• বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯, ৭ ভাদ্র ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

১৪ হাজার ফুট উপর থেকে স্কাইডাইভিং

  পাপিয়া শারমিন

৩০ জুলাই ২০১৯, ১৭:৪৫
স্কাইডাইভিং
উড়তে উড়তে পৃথিবী দেখার অনুভূতি বলে বোঝানো যাবে না। (ছবি : লেখক)

আমি স্কুল লাইফে কখনো লং জাম্প বা হাই জাম্প দেইনি। প্যারাসেইলিং তো অনেক দূরে কখনো রোলার কোস্টারেই চড়িনি। এয়ার ক্রাফটে ওঠার আগে ট্রেইনার জানতে চাইলো, স্পিনিং রাইডে আমার সমস্যা হয়েছে কি না কখনো? আমি বললাম, "না হয়নি।" অথচ আমি জানিও না আমার সমস্যা আছে কি না। কখনো ঐ ধরনের রাইডে চড়ার সাহস করিনি। তবে রকি মাউন্টেনের স্কাই ওয়াকে হাঁটতে বেশ ভয় করেছিল।

আমরা চার বন্ধু মিলেই ঘুরে বেড়াই। ঠিক করলাম রোজার ঈদের পরে স্কাইডাইভ দিব। যেই ভাবা সেই কাজ। পাশের স্টেট পেনসেলভেনিয়ার স্কাইস দ্য লিমিট ডাইভিং সেন্টারে বুকিং দিয়ে দিলাম। কিন্তু বাসায় বলা মাত্রই আম্মুর অজ্ঞান হওয়ার দশা। অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে তাকে রাজি করালাম। অনেকক্ষণ পর একটু সম্মতি দিলেন। তাতেই আমায় আর পায় কে।

চারজনেরই প্রথমবার। সবাই খুব এক্সাইটেড। সবকিছু রেডি। এবার শুধু কাঙ্ক্ষিত দিনটির জন্য অপেক্ষা। কিন্তু বিধিবাম! সে দিনের ঠিক আগের দিন ডাইভিং সেন্টার থেকে ইমেইল আসলো একটা। আমাদের স্কাজুয়াল্ড ডে তে অনেক বৃষ্টি থাকবে সে কারণে আকাশে ওড়া  সম্ভব না। তারিখ পেছাতে হবে। নিউইয়র্কে ৩-৪ জনের সময়ের সমন্বয় করে কোথাও যাওয়া খুব কঠিন। সবাই সবার কাজে খুবই ব্যস্ত থাকে। তাছাড়া সবার ওয়ার্কিং স্ক্যাজুয়ালও ভিন্ন। আমি বন্ধুদের জানিয়ে দিলাম যে আমার কানাডা ট্যুরের আগে আমি যেতে পারব না। সবাই মিলে তখন নতুন করে দিন করলাম জুনের ২৫ তারিখ।

স্কাই ডাইভিং

এয়ার ক্রাফট থেকে লাফ দেওয়ার পরপর। (ছবি : লেখক) 

আবারও অপেক্ষা। এবার আরও ভয়ানক ঘটনা ঘটে গেল। হাওয়াইতে স্কাইডাইভিং করার সময় একটি ছোট্ট এয়ারক্রাফ্ট ক্রাশ করল জুনের ২৪ তারিখে। ১১ জন নিহত হয় ঐ ঘটনায়। এমন একটি ঘটনায় শোক প্রকাশ করতে ২৫ শে জুন আমাদের ডাইভিং সেন্টার ডাইভিং বন্ধ রাখবে ঘোষণা দিল। এবার ভয় গেল বেড়ে। বাসায়ও আর কিছু না জানিয়ে জুলাইয়ের ১২ তারিখে তিন বন্ধু চললাম ডাইভিং দিতে। হ্যাঁ, তিন বন্ধুই। কারণ ঐ দুর্ঘটনার পর আমাদের একজন সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেললো। সে যাবে না আর।

জুলাই ১২ তারিখ যথাসময়ে আমরা পৌঁছে গেলাম ডাইভিং সেন্টারে। প্রথমে মরে গেলে কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় টাইপ কিছু পেপার ওয়ার্ক সাইন করতে হলো। এরপর চলল বেশ কিছু বেসিক ট্রেনিং। আমাদের ডাইভ দেওয়ার কথা ছিল দুপুর তিনটায়। কিন্তু ট্রেনিং শেষে জানতে পারলাম আজ অনেক বেশি বাতাস বইছে উপরে। বাতাসের গতি না কমা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে সবার। ভেবেছিলাম হয়তো বাতাসের কারণে ডাইভ না করেই আমাদের ফিরতে হবে নিউইয়র্ক। অপেক্ষা করতে করতে বিকাল ৬টা থেকে আবার ডাইভিং শুরু হলো।

বিকাল সাড়ে ছয়টার দিকে আমরা এয়ারক্রাফটে উঠলাম। ছোট্ট একটা এয়ারক্রাফ্ট। আমরা আটজন আর আমাদের সবার সাথে একজন করে ট্রেইনার। এখানে জাম্প দেওয়ার বেশকিছু নিয়ম আছে। ট্রেইনার সাথে নিয়ে ২৫টা জাম্প সফলভাবে দিতে পারলে তখন একাই জাম্প করা যায়। এয়ারক্রাফটে কোন সিট নেই। সবাইকে পাটিতে বসার মতো বসতে হয়।

আনুমানিক ৭০০০ ফুট উপরে ওঠার পরই এয়ারক্রাফটের সাটার খুলে দিল। বাকি ৭০০০ ফুট খোলা সাটার নিয়েই উপরের দিকে উঠলাম। উপরে প্রচণ্ড ঠান্ডা বাতাস বইছিল। সাটার খুলে দেওয়ার পর থেকে বুকের কাঁপুনি বেড়ে গেল।

স্কাইডাইভিং

মনে হচ্ছিল আমার কোনো ওজনই নেই। (ছবি : লেখক) 

আমরা ১৪ হাজার ফুট উপরে। একজন একজন করে লাফিয়ে নামবে। আমার পালা তিন নম্বরে। সামনের জন লাফ দেওয়ার ২-৩ সেকেন্ডের মধ্যে আমিও লাফ দিব। এমন সময় আমার ট্রেইনার জিজ্ঞেস করলো, আমার কিছু বলার আছে কি না? আমি বললাম, "এই মুহূর্তে নিজের নাম ছাড়া আর কিছুই মনে আসছে না আমার।"

একে একে দুইজন লাফিয়ে নামল। এবার আমার লাফ দেওয়ার পালা। আমি নিচে তাকিয়ে প্লেনের থেকে আর পা নামাতে পারছি না। ট্রেইনার কিছুটা পুশ করেই লাফ দেওয়ালো। লাফ দেওয়ার পর থেকে প্যারাসুট খোলা পর্যন্ত সময়টাকে বলা হয় ফ্রি ফল। মাত্র ৪০ সেকেন্ড স্থায়ী ছিল ফ্রি ফল। আমার কাছে ৪০ সেকেন্ডই তখন যেন অনন্তকাল মনে হচ্ছিল। একটাই ভয় কাজ করছিল ভেতরে। যদি আমার ট্রেইনারের থেকে সেফটি লকটা খুলে যায়। হাস্যকর চিন্তা।

প্রথম ১০ সেকেন্ড চোখ বন্ধই ছিল। এরপর চোখ খুলেই মনে হলো পাশে সূর্য আর নীল রঙের প্রাচুর্য। নিচে শুধু সাদা মেঘ। হিম শীতল ঠান্ডা বাতাস। বাতাসের প্রচন্ড বেগ। মনে হচ্ছিল বাতাসেই বুঝি খণ্ড খণ্ড হয়ে যাচ্ছি। ফ্রী ফলে পজিশন ছিল উপুড় হয়ে শুয়ে থাকার মতো। উপর থেকে নিচে পড়ার অনুভূতিটা অনেকটা ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে পড়ে যাওয়ার মতোই। তবে ভয় বা উচ্ছ্বাস কমপক্ষে ২০ গুণ বেশি।

স্কাইডাইভিং

অবশেষে নামলাম পৃথিবীর বুকে। (ছবি : লেখক) 

মেঘের স্তর পার করেই বুঝতে পারলাম প্যারাসুট ওপেন হয়েছে। এবার নিচের নদীটাকে সাপের মতো দেখা যাচ্ছে। পোকোনো মাউন্টেনের পুরো ভিউটা উপর থেকে দেখলাম। এবার মনে হচ্ছে পাখির মতো উড়ছি। শূন্যে ভেসে আছি। মনে হচ্ছে যেন আমার কোনো ওজনই নেই। পারাসুট ওপেন হওয়ার পর অটোমেটিক পজিশন চেঞ্জ হয়ে গেল। এখন যেন হাওয়ায় দাঁড়িয়ে আছি।

এবার ঘটলো মজার ঘটনা। ট্রেইনার বললো, পা দুটোকে চেয়ারে বসার পজিশনে আনতে। কিন্তু আমি তো কোনো ওজনই টের পাচ্ছি না। পা নাড়াতে পারছি না। ট্রেইনার বলল, "পারবে, আর একটু চেষ্টা করো।" অনেক কষ্ট করে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থান থেকে পা টেনে চেয়ারে বসার পজিশনে আনলাম। এরপর সেফলি ল্যান্ড করলাম। ফ্রি ফল সহ ল্যান্ডিং এ মোট সময় লেগেছিল মিনিট পাঁচেকের মতো। আর খরচটা একেক জায়গায় একেক রকম। আমার পেনসেলভেনিয়াতে ভিডিওসহ মোট ৩৫০ ডলার খরচ হয়েছে। ৭ হাজার ফুট থেকে লাফ দিলে আরও কম খরচ হতো।

ডাইভিংয়ের আগে কিছু মানুষ বলেছিল, “অন্যদের ৫ মিনিট লাগলে তোর তো ২ মিনিট লাগবে নিচে পড়তে যে মোটা তুই।“ অনেকে সাহস দিয়েছিল তবে বেশির ভাগই ক্রিটিসিজম ছিল। তারপরও সাহস করলাম। বাধা ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার নামই জীবন। সবচেয়ে ভালো লেগেছে এখন পরিচিত অনেককেই বলতে শুনছি এবার তারাও সাহস করবে, আমাকে দেখে।

ওডি/এসএম

দেশ কিংবা বিদেশ, পর্যটন কিংবা অবকাশ, আকাশ কিংবা জল, পাহাড় কিংবা সমতল ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা অথবা পরিকল্পনা আমাদের জানাতে ইমেইল করুন- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড