• বুধবার, ২৬ জুন ২০১৯, ১২ আষাঢ় ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

ছোট গল্প : শিং মাছ

  সানজিদা রিয়া

২৩ মে ২০১৯, ১৫:৩৭
শিংমাছ
ছবি : সংগৃহীত

পাশ ফিরে শুতে ভয় পাচ্ছে রোদসী। ওর কেবলই মনে হচ্ছে পাশে শুয়ে আছে মাছটা। মাছের সাথে পরিচিত হওয়া যাক। দিন দশেক আগে রোদসীর বাবা এক কেজি তরতাজা শিং মাছ কিনে আনলেন। শিং মাছগুলো তখনো জীবিত। লাফাচ্ছে যেন কাতর ভাবে! রোদসী বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ওরা এভাবে লাফায় কেন? বাবা বলেছিলেন, বেশিক্ষণ পানিতে না থাকলে ওরা শ্বাস নিতে পারেনা বলে মরে যায়। রোদসী আরও মিনিট দশেক অপেক্ষা করে একটা মাছ তুলে নিল আলাদা একটা পাতিলে। সেই পাতিল ভর্তি পানি। মাছ তোলার প্রক্রিয়ায় শিং এর গুঁতোও খেল! কিন্তু রোদসীর একটুও খারাপ লাগলো না। এই একটা মাছকে সে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে!

পাতিলটা এনে রোদসী খাটের তলায় রাখলো। এ ঘরটা রোদসীর দিদির। দিদি কিছুদিন ধরে মামার বাড়ি বেড়াতে গেছে। সে যাই হোক, রোদসীর সারা দিন কাটলো মাছটাকে নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা করে! শিং মাছ কী খায়? একটা একুরিয়াম বানিয়ে ফেলা যায় কিনা! এদিকে দুপুরে রান্নাঘর থেকে ঘুরে এসে বুঝতে পারলো, মা টের পাননি যে একটা মাছ কম ছিল পাতিলে। কি সুন্দর মাছ রান্নার গন্ধ! ক্ষুধায় রোদসীর পেট চোঁ চোঁ করছিল। সে সবার আগে খেতে চলে গিয়েছিল ডাইনিং টেবিলে। মা গরম গরম শিং মাছের তরকারি তুলে দিলেন প্লেটে। রান্না করা শিং মাছ দেখে রোদসীর গা গুলিয়ে উঠলো। সে কিছু মুখে দিতে পারলো না। আরেকবার তরকারির দিকে তাকাতেই বমি করে দিল খাবারের প্লেটেই।

রাতেও আবার চেষ্টা করা হল ওকে খাওয়ানোর। সারাদিন কিছু না খেয়ে সাত বছরের একটা বাচ্চার সুস্থ থাকা দায়! অথচ ওই শিং মাছ দেখলেই রোদসী বমি করে দিচ্ছে। মা অন্য তরকারি নিয়ে এলেন। তাও রোদসী খেতে পারেনি। মা-বাবা দুজনই বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন।

গভীর রাতে রোদসীর ঘুম ভেঙে গেল। তার পাশে মা ঘুমুচ্ছিলেন। রোদসী ঘুমের ঘোরে মায়ের বুকে মুখ লুকাতে গেল। মা আঁতকে উঠলেন। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে রোদসীর কপাল। সারারাত বসে বসে বাবা মা ওকে জলপট্টি দিলেন। ওষুধ খাওয়ালেন। জ্বর গ্রীষ্মের দাবদাহের মত হু হু করে বেড়েই চললো!

শেষরাত। রোদসী আধো ঘুম আধো জাগরণের মধ্য থেকেই দেখতে পায়, মাছটা ওর ঘরে চলে এসেছে। পাতিল থেকে বের হয়ে কাতরাতে কাতরাতে লাফাতে লাফাতে সে খাবার চাচ্ছে! মাছের পেটে খুব ক্ষুধা! রোদসীর মতো ক্ষুধা!

রোদসী দেখতে পায়, সে নিজে উঠে গিয়ে ফ্রীজ খুললো খাবারের আশায়। ফ্রীজে কেবল শিং মাছের তরকারি। রোদসী এখন আর তরকারিটা চিনতে পারেনা। সে মাছটার সামনে শিং মাছের তরকারিটাই এনে রাখে। মাছ বমি করে দেয়। অনেক বমি। রোদসীর জামা ভরে যায় সে বমিতে। জ্ঞান হারালো রোদসী।

সাতদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে রোদসী। দিদি তখনো বাড়ি ফেরেনি। বাবা মা রোদসীর সাথে হাসপাতালেই ছিলেন। এ কয়দিন ঘর তালা দেয়াই ছিল।মায়ের নাকে একটা বোটকা গন্ধ এসে লাগলো ঘরে ঢুকতেই। বোটকা গন্ধের উৎস খুঁজে বের করতে নামেন তিনি। রোদসী হাল্কা গলায় বলে, "দিদির খাটের তলায় পাতিলে একটা মাছ রাখা ছিল, মা। ও না খেতে পেয়ে মরে গেছে। আমার দোষ নেই, মা। আমি ওকে তরকারি দিয়েছিলাম, ও আমার ওপর বমি করে দিল।"

মা কিছু না বলে পাশের রুমে গেলেন। পাতিল টা আবিষ্কার করলেন। তারপর আর বোটকা গন্ধ পাওয়া গেলনা। রোদসীও আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না।

দিদি ফিরে এলে রোদসী আবার দিদির ঘরে সেই খাটে ঘুমাতে গেল। মাঝরাতে তার ঘুম ভেঙে গেল। সে পাশ ফিরে দেখলো, দিদির আকারের একটা শিং মাছ কাতরাচ্ছে বিছানায়। অস্ফুট স্বরে বলছে। সে খেতে চায়। শিং মাছের তরকারি খেতে চায়।

ওডি/এসএম

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড