• বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বিষাদ সিন্ধুর লেখক বেঁচে থাকলে আজ তার বয়স হতো ১৭৪

  তরিকুল ইসলাম তরুন, কুষ্টিয়া

১৩ নভেম্বর ২০২১, ১৩:৪৮
ছবি : সংগৃহীত

অমর লেখক 'বিষাদ সিন্ধু' রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন ১৮৪৭ সালের ১৩ই নভেম্বর কুষ্টিয়ার কুমারখালীর লাহিনী পাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মীর মশাররফ হোসেনের পিতা মীর মোয়াজ্জম হোসেন। তাঁর পূর্ব পুরুষ সৈয়দ সা’দুল্লাহ বাগদাদ থেকে প্রথমে দিল্লীতে এসে মোগল সেনা বাহিনীতে চাকুরী গ্রহণ করেন। পরে তিনি ফরিদপুর জেলার স্যাকরা গ্রামে আগমন করে এক হিন্দু ব্রাহ্মণ কন্যার পাণি গ্রহণ করে রাজবাড়ী জেলার পদমদী গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন।

বাংলাদেশের পারিবারিক রীতি অনুসারে গর্ভাবস্থায় মহিলারা মাতা-পিতার বাড়িতে আসে। সেকারণে মীর মোশাররফ হোসেন মাতৃগর্ভে থাকাবস্থায় তাঁর মাতা দৌলতন নেছা কুষ্টিয়া শহর থেকে তিন মাইল পূর্ব গড়াই ব্রিজের নিকটস্থ’ লাহিনীপাড়া গ্রামে অর্থাৎ মীরের মাতামহের বাড়ি (নানা বাড়ি) চলে আসেন। মীরের পিতামহের মতোই মাতামহও ছিলেন খুবই সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য ব্যক্তি। মীর তার মাতামহের বাড়িতেই জন্মগ্রহণ করেন। মীরের মাতামহের মৃত্যুর পর পিতা মোয়াজ্জেম হোসেন কিছুদিন কুষ্টিয়া জেলার লাহিনীপাড়া গ্রামেই বসবাস করেন। মীর মশাররফ হোসেন বাল্যকালে প্রথম গৃহে, পরে গ্রামের জগমোহন নন্দীর পাঠশালায় লেখাপড়া আরম্ভ করেন। এরপর অল্প কিছু দিন কুমারখালী এম. এন. স্কুল, কুষ্টিয়া হাই স্কুলে পড়াশুনা করেন।

১৮৬০ সালে মীর মশাররফের মা দৌলতুন্নেসা মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর মীর নিজ বাড়ি রাজবাড়ী জেলার পদমদী গ্রামে ফিরে যায় এবং পদমদী হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে পড়াশুনা করতে থাকেন। পরে কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। সেই সময় মীরের বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। এ বয়সেই তিনি সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। সাহিত্যের সব ক্ষেত্রেই তাঁর উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেছেন। গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা, আত্মজীবনী, প্রবন্ধ ও ধর্ম বিষয়ক প্রায় ৩৭টি বই রচনা করে গেছেন। এরমধ্যে রত্নাবতী, গৌরী সেতু, বসন্তকুমারী, নাটক জমিদার দর্পণ, সঙ্গীত লহরী, উদাসীন পথিকের মনের কথা, মদীনার গৌরব, বিষাদসিন্ধু বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সাহিত্য রচনার পাশাপাশি তিনি কিছুদিন সাংবাদিকতাও করেছিলেন। প্রথমে তিনি কাঙাল হরিণাথ মজুমদারের সাপ্তাহিক গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকা ও কবি ঈশ্বরগুপ্তের সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় কিছু দিন কাজ করেন। এরপর ১৮৮০ সালে তিনি নানা বাড়ি এলাকা লাহিনীপাড়া থেকে ‘হিতকরী’ নামের একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করেন।

সম্ভবত অষ্টম শ্রেণীতে উঠে তিনি কলকাতায় পিতৃবন্ধু নাদির হোসেনের বাসায় থেকে কিছুকাল পড়াশুনা করেন। নাদির হোসেনের বাসায় অবস্থানকালে তাঁর প্রথমা সুন্দরী কন্যা লতিফনের সাথে প্রথমে ভালবাসা এবং পরে বিবাহের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু বিবাহের সময় নাদির হোসেন প্রথম কন্যার পরিবর্তে দ্বিতীয় কুরুপা ও বুদ্ধিহীনা কন্যা আজিজন্নেসার সাথে তাঁর বিবাহ দেন (১৯ মে ১৮৬৫)। এই ঘটনার পরিণামে লতিফন্নেসা আত্মহত্যা করলে মীর ভীষণ আঘাত পান। তিনি তাঁর স্ত্রী আজিজন্নেসাকে ক্ষমা করতে পারেন নাই। মীরের প্রথম বিবাহ সুখের না হওয়ায় বিবাহের আট বছর পর সাঁওতা গ্রামের এক বিধবার কন্যা কালী ওরফে কুলসুম বিবিকে বিবাহ করেন।

এই ঘটনায় আজিজন্নেসার সাথে তাঁর মনোমালিন্য আরও তীব্র হয়। অতঃপর মীর মশাররফ হোসেন ওই এলাকায় বসবাস করতে না পেরে টাঙ্গাইল জেলার গজনবী এষ্টেটের এক তরফে ম্যানেজার হয়ে টাঙ্গাইলের ‘শান্তিকুঞ্জে’ বিবি কুলসুমকে নিয়ে বসবাস করতে থাকেন। তারপর টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার এস্টেটেও তিনি কাজ করেন। দেলদুয়ারে তিনি ম্যানেজার হন ১৮৮৪ সালে। এদিকে আজিজন্নেসা কয়েক বছর অনাদর অবহেলায় নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করে লাহিনীপাড়ায় মারা যান এবং লাহিনী পাড়াতেই তাকে সমাহিত করা হয়।

অন্যদিকে জমিদারদের সঙ্গে বিবাদের কারণে ১৮৯২ সালে ওই চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি প্রথম স্ত্রী আজিজুন্নেসার মৃত্যুর পর আবার লাহিনীপাড়ায় চলে আসেন। মীর সাহেবের বিষাদসিন্ধু গ্রন্থটি দেলদুয়ারে থাকার সময়ে লেখা। জমিদারি এস্টেটে কাজ করতে গিয়ে তিনি জমিদারদের ক্ষুদ্রতা, স্বার্থপরতা, সম্পত্তি লিপ্সা, ষড়যন্ত্র, হিংসা-বিদ্বেষ এবং নানা রকম অনাচার দেখেছিলেন। সে সবের বিবরণ আছে গাজী মিঞার বস্তানী’ ও ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’ বই দুটিতে। এ দুটি বইয়ের গদ্যও শৈল্পিক ও সাবলীল। জমিদারি এস্টেটের কাজ যাওয়ার পর মীর মশাররফ হোসেন বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করতে থাকেন।

তিনি কলকাতায় ছিলেন ১৯০৩ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত। প্রথম স্ত্রী আজিজুন্নেসার গর্ভে কোন সন্তান জন্মগ্রহণ করেনি। মীর মশাররফ হোসেনের পাঁচটি পুত্র ও ছয়টি কন্যা সবাই বিবি কুলসুমের গর্ভজাত। মীর মশাররফ হোসেনের সন্তান, রওশন আরা, এক কন্যা (নাম জানা যায় নাই), ইব্রাহীম হোসেন, আমিনা, সালেহা, সালেমা, আশরাফ হোসেন, ওমর দারাজ, মাহবুব হোসেন, রাহেলা ও মোসতাক হোসেন। ১৯১১ সালের ১৯ শে ডিসেম্বর নিজ বাড়ি রাজবাড়ী জেলার পদমদী গ্রামে মীর মশাররফ হোসেন ইন্তেকাল করলে বিবি কুলসুমের কবরের পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। মুসলিম সাহিত্যিকদের পথিকৃত মীর মশাররফ হোসেন।

ওডি/এমএ

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড