• বুধবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২১, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

গ্রন্থ পর্যালোচনা : 'দূরবীনে দূরদর্শী' শেখ ফজলুল হক মণি 

  অধিকার ডেস্ক

৩০ মার্চ ২০২১, ১৪:০৮
dfgh
ছবি : দৈনিক অধিকার

শেখ ফজলুল হক মণি ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, লেখক, প্রাবন্ধিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষক। ১৯৭০ সালের ১১ জানুয়ারি তাঁর সম্পাদনায় সাপ্তাহিক বাংলার বাণী পত্রিকা প্রকাশিত হয়, যা দেশ স্বাধীন হবার পরে ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ‘দৈনিক বাংলার বাণী’ পত্রিকাতে রূপান্তরিত হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনি ‘দৈনিক ইত্তেফাক’, ‘দি পিপলস’ও ‘দৈনিক বাংলার বাণী’তে নিয়মিত কলাম লিখতেন। কলামগুলোতে অত্যন্ত সহজ সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় তাঁর নিজস্ব অভিমত, চিন্তা, চেতনা প্রকাশ করতেন। তিনি বাংলার বাণীতে ‘দূরবীনে দূরদর্শী’ নামে কলাম লিখতেন। মৃত্যুপরবর্তী সময়ে তাঁর লেখা কলামগুলোকে সংগ্রহ করে আগামী প্রকাশনী প্রকাশ করেছে ‘দূরবীনে দূরদর্শী’ নামক গ্রন্থ, যাতে সম্পাদনা করেছেন ফকীর আবদুর রাজ্জাক ও বিমল কর। দূরবীনে দূরদর্শী গ্রন্থটি আগামী প্রকাশনী থেকে প্রথম প্রকাশিত হয় সেপ্টেম্বর ২০১১ এবং এর দ্বিতীয় মুদ্রণ বের হয় ফেব্রুয়ারি ২০২০।

দূরবীনে দূরদর্শী গ্রন্থটিতে শেখ মণির রাজনৈতিক দর্শন, সমাজদর্শন, অর্থনৈতিক ভাবনা, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও সমালোচনাসহ তাঁর জীবনদর্শনের সামগ্রিক চিত্র ফুটে উঠেছে। কলামিস্ট শেখ মণি অত্যন্ত দূরদৃষ্টি সম্পন্ন একজন লেখক ছিলেন, তিনি তাঁর লেখায় সদ্য স্বাধীন দেশে যে আংশকা ও সংকটগুলো বিশ্লেষণ করেছিলেন, পচাত্তর পরবর্তী সময়ে অনেক বিষয়ের প্রতিফলন ঘটেছে, যার কারণে তাঁর লেখাগুলোর ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে।

শেখ ফজলুল হক মণির দূরবীনে দূরদর্শী গ্রন্থটিতে মোট ২৬টি নিবন্ধ সংকলিত হয়েছে। নিবন্ধমালার শিরোনামগুলো হচ্ছে: দেশের সাথে বাংলার বাণীর যাত্রা শুরু; প্রসঙ্গ:আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব পরিবর্তন; মুজিববাদ দর্শনে ও বাস্তবে; দুর্নীতি ও আমলাতন্ত্র; পরিকল্পনা ও অর্থনীতি বিষয়ে জটিলতা; সবজান্তা আমলার কেরামতি; ডি পি ধরের ঢাকা সফর; নিক্সনের মস্কো সফর; হঠাৎ ভাগ্য পরিবর্তন; মা’র চেয়ে যার বেশি দরদ; ছেষট্টির সাত জুন:প্রস্তুতি পর্ব; আজগুবি রটনা স্বাধীন সংবাদপত্রের দায়িত্ব নয়; বন্ধু সাচ্চা ও দো-আঁশলা; সময় কোথায় সময় নষ্ট করবার; বঙ্গবন্ধুর তাবিজ দিয়ে বেশিদিন চলবে না; গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার নয় নিজলিঙ্গাপ্পা-কামরাজের দলই সমাজতন্ত্রের শত্রু; কোন নেপোরা দই খাচ্ছে; বøাক মানির কেরামতি; আমলাতান্ত্রিক কুষ্ঠব্যাধির দায় কে বইবে?; ভাসানীর বৃহৎ বাংলার দাবি; বিপ্লবের পর প্রতিবিপ্লব আসবেই; মুজিবের শাসন চাই আইনের শাসন নয়; পরিকল্পনা কমিশনের দরবারে; দালালদের ক্ষমা প্রসঙ্গে; ন্যাপের বাহনটির এই আচরণ কেন?; এবং ভাসানী-মোজাফফর-মস্কো।

“বিপ্লবের পরে প্রতিবিপ্লব আসবেই”- শেখ মণির এ উক্তিটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। দূরবীনে দূরদর্শী গ্রন্থে বিপ্লবের পরে প্রতিবিপ্লব আসার বিষয়টি একটি নিবন্ধে ব্যাখ্যা করেছেন। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্র- “প্রত্যেক ক্রিয়ার একটা সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে”। রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রে শেখ মণি বলেন যে, বিপ্লবের পরে প্রতিবিপ্লব, যুদ্ধের পরে দারিদ্র। এবং পরিবর্তনের প্রয়াস। দুটো স্বাভাবিকভাবেই দেখা দিতে পারে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বিপ্লব এবং যুদ্ধ উভয় প্রক্রিয়া এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রে প্রতিবিপ্লবীদের উত্থান এবং ষড়ষন্ত্র সম্পর্কে তিনি বঙ্গবন্ধুকে আগেই সতর্ক করেছিলেন। শেখ মণি প্রতিবিপ্লবী বলতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধীচক্র, জামায়াতে ইসলাম ও মুসলিম লীগের সমর্থক, পাকিস্তানী মতাদর্শে বিশ্বাসী আমলা এবং পাকিস্তান-আমেরিকা ও চীনের এজেন্টদের বুঝিয়েছেন। তৎকালীন সময়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে তিনি প্রতিবিপ্লবীদের ষড়ষন্ত্রের তত্ত্ব বিশ্লেষণ করেছেন। এশীয় কূটনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শাসকদের স্বার্থে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিপতিদের সাথে চীনের সংযোগ ও মদদে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রতিবিপ্লবী সৃষ্টি করে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়। চীন-মার্কিন-পাকিস্তান সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে নসাৎ করার অভিপ্রায়ে প্রতিবিপ্লবী শক্তিসমূহকে কাজে লাগিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে কিংবা উৎখাত করে বিকল্প সরকার গঠন করে তাদের তাঁবেদারী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। শেখ মণি প্রতিবিপ্লবীদের সকল চক্রান্ত রুখে দিতে গণমানুষের দল আওয়ামী লীগকে মুজিববাদী দর্শন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বিনির্মাণের কথা বলেন। ইতিহাসের পরিক্রমায় ৭৫ এর ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে প্রতিবিপ্লবীদের উত্থান হয়। শেখ মনির রাজনৈতিক দূরদর্শীতার প্রমাণ আমরা পাই: বিপ্লবের পর প্রতিবিপ্লব সৃষ্টি হয়েছে এবং স্বাধীনতাবিরোধী প্রতিবিপ্লবীরা ২১ বছর ক্ষমতায় থেকে পাকিস্তানের প্রেসক্রিপশনে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। সেই স্বাধীনতাবিরোধী প্রতিবিপ্লবীরা এখনও নানা ষড়ষন্ত্রে সক্রিয়।

রাষ্ট্রদর্শনের ইতিহাসে মুজিববাদ এক নতুন ধারা, নতুন সমন্বয়, অনন্য তত্ত্ব। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সমন্বয়ে গঠিত হলো মুজিববাদ। মুজিববাদের অন্যতম উপাদান হচ্ছে সমাজতন্ত্র। রাষ্ট্রদর্শনে সমাজতন্ত্র মতবাদটি এসেছে কার্ল মার্কস এর তত্ত্ব থেকে। শেখ মণি রচিত দূরবীনে দূরদর্শী বইটির ‘মুজিববাদ দর্শনে ও বাস্তবে’ নিবন্ধে অত্যন্ত সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় মুজিববাদ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মার্কসবাদের ঐতিহাসিকতা, গুরুত্বতা ও প্রায়োগিকতা বিশ্লেষণ করেছেন। মার্কসবাদ হচ্ছে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। হেগেলের দ্বন্ধত্বত্ত ও ফয়েরবাখের বস্তুবাদের সমন্বয়ে এসেছে মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। সমাজবিবর্তনের ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশে আদি সাম্যবাদ থেকে ভূ-মালিক, ভূমিদাস, শ্রমিক-মালিকের, শোষক-শোষিতের দ্বান্দ্বিকতার পথ অতিক্রম করে, সংঘাতের পর সংঘাত সৃষ্টি করে সকল সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে সমাজে সকল শ্রেণী পেশার মানুষের মধ্যে শান্তি, ও সম্পদের সুষম বন্টনের মাধ্যমে সাম্য-সমতা নিশ্চিত করার কথা বলে মার্কসের সমাজতন্ত্রে। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রই মার্কসবাদের মূলসূত্র। মার্কসবাদের সমাজতন্ত্র হচ্ছে মুজিববাদের অন্যতম প্রধান উপাদান। শেখ মণি মার্কসবাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বলতে চেয়েছেন যে, স্থান-কাল-পাত্রভেদে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী আন্দোলনের ধারা পরিবর্তিত হয়। শিল্প নির্ভর ইউরোপ কিংবা কৃষিভিত্তিক এশিয়ার সমাজতন্ত্রের আন্দোলন, জাতীয়তাবাদের চিন্তাধারা ভিন্নতর অর্থ ও লক্ষ্যে কার্যত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সমাজতন্ত্রের মধ্যে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের নির্যাস তুলে দিয়ে সমগ্র বাঙালি জাতির নিকট সমাজবাদী কর্মসূচীকে গ্রহণযোগ্য করেছেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তিনি গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী চেতনাকে সমাজতন্ত্রের সাথে সমন্বয় করেছেন। মার্কস ছিলেন কেবলমাত্র বস্তুবাদী, গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী নয়। মাও সেতুং ছিলেন বস্তুবাদী ও জাতীয়তাবাদী, গণতান্ত্রিক নহে। আব্রাহাম লিংকন ছিলেন গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী কিন্তু সমাজবাদী নন। শেখ মুজিব ছিলেন গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী হয়েও সমাজবাদী। এখানেই মুজিব অনন্য ও অসাধারণ। তাই মুজিববাদী দর্শন ইতিহাসের ধারায় নতুন প্রায়োগিক তত্ত্ব।

শেখ ফজলুল হক মণি রচিত দূরবীনে দূরদর্শী গ্রন্থের দুর্নীতি ও আমলাতন্ত্র; সবজান্তা আমলার কেরামতি; বঙ্গবন্ধু’র তাবিজ দিয়ে বেশিদিন চলবে না; আমলাতান্ত্রিক কুষ্ঠব্যাধির দায় কে বইবে কলামসমূহে প্রচলিত আমলাতন্ত্রের সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে পাকিস্তানী মনোভাবাপন্ন আমলাদের কেউ কেউ প্রতিবিপ্লবী চক্রান্তে লিপ্ত এবং যে সকল আমলারা দুর্নীতিপরায়ণ, ক্ষমতালিপ্সু, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের বিরোধী তাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। তাছাড়া এ গ্রন্থে- পরিকল্পনা ও অর্থনীতি বিষয়ক জটিলতা; হঠাৎ ভাগ্য পরিবর্তন; সময় কোথায় সময় নষ্ট করবার; ব্ল্যাক মানির কেরামতি; পরিকল্পনা কমিশনের দরবারে নিবন্ধসমূহে সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রে কিভাবে সম্পদের সুষম বন্টন করা যায় ও স্বনির্ভর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করা যায় সে বিষয়ে অলোকপাত করেছেন।

সার্বিক আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, শেখ ফজলুল হক মণি রচিত দূরবীনে দূরদর্শী গ্রন্থটি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের তৎকালীন সময়ের সংকট, সীমাবদ্ধতা, সম্ভাবনা, মুজিববাদ, আওয়ামী লীগের ভূমিকা, বিপ্লব-প্রতিবিপ্লব, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, আমলাতন্ত্র, আন্তর্জাতিক রাজনীতিসহ বিভিন্ন দিক ফুটে উঠেছে যা জ্ঞানতাত্ত্বিক জগতে নতুনমাত্রা যোগ করেছে। লেখক অত্যন্ত সহজ সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় সবকিছু ব্যাখ্যা করেছেন। সুদীর্ঘ সময় আগে শেখ মণির লেখাগুলো সংগ্রহ করে ফকীর আবদুর রাজ্জাক ও বিমল কর সম্পাদনা করেছেন যা উচ্চ প্রশংসার দাবিদার। আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এ গ্রন্থটি নান্দনিক প্রচ্ছদে মোড়ানো হয়েছে। দূরবীনে দূরদর্শী গ্রন্থটি শেখ মণির রাষ্ট্রদর্শন ও জীবনদর্শন সম্পর্কে গবেষণায় নবদিগন্তের দ্বার উন্মোচন করবে বলে আশা করা যায়।

গ্রন্থটির পর্যালোচনা করেছেন : বেল্লাল আহমেদ ভূঞা অনিক, শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।

ওডি/

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড