• শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২০, ১৪ চৈত্র ১৪২৬  |   ৩৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

গল্প : একটি অটোগ্রাফ

  সোহেল দ্বিরেফ

২১ মার্চ ২০২০, ১০:১৪
কবিতা
ছবি : শব্দনীল

বছর ঘুরে বইমেলা এলেই যেন আরিফের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা শুরু হয়! গত কয়েক বছর থেকে তাকে দেখেছি বইমেলা নিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় পার করতে। প্রতিনিয়ত মেলায় ঘুরাঘুরি করতে করতে বেশ কয়েকজন কবি, লেখক এবং প্রকাশকের সাথে তার পরিচয়ও হয়েছে। তাদের সাথে থাকতে থাকতে সে নিজেকেও ওরকম শ্রেণীর কিছু একটা মনে করে। বন্ধু মহলের কেউ কেউ তাকে উৎসাহ দেয় লেখালেখি করতে বিশেষ করে রাহি। 

এইতো গতবছরেও কথায় কথায় এক আড্ডায় রাহি তাকে বলেছিল, ‘আরিফ, তুই কবিতা লেখার চেষ্টা কর। তোর চেহারার মধ্যে একটা কবি কবি ভাব আছে। তাছাড়া অনেকের সাথেই তো তোর পরিচয় আছে। চেষ্টা করে দেখ। যখন তোর বই বের হবে তখন আমরা কিনব আর তোকে প্রমোট করে ফেসবুকে পোস্ট করব।’
কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে সেও উত্তর দিলো, ‘ওটা আমারও স্বপ্ন। কিন্তু লেখালেখি বললেই তো হয় না। এজন্য সাধনা দরকার।’
‘আরও একটা বুদ্ধি আছে। একদম শর্টকাট, কোনো সাধনার দরকার নেই।’
‘কি সেটা?’
‘তোকে একটা প্রেম করতে হবে। প্রেম করে মোটামুটি ধরনের একটা ছাঁকা খাইতে পারলেই তুই কবি!’
‘তাই নাকি!’
‘আরে হ্যাঁ। এবার তো আমার খুব কাছের এক বন্ধুর কবিতার বই বের হয়েছে! ও তিতুমীর কলেজে পড়ে। আমার ছোটবেলার বন্ধু। প্রথমে সেও খুব চেষ্টা করেছিল কবি হওয়ার জন্যে। অবশেষে একটা প্রেম করেছে, তারপর ছাঁকা, তারপর কবি!’
‘ভালো তো। কিন্ত আমি যাদের সাথে কথা বলি, তারা বলে, প্রচুর পড়তে হবে তারপর লিখতে হবে। কিন্তু আমি তো পড়ি তবুও লেখার ভাবটা আসে না।’
‘ওসব বাদ দে। আমি যা বলেছি সেটা কর। তোর কি মন চায় না সেইদিন দেখতে যেদিন শতশত পাঠক তোর অটোগ্রাফ নেয়ার জন্যে লাইন দিবে, ছবি তুলতে চাইবে, একসময় তুই ক্লান্ত হয়ে যাবি তবুও... ’
‘অবশ্যই চাই। এটা আমার স্বপ্ন। কখনো পূরণ হবে কি-না জানিনা।’
‘তাহলে আমি যেটা বলেছি সেটা কর।’
‘মেয়ে পাব কোথায়? কে আমাকে ভালোবাসবে?’
‘ওটা তোকেই খুঁজে নিতে হবে। মনের মানুষ নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়।’
এভাবে কয়েকমাস পেরিয়ে যায় কিন্তু আরিফ এখনো প্রেম করার জন্যে একটা মেয়ে যোগাতে পারল না। তবুও তার চেষ্টা থেমে নেই। তার মাথায় এখন একটাই চিন্তা, এখন যেহেতু এপ্রিল মাস চলছে তাহলে তিন-চার মাস প্রেম করে তারপর দুইমাস মতো দেবদাস হয়ে থাকতে হবে। তাহলে আস্তে আস্তে লেখা বেরিয়ে আসবে। আর ওসব লেখা একসাথে করেই সামনের বইমেলায় একটা কবিতার বই বের করব। 

অবশেষে ছোটভাই মোস্তফার মাধ্যমে একটা প্রেমিকা জুটিয়ে ফেলল। মেয়ের নাম রানু। পড়ে ইডেন কলেজে। বয়সে আরিফের চেয়ে দু'বছরের ছোট। তাদের প্রেম শুরু হওয়ার আগেই যেন ভেঙে গেল! কয়েকদিন ঘোরাঘুরি করার পর অজানা কোন এক কারণে মেয়েটি তাকে ত্যাগ করে। মানুষিকভাবে সে খুবই কষ্ট পায়। তবুও ভেতর থেকে লেখা আসছে না! কি এক মুশকিল! 

আস্তে আস্তে সবার সাথেই সে যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। এই একাকীত্বের দিনগুলোতে তার একমাত্র সঙ্গী খাতা আর কলম! বহু চেষ্টা করে কিছু কবিতা লিখেছে। নিজের লেখা যতবারই সে পড়ছে ততবারই যেন মুগ্ধ হচ্ছে! তারপর লেখাগুলো তার বন্ধুদেরকে দেখাল। তারাও তাকে অভয় দিয়ে বলে, সত্যিই লেখাগুলো অনেক ভালো হয়েছে। বই করতে কোনো সমস্যা নেই। একথা শুনে আরিফের বুকটা যেন আনন্দে আটখানা হয়ে গেল! একপর্যায়ে তার বন্ধু রাহি বলে, ‘এগুলো দিয়ে এই বইমেলাতে বই করতে হবে তাহলে আর তোকে ধরে কে! কবি বন্ধু আমার!’

বইমেলার দিনকাল ঘনিয়ে আসছে। জানুয়ারি গেলেই ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা শুরু। তাই টাকা ম্যানেজ করা এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা দরকার। এদিক সেদিক করে টাকা ম্যানেজ করেছে এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সাথেও  মোটামুটি চুক্তি করে ফেলেছে তাই আর বেশি চিন্তা নেই। বন্ধু মহলের সবাই এখন তাকে কবি বলে ডাকে। এখন আর কেউ তার নাম ধরে ডাকে না। সে নিজেও মনে মনে ভাবতে থাকে, আমার বইটা তাহলে সত্যিই হিট হচ্ছে। 

বইমেলা শুরু হয়ে গেছে। কবি, লেখক, পাঠক এবং প্রকাশকদের পদচারণয় মুগ্ধ চারপাশ। মেলার দ্বিতীয় সপ্তাহে এলো তার বই। তার প্রথম বইয়ের নাম রেখেছে ‘কী পেলে আমায় কাঁদিয়ে’। আনন্দের কোনো অন্ত নেই তার। প্রথম বই বলে কথা! মেলায় পরার জন্যে পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে সে একটা হলুদ পাঞ্জাবিও কিনে রেখেছিল! সেই হলুদ পাঞ্জাবি পরে সে এখন প্রতিদিন মেলায় যায় এবং রাত করে ফিরে আসে। যে বন্ধুগুলো খুব উৎসাহ দিয়েছিল তারা আজ কেউ পাশে নেই! ব্যস্ততা দেখিয়ে তারা পাশ কাটিয়ে চলে! 

আরিফ সকালে খুব আশা নিয়ে বের হয় এবং রাতে শুকনা মুখ নিয়ে হলে ফিরে আসে। পরিচিত কারও সাথে দেখা হলেই জিজ্ঞেস করে, কিরে, কবি তোর বই কেমন চলছে? আরিফ কোন উত্তর দিতে পারে না। এভাবেই চলতে থাকে। আজ মেলার ২৭ তম দিন চলছে। এখনো তার এক কপি বই বিক্রি হয়নি! অনেকই এসে বইটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছে! তখন সে ভাবতে থাকে, এবার হয়তো একটা ক্রেতা পাওয়া গেল আর আমিও অটোগ্রাফ দিব, ছবি তুলবো। 

আরও পড়ুন : ছোট গল্প : অভিমানী পৃথিবী

আরিফের পাশেই লেখকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন অটোগ্রাফ এবং ফটোগ্রাফ নিয়ে! মেলা শেষ তবুও তার সেই মুহূর্তটা এলো না। একটা অটোগ্রাফ বা একটা ফটোগ্রাফ কিছুই না! মেলা শেষে প্রকাশক তার সম্পূর্ণ বই বুঝিয়ে দিলে একটা মিথ্যে হাসি দিয়ে সেগুলো নিয়ে ফিরে আসে আর মনে মনে ভাবতে থাকে, এমন দুষ্ট বন্ধুদের কথা শুনে আর কখনো কবি হতে চাইবো না!

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড