• মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮  |   ২৫ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

গ্রন্থ পর্যালোচনা : রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট'

  কাজী সায়েম রহমান

২৫ মে ২০২১, ১৮:৪৭
xg
ছবি : সংগৃহীত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামটার চারপাশে যেসব বলয় অহর্নিশ ঘুরপাক খাচ্ছিল এর ভেতরে তার নতুন বউঠান কাদম্বরী দেবী এক অনন্য সাধারণ নাম। যুগে যুগে সে নাম তার ক্ষেত্রমহলের বাহিরে একযোগে ছড়িয়ে এসেছে কৌতূহল, রহস্য, নিষিদ্ধ গন্ধমের গন্ধ। একজন শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বা সাহিত্যের একজন প্রবাদপুরুষকে জানার প্রবল আগ্রহ ছিল সাধারন এবং অসাধারন সকলের। মানুষর আত্মা, মন, বুদ্ধি, বিবেক সময়স্রোতের বহমান ধারায় খোলা বাতাসে কতকটা শাসনে কখনও প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে,আর অনবরত তাকে প্রভাবিত এবং অনুরণিত করতে থাকে তার চারপাশের সমাজ, ধর্ম, পরিবার, আত্মীয়, বন্ধু, প্রেম, প্রবঞ্চনা ইত্যাদি ও ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথের সে বলয়কে জানতে বা রবীন্দ্রনাথকে জানতে অথবা তাকে বুঝতে হলে কাদম্বরীকে অনিবার্যভাবে জানা দরকার। রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘কাদম্বরীর সুইসাইড নোট’ বইয়ে তিনি কাদম্বরীর শেষ চিঠি তুলে দিয়েছেন,যে চিঠি কাদম্বরী দেবী লিখেছিল ১২৭ বছর আগে তার মৃত্যুর ক্রান্তিলগ্নে। সেই আধপোড়া উদ্ধারকৃত চিঠিতে কাদম্বরী লিখেছে – “আমাকে মনে রেখো রবি ” এ কথাটুকু বলার স্পর্ধাও আজ আমার নেই।

এক বসন্তে একটা মেয়ে ঘরে খিল দিয়ে সারাদিনব্যাপী উপবাস দিয়ে সুইসাইড নোট লিখে যাচ্ছে। টেবিলের উপর ছড়ানো অসংখ্য প্রেমপত্র। একটু পরপর সে বহুদিনের জমানো আফিমের গুলিগুলো একটা একটা করে খাচ্ছে আর লিখছে। একবিন্দুতে দাঁড়িয়ে সমগ্র জীবনকে দেখছে শেষবারের মত। দৈন পরিবারের রোগা-কালো মেয়েটি এই ঠাকুর বাড়িতে ছিল নিঃসঙ্গ। একাকী ব্যক্তিগত ভাবনায় একান্তে তার মনে জমেছে যতটা অপমান, অপবাদ, একাকীত্ব, যতটা তাকে গিলতে বসেছে হতাশার অন্ধকার, ততোটাই সে আঁকড়ে ধরেছে রবিকে, যে ছিল তার একমাত্র বন্ধু, ঠাকুরপো, সমব্যথিত কিংবা দোসর। তাকে তার মত করে বুঝতে পারাটায় হয়ত একটানে নিয়ে গেছে তাকে এক মথিত সমুদ্রে, এক নিষিদ্ধ দুর্বার প্রেমে। সে প্রেমে যত বাঁধা এসেছিল ততই পেয়েছে বেগ। একদিন সে সম্পর্কেও হল বিচ্ছেদ। হেথা পুরাতনকে হঠে দিয়ে নতুনে বাঁধল খেলাঘর। স্বেচ্ছামৃত্যুকে বেছে নিল কাদম্বরী। দেবেন্দ্রনাথ প্রায় লোপাট করে দিয়েছিলেন নিষিদ্ধ কাদম্বরীর অপঘাতের সব চিহ্ন, কিন্তু তবু তার চিঠি পুড়ে ভস্ম হয়নি,হয়ত তা হতে দেয়নি রবি নিজেই। ভয়ংকর প্রতিভাধর একজন সাহিত্যিক তখন লিখে চলছে একের পর এক কবিতা, গান, নাটক, গল্প। পাশে থেকে কাদম্বরী দেবী হয়ে উঠলেন তার সৃষ্টিসঙ্গী। তারা একে অন্যের সুখ, দুঃখ, আবেগই শুধু আদান-প্রদান করত না, তারা বিচরন করেছিল একে অন্যের কল্পনায়ও। রবির জগতজোড়া ছিল বউঠান। আর এটা বলা যায় রবীন্দ্রনাথের অনেক ভাবনার উপজীব্য যুগিয়েছে কাদম্বরী। তিনি চিঠিতে লিখলেন- আজ আমার দরজা বন্ধ। এ দরজা আমি বন্ধ করেছি। খুলব না আমি। তোমরা খুলো-আমার মৃত্যুর পরে। সেই রুদ্ধ দুয়ার খোলার অভিজ্ঞতা থেকে হয়ত তোমার মধ্যে জন্ম হবে কোনও লেখা কোনওদিন- কে বলতে পারে! আমি থেকে যাব তোমার সেই লেখার আড়ালে।

জোড়াসাঁকোর সে প্রেমস্বর্গে কাদম্বরী প্রথমবার আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন। সবাই জেনে গেল তার অদম্য প্রণয়ের কথা। তাকে জোড়াসাঁকোর বাড়ি থেকে বিতাড়িত করা হল। সে আর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ গিয়ে থাকতে শুরু করল চন্দননগরের বাড়িতে, এদিকে রবীন্দ্রনাথ চেপেছে তখন বিলেতের জাহাজে। হঠাৎ তিনি মাদ্রাজে পৌঁছে জাহাজ থেকে নেমে পড়লেন, ফিরে এলেন চন্দননগরে। বাঁধা-বিপত্তির প্রবল ঝড়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠে নিষিদ্ধ প্রেম,আর তখন অকাট্য বিধান আসে দেবেন্দ্রনাথের,ছেলেকে বিয়ে করতে হবে। মাঝে মাঝে কথাচ্ছলে কাদম্বরী রবীন্দ্রনাথকে দায়ী করে বলে- ঠাকুরপো যদি বলি বিলেতের পথ থেকে তোমার এই ফিরে আসার মধ্যেই নিহিত ছিল আমার মরণের বীজ- সহ্য করতে পারবে?

আবার সারাটা চিঠি জুড়ে বারবার নির্মোহ-নিঃসঙ্কোচে বলেছে তোমার কোন দায় ছিলনা, তুমিই তো একমাত্র ভালবেসেছিলে, বাঁচিয়ে রেখেছিলে। এই বইয়ে যেন দেখা যায় স্বেচ্ছা-মৃত্যুপথযাত্রী কাদম্বরীকে ঠিক তার সময় ঘনিয়ে আসার আগ মুহূর্তে, আবার সে পড়ন্ত বেলায় দাঁড়িয়ে তার বিষাদ-ক্লান্ত মন নিয়ে পরিক্রম করে জীবনের রক্তাক্ত স্মৃতির ভাঁজে ভাঁজে।

ওডি/

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড