• শুক্রবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০ ফাল্গুন ১৪২৫  |   ২০ °সে
  • বেটা ভার্সন

গল্প : ভাঙন থেকে বসন্ত

মার্জিয়া মোস্তফা মাথিন

  অধিকার ডেস্ক    ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৩:৩৬

মার্জিয়া মোস্তফা মাথিন
মার্জিয়া মোস্তফা মাথিন

নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে ইরা'র জন্ম, কিন্তু কোনো না পাওয়া তাকে আটকে রাখতে পারে না । সবকিছু ছাপিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্যই যেন তার জন্ম হয়েছে। 

উনিশ বছর বয়সেই তার বিয়ে হয়ে গেল অমিয়'র সাথে। পরিবারের দিকে তাকিয়ে ইরা বিয়েটা করতে বাধ্য হলো, অমিয় শিক্ষিত ছেলে সে নিশ্চয়ই ইরার স্বপ্নগুলো পূরণে সাহয্য করবে। 

যদিও অমিয় অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ইরার বাবাকে- তার মেয়েকে পড়াশোনা করাবে, স্বপ্নপূরণে বাধা দেবে না। কিন্তু বাস্তবটা অনেকটাই ভিন্ন। অমিয়'র কাছে পড়াশোনা মানে শুধু পাঠ্যবই! আর ইরা হলো সর্বগ্রাসী প্রতিভার অধিকারী। কে রুখে তাকে, কী পারে না সে! কিন্তু অমিয় রুখে ছিল, স্বামী বলে হয়ত। 

প্রতিভাবান প্রতিবাদী ইরা নামমাত্র পড়াশোনা করছে আর সংসার করছে, মেয়েটা মানিয়ে নিয়েছে আর মানিয়ে নেয়াই নাকি মেয়েদের ধর্ম। কিন্তু খুব লাভ যে হলো তা না, অমিয় প্রতিনিয়ত ইরাকে ছোট করতে শুরু করলো। বিয়ে না হলে ইরা কখনো জানতই না তার এত খুঁত আছে।

হাস্যোজ্জ্বল মেয়েটা কেমন মলিন হয়ে যেতে শুরু করলো তবুও সংসারের প্রতিটা দায়িত্ব খুব যত্ন করে পালন করছিল। ইরা যেদিন টের পেল অমিয় তার চাচাতো ভাই, খালাতো ভাই, বন্ধু সবার সাথে জড়িয়ে ইরাকে সন্দেহের চোখে দেখে তখন ঘৃনায় ইরা'র মরে যেতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু ইরা জানতোও না এটা তো মাত্র শুরু ছিল।  

পড়াশোনার পাশাপাশি ইরা উপস্থাপনা এবং সাংবাদিকতার একটা ডিপ্লোমা করা শুরু করলো, আগে থেকেই উপস্থাপনা ইরার নেশা, এখন নিজেকে সে আরেকটু ঝালিয়ে নিচ্ছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ইরা একটা অনলাইন নিউজ পোর্টালে কাজও পেয়ে গেল আর নিজেকে নিয়ে আরও বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো। 

অমিয়'র সহ্য হলো না কিন্তু যেহেতু সে ভদ্র সমাজের তাই ইরার গায়ে হাত তুলতে পারলো না, নানা রকমভাবে তাকে আটকানোর চেষ্টা করলো, এমনকি তার পরিবারকে বোঝালো ইরার জন্য সাংবাদিকতা পেশাটা মোটেও উপযুক্ত নয় ইরা বরং একটা স্কুলে চাকরি করতে পারে। 

নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তাদের সন্তানের সংসার নিয়ে একটু বেশি চিন্তা করে, ইরার বাবা তাকে জানিয়ে দিল সব বন্ধ করতে নইলে ইরার সংসারটা ভেঙে যেতে পারে। ইরা আবার হেরে গেল। সংসার করতে শুরু করলো। 

প্রথম থেকে হাজার চেষ্টা করেও ইরা অমিয়কে বন্ধু বানাতে পারলো না। এত কিছুর পরও ইরা অমিয়কে, অমিয়ের পরিবারকে আগলে রেখেছে, কখনো কখনো প্রয়জনের বেশিও প্রাধান্য দিয়েছে, ভালোবেসেছে। অমিয় ইরাকে শ্রন্ধা করে না মুখে বলে ভালোবাসে কিন্তু ইরা খুব ভালো করে জানে এটাকে ভালোবাসা বলে না। 

ইরা'র অভিমান হয় প্রত্যেকের উপর এমনকি নিজের উপর। সারা জীবন অন্যের জন্য ভেবে গেল মেয়েটা কিন্তু নিজের জন্য ভাবলো না, এখন আত্নসম্মানবোধটুকুও নেই। এমন ভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াটাই ইরা'র কাছে সহজ মনে হলো।

তৃতীয় বারের মত সিলিং ফ্যানের সাথে ওড়না ঝুলাতে গিয়ে ইরা হঠাৎ নিজের প্রেমে পড়ে গেল। আত্নহত্যাটা আর করা হয়ে উঠলো না বরং নিজের সাথে প্রতিজ্ঞা করলো নিজের জন্য বাঁচবে, নিজেকে একটু ভালোবাসবে।  

ইরা তার স্বপ্ন পূরণের জন্য নতুনভাবে নিজেকে প্রস্তুত করা শুরু করলো, ঠিক করলো সাংবাদিকতাকেই প্রফেশন হিসেবে নেবে। সাংবাদিক বিভাগে পড়ে এমন এক বন্ধুর সাহায্য নিয়ে ঘরে বসেই এ বিষয়ক সব খুটিনাটি বই পড়া শুরু করলো আর ডিপ্লোমার অভিজ্ঞতা তো ছিলই। সব থেকে বড় কথা ইচ্ছাশক্তি ছিল আকাশ ছোঁয়া। 

সব মিলিয়ে গোপনে একটি সিভি পাঠালো জাতীয় পর্যায়ের একটি চ্যানেলে। বেশকিছুদিন পর ইরা'র ডাক এলো, ভয়ে ইরা চুপসে গেল এত প্রতিযোগিতার ভিড়ে নিজের অস্বিত্ত খুঁজে পাবে তো ইরা। ইরাকে অবাক করে দিয়ে ইন্টারভিউ বোর্ড জানালো, প্রথমে কাজ শেখার জন্য একমাস তাকে ফিল্ড ওযার্ক করতে হবে। 

ইরার বিশ্বাস হচ্ছে না, প্রথমেই সে এই আনন্দের খবরটা সব থেকে কাছের মানুষ অমিয়কে জানালো। প্রতিউত্তরে অমিয় বললো এই চাকরিটা করলে তোমার জীবনে অন্ধকার নেমে আসবে। আমি তোমাকে গ্রহণ করবো না। অমিয়র কথা শুনে ইরা আকাশ -পাতাল কাঁপিয়ে অট্টহাসি হাসলো।  

সেদিন ইরা অমিয়কে ডিভোর্স লেটার পাঠানোর জন্য বাহিরে গেল। ফেরার পথে একটা হালকা হলুদ রঙের শাড়ি, লাল কাঁচের চুড়ি আর এক পাতা টিপ কিনে আনলো...

আজ তেরো ফেব্রুয়ারি ইরা'র প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট। আজ বসন্তও বটে! ইরা হালকা হলুদ রঙের শাড়িটা পরলো, তার নতুন পরিচয় আইডি কার্ডটা গলায় ঝুলালো আর কপালে ছোট্ট একটা লাল টিপ পরলো। কী যে সুন্দর লাগছে ইরাকে... দেখে সে নিজেই মুগ্ধ। 

বাসার নিচে অফিসের গাড়ি অপেক্ষা করছে। ইরা নিচে নামতেই ড্রাইভার সালাম দিয়ে গাড়ির দরজাটা খুলে দিল। ইরা ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছে। ড্রাইভার মিষ্টি হেসে বললো- ‘আপা গান ছাড়ি’। ইরা হ্যাঁসূচক মাথা নাড়লো।

গান বাজছে "আহা,আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে,
এত বাঁশি বাজে,এত পাখি গায়। 

এটাই ইরা'র জীবনে প্রথম বসন্ত। ইরা'র নিজেকে আজ পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হচ্ছে।
 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড