• শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

মার্কিন মুলুকের পথে পথে

  পাপিয়া শারমিন

২৫ এপ্রিল ২০১৯, ২২:৩৭
আমেরিকা ভ্রমণ
ব্রান্ডওয়াইনক্রীক স্টেট পার্কে গোলাপী সৌন্দর্যের নিচে বসে প্রাণ জুড়িয়ে গেল। (ছবি : লেখক)

আমেরিকা নাম শুনলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে সারি সারি আকাশচুম্বি ভবন আর সুন্দর সুসজ্জিত নগরী। আসলে আমেরিকাকে সিনেমা টিভিতে এরকমই দেখা যায় বেশি। বিশ্বের বড় দেশগুলোর একটি হলো আমেরিকা। এদেশটি শুধু আয়তনেই বিশাল না, বরং এর রয়েছে ঘুরে বেড়ানোর মতো অসংখ্য জায়গা। যদিও এখানকার মানুষদের ঘুরে বেড়ানোর ফুসরত মিলে কমই। ছুটি ছাটা পেলেই দল বেঁধে ঘুরতে চলে যায় এদেশের অনেক মানুষ। বেশ কয়েক বছর ধরেই আমি আছি আমেরিকাতে। কাজের সুবাদে বন্ধু বান্ধবও জুটেছে বেশ কিছু। সময় সুযোগ পেলে আমিও ছুটে বেড়াই তাদের সাথে নিয়ে।

হাঁপিয়ে উঠেছিলাম টানা কয়েকদিন কাজ করতে করতে। দম ফেলার একটা সুযোগ নিয়ে এলো স্প্রিং ব্রেক। ছুটিটা বেশ বড়সড়ই। কোথাও ঘুরতে যাওয়ার একটা তৃষ্ণা জেগেছিল আগে থেকেই। কিন্তু কোথায় যাব তা ভাবা হয়নি। একেকবার একেক্টা জায়গার নাম মাথায় এসেছে। বন্ধুদের কাছে শেয়ার করতেই খুশিতে লাফিয়ে উঠলো সবাই। একদিনের মধ্যে প্লান করেই চার বন্ধু বেরিয়ে পড়লাম গাড়ি নিয়ে।

আমেরিকা

কতদিন পর শিশিরে পা ভিজিয়েছিলাম মনে পড়ে না। (ছবি : লেখক) 

জার্নি শুরু করলাম রাত সাড়ে তিনটায়। গন্তব্য ভার্জেনিয়া বিচ। নিউইয়র্ক থেকে ভার্জেনিয়া বিচের দুরত্ব ২৮০ মাইল। অনেকদিন পর সমুদ্রের কাছাকাছি হচ্ছি । মনের মধ্যে এখনই সমুদ্রের ঢেউ ফুঁসতে শুরু করেছে। হাতে সময় নিয়েছি দুইদিন। এই দুইদিনে খুব বেশি জায়গা হয়তো ঘুরতে পারব না কিন্তু নিঃশ্বাস ফেলার ফুসরত তো মিলবে। ভোরের আলোর ফুটছে পুব আকাশে। চোখে নেমে আসছে ঘুম। এর মধ্যে ইয়ারফোনে বাজছে জন ডেনভারের কান্ট্রি রোড গানটি। গান শুনতে শুনতে কোথায় যে হারিয়ে যাচ্ছি। কী অদ্ভুত একটা আনন্দ হচ্ছে বলে বোঝানো যাবে না।

আমেরিকা

চেসাপীক বে ব্রিজ টানেল ।(ছবি : সংগৃহীত)  

দুই দিনের সফরে ঘুরেছি চারটা স্টেটের বিভিন্ন শহরে। প্রথম দিন নিউইয়র্ক থেকে যাত্রা শুরু করে প্রথমে দেলাওয়ার স্টেটে আসি। এরপর দেলাওয়ার থেকে মেরিল্যান্ড স্টেট হয়ে ভার্জেনিয়া। দ্বিতীয় দিন ভার্জেনিয়া থেকে পেনসেলভেনিয়া স্টেটের ফিলাডেলফিয়া হয়ে নিউইয়র্ক ফেরা। এই দুটি দিন প্রকৃতিকে দেখেছি খুব কাছ থেকে।

দেলাওয়ার স্টেটে পৌঁছাই সকাল ৭ টা বাজে। প্রথমেই গেলাম ব্রান্ডওয়াইনক্রীক স্টেট পার্কে। এখানে একটা মজার ঘটনা ঘটলো। পার্কটা খোলে সকাল ৮ টায়। আমরা একঘন্টা আগে পৌঁছে গেছি। এখন একটা ঘন্টা অপেক্ষা করা ছাড়া কিছু করার নেই। এরই মধ্যে পার্কের এক কর্মচারীর সাথে দেখা। ব্যাস ভদ্রলোককে ২ মিনিটে পটিয়ে ফেললাম! তিনি আমাদের পার্কে ঢোকার অনুমতি দিলেন!  ঘড়িতে সময় দেখলাম সাতটা বেজে ৫ মিনিট। যেহেতু এন্ট্রি ফি সকাল ৮ টা থেকে কালেক্ট করে, তাই তিনি আমাদের গাড়িটা ফ্রীতেই যেতে দিলেন । এন্ট্রি ফি না দিয়ে, পার্ক ওপেন হওয়ার আগেই পার্ক ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা হয়ে গেল আমাদের।

আমেরিকা

বন্য ঘোড়াদের সাথে বিপদজনক সেলফি।(ছবি : লেখক) 

ব্রান্ডওয়াইনক্রীক স্টেট পার্ক টা উইলমিংটন শহর থেকে ৩ মাইল উত্তরে অবস্থিত। ৯৩৩ একর জায়গার উপর তৈরি বিশাল এক পার্ক। অনেকদিন পর সকালে পাখির ডাক শুনতে শুনতে সবুজ ঘাসে হাঁটলাম। ঘাসে চাদর বিছিয়ে সকালের নাস্তাটাও সেরে ফেললাম চার বন্ধু মিলে। নিউইয়র্ক থেকে কাচ্চি, গ্রীল্ড চিকেন, নান আর বিভিন্ন ধরনের ফল নিয়ে এসেছিলাম সারাদিনের জন্য। নিউইয়র্কের বাইরে দেশীয় খাবার পাওয়াটা বেশ কঠিনই।

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য মেরিল্যান্ড স্টেটের  অ্যাসাট্যাগ আইল্যান্ড। এখানকার সিনকোট্যাগ আইল্যান্ড এবং অ্যাসাট্যাগ স্টেট পার্ক বন্য ঘোড়ার জন্য বিখ্যাত। সারা দ্বীপ জুড়েই অসংখ্য ঘোড়া ঘুরে বেড়াচ্ছে মুক্তভাবে। এসব ঘোড়া যেমন তেজি তেমনই সুন্দর। একই সাথে বিপদজনক হিসেবেও বেশ নাম ডাক আছে এদের। এখানকার দর্শনার্থীদের জন্য নির্দেশনা দেওয়া আছে ঘোড়া দেখতে হলে অন্তত ৪০ ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। কে শোনে কার কথা! সুযোগ মতো আমি ঠিকই একদম কাছ থেকে ছবি তুলে এসেছি ঘোড়াদের সাথে।

আমেরিকা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি মার্কিন নৌবাহিনীর এই যুদ্ধ জাহাজ। (ছবি : লেখক) ​​​​​​​

প্রথম দিনের শেষ গন্তব্য ভার্জেনিয়া বিচ । এখনো দুটো প্রধান আকর্ষণই তো বাকি। এই ট্যুরের মূল আকর্ষণ চেসাপীক বে ব্রিজ-টানেল। ২৩ মাইল দীর্ঘ এই টানেলটির অফিসিয়াল নাম লুসিয়াস জে. কেলাম জুনিয়র ব্রিজ টানেল। দুই দুইটা নাম থাকতেও এই টানেল কিন্তু ভার্জেনিয়া টানেল নামেই বেশি পরিচিত

দিনের শেষ আকর্ষণ ভার্জেনিয়া বিচ। সেখানে পৌঁছুতে পৌঁছুতে বিকেল। প্রাণ ভরে উপভোগ করলাম সামুদ্রিক সূর্যাস্ত। ভার্জিনিয়া বিচে শেষ মুহূর্তের রক্তিম আলোয় মন উদাস হয়ে যাচ্ছিল বারবার। সমুদ্রের ঢেউ আর আকাশের রঙ মনকে কেমন বিষণ্ণ করে দিচ্ছিল।

পরদিন সবাই সকাল ৬ টায় খালি পায়ে শিশিরভেজা ঘাসে হাঁটতে বের হলাম। যেটা নিউইয়র্ক সিটিতে অনেকটা দিবাস্বপ্ন বলাযায়। শিশিরের মৃদু স্পর্শের সাথে ছিল ভোরের পাখিদের কিচিরমিচির। একটা দিনের শুরুটা ভাল করতে আর কি লাগে!

আমেরিকা

এটিই সেই বিখ্যাত লিংকন গান। (ছবি : লেখক) ​​​​​​​

আজকের প্রথম আকর্ষন ইউএসএস উয়িসকন্সিন (বিবি-৬৪) নামের একটি যুদ্ধ জাহাজ। এটি ইউএস নেভির দ্বিতীয় যুদ্ধ জাহাজ। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি ব্যবহৃত হয়েছিল বেশি। জাহাজটি নির্মাণ করা হয় ফিলাডেলফিয়াতে। বর্তমানে এটি ভার্জেনিয়া স্টেটের নরফোক সিটিতে মিউজিয়াম শীপ হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছে।

দিনের দ্বিতীয় আকর্ষণ ছিল ফোর্ট মনরো ন্যাশনাল মন্যুমেন্ট। এটি একটি ঐতিহাসিক স্থান। আমার কাছে এটিকে লালবাগের কেল্লার মতোই লেগেছে। ১৮৬২ সালের ঐতিহাসিক লিংকন গান নামক কামানটি এখানেই সংরক্ষিত আছে।

বাড়ি ফেরার আগে ট্যুরের শেষ গন্তব্য ছিল পেনসেলভেনিয়া স্টেটের ফিলাডেলফিয়া সিটি। ফিলাডেলফিয়া তে প্রথমে  মিউজিয়াম অব আর্ট এবং শেষে পেন্স ল্যান্ডিং এবং ডাউনটাউন এর নাইটভি দেখার মাধ্যমে শেষ হল আমার এবারের রোড ট্রীপ।

ওডি/এসএম 

দেশ কিংবা বিদেশ, পর্যটন কিংবা অবকাশ, আকাশ কিংবা জল, পাহাড় কিংবা সমতল ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা অথবা পরিকল্পনা আমাদের জানাতে ইমেইল করুন- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড