• বুধবার, ২৬ জুন ২০১৯, ১২ আষাঢ় ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

‘তোমার শহর’ উপন্যাসের ৬ষ্ঠ পর্ব

ধারাবাহিক উপন্যাস : তোমার শহর

  রোকেয়া আশা

২৫ মে ২০১৯, ১৪:১৯
গল্প
ছবি : প্রতীকী

জেরিনের চাপাচাপিতে শাড়ি পরতে হলো, এমন না যে আমি শাড়ি পরিনা। পরি, যথেষ্ট আগ্রহ নিয়েই পরি। আজ পরতে হলো জেরিনের জন্য। ধবধবে সাদা শাড়ি, কালো ব্লাউজ, কপালে মাঝারি আকারের একটা কালো টিপ আর চোখে টেনে কাজল। ব্যাস! 

এটুকুতেই আমার সাজ শেষ। বের হওয়ার সময় কি মনে করে ডান হাতে একমুঠো সাদা কাচের চুড়ি পরে নিলাম। আমরা যখন বের হচ্ছি তখনো একইরকম অন্ধকার। ফোন বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখি, মাত্র দুটো পাঁচ বাজে। অস্বস্তি লাগছে কিছুটা শাড়ি পরে। অনভ্যাসের জন্য নয়। কিছুটা টমবয় ভাব থাকলেও শাড়ির ক্ষেত্রে আমি বরাবরই উৎসাহী, স্বচ্ছন্দও। এখনকার অস্বস্তির কারণ বাইরের অন্ধকার গুমোট ভাবটা। যখন তখন বৃষ্টি নামতে পারে। সাদা শাড়ি পরে বৃষ্টির মধ্যে পড়লে বিচ্ছিরি একটা অবস্থা হবে। শাড়িটা এসে গায়ের সাথে লেপ্টে থাকবে। জোর করে অস্বস্তিটা সরিয়ে দিই মাথা থেকে। বৃষ্টি এখনই নামবে না। উঁহু। 

কোথায় যাবো আগে থেকে কিছু ঠিক করা ছিলো না, রিকশায় উঠেই জেরিন যখন বটতলায় যেতে বললো অবাক হইনি। আমাকে ছাড়া ছুটির দিনে ও লাঞ্চ করবে না জানা কথা। রিকশা চলতে চলতেই ফোন এলো। সম্রাট। এখানে সম্রাটের পরিচয়টা একটু জানিয়ে রাখা দরকার। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড জেরিন, কিন্তু এরপর কোন বন্ধুর নাম বলতে হলে সেটা সম্রাট। 

হ্যারি পটার সিরিজে হ্যারি আর হারমিওনে প্রাণের বন্ধু ছিলো। বিপরীত লিঙ্গের দুটো মানুষ বেস্ট ফ্রেন্ড হলে এই প্রাণের বন্ধুর জন্য প্রেমট্রেম হয় না। হ্যারির যেমন চো চ্যাংয়ের সাথে প্রেম টেকেনি। 
সম্রাটের দূর্ভাগ্য, আমাদের দুজনের রনের মত সুন্দরী ছোটবোন থাকা কোন বন্ধু নেই। যেকারণে বেচারার প্রেমও হচ্ছে না। অবশ্য প্রেম না হওয়া নিয়ে সম্রাট মুখে যতটা হাহুতাশ করে, বাস্তবে এতটা মাথাব্যথা ওর নেই। 
- তুনু কই তুই? 
- বটের দিকে আসছি। 
- তাড়াতাড়ি আয়। উঁচুবটে নেমে কল দিবি। 
আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফট করে ফোনটা কেটে দেয়। আমি জেরিনের দিকে তাকিয়ে হাসি। 
- সম্রাট উঁচুবটে দাঁড়িয়ে আছে। 
জেরিনও ফিক করে হেসে ফেলে। আমিও হাসি। আহ্! বন্ধু! 
উঁচুবটে নেমে সম্রাটকে আর ফোন দিতে হলো না, রিকশা থেকে নামার সময়ই ওকে দেখি আমি। সম্রাটও দেখে আমাদের। হাত নাড়ে। 
আমি আর জেরিন ওর কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই ও কৃত্রিম বিস্ময় নিয়ে বলে, ‘এত রঙ কই পাস তোরা? শাড়ি কিসের জন্য আবার?’
আমিও হেসে ফেলি। ওর দিকে তাকিয়ে বলি, ‘তোর জন্য পরেছি। আমাদের মধ্যে যাকে তোর বেশি ভালো লাগবে, তার সাথে তোর বিয়ে হবে আজকে।’
 
তিনজনই শব্দ করে হাসতে থাকি। আকাশে তখনও মেঘ। তবে আমার মধ্যে এখন আর কোন মেঘ নেই। আমার সাথে আমার বন্ধুরা আছে।

খেতে খেতে ওদের দুজনকে সকালের ঘটনাটা বলি। আমি বালছাল বলছি দেখে নিবিড় ভাইয়ের এক্সপ্রেশনটা যদি তোরা দেখতি। হিহিহি! 
খাওয়ার সময় বেশি হাসাহাসি করাটা আমার মায়ের পছন্দ না। কয়েকবার খাওয়ার সময় হাসতে গিয়ে গলায় খাবার আটকে ভয়ানক ঝামেলা বাঁধিয়েছি। তবুও, বন্ধুদের সাথে বসে খাওয়ার সময় হাসি আটকানো সম্ভব বলে আমার মনে হয় না। সম্রাটের গলায় এরমধ্যেই ভাত আটকেছে। 

ও কাশতে কাশতেই কথা বলছে এরপরেও, ‘হেয়ার এন্ড স্কিন, না তুনু? হিহিহি!’ 
আমি জগ থেকে স্টিলের গ্লাসটায় পানি ঢেলে ওর দিকে গ্লাস বাড়িয়ে দেই। 
- পানি খা ব্যাটা! মরবি তো! 
সম্রাট পানির গ্লাসটা হাতে নিয়েও হিহি করে হেসেই যাচ্ছে। আমার আর জেরিনের মুখোমুখি বসেছে ও। আমার পাশে বসা জেরিনের অবস্থা আরও অদ্ভুত। ও হাসতে হাসতে একটু পরপর আমার কাঁধে পড়ে যাচ্ছে। 
বাইরে তখন ঝুমঝুম বৃষ্টি। আর এই ছোট হোটেলের ছোট একটা টেবিলে জীবন। আজ ছুটির দিন। সম্রাটের ঢাকায় থাকার কথা। কোন এক বিচিত্র কারণে ( বলা উচিৎ সম্পূর্ণ অকারণে) আজ ও এই ছোট শহরটায় থেকে গেছে। অদ্ভুতভাবে আজ এই শহরবন্দী মেঘের দিনে আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় দুই বন্ধুর হাত ধরে বসে আছি। 
- আজ আষাঢ়ের এক তারিখ, জানিস তোরা? 
আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দুজনই মাথা নাড়ে। 
- এসব তোর জানার কথা আমরা জেনে কি করবো? 
জেরিনের কথা শুনে সম্রাট ওর বা হাতটা উঁচু করে ধরে। জেরিনও। হাই ফাইভ। 

আমি মুচকি হাসি ওদের দিকে তাকিয়ে। আবার বাইরে তাকাই। শাড়ির রঙের জন্য অস্বস্তি লাগছে বৃষ্টি দেখে। কিন্তু বর্ষার প্রথম বৃষ্টি, উপেক্ষা করা কি ঠিক হবে!

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড