• শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

গল্প : খোলা চুল

  জান্নাতুল ফেরদৌস মীম

০৬ এপ্রিল ২০২০, ১৩:০১
খোলা চুল
খোলা চুল

ঘড়িতে সময় ৯.০০ টা।
রাশেদুল আহমেদ আর মম একসাথে সকালের নাস্তা করছিলেন। মম রাশেদুল আহমেদ এর একমাত্র মেয়ে। এবার ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। বাবা আর মেয়ে প্রতিদিন সকালে একসাথেই নাস্তা করে,প্রতিদিন তিনিই মম কে নিয়ে সকালে বের হয়ে যান। তারপর মম চলে যায় তার কলেজে। আর তিনি যান অফিসে ।

আজও ঘুম ভাঙলো মম’র ডাকে। তিনি উঠে লক্ষ্য করলেন মম প্রতিদিনের মত সব কাজ করে কলেজের জন্য তৈরি হয়ে গেছে। টেবিলের উপর নাস্তা রাখা। মম প্রতিদিন ফজরের সময় উঠে নামাজ পরে, নাস্তা বানায়। তারপর বাসার কাজগুলো সব গুছিয়ে রাখে। বাসায় তার বাবা আর সে ছাড়া কেউ নেই। তাই জিনিসপত্র তেমন অগোছালো থাকে না। যেটুকু থাকে তা মম সকালে গুছিয়ে তারপর কলেজে যায়। রাশেদুল আহমেদ বাসায় একটা কাজের মেয়ে রেখেছিলেন। একদিন সকালে উঠে দেখেন মেয়েটা পালিয়েছে। সঙ্গে করে বেশ কিছু দামি জিনিসপত্র নিয়ে তবেই গেছে। আলমারির চাবি রাশেদুল আহমেদের কাছে থাকে। তাই হয়তো টাকা পয়সা কিছু নিতে পারে নি। এরপর থেকে মম আর কাজের লোক রাখতে দেয় না।যা কাজ থাকে তা বাবা মেয়ে মিলেই করে ফেলে। মম কলেজ শেষ করে, প্রাইভেট পড়ে একদম বিকেলে বাসায় ফিরে। রাশেদুল আহমেদ এর আসতে সন্ধ্যে হয়ে যায়। দুপুরে বাহিরেই লাঞ্চ করে নেয় তারা। রাতের রান্নাটা শুধু করতে হয়।

আজও সকালে নাস্তা শেষ করে রাশেদুল আহমেদ আর মম এক সাথে বের হয়ে গেলেন। মেয়েকে বাইকে করে কলেজের সামনে নামিয়ে দিয়ে তিনি অফিসে চলে গেলেন।
 
সন্ধ্যের সময় বাসায় ফিরে দরজায় নক করতেই মম এসে দরজা খুলে দিলো। সারাদিনের ক্লান্তি পেছনে ফেলে তিনি রুমে প্রবেশ করলেন। ফ্রেশ হয়ে এসে মম’র রুমে উঁকি দিয়ে দেখেন মম পড়ছে। তাই মম কে আর না ডেকে তিনিই কিচেনে চলে গেলেন।চুলায় ভাত আর মাছ ভাজি বসিয়ে দিয়ে তিনি একটি শপিং ব্যাগ হাতে মম’র রুমে ঢুকলেন। মম বাবার দিকে ঘুরে শপিং ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে বললো,
– এটা কি বাবা ?
রাশেদুল আহমেদ মম’র দিকে ব্যাগটা দিয়ে বললেন, এটা তোমার জন্য মা।

মম প্যাকেট টা খুলে দেখলো একটা লাল টকটকে শাড়ি। খুশিতে মম এর চোখ চিকচিক করছে। তার চোখের দিকে এখন যে কেউ তাকালেই বুঝবে সে কতটা খুশি হয়েছে।

জানুয়ারি মাস, সব স্কুল কলেজে এখন খেলাধুলা,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে। কাল কলেজের ফাংশনে মম এর একটা নাচ আছে। সে জন্য ওর লাল শাড়ি দরকার ছিলো। নিজের কোন লাল শাড়ি নেই বলে মম তার বান্ধবি ইরা কে ফোন দিয়ে বলছিলো একটা লাল শাড়ি ম্যানেজ করে দেয়ার জন্য। তখন রাশেদুল আহমেদ মেয়ের এ কথা শুনেন। আর আজ অফিস শেষ করে শপিংমলে গিয়ে এই লাল শাড়িটা মম’র জন্য কিনে আনেন।

মম শাড়িটা নিয়ে দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাড়ায়। বিভিন্ন ভঙ্গিতে শাড়িটা শরীরে জড়িয়ে দেখছিলো। মেয়েকে এতোটা খুশি দেখে রাশেদুল আহমেদ কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

পৃথিবীর সকল বাবা মা চায়, সন্তানের মুখে সব সময় হাসির রেখাটা বজায় রাখতে। নিজের সমস্তটা দিয়ে সন্তানদের চাওয়া পাওয়া পূরণ করে যান তারা। নিজে না খেয়ে হলেও সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেয়া মানুষ গুলোকেই বলা হয় বাবা-মা। যারা কোন স্বার্থ ছাড়াই সন্তানকে শুধু ভালোবেসে যায়।

ডিনার শেষ করে রাশেদুল আহমেদ আর মম এক সাথে বসে ছিলেন। তারপর কাল কলেজের ফাংশনে যে নাচটা মম দিবে তা বাবাকে সে দেখাচ্ছিলো।

বাবা মা কখনো সন্তানদের তেমন ভাবে লক্ষ করেন না, কখন বড় হয়ে যায় তারা। চোখের সামনে সারাক্ষণ থাকা মানুষ গুলোর দিকে আমরা নজর কমই দেই। তেমন ভাবে খেয়াল করে তাদের বেড়ে ওঠা, তাদের রূপ, সৌন্দর্য দেখা হয় না। হঠাৎ করে দেখা কোন অপরিচিত মানুষের দিকে আমরা যেভাবে তাকিয়ে থাকি, তাদের যেমন নিখুঁত ভাবে দেখি তেমন ভাবে নিজের কাছের মানুষ গুলো কে খুব কম সময়ই দেখা হয়। রাস্তায় কোন মানুষকে দেখে ভালো লাগলে আমরা বলে দিতে পারি তার সৌন্দর্যের বিবরণ। তবে আমরা কয়জন আছি যে বাবা মায়ের মুখের দিকে অনেকটা সময় তাকিয়ে থেকে তাদের সৌন্দর্যের পর্যবেক্ষণ করি? নিজের আশেপাশের মানুষকে এভাবে দেখা হয় না। মনে হয় সে তো সব সময়ই আছে আমার চোখের সামনে।

রাশেদুল আহমেদ এর ও ঠিক এমনটাই মনে হলো। হঠাৎ করে তিনি লক্ষ্য করলেন মেয়েটা অনেকটা বড় হয়ে গেছে। এক দম মায়ের মত হয়েছে দেখতে, মায়ের মতই লম্বা হয়েছে। হালকাপাতলা গড়নের ফর্সা মুখটা রেগে গেলে লাল হয়ে যায়।লম্বা চুল গুলো কোমর ছাড়িয়েছে।

একটু পর মম হাতে তেল এর বোতল নিয়ে বাবার রুমে গেলো। রাশেদুল আহমেদ মেয়েকে রুমে আসতে দেখে শুয়া থেকে উঠে বসলো।
-কিরে মা, কিছু বলবি ?
-হ্যাঁ বাবা, চুলে তেল দিবো। তুমি একটু দিয়ে দাও প্লিজ।
-কিন্তু এতো রাতে! কাল না তোর কলেজে ফাংশন আছে ? তাহলে এখন চুলে তেল দিবি কি জন্য।
-আরেহ! চুলে তেল দিয়ে তারপর শ্যাম্পু করবো। তেল দেয়ার পর শ্যাম্পু করলে চুল অনেকটা সিল্কি হয়।

রাশেদুল আহমেদ মেয়ের মাথায় তেল দেয়ার সময় মম বললো,
-জানো বাবা,তুমি মাথায় তেল দিয়ে দিলে আমার আরামে ঘুম পেয়ে যায়।

মেয়েটা একদম তার মায়ের মত হয়েছে। আলেয়া ঠিক এমন করে বলতো তাকে,
-হ্যাঁ গো জানো,তুমি তেল দিয়ে দিলে আরামে আমার ঘুম পেয়ে যায়।
তিনি বিনিময়ে একটা হাসি দিতেন। আলেয়ার চুলে সব সময় তাকেই তেল দিয়ে দিতে হতো। তেল দেয়ার পর চুল গুলো সকালে শ্যাম্পু করে নিতো আলেয়া। এখন মম ঠিক এমনটাই করে।

আলেয়ার সাথে পরিচয়টা হয়েছিলো তার অফিসে। একদিন অফিসে হঠাৎ করে একটা মেয়ে জয়েন করে। ঠিক তার টেবিলের পাশের টেবিলটা ছিলো ওই মেয়েটার। প্রথম দিনই মেয়েটা তাড়াহুড়ো করে অফিসে প্রবেশ করে, রাশেদুল কে উদ্দেশ্য করে বলেছিলো,
-সরি সরি একটু দেরী হয়ে গেলো। স্যার কি এসে গেছেন? খোঁজ করে ছিলেন আমার?
রাশেদুলের কানে মেয়েটার কোন আওয়াজ পৌঁছালো না। সে শুধু তাকিয়ে রইলো কোমর ছাড়িয়ে যাওয়া খোলা চুলে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে। হালকা লিপস্টিক রাঙা ঠোঁটে মেয়েটা কিছু একটা বলে যাচ্ছে তাকে, তবে সেদিকে তার খেয়াল নেই।
– হ্যালো মিস্টার? আপনাকে বলছিলাম।(রাশেদুলের চোখের সামনে হাত নেড়ে কথাটা বললো)

-জ্বি বলেন।
-বলছিলাম স্যার কি আমার খোঁজ করেছিলেন?
-না। আপনি ছাড়াও অফিসে অনেক লোক আছেন। স্যারের সবার খোঁজ নেয়া ছাড়াও অনেক কাজ আছে।
– যাক বাবা বাঁচলাম। ওহ আচ্ছা, আমি আলেয়া। আপনি?

-আমি রাশেদুল।

এভাবেই আলেয়ার সাথে রাশেদুলের পরিচয় হয়েছিলো। তারপর এক সময় সম্পর্কে জড়ায় তারা। অতঃপর বিয়ে।

বিয়ের দু’বছর পর, আলেয়া আর রাশেদুলের মেয়ে মম’র জন্ম হয়। তবে সেদিন ডেলিভারির সময়ই আলেয়া মারা যায়। এরপর থেকে মম কে নিয়েই রাশেদুলের জীবন। মম কে ঘিরেই বেঁচে থাকা।

ভাবনার জগত থেকে বেরিয়ে এসে তিনি মেয়ের মাথায় তেল দিয়ে দেন।

সকালে নাস্তা শেষ করে, মম রুমে বসে সাজগোজ করছিলো।রাশেদুল আহমেদ অফিসের জন্য তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছিলেন মেয়ের জন্য। একসাথে বের হবে।
– মম..? মা হলো তোর?
-এই তো বাবা হয়ে গেছে।

কিছুক্ষণ পর মম রুম থেকে বেড়িয়ে আসলো। রাশেদুল আহমেদ মেয়েকে মুগ্ধ হয়ে দেখছিলেন। লাল শাড়িটা কুঁচি দিয়ে পড়েছে মম। ঠোঁটে গাড় লাল লিপস্টিক, কপালে ছোট একটা লাল টিপ, চোখে গাড় কাজল, কোমরে একটা সবুজ ওড়না বেঁধেছে। লাল এর মাঝে সবুজ। মেয়ের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন,
-বাহ! আমার মা টাকে একদম হুরপরীর মতো লাগছে।
মম হেসে দিয়ে বললো,
-চলো বাবা, বের হই।
কথাটা শেষ করে বের হওয়ার জন্য মম দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। রাশেদুল আহমেদ লক্ষ্য করলেন, মেয়ের পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে আছে লম্বা খোলা চুল গুলো।

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড