• রোববার, ০৭ জুন ২০২০, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭  |   ৩৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

তাজবীর সজীবের গল্প : ভাগ্যবতী

  সাহিত্য ডেস্ক

২৭ মার্চ ২০২০, ২১:০৭
তাজবীর সজীব
তাজবীর সজীব

সরকারি কলেজ। পুকুর পাড়ের বকুল তলা। পুকুরের পানি টলে উঠল, মাছ খাবি খেয়ে গেল। গোমড়া আকাশ আরও গম্ভীর হয়ে মেঘের গর্জন ঘটাল। রিয়া একটু খানি কেপে গেল। আমার হাত ধরল সে, অভয় দেবার চেষ্টায় বললাম, কীরে ভয় লাগছে? 
রিয়া মেঘ ডাকার ভয় এবং ভয় পাওয়ার যৌথ লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ রে। মেঘ ভয় লাগে খুব। তোর লাগে না?’
‘না। মেঘ, বাঘ-ভাল্লুক, ঝড়-বৃষ্টি, দুর্যোগ কোনো কিছুতেই ভয় লাগে না আমার।’
রিয়া লজ্জা এবং ভয় কাটিয়ে উঠেছে, উচ্ছুক দৃষ্টিতে বলল, কোনো কিছুতেই না?
প্রশ্নটি আমাকে তাড়িত করল। ভাবলাম, ভাবনা শেষ হলে তারপর বললাম, হ্যাঁ। হয়। 
কীসের ভয়?
আবার এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলাম। তারপর বললাম, তোকে হারানোর ভয়। 
রিয়া আমার উত্তরের উত্তরে তার ভুবন ভুলানো এবং আমাকে দোলানো হাসি উপহার দিয়ে বলল, দূর বোকা আমি হারাব কেন? 
আমি কিছু একটা বলতে চাইলাম। বেরসিক দুষ্টু প্রকৃতির বৃষ্টি আমাকে সে সুযোগ না দিয়ে আমার আর আমার রিয়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমরাও দাপিয়ে উঠে কলেজ বারান্দায় চলে গেলাম। বারান্দায় বেঞ্চ পাতা ছিল, সেখানেই ঠাঁই হলো আমাদের।    
রিয়া তার ছোট ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে খুটখাট শুরু করল। ধুর, ভালো লাগে না আমার। আমাকে পাশে রেখে, বারান্দার ওপারে অজস্র বৃষ্টির ফোয়ারা রেখে, মোবাইল ঘাটাঘাটি করে কেউ? বোকা মেয়ে কোথাকার। 
রাগ করে থাকার খুব চেষ্টা করেও হলো না, তার সাথে কথা বলার ইচ্ছা আমাকে পরাজিত করল। বললাম, ‘কীরে মোবাইলে কী করিস এত?’
‘একটা ছবি দেখছি’
‘দেখি কীসের ছবি’
ওর হাত থেকে মোবাইল নিয়ে দেখি একটা সোনার হারের ছবি।
আমি সহজাতভাবে বলে ফেললাম, ‘কী হলো কিনবি এটা।’
রিয়া তার মায়াময় সুন্দর মুখ কালো করে ফেলে বলল, ‘তাহলে আমি ভাগ্যবতী হতাম, এরকম একটা হার কেনার ভাগ্য কি আমার আছে? গরিব ঘরে জন্মেছি। পড়ালেখা করতে পারছি তাইতো বেশি।’
রিয়ার লম্বাটে সুশ্রী মুখের দিকে তাকালাম, দেখলাম সেখানে রাজ্যের মেঘ। ছোঁয়াচে রোগের মতো মিতুর থেকে আমার জীবনেও যেন মেঘ নেমে এলো, অন্ধকার হয়ে গেল আমার পৃথিবী। রিয়ার সামান্য কষ্টও আমাকে কঠিন করে ছুঁয়ে দেয়, সবসময়। নবম শ্রেণিতে পড়ার কালে কোচিংয়ে তার সাথে পরিচয়, বন্ধুত্ব। এখন আমরা এই কলেজে একাদশে পড়ি। তবে দুজন দু বিভাগে, সে কমার্সে, আমি সাইন্সে। পড়ালেখার আলাদা বিভাগ আমাদের মাঝে বিভাজন করতে পারেনি মোটেও।    

বন্ধুত্বের অনুভব ছাপিয়ে প্রতিদিন আমি তার প্রতি নতুন আরেকটি অনুভবের ঘনত্ব অনুভব করি। কিন্তু বলতে পারি না। আমার ধারণা রিয়াও আমাকে কিছু বলতে চায়। কিন্তু পারে না। আমরা বেশ ছিলাম। ভালো। আামার অনেক সাধের প্রিয় বাইকে একসাথে কলেজে যাওয়া আসা। বিকেলের সোনালী মিষ্টি রোদ ভেদ করে বাইকে দুজনের এখানে ওখানে ছোটাছুটি। মাঝে মাঝে ওর, চটপটি ফুসকার আবদার। বেশ তো, এই দিনগুলো। কিন্তু এই মুহূর্তে রিয়ার এই বাস্তুগত না পাওয়ার হতাশা আমাকেও পুড়িয়ে অঙ্গার করে ফেলল।

পরের দিন কলেজ বেলা। প্রতিদিনের নিয়মে ক্লাস বাং দিয়ে বকুল তলায় পৌঁছে দেখি, আজ অন্য একটি নিয়মের ব্যতিক্রম হয়েছে। আজ রিয়া আমার আগে এসে বসে আছে। 
আমি গিয়ে পাশে বসলাম। রিয়া জিজ্ঞেস করল, ‘কীরে আজ তোর দেরি হলো যে। 
হুম। একটু দেরিই হলো। অনেকক্ষণ হলো এসেছিস, না? আসলে আজ ক্লাসে এটেন্ডেন্ট দিতে সামান্য দেরি হয়ে গেল।  
আচ্ছা বাদ দে। এই তোর বাইক পার্ক করা দেখলাম না আজ, নিয়ে আসিসনি?
আমি কথা বললাম না। চুপ করে রইলাম।
ও অবাক হলো। 
আবার বলল, ‘কেউ নিয়েছে?’
‘না’
‘বাইক নষ্ট হয়ে গেছে? সারতে দিয়েছিস?’
‘না’
‘বাসায় রেখে এসেছিস?’
‘না’
‘তবে বাইক কী করেছিস?’
জবাব দিলাম না। চুপ করে রইলাম।
রিয়া অধৈর্য হয়ে জানতে চাইল, ‘তোর বাইক কোথায়?’
কিছুক্ষণ থ মেরে বসে রইলাম। তারপর আস্তে করে বললাম,‘বেচে দিয়েছি।’
রিয়া যেন একটা ধাক্কা খেল, ‘তোর এত প্রিয় বাইক বেচে দিলি। কেন?’
আবার চুপ করে রইলাম আমি। 
রিয়া এবার উত্তেজিত হয়ে উঠল।
‘তুই বলবি না? বাইক কেন বেচেছিস? এমন কী কথা যে আমাকেও বলা যায় না। এত পর আমি তোর?’
আমি এবারো কথা বললাম না। আমার কলেজ ব্যাগ থেকে একটি বক্স বের করে রিয়ার হাতে দিলাম। রিয়া অবাক হয়ে বক্সটা খুলে কথা বলতে পারল না টানা কয়েক সেকেন্ড। যেন কেউ তাকে ফ্রিজ করে দিয়েছে। একবার সে আমার দিকে তাকায় আরেকবার বক্সের দিকে চায়। পুকুরের পানি টলমল করে উঠল, গাছ থেকে কী একটা পড়ল। রিয়ার চোখেও টলমলে পানি। সোনার হারটা থেকে চোখ ফিরিয়ে আমার চোখে চেয়ে কান্নাভেজা কণ্ঠে রিয়া জানতে চাইল, 
‘আমি এত ভাগ্যবতী রে?’
আমি বাতাস থেকে বুক ভরে কিছু তাজা অক্সিজেন শুষে নিয়ে বললাম,‘কী জানি, হয়তোবা, হ্যাঁ’

কেটে যেতে থাকে দিনরজনী। গরম গলে শীতকাল আসে। বিদেশি পাখির ঝাক বহু পথ পাড়ি দিয়ে বাংলায় পৌঁছায়। ক্লাস বাং দেওয়ার আরেকদিন, রিয়া আমার হাতে একটি চিঠি ধরিয়ে দেয়। বলে, ‘পরে পড়িস, খবরদার এখন পড়বি না। আমি বাধ্য ছেলে। তখন পড়ি না। 
রাতে খাবারের পর পড়ার টেবিলে নিরিবিলি পড়তে বসি। বুক পকেটে খুব যত্নে রেখে দেওয়া রিয়ার চিঠি পড়ব। বুক দুরু দুরু করে। বোধ হয় মনের কথা রিয়া এবার বলেই দিল।চিঠির পরতে পরতে নিশ্চয়ই আমার প্রতি রিয়ার ভালোবাসার কথা ছুঁয়ে আছে। আহা। যেটা আমি পারিনি রিয়া আজ তাই করে দেখাল। মনে মনে রিয়ার প্রশংসা করে উঠি, সাবাস রিয়া। আমি যা পারিনি মেয়ে হয়েও তুই তাই করে দেখালি। 

আমি চিঠিটা খুললাম। 

শাওন,
    কী করে যে কথাটা তোকে বলি। তুই যে কীভাবে নিবি ব্যাপারটা, বুঝতে পারছি না। দেখ, আমি একটা মেয়ে। আমাদের অর্থাৎ মেয়েদের আল্লাহ তিনটা চোখ দিয়েছে। অতিরিক্ত চোখ দিয়ে আমরা ছেলেদের অনেক কিছুই দেখতে পারি। আমি সেই চোখ দিয়ে অসংখ্যবার মেপেছি তোকে, অসংখ্যবার দেখেছি তোকে সে চোখে, তুই আমাকে প্রচণ্ড পরিমাণে ভালোবাসিস। ভালোবাসাবাসির এই অস্থীর সময়ে, সত্যিকারের এমন ভালোবাসা পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। দুর্লভ এই ভালোবাসা তুই আমাকে বাসিস। সত্যি আমি ভাগ্যবতী রে। নিজের জীবনের চেয়ে প্রিয় কিছু হয় না জানি, তবুও হলফ করে বলতে পারি তুই আমার জন্য তোর জীবন বাজি রাখতে পারিস। বলা হয়নি কখনো, আজ বলছি শোন, আমিও তোকে ভালোবাসি। তবে তোর মতো করে নয়। তোর মতো স্বার্থহীন, নিষ্পাপ ভালোবাসা কজনে বা বাসতে পারে বল? আচ্ছা বাদ দে ভালোবাসির কথা। এখন আসল কথায় আসি। 

সামনের মাসে আমার বিয়ে। ছেলে ডাক্তার। ঢাকা শহরে ৩টা বাড়ি। বাড়ির সকলের জন্য আছে আলাদা গাড়ি। ছেলে আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড। আমাকে দেখতে এসেছিল। প্রথমে একা। পরে বাবা-মাকে নিয়ে। আমাকে সবার খুব পছন্দ। আমি ইচ্ছে করলেই ভেঙে দিতে পারতাম, বিয়েটা। কেন দেব? প্রশ্নই ওঠে না। আসলে আমিই ফেসবুকে ডাক্তার সাহেবকে পটিয়েছি। এখন আমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছে। ডাক্তার মানুষ, দেখতেও সুন্দর, তার উপরে তাদের এত গাড়ি বাড়ি টাকা পয়সা, সব মিলিয়ে সোনায় সোহাগা রে। শাওন, আমাকে ভুল বুঝিস না। অভাবের সংসারে বড় হয়েছি, দারিদ্র্যতার কষাঘাতে পিষে গেছে জীবন। আমার টিউশনির পড়ার টাকাটাও তুই দিস তোর পকেটমানি বাঁচিয়ে। আমার কলেজ ফিস এমনকি আমার বই খাতা কলম তুই-ই কিনে দিস। এভাবে আর কতদিন শাওন ? আমি আর পারছি না। তোর ভালোবাসার ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না রে। তুই তোর কত শখ, কত প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে আমার জন্য যা করেছিস তা কীভাবে ভুলব বল? দেখ, আমি জানি পড়ালেখা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তুই একদিন আমাকেই বিয়ে করতি। কিন্তু সেই ‘একদিন’ এর যে অনেক দেরি রে শাওন। শাওন, এতদিন আমি দারিদ্যের বোঝা বয়ে নিয়ে যেতে পারব না রে।ভবিষ্যতের আশায় বর্তমান বিসর্জন দেওয়া বোকামি কিনা বল? তুইতো জানিসই আমি একদম বোকা মেয়ে না? প্লিজ তুই আমার বিয়েতে আসিস। প্লিজ। আমি আর এ কদিন কলেজে আসব না। আমি তোর জন্য বিয়ের কার্ড পাঠিয়ে দেব। প্লিজ তুই কাঁদিস না। খবরদার কাঁদবি না। না না না না না।
                    রিয়া...তোর রিয়া  

বিয়ে হলো রাতে। কাকলি অডিটরিয়ামে। আমি গেলাম। দেখলাম, বউ সেজে বসে আছে রিয়া। পরীর মতো লাগছে ওকে। বুকে আমার ধাক্কা লাগল। হাহাকার বয়ে গেল সেখানে। ইশ এই বউটা তো আমারও হতে পারত। বরপক্ষ এখনো আসেনি। রিয়া আমাকে দেখে ইশারায় কাছে ডাকল। পাশ থেকে একটি বড় খাম আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। কোনো কথা হলো না। চলে এলাম।
চলে এলাম পানির কাছাকাছি। অন্ধকারের গহীনে বসলাম গড়াই নদীর তীরে। শীতের রাত। উথাল-পাথাল জ্যোৎস্না। আমি খাম খুললাম। পাচ বান্ডিল ১০০০ টাকার নোট। সাথে একটি চিরকুট। ভিতরে লেখা

শাওন,
    এখানে ৫ লাখ টাকা আছে। আমার হবু বরের কাছ থেকে নিয়েছি। চাইতেই দিয়ে দিল। একবার জিজ্ঞেসও করল না এত টাকা দিয়ে আমি কী করব। তাহলে বোঝ কত বড়লোক, আর আমাকে কত ভালোবাসবে। বাসবে না বল? এই টাকা দিয়ে তুই তোর ইচ্ছে মতো একটা বাইক কিনবি। আর নতুন কোনো রিয়াকে নিয়ে ইচ্ছেমতো ঘুরবি। আর শোন কখনো টাকা লাগলে আমাকে জানাস। লজ্জা করিস না। তুই তো কষ্ট করে আমাকে অনেক দিয়েছিস। আর তোকে দিতে আমার কোনো কষ্ট করা লাগবে না। ভালো থাকিস। ও ভালো কথা সেদিন লিখেছিলাম না আমি খুব চালাক। আসলে ভুল। আমি বড্ড বোকা একটি মেয়ে। তোর মতো ছেলেকে একজীবনে পাওয়া, শতজন্মের পাওয়া রে। আর আমি পেয়েও হারাচ্ছি। আমি খুব বোকা না বল? 

                                ইতি
                                রিয়া...তোর রিয়া

আমি সারারাত নদীর ধারে বসে রইলাম। ৫০০টি নৌকা বানালাম। টাকার নৌকা। ভাসিয়ে দিলাম নদীর স্রোতে। নৌকাগুলো চাদের আলোয় মাঝে মাঝে চিকচিক করে উঠল। মনের ভিতর বেজে উঠল সঞ্জীব চৌধুরী, 
‘ ঐ কান্না ভেজা আকাশ আমার ভালো লাগে না
থমকে থাকা বাতাস আমার
ভালো লাগে না’

আরও পড়ুন : সাদাত হোসাইনের গল্প : তেষ্টা

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড