• মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৫ ফাল্গুন ১৪২৬  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

আহসান হাবীব : তিরিশোত্তর কাব্যধারার প্রথম বিদ্রোহী কবি

  শব্দনীল

০২ জানুয়ারি ২০২০, ১০:২৫
কবিতা
ছবি : কবি আহসান হাবীব

‘সেই অস্ত্র আমাকে ফিরিয়ে দাও
সে অস্ত্র উত্তোলিত হলে
পৃথিবীর যাবতীয় অস্ত্র হবে আনত
সে অস্ত্র উত্তোলিত হলে
অরণ্য হবে আরো সবুজ’

ত্রিশোত্তর আধুনিক বাংলা কবিতায় যখন পশ্চিমাধারায় জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে কাব্য রচনা করে যাচ্ছিলেন তখন এই ধারার পরিবর্তনে আসেন কবি আহসান হাবীব। কবিতার আধেয় বা বিষয়বস্তুর বিবেচনায় তিরিশোত্তর কাব্যধারার প্রথম বিদ্রোহী বলা হয় তাকে। তাকে বলা হয় তিনি চল্লিশের দশকের অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি। আজ এই মানুষটির জন্মদিন।

তিনি ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি পিরোজপুর জেলার সংকরপাশা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম হামিজুদ্দীন হাওলাদার এবং মা জমিলা খাতুন। অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল পিতা-মাতার নয় সন্তানের ভেতর তিনি ছিলেন প্রথম। পারিবারিকভাবে আহসান হাবীব সাহিত্য সংস্কৃতির আবহের মধ্যে বড় হয়েছেন। তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজেদের পাঠশালায়। কৈশোরেই আহসান হাবীব মধ্যযুগীয় পুঁথি, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের কবিতা থেকে শুরু করে মীর মশাররফ হোসেনের বহু গ্রন্থ পড়েন। সাবেক মহকুমা শহর পিরোজপুরের মাইনর স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হলেও আর্থিক কারণে স্কুল ছাড়েন তিনি। বড়দের উপদেশে তার বাবা গ্রামের মাদ্রাসায় ভর্তি করেও পরবর্তী সময় তার ইচ্ছানুযায়ী আবার স্কুলে ভর্তি করা হন। 

কৈশোরে থেকেই তার কবিতার প্রতি প্রচণ্ড ঝোঁক ছিল। কলকাতার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এই সময় থেকে প্রকাশিত হতো তার। স্কুল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ‘মায়ের কবর পাড়ে কিশোর’ তার প্রথম মুদ্রিত রচনা। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রথম কবিতা ‘প্রদীপ’। যা প্রকাশিত হয়ে ছিল শরিয়তে ইসলাম পত্রিকায়। এছাড়া কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকা যেমন – দেশ, মাসিক মুয়াজ্জিন, সাপ্তাহিক মোহাম্মদী, সাপ্তাহিক হানাফীতে প্রকাশিত তার কবিতা।

আহসান হাবীবের কবিতার পটভূমি ছিল সমাজ ও সমাজ-সচেতনতা এবং শ্রেণিচেতনা। এই সচেতনতা এসেছে গ্রামকেন্দ্রিক জীবনবোধ, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিশ্বাস, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ ইত্যাদির মধ্য থেকে। তার কবিতার দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়। ‘রেড রোডে রাত্রিশেষ’ কবিতায় তিনি বলছেন-
রাতের পাহাড় থেকে
খ’সে যাওয়া পাথরের মত
অন্ধকার ধসে ধসে পড়ছে।
এখানে এই বিশাল পথ জড়িয়ে
অন্ধকার প’ড়ে আছে
দীর্ঘকায় সাপের মত।

তিনি অস্তিত্ব-প্রকাশের সংগ্রামশোভিত দিক নিয়ে বলছেন। অস্তিত্ব স্থান থেকে উত্তর খুঁজেছেন, সংগ্রাম করেছেন সমাজের মানুষ এবং শ্রেণী বিভাজনের সাথে। আত্ম প্রকাশের এ বাসনা এবং সাধনা ব্যক্তিমানুষের যেমন, তেমনি সমাজেরও থাকে তারই চিত্র অঙ্কন করেছেন কবিতায়। 

‘আমি তো বিদেশী নই, নই ছদ্মবেশী বাসভূমে
না, তারা জানে না কেউ আমার একান্ত পরিচয়
অথচ নিঃসঙ্গ বারান্দার
সন্ধ্যা, এভেন্যুর মধ্যরাত্রির স্তব্ধতা, সার্কাসের
আহত ক্লাউন আর প্রাচীরের অতন্দ্র বিড়াল,
কলোনির জীবনমথিত ঐকতান, অপ্সরীর
তারাবেঁধা কাঁচুলি, গলির অন্ধ বেহালাবাদক
ব্রাকের সুস্থির মাছ, সেঁজার আপেল জানে কতো
সহজে আমাকে,...’
‘রৌদ্র করোটিতে’ কবিতায় নিজের মধ্য দিয়ে বুঝাতে চেয়েছেন আধুনিক মানুষ কতটা নিঃসঙ্গ। তার সঙ্গে জড়িত আছে ব্যক্তিসত্তার সংকট। যা আমাদের দুমড়ে- মুচড়ে নিয়ে যাচ্ছে নিঃশেষের দিকে। তিনি প্রচলিত পন্থার, উপমা-উৎপ্রেক্ষা-রূপকের চেয়ে সমান্তরাল রূপক ও প্রতীক ব্যবহার করে কবিতা লিখে গেছেন। 

কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাত্রিশেষ’ প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালে। তার গ্রন্থের সংখ্যা ২৫টি। লিখেছেন উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ছোটদের ছড়া ও কবিতা। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো— রাত্রিশেষ, ছায়াহরিণ, সারা দুপুর, আশায় বসতি, মেঘ বলে চৈত্রে যাবো, দু’হাতে দুই আদিম পাথর, প্রেমের কবিতা, বিদীর্ণ দর্পণে মুখ, রাণী খালের সাঁকো, আরণ্য নীলিমা, জাফরানী রং পায়রা, জোছনা রাতের গল্প, ছুটির দিন দুপুরে, বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, ছুটির দিন দুপুরে, কাব্যলোক প্রভৃতি।

সাহিত্য অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন— আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, নাসিরুদ্দিন স্বর্ণপদক, আবুল মনসুর আহমেদ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পদক, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, কবিতালাপ পুরস্কার, পদাবলি পুরস্কার, কবি আবুল হাসান স্মৃতি পুরস্কার ইত্যাদি।

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনের এই অভিভাবক ১৯৮৫ সালের ১০ জুলাই পরলোকগমন করেন। 

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড