• বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯, ৫ আষাঢ় ১৪২৬  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন

‘তোমার শহর’ উপন্যাসের ৭ম পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস : তোমার শহর

  রোকেয়া আশা ০১ জুন ২০১৯, ১৩:৪৩

গল্প
ছবি : প্রতীকী

বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও না ভিজলে কঠিন পাপ হয়। আমি যখন এই কথাটা বলছিলাম সম্রাট আর জেরিন তখন হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছিলো। আমার শাড়ি সমস্যার সমাধান হয়েছে। জেরিনই সমাধান করেছে। আমার শাড়ির আচলটা কয়েক পরতে ভাজ করে কাঁধে সেফটিপিন দিয়ে আটকে দিয়েছে। এখন আমি মোটামুটি নিরাপদ অবস্থায় আছি। খেয়েদেয়ে বিল দেওয়ার পর ঠিক হলো আমরা প্রথমে চৌরঙ্গীতে যাবো। সেখানে কদম গাছটা ফুলে ছেয়ে আছে। বর্ষা আসেনি বলে আমি কদম হাতে নিইনি এতদিন। আজ আর বাধা নেই। আজ পয়লা আষাঢ়ে আমরা তিন বন্ধু বর্ষাবন্দনা করবো। 

দুই তরুণী আর কিশোর কিশোর চেহারার এক তরুণ হাত ধরাধরি করে ঝুম বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে; তরুণী দুজনের পরনে শাড়ি। এরকম অদ্ভুত ঘটনা রাস্তাঘাটে সচরাচর দেখা যায় না। তবে এই শহরের গল্পগুলো অন্যরকম। এখানে পাপ-পূণ্য আর স্বাভাবিক-অস্বাভাবিকের হিসেব বাকি পৃথিবীর চেয়ে আলাদা। আমরা তিনজন যখন ভিজতে ভিজতে হাঁটছি, তখন এরচেয়ে সত্য এরচেয়ে স্বাভাবিক কিছুই এখানে নেই। বন্ধুত্ব একটা অদ্ভুত সম্পর্ক। একমাত্র এই সম্পর্কেই ভবিষ্যৎ নিয়ে কেউ ভাবে না। বোধহয় এজন্যই, বর্তমানের প্রতিটা মুহূর্ত শুধু বন্ধুদের সাথেই সত্য।
 
তিনজন হাঁটতে হাঁটতে চৌরঙ্গী পৌঁছাতেই আমার খানিকটা মন খারাপ হয়ে গেলো। দু’বছর আগে এখান থেকেই নাফিজ আমাকে কদমফুল দিয়েছিলো। আমার প্রথম প্রেম। নিবিড় ভাইয়ের প্রতি ফল করার জন্যে বোধহয় নাফিজের সাথে ব্রেকআপটাও কিছুটা দায়ী। সবকিছু সহ্য করা যায়, কিন্তু খুব নিজস্ব অনুভূতির শূন্যতা সহ্য করা যায় না। তাই বোধহয় অনুভূতিহীন হয়ে পড়ার আগেই নাফিজের জন্য কষ্টটা নিবিড় ভাইয়ের প্রতি অদ্ভুত আবেগে রূপ নিয়ে নিয়েছে। প্রেম শব্দটার মধ্যেই একটা গভীর বিষাদ লুকিয়ে থাকে। এখন থেকে দু’শো বছর আগেই কলকাতায় এক তরুণ বসে এইসব গাঢ় বিষাদময় প্রেমের কথা লিখে গেছেন। বর্ষাবন্দনায়ও প্রেম, বসন্তবরণেও প্রেম।
 
কোন এক নির্জন দিনে সেই তরুণ তার গুপ্ত প্রেয়সী নতুন বৌঠানকে একটা কদমফুল হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘এটা প্রথন কদম না হোক, আমি তোমায় দিচ্ছি, তাই এটাই বাদল দিনের প্রথম কদমফুল।’
সেই প্রেমও পরে বিচ্ছেদের মুখ দেখেছে। আমি অজান্তেই একটা শ্বাস ফেলি। তারপর এগিয়ে যাই পুকুরের পাশে। কদমগাছটার কাছে। একগুচ্ছ ফুল টেনে ছিড়ে বন্ধুদের কাছে ফিরে আসি। এই কদম নিয়ে এত ফ্যাসিনেশন কি এদেশে আগেও ছিলো? ছিলো না। 
দুশো বছর আগে এক তরুণ তার প্রেয়সীর হাতে কদম তুলে দিয়ে এই কদমপ্রেমের ভিত্তিটা তৈরী করে দিয়ে গিয়েছিলেন। আর তার অনেক- অনেক পরে; বাংলাদেশের আরেক তরুণ তার লেখা উপন্যাস আর তার বানানো নাটকে বর্ষাবন্দনার প্রধান উপকরণ হিসেবে কদম ফুলকে একদম প্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে গেছেন। 
প্রথম তরুণ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; আর দ্বিতীয়জন, হুমায়ূন আহমেদ। বঙ্গদেশের বর্ষার রূপ বোধহয় এই দুই লেখক পাল্টে দিয়েছেন। আমি কয়েকটা ফুল জেরিনের হাতে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করি ওকে, ‘বাদল দিনের প্রথম কদমফুল - গানটা পারিস?’
জেরিন মুচকি হাসে আমার দিকে তাকিয়ে। তারপর গাইতে শুরু করে। আমি আর সম্রাট তন্ময় হয়ে শুনি।
 
জেরিন হচ্ছে সেইরকম একটা মেয়ে যাকে অনায়াসে কোন উপন্যাসের নায়িকার চরিত্রে বসিয়ে দেওয়া যাবে। হুমায়ূন আহমেদ তার সব উপন্যাসে নায়িকার বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখতেন ‘অত্যন্ত রূপবতী তরুণী’; জেরিন ঠিক তাই। 
এরকম ঝুমঝুম বৃষ্টির মধ্যে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে শাড়ি পরা এক রূপবতী তরুণী কদমফুল হাতে গান গাইছে। প্রথম বর্ষার বৃষ্টির মধ্যে একটা আলাদা সুর আছে। এই সুরের সাথে জেরিনের অদ্ভুত সুন্দর গলার গান মিশে এই গ্রহের সবচেয়ে সুন্দর শব্দ সৃষ্টি করেছে। বৃষ্টির পানি এসে বারবার আমার চোখ ঝাপসা করে দিচ্ছে, আমি চোখ মোছার চেষ্টা না করেই ওর দিকে তাকিয়ে আছি। কি অপূর্ব একটা দৃশ্য!

পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটা বৈশিষ্ট্য আছে, এখানে ছন্দপতন বলে কিছু হয় না। জেরিনের গানের শেষের দিকে তাই যখন কেউ একজন আমার নাম ধরে ডাক দিলো, আমাদের কাছে সেটাকেও এই অপূর্ব দৃশ্যেরই একটা অংশ হিসেবে মনে হলো। আমি চোখ মুছে মুখ তুলে তাকাই। নিবিড় ভাই হেঁটে আসছেন। সবসময় চোখে থাকা চশমাটা হাতে, স্বাভাবিক। কাচে জমা পানির চেয়ে চোখে জমা পানি মুছে ফেলা বেশি সহজ। তা যেখানেই হোক না কেন। 
তিনি আমাদের পাশে এসে দাঁড়াতেই সম্রাট হাসিমুখে গিয়ে উনার সাথে হ্যান্ডশেক করলো। 
- আপনি ভিজছেন কেন এভাবে? 
সম্রাটের প্রশ্নের উত্তরে তিনি আমাদের তিনজনের দিকে এক এক করে তাকিয়ে বললেন, ‘তোরাও তো ভিজছিস। আর তোরা দুইটা শাড়ি পরে ভিজছিস কেন? এত তেল?’ 
আমি আর কিছু বলি না। জেরিনই চট করে বলে দেয়, ‘এটা তুনুর জন্য। আজকে আষাঢ় মাসের এক তারিখ, মানে বর্ষার প্রথম দিন। আজকে বৃষ্টিতে না ভিজলে নাকি পাপ হবে।’
জেরিনের কথা শুনে তিনি তার স্বভাবসুলভ হাসিটা দেন আবার। আমার ভালো লাগে ভীষণ। সকালে উনার সাথে উল্টোপাল্টা কথা বলে এমনিতেই মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। এখন বৃষ্টির সাথে সাথে সেইসব মন খারাপও ধুয়ে যাচ্ছে। তবে সেটা আর বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। 
- আচ্ছা, থাক তোরা। আমি আসি। 
আশ্চর্য! উনার তো চলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিলো। এতে আমার এতটা খারাপ লাগারই বা কি আছে! অথচ তবুও খারাপ লাগতে থাকে। 
আমি মন খারাপ ভাবটা কাটাতে সম্রাট আর জেরিনের দিকে তাকাই আবার। 
- এই, তোরা কালীদাসের মেঘদূত পড়েছিস? 
দুজনেই মাথা নাড়ে ওরা। পড়েনি। আমি অন্যমনস্ক হয়ে যাই কিছুটা। নিজের মনেই আবৃত্তি করতে শুরু করি,
‘ধারাসিক্তস্থলসুরভিণস্ত্বন্মুখস্যাস্য বালে
দূরীভূতং প্রতনুমপি মাং পঞ্চবাণঃ ক্ষিণোতি
ধর্মান্তেঽস্মিন্বিগণয কথং বাসরাণি ব্রজেযুঃ
দিক্সংসক্তপ্রবিততঘনব্যস্তসূর্যাতপানি।’
- এই, কি বলছিস এইসব? 
সম্রাট আমার কাঁধে হাত দিয়ে একটা ঝাঁকি দিতেই বাস্তবে ফিরে আসি। ওদের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে শ্লোকটা বাংলায় বলি আবার।
‘স্বপন-মিলনে যদি কভু প্রিয়ে তোমারে হৃদয়ে ধরিতে যাই,
শূন্য আকাশে প্রসারিয়া বাহু বৃথাই কেবল দুঃখ পাই!
হেরি অভাগার গভীর যাতনা দেবতারও আখিঁ সজল হয়,
তরু কিশলয়ে অশ্রু মুক্তা ঝরি’ ঝরি’ পড়ে বেদনাময়!’ 
- কি এটা? 
জেরিনের প্রশ্ন শুনে তাকাই ওর দিকে। 
- মেঘদূতের শ্লোক। উত্তরমেঘে ছিলো এই শ্লোকটা। বেচারা যক্ষ তার যক্ষপ্রিয়ার জন্য কেমন অনুভব করছিলো, তার একটা ছোট বর্ণনা। 
- প্রথমে কি অংবং বলছিলি? 
- সংস্কৃত। না, আমি সংস্কৃত পারি না। তবে এইরকম দুই চারটা শ্লোক খুব ভালো লাগলে মুখস্ত করে রাখি। এই আর কি! 

ওরা দুজন আবার দুপাশ থেকে আমার হাত ধরে। আমরা হাঁটতে শুরু করি, আরও সামনে যাবো। আরও অনেকটা পথ হাঁটবো আমরা। আমি পেছনে তাকাই একবার। কদমগাছটার পাতা থেকে সত্যিই বোধহয় মেঘের অশ্রুমুক্তা ঝরে পড়ছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড