• বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২০, ১৯ চৈত্র ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ছোট গল্প : অভিশাপ

  ফখরুল হাসান

২২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:২৯
গল্প
ছবি : প্রতীকী

সন্ধ্যে ছুইছুই। আকাশের বুক লালটুকটুকে। পাখিরা ফিরছে তাদের চেনাচেনা ঘরে। এই চেনাজানা ঘর যে কতটা আপন তা অনুভব করতে চোখের কোণ বেয়ে নেমে আসছে দু’ফোটা জল। সেই সকালে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয় পাখি, ঠিকানা না জেনেই। কিন্তু ঠিক সময়ে ফিরে আসে ঘরে। খানিকবাদেই টুনির জীবনে পাখির মতোই চিরচেনা ঘর ছেড়ে অচেনা ঘরে যেতে হবে। যদিও ইচ্ছের বিরুদ্ধেই হচ্ছে সব। মনে মনে ভাবছে কেনো যে এই দৃশ্যমান বন্ধন। অথচ অদৃশ্য কালামে তার বাঁধন। 

আজকে টুনির মধ্যে যেনো এক বিদ্যান বিদ্যান চিন্তার দুয়ার খুলে যাচ্ছে। ভাবছে বিয়ে এমন একটি সামাজিক বন্ধন, যা সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে শারীরিক সম্পর্কের অনুমতি দেয়। যে মূহুর্তের জন্য অপেক্ষা করে প্রতিটি মানব সন্তান। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত মূহুর্তটুকু যদি প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত বয়সের দুইজন মানুষেকে এক করে দেয়। 

তাহলেই ঘটতে পারে চরম বিপদ। আর এই সব ঘটনাগুলো ঘটে হতদরিদ্র পরিবারে। এমনটা হতে পারে দুটি কারণে অশিক্ষা ও দারিদ্র্যতা। মেয়ে হলে তো বিদায় দিতেই হবে। গ্রামের স্কুল শেষ করে থানার স্কুলে পড়ে কম কি! তাছাড়া, শোনা যাচ্ছে ছেলেও নাকি ভাল। বাড়ির উঠোনে বসে মুখে পান চিবোতে চিবোতে ঘটক সুরুজ মিঞা বললো কথাগুলো, ‘এমন ছেলে কোথায় পাবেন মিয়া। তাছাড়া, পুরুষ মানুষের একটু বয়স থাকলেও সমস্যা নেই, বিয়ের পর ঠিক হয়ে যাবে।’

এসব ভাবতে ভাবতে রাত নেমে এলো। টুনিকে নানান সাজে সাজানো হচ্ছে। নিজের চেহারার দিকে তাকিয়ে নিজেই বিস্মিত সে। একটু পরেই তাকে যেতে হবে অন্য ঘরে। যেখানে সে অজানা এক নারী। মধ্যরাতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মেয়েকে নিয়ে আসা হল তার নতুন ঘরে। যে মেয়েটি সবে জীবনের সংজ্ঞা শিখতে শুরু করেছে, শৈশব থেকে কৈশোরে পা রাখতে যাচ্ছে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই, তার আজ বাসর রাত। 

পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে সতীত্ব যাচাই করার উৎসব। আর বিয়ে তো একটি সামাজিক বৈধতা মাত্র। সমাজ অনেক এগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিয়ের সময় মেয়ের মতামতটা এখনও গৌন। একটা সময় বাড়ির সব কোলাহল থেমে গেলো। টুনিকে একটি সাজানো গোছানো ঘরে রাখা হলো। এমন ঘর সে অনেক দেখেছে। 

আজ সেই ঘরের বাসিন্ধা সেও। তার চেয়ে বছর পনের বড় ছেলেটি ঘরে ঢুকেই শরীরের সমস্থ পোশাক খুলে বিছানায় আসতে টুনির লজ্জার শেষ নেই। তারপর টুনিকে খামছে ধরলো বাঘের মতো। যেনো টুনির শরীরটা কোনো সুস্বাধু মাংসের ঢিবি। টুনির ইচ্ছে করছে, চিৎকার করতে, কিন্তু বাসর ঘরে চিৎকার করা যে উচিত নয়, এতটুকু বুঝতে শিখেছে টুনি। শিখিয়ে দিয়েছে তার দাদী জামেনা বেগম। তবুও হাত পা ছুঁড়ে বরের লালসার যজ্ঞ থেকে বেরিয়ে আসার মিথ্যে চেষ্টা। টুনির সকল বাধাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বর তার লালসার জগতে তৃপ্তির ঢেকুর ছাড়ে।

শরীরের উপর ওঠে ভারী ওজনের ভর দিতে থাকে প্রবল উচ্ছাসে। টুনির সকল যন্ত্রনা আর কান্নায় পুরুষটা যেনো কাপালিকের মতো উৎফুল্ল হতে থাকে। তখন টুনি রক্তে ভেজা। তখনও ফিনকির মত রক্ত যাচ্ছে। ক্রমান্বয়ে সাদা ফাক্যাসে হয়ে আসছে মুখের রঙ! এসব দেখে পুরুষটার তৃপ্তির শেষ নেই। সে হাসতে হাসতে বলে আমি সৌভাগ্যবান। আমার বউ সতী। ধীরে ধীরে টুনির শরীর অসাড় হয়ে যায়। বরের হুশ ফেরে। সে বুঝতে পারে টুনি বেশ অসুস্থ। দ্রুত তাকে হসপিটালে নিতে হবে। নইলে হযতো সর্বনাশ হতে পারে।

রাত ১টা ১৩ মিনিট। হোসেনপুর উপজেলা হাসপাতালের ডিউটি ডাক্তার জিকু, সবে বিশ্রাম নেয়ার জন্য ঘুম ঘুম চোখে চেয়ারে হেলান দিয়েছে। ইমারজেন্সি থেকে কল আসল স্যার জরুরি আসেন রোগীর অবস্থা খুব বেশি খারাপ। চোখের পাতায় ঘুম ঠেসে আসলেও কিছু করার নাই। দ্রুত পা চালিয়ে ইমারজেন্সিতে এসে চমকে যাওয়ার মত অবস্থা। রোগীর, রক্তে ভেজা শাড়ি। মুখের রঙ ফ্যাকাসে, সাদা। কাপড় দেখেই বোঝা যাচ্ছে নতুন বিয়ে হয়েছে। ডাক্তার জিকু, জানতে চাইল কি হয়েছে? জিকু ডাক্তারের প্রশ্ন শুনেই চোরের মত একজন রুম থেকে বের হয়ে গেল। 

রোগীর সঙ্গে আসা অর্ধ বয়সী মহিলা বলল, ‘ডাক্তার হইছেন বুঝেন না! সব বলতে হইবো!’ ডাক্তার জিকুর সবকিছু বুঝে উঠতে একটু সময় লাগলো। বরের তুলনায় কম হয়ে গেছে কনের বয়স। বাচ্চা মেয়ে, দেখে বুঝা যায় সবে মাত্র ১৩ পেরিয়ে ১৪ বছরে পড়েছে। দারিদ্র্যতা ও অশিক্ষার কারণে হয়তো মেয়ের বাবাও মোটামুটি ভাবে লাল শাড়ি পড়িয়ে মেয়েকে বিদায় দিতে পেরে খুশি।

ডাক্তার জিকু, কথাগুলো ভাবছে তখনও রক্ত যাচ্ছে প্রচুর। হাতে পালস দেখা হল। খুবই কম। জরুরি ভিক্তিতে রোগীকে রক্ত দেয়া দরকার। জরুরি অবস্থায় অপারেশন করে ছিঁড়ে যাওয়া অংশ ঠিক করতে হবে। এই ভয়াবহ সংকটাপন্ন রোগীকে নিয়ে হিমসিম খাওয়ার অবস্থা কর্তব্যরত ডাক্তারের। ধীরে ধীরে আঁধার কেটে দিনের আলো ফুটতে শুরু করে। চারদিকে শুধু আহাজারিতে ভেসে আসে টুনির আঁধারের যাত্রী হওয়ার এক বিষাদময় খরব।

নবীন- প্রবীন লেখীয়োদের প্রতি আহ্বান: সাহিত্য সুহৃদ মানুষের কাছে ছড়া, কবিতা, গল্প, ছোট গল্প, রম্য রচনা সহ সাহিত্য নির্ভর আপনার যেকোন লেখা পৌঁছে দিতে আমাদেরকে ই-মেইল করুন [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড