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গও বটে। ‘Excessive Sneezing’ লিখে গুগল করলে চিকিৎসা শাস্ত্রে আগ্রহীরা অনেক মজার কিছু জানতে পারবেন।

৪.

ইতি নামের যে বুদ্ধিমতি মেয়েটির সাথে জয়নালের পরিচয় হয়, সে অপরূপ রূপবতী। একটা বিষয় এখানেই বলে রাখি, হুমায়ূন আহমেদ প্রায়ই তার রূপবতী নায়িকাটিকে নায়কের বয়ানে পাঠকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। প্রেমিকের চোখে আমরা মেয়েটিকে দেখি।

কারও মনে প্রশ্ন আসতে পারে, হুমায়ূনের বইয়ে আঁকা মেয়েরা আসলে কোথা থেকে আসে, যদি প্রশ্ন আসেই, তার উত্তর হল- তারা থাকেই প্রেমিকের আঁখিপল্লবে। যে দেখে সেই দেখে। এই রূপ, অরূপের। ভালোবাসার কাজলে আঁকা। মমতায় মুড়িয়ে রাখা। তাই এই উপন্যাসের ইতি অপরূপ। অনেক ক্ষেত্রেই হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে এইরূপ অপরূপের দেখা মেলে।

অথচ জয়নালকে কিন্তু টেকো হতে হয়েছে। অতিরিক্ত রোগা। অতিরিক্ত লম্বা। ধূমপায়ী। বেশ অনাকর্ষণীয়। তাকে পাঠকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন শামসুদ্দিন সাহেব। বাস্তব চোখে যা দেখা যায়, তাই ই জয়নাল। এই বিষয়টি লেখকের নির্বাচন। কোন চরিত্রকে কার চোখ দিয়ে দেখাবেন। অনেক সময় লেখকের চোখেও আমরা দেখি কাউকে কাউকে। তবে এই সিলেকশনের মধ্য দিয়ে একটি লেখায় লেখক নিজে কিভাবে থাকতে চেয়েছেন তা বোঝা যায়। এই উপন্যাসে জয়নাল আসলে শামসুদ্দিন সাহেবের চোখে আমাদের কাছে আসুক এইটা লেখকের চাওয়া ছিল- এইটুকু বললে অত্যুক্তি হবে না আশা করি।

৫.

উপন্যাসটিতে খাবারের অন্তত দুটি দৃশ্যের মনোরম বর্ণনা আছে। একবার, রাহেলার রান্না করা খাবার নিয়ে শামসুদ্দিন সাহেবের মন্তব্য, আরেকবার আছে জয়নালের ওখানে। দুটিই রসসিক্ত অপূর্ব বর্ণনা। একেবারে রান্না করার ডিটেইল উঠে এসেছে টেবিলে, পাতে। স্বাদের এমন মোহনীয় বর্ণনা আছে, যে তা পাঠকের জিহ্বায় প্রবাহিত হয়। স্বাদ পাওয়া যায় সেই সব জাদুমাখা খাবারের। লেখকের রসিক জিহ্বার ইঙ্গিত পাওয়া যায় এতে।

৬.

হুমায়ূন আহমেদের আবির্ভাব বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রথমত যে কারণে সেটি হল, লেখায় হুমায়ূন আহমেদ অন্যদের মত নয়। এটিই তার শক্তি। এবং অবধারিত ভাবে দুর্বলতাও। শক্তি, কারণ তিনি নতুন কিছু করে আকর্ষণীয় হয়ে উঠলেন। আর দুর্বলতা একারণে যে, তিনি তার সামনে থাকা সব লেখককে সচেতন ভাবে এড়িয়ে গেলেন। সবচে করুণ হল যে জায়গাটা সেটা হলো, হুমায়ূনের আহমেদের লেখার ভাষা হয়ে উঠল পানসে। ভাষায় এতটুকু জৌলুশ নেই। মাঝে মাঝে মনে হয়- কিছুই নেই। দীন হীন মলিন। দুঃখিনী বর্ণমালা! মিসকিনের মত ভাষা নিয়ে সাহিত্যে এত দৃঢ়ভাবে জায়গা করলেন কি করে তা আমি ভেবে পাইনা। কিংবা হয়ত জায়গা করেন নি এখনও, কে জানে! তবে সাহিত্যে যে এই জাতির ভাষায় কারুকার্য দেখার আগ্রহ নাই, সে বিষয়ে হুমায়ূন আহমেদ আর সেবা প্রকাশনীকে বিপুলভাবে গ্রহণ করে পাঠকসমাজ তাদের রায় দিয়েই দিয়েছে। অন্তত আমার তাই ধারণা।

৭.

এই উপন্যাসটিতেই ধ্রুব এষ আর সমর মজুমদারের বাইরে নতুন একজনের করা প্রচ্ছদ পেয়েছিলাম আমরা। মাসুম রহমান। সুন্দর এক প্রচ্ছদ তিনি এঁকেছিলেন। বেশ মানিয়েছিল বইয়ের সাথে।

৮.

আজ আমি কোথাও যাবো নাগোপন প্রতিজ্ঞার গল্প। এই দৃঢ় চেতনা জীবন থেকেই এসে সাহিত্যে মিশেছে। কোথাও না যাবার প্রবল শক্তি বাংলাসাহিত্যে খুব বেশি চরিত্র অর্জন করতে পারেনি। জয়নালকে একারণেই হয়ত আমাদের কারও কারও আর কিছুদিন মনে থাকবে।

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড