শত বছর পেরিয়ে আজও সগৌরবে মাথা উঁচু করে আছে বরেন্দ্র জাদুঘর

প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:০৬

  নুরুজ্জামান খান

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিলেন, ‘গহনের মধ্যে অদৃশ্য গৌড় পুনরাবৃত্তের লুপ্তপ্রায় রথচক্ররেখার অনুসরণ করিয়া আপনারা আমাদের দেশের ইতিহাসের যে সুপ্রশস্থ রাজপথ উৎঘাটনে ব্রতী হইয়াছেন, আপনাদের সে উদ্যোগ সার্থক হইল।’

কবিগুরু রাজশাহীর বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির প্রকাশিত ‘গৌড়রাজমালা’ পড়ে কথাগুলো বলেছিলেন। শত বছর পেরিয়েছে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। ১০৮ বছর অতিক্রম করে ১০৯ বছরে পা রাখতে যাওয়া দেশের প্রথম ও প্রাচীন এ জাদুঘরটির সৌন্দর্য বয়সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। ১৯১০ সালে কুমার শরৎকুমার রায়ের প্রতিষ্ঠিত জাদুঘরটি এখন বঙ্গীয় শিল্পকলার সবচেয়ে সমৃদ্ধ সংগ্রহশালা। বর্তমানে এখানে রয়েছে প্রায় ১১ হাজার প্রত্ন নিদর্শন।

বরেন্দ্র জাদুঘর

গেটের পাশের কারুখচিত শিল্প

 

বাংলাদেশের বিস্মৃত ও লুপ্তপ্রায় ইতিহাসের উপাদান সংকলনের আশায় বরেন্দ্রভূমিতে ধারাবাহিকভাবে তথ্যানুসন্ধানের জন্য গত শতাব্দীর প্রথম দশকে গঠিত হয় বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি। এ ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের জাদুঘর। মহৎ ও কালজয়ী এ প্রচেষ্টার পেছনে কুমার শরৎকুমার রায়ের ব্যক্তিগত অবদান অপরিসীম। তার অদম্য জ্ঞান পিপাসা এবং পুরাতত্বের প্রতি গভীর অনুরাগ এ প্রচেষ্টাকে সার্থক করে তুলেছে।

বরেন্দ্র জাদুঘর

দর্শণার্থীদের কাছে ডাকছে বরেন্দ্র জাদুঘর

 

শত বছর বয়স পার হলেও কমেনি এর সৌন্দর্য, কমেনি আকর্ষণ করা বা দর্শণার্থীদের কাছে ডাকার প্রচেষ্টা। তাইতো প্রতিদিন বিভিন্ন শত শত জ্ঞান পিপাসু আর ভ্রমণ পিপাসুরা ভীড় জমান জাদুঘর চত্বরে। ভীড় জমানো মানুষগুলোও বিচিত্র ধরনের। এদের ধর্ম-বর্ণ, বয়স, জাতি, ভাষা, অঞ্চল, পেশা বিভিন্ন , হয়তো অভিন্ন এক মায়ার টানে  তারা ছুটে আসে জাদুঘরটিতে। দর্শনার্থীদের মধ্যে কেউ শেখার কৌতূহল থেকে নাড়াচাড়া করে দেখতে চান সংরক্ষণ করা নিদর্শনগুলো আবার কেউ শুধু বিনোদনের জন্য এক ঝলক দেখে সময় কাটান।

রাজশাহীতে বসবাস করেন এমন কোনো মানুষ পাওয়া যাবে না যে, কোনো দিন বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে যাননি। গবেষণার জন্য নির্মিত হলেও অবসর কাটানোর জন্য এটি কম উপযোগী নয়। জাদুঘরে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী কিশোর আশিক জানান, সে অসংখ্য তার ছোট্ট জীবনে অসংখ্যবার এসেছে জাদুঘর দেখতে। শুধুই গবেষণা নয়, তার উদ্দেশ্য অবসর সময়ও কাটানো।

বরেন্দ্র জাদুঘর

জাদুঘরের ভেতরের দৃশ্য

 

আশিক কিশোর থেকে এক সময় যৌবনে আর যৌবনে থেকে বার্ধক্যে পৌঁছে যাবে। বার্ধক্য থেকে হয়তো একদিন পরপারে চলে যাবে। আশিকের মতো শত শত কিশোর যুগ যুগ ধরে দর্শনার্থী হয়ে এসেছিল এই বরেন্দ্র জাদুঘরে। আজ তাদের অনেকে হয়তো পৃথিবীতে নেই, পৃথিবীতে থাকলেও হয়তো রাজশাহী নগরীতে আর নেই, কিন্তু বরেন্দ্র জাদুঘরটি শত বছর অতিক্রম করে আজও দাঁড়িয়ে আছে নগরীর হেতেম খাঁ নামক স্থানে। মানুষের আসা-যাওয়ার মিছিলে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর মাথা উচুঁ করে দাঁড়িয়ে থাকবে যুগের পর যুগ বছরের পর বছর। 

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়