• রবিবার, ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৬  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন

আমের শহর চাঁপাইনবাবগঞ্জে একদিন

চাঁপাইনবাবগঞ্জ_অধিকার
ছবি : সম্পাদিত

উত্তরবঙ্গ বলতে আগে সবসময় বুঝতাম এক নানীবাড়ী দিনাজপুর আর দাদাবাড়ী ঠাকুরগাঁও। তোবে গতানুগতিক গণ্ডির বাইরেও উত্তরবঙ্গের যে আরও বিস্তর পরিধি রয়েছে সেটা বুঝেছি বড় হবার পর। 

এই ধরুন সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, নওগাঁ ইত্যাদি। এসব জেলায় বেশ কয়েকবার যাওয়া হয়েছে তোবে বনলতা সেনের নাটোর হয়ে কখনো শিক্ষানগরী রাজশাহী কিংবা আমের দেশ চাঁপাইনবাবগঞ্জে যাওয়া হয়নি।

যাই হোক, এবার ভাবলাম অনেক তো যাওয়া হল এদিক সেদিক, এবার চাঁপাইয়ের ওদিক যাওয়া যাক। অবশ্য বন্ধু জাহিদ অনেকদিন থেকেই একটি রাইসমিল ভিজিটের কথা বলে আসছিল (এখন সে একজন চালের সফল ব্যাবসায়ী)। ভাবলাম রাইসমিলও দেখা হলো আর সাথে চাঁপাই তো ঘুরা হবেই। 

অবশেষে গেল বছরের মে মাসের প্রথমদিকেই সেই দিনক্ষণ এলো। চলে গেলাম কল্যাণপুরে।  সেখানে আগে থেকেই উপস্থিতো ছিলেন বন্ধু জাহিদ। প্রচণ্ড গরম হওয়ায় ভাবলাম নন এসি বাসে না গিয়ে এসি বাসে গেলে কেমন হয়। পরবর্তীতে গ্রামীণ ট্রাভেলস এর হুন্ডাই এসি কোচে করে রওনা দিলাম। বলে রাখা ভালো চাঁপাইনবাবগঞ্জ ট্যুরে আমাদের থাকার ব্যাবস্থা হয়েছিল গ্রামীণ ট্রাভেলসের নিজস্ব রেস্ট হাউজে। গ্রামীণ ট্রাভেলস এর মালিকের রাইস মিল পরিদর্শন করতেই আমরা মূলতো যাচ্ছিলাম।

বাস ছাড়ল। গাবতলী, আমিনবাজার, চন্দ্রা, মির্জাপুর পেরিয়ে বাস টাঙ্গাইল মহাসড়কে প্রবেশ করল। এই রাস্তা সবসময় আমার কাছে সুপরিচিতো দিনাজপুর–ঠাকুরগাঁও ভ্রমণকালে। অপেক্ষায় ছিলাম কখন সিরাজগঞ্জ পৌঁছে একদম নাটোর–বনপাড়া রোডে প্রবেশ করব। 

এভাবে দেখতে দেখতে চলে এলাম ফুড ভিলেজ প্লাস (হাইওয়ে রেস্টুরেন্ট)। হালকা খাবার শেষ করে উঠে পড়লাম বাসে, এবার বাস প্রবেশ করল নাটোর বনপাড়া রোডে। এই রোডের একটি বিশেষত্ব হচ্ছে রোডটিতে সাইকেলসহ থ্রি হুইলার চলার জন্যে আলাদা একটি লেন আছে এবং সম্পূর্ণ রাস্তাটি করা হয়েছে চলনবিলের উপর মাটি ফেলে। তাই কাচিকাটা নামক একটি স্থানে যানবাহন চলাচলকারীদের টোল দিতে হয়। 

কাচিকাটার দুপাশে চলনবিল, মাঝখানে রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছি আমরা। এভাবে নাটোর ক্রস করতে করতে ঘুম চলে আসে। একটু সকাল হলে ঘুম ভেঙ্গে উঠে দেখি যে গোদাগাড়ী নামক একটি স্থান পার হচ্ছি। পাশে জাহিদকে জিজ্ঞেস করতেই সে বলে এটাই রাজশাহীর শেষ, আমরা রাজশাহী ফেলে এসেছি। একটু মন খারাপ হলো আমার, ভাবলাম রাজশাহী শহরটা দেখতাম বাসের মধ্যে থেকেই। 

সে যাই হোক, সকাল ৮টার দিক আমরা চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রবেশ করি। চাঁপাইয়ের ঢাকা বাস স্ট্যান্ডে আমাদের নামিয়ে দেয়া হয়। চলে গেলাম রেস্ট হাউজে, সেখানে আবার ঘুমিয়ে দুপুরের দিকে রহনপুরে চলে যাই রাইস মিলে। সেখানেই দুপুরের খাবার আয়োজন করা হয় আমাদের জন্য। 

এরপর কাজ শেষ করে চাঁপাই শহরে চলে আসি। আমার কেন জানি এই জেলা শহরগুলির প্রতি একটা দুর্বলতা কাজ করে। বাংলাদেশের যেসব গুটিকতোক শহরে ব্রিটিশ আমলের ছোঁয়া লেগে আছে, চাঁপাই সেগুলির অন্যতম। রিক্সা না নিয়ে ভাবলাম হেঁটে হেঁটে দেখি শহরটাকে। এভাবে প্রায় ঘণ্টাখানেক হেঁটে শহরটা উপভোগ করলাম। মফস্বল শহর বিধায় ৮টার মধ্যেই রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। 

রাতে এক হোটেলে (নামটা মনে নেই) চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত কালাই রুটি আর মুরগীর মাংস দিয়ে আহার সেরে নিই। কালাই রুটি প্রচুর ভারী একটি খাবার এবং এই অঞ্চলে জনপ্রিয়ও বটে। মূলত মাশকলাই দিয়ে এটি বানানো হয়। 

পরদিন সকালে উঠেই গ্রামীণ ট্রাভেলস এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর রাকিব ভাই আমাদের ফোন দিয়ে তৈরি থাকতে বলেন। হোটেল তামান্নায় মালাইকারী নামক মিষ্টি, কড়কড়ে তেলে ভাজা পরটা আর ডাল দিয়ে নাশতা সেরে তার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকি আমরা দুজন।

অবশেষে রাকিব ভাই মাইক্রোবাস নিয়ে আসেন আমাদের কাছে। জিজ্ঞেস করতেই বললেন উনি সোনামসজিদ এবং কানসাটে আমাদের নিয়ে যাবেন। বলে রাখা ভালো কানসাট চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি উপজেলা এবং এই এলাকা থেকে দেশের প্রায় ৬০ ভাগ আমের চাহিদা মেটানো হয় গ্রীষ্ম মৌসুমে। গাড়ি চলতে থাকল মহানন্দা নদীর উপর নির্মিত সেতুকে অতিক্রম করে কানসাটের দিকে।

যেতে যেতে আমবাগানের দেখা পড়ল সারি সারি। তবে এই আমবাগান সবগুলোই ছিল কাঁচা আমে পরিপূর্ণ।

এভাবে চলে এলাম সোনামসজিদ বন্দরে। সোনামসজিদ বন্দর দিয়ে ভারতের মালদা জেলা খুবই কাছে। ভারতের এই বন্দরের নাম “মহদীপুর”। ভারতীয় ট্রাকগুলি দেখে আমার চক্ষু পুরোই ছানাবড়া! ১২ চাকার নিচে কোন ট্রাকই নেই তাদের। আর ট্রাকগুলির ড্রাইভিং প্যানেলের ঠিক পিছেই তাদের বিশ্রামের জন্যে রয়েছে একটি ছোট রুমের মতো। কেননা তাদের যে পাড়ি দিতে হয় হাজার হাজার কিলোমিটার। বউ-সন্তান, পরিবার ছেড়ে থাকতে হয় প্রায় সপ্তাহ দুয়েকের মতো।

সোনামসজিদ বন্দর দেখে আমরা যাত্রা শুরু করি কথিতো “জ্বীনের মসজিদের” দিকে। জনমুখে প্রচলিত আছে যে এই মসজিদ নাকি জ্বীনেরা একরাতে তৈরি করেছিল। তবে ভোর হয়ে যাওয়ায় শুধু ছাদ ঢালাই দিতে পারে নাই। ফলে ছাদ ছাড়াই মসজিদটি থেকে যায়।

এরপর আবার একই সেই যাবার পথ ধরেই ফিরে আসতে হয় আমাদের। আমার একটু তাড়া ছিল বিধায় বিকেলের মধ্যেই ঢাকা ফেরার প্রস্তুতি নিতে হবে।

এদিকে বেশ ভালোই ক্ষুধা লেগে গিয়েছিল। সবার সাজেশন নিয়ে তাদেরকে নিয়েই সবাই মিলে চলে গেলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের বিখ্যাত “আলাউদ্দিন” হোটেলে। সেখানের খাসির মাংস ভুনা নাকি এই শহরের সেরা। ভাবলাম হয়ে যাক। আমার জীবনের সেরা খাসির মাংস সেদিনই খেয়েছিলাম। ভবিষ্যতে চাঁপাই আসলে এই হোটেলে একবার হলেও ঢু মারব এরকম পণ করেই খাবার দাবার সেরে বিদায় হলাম হোটেল থেকে।

এবার ফিরে আসার পালা। সবার থেকে বিদায় নিয়ে গ্রামীণের নন এসিতে চড়ে রওনা দিলাম চাঁপাই থেকে।। খুব ক্লান্ত লাগছিল, তবুও ভাবলাম যাবার সময় রাজশাহী শহরটা একটু দেখতে হলেও জেগে থাকা দরকার। 

অবশেষে রাজশাহী শহর দেখার সৌভাগ্য হলো কিছুটা। শিরোইল বাস টার্মিনালের বিপরীতে রাজশাহী রেল স্টেশন দেখে মনে হলো ঢাকার কমলাপুর আছি। রাজশাহী শহর বেশ গোছানো লেগেছে। তবে বাস বাইপাস দিয়ে এসেছিল বিধায় পুরো শহর আর দেখা হয় নাই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দেখেছিলাম। এরপর লম্বা ঘুমে একদম ঢাকা এসে পৌঁছাই।  

লেখক : আকিব চৌধুরী। 
 

দেশ কিংবা বিদেশ, পর্যটন কিংবা অবকাশ, আকাশ কিংবা জল, পাহাড় কিংবা সমতল ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা অথবা পরিকল্পনা আমাদের জানাতে ইমেইল করুন- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড