নাফাকুম এবং কিছু ভুল ধারণা

প্রকাশ : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ১১:২৮

 অধিকার ডেস্ক   

নাফাকুম যাওয়ার আগ পর্যন্ত এটা সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল এর মত শ্বাপদসংকুল জায়গা বাংলাদেশে আর নাই। নাফাকুম হল সাপ-জোঁকের আস্তানা।

নাফাকুম যাওয়ার আগে যেই চারটা প্রশ্ন বারবার মাথায় দ্রিমদ্রিম করে বাড়ি মারছিল, সেগুলো হলো-

১. থাকবো কই?
২. খাবো কী? 
৩. মশার হাত থেকে বাঁচবো কী করে? 
৪. সাপে কাটলে কী করবো?

এই চারটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে শুধু পিঠের বোঝাই বড় হয়েছে, আর ট্রেকিংয়ে কষ্ট পেয়েছি!

আমরা গিয়েছি সর্বমোট পাঁচজন। আমি, তিন বোন আর দুলাভাই। মাচায় থাকতে হবে শুনে শীত থেকে বাঁচতে জ্যাকেটতো পরেছিই সবাই, সাথে ব্যাগে নিয়েছি শীতের চাদর। কী খাবো সেই টেনশনে খেজুর-কিসমিস আর বাদাম নিয়েছি ব্যাগ ভর্তি করে। মশার হাত থেকে বাঁচতে কয়েল-আগুন ধরানোর সব উপকরণ, ওডোমোস- মশার স্প্রে নিয়েছি। শুধু সাপের ব্যাপারে বুঝতে পারছিলাম না কী করা উচিত। অতপর এক গাছি রশি নিয়ে গেছি যেন সাপে কাটলে অন্তত বেঁধে ফেলতে পারি জায়গাটা!

যাইহোক, জিনিসপত্রের বোঝা মাথায় নিয়ে সকাল সাড়ে সাতটার বাসে রওনা দিলাম রাঙামাটি থেকে। বান্দরবান গিয়ে পৌঁছলাম বেলা এগারোটায়! তাড়াহুড়া করে থানচির বাস কাউন্টারে গেলাম, গিয়ে দেখি একটার আগে বাস নাই। সেই বাসও গিয়ে পৌঁছাবে পাঁচটার দিকে। তখন আর রেমাক্রির দিকে কোনো বোট ছাড়বে না! ওদিকে গাইড মহোদয় বারবার ফোন করছে থানচি থেকে। তাকে ঘটনা বললাম, সে বললো চান্দের গাড়ি ম্যানেজ করে দিবে। কিন্তু দাম পড়বে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা! এখন যেহেতু সিজন, তাই রাজি হয়েই গিয়েছিলাম। 

কিন্তু সেই গাড়ি আসার আগেই সৌভাগ্যক্রমে আরেকটা গাড়ি চলে আসলো সামনে। সে সুন্দর করেই বললো সে একদম রিজনেবল দামে যাবে। দামাদামী করতে হবে না। যাওয়ার খরচ সাড়ে চার, আর যদি যাওয়া-আসা হয় তাহলে সাত! গাইডকে ফোন করে বলে দিলাম গাড়ি না পাঠাতে। এটাতেই চেপে বসলাম।

থানচি যাওয়ার পথে সাইরুতে থামলাম। ওখানে ছবি তুলে চলে গেলাম ক্যাফে নীলে। খেয়েদেয়ে হেলতে দুলতেই চারটার একটু আগে গিয়ে পৌঁছালাম থানচি।

এরপর থানচি বাজার থেকে গাইডের ঠিক করা বোটে করে চলে গেলাম রেমাক্রি। গিয়ে পৌঁছলাম সোয়া ছয়টার দিকে। সেই রাতটা থেকে গেলাম রেমাক্রিতেই।

এবার বলি ধরা খাওয়ার বিষয়টা। অহেতুক দুই হাজার টাকা দিয়ে গাইড ঠিক না করে থানচি বাজারে গিয়ে বোটওয়ালা খুঁজলেই চলতো। বোটে আসা-যাওয়া সাড়ে চার হাজার টাকা+গাইড দুই হাজার টাকা সাথে আবার গাইড-বোটম্যানদের থাকা-খাওয়াও আমাদের টাকায়! 

অথচ এগুলো অনেকটাই বেঁচে যেত যদি আমরা থানচি বাজারে গিয়ে বোটওয়ালা খুঁজতাম। মোটামুটি তিন-সাড়ে তিনেই বোটওয়ালা ম্যানেজ হয়ে যেত। ম্যাক্সিমাম বোটওয়ালাই গাইড। তারা যদি গাইড হিসেবে কাজ না-ও করে, রেমাক্রিতে গিয়ে "নাফাকুম গেস্ট হাউজে" গিয়ে বললেই লোকাল গাইড হিসেবে মার্মা ছেলেপেলে পাওয়া যায়। তারা জাস্ট পাঁচশ টাকার বিনিময়ে নাফাকুম ঘুরিয়ে আনে!

নাফাকুম

নাফাকুমের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য  

 

মজার বিষয় হলো আমাদের গাইড সাহেব আমাদেরকে নিয়ে নাফাকুমেই যায়নি! সে কেবল থানচি থেকে বোটে করে রেমাক্রি গিয়ে ওখানেই মাস্তি করেছে আবার বোটে করে থানচি পর্যন্ত ফিরে এসেছে! আর রেমাক্রি থেকে আমাদের সাথে নাফাকুমে পাঠিয়েছে আরেক লোকাল গাইডকেই। সেই লোকাল গাইডের কাছ থেকেই জানলাম তাকে শুধু পাঁচশ টাকাই দেওয়া হবে! 

তার মানে গাইড সাহেব আমাদের বোটে করে ফ্রিতে রেমাক্রি গিয়ে আমাদের টাকাতেই ক’ রাত ফ্রিতে থেকে- খেয়ে আবার আমাদের বোটেই থানচি ব্যাক করে ফাও ফাও দেড় হাজার টাকা কামিয়ে নিলো! অথচ একে আমাদের দরকারই ছিল না!

যাইহোক, এবার আসি ভুল ধারণাগুলোর ব্যাপারে। আমারা দুশ্চিন্তায় ছিলাম থাকা-খাওয়া আর ওয়াশরুম নিয়ে৷ রেমাক্রিতে রাত কাটানোর জন্য আছে "নাফাকুম গেস্ট হাউজ"। জনপ্রতি মাত্র ১৫০ টাকা ভাড়া (রুম হিসেবে ভাড়া না)। খাওয়াও ওখানেই। প্যাকেজ ১৫০ টাকা। ভাত, বড় মাছ, ডাল, আলু ভর্তা। অথবা ভাত, পাহাড়ী মুরগী, ডাল, আলু ভর্তা। সাথে চাইলে এক্সট্রা ডিমের তরকারি নেওয়া যাবে। পার পিস ২০ টাকা। খাবার সত্যিই অসাধারণ। বিশেষ করে নদীর বড় মাছ। এখনো জিভে স্বাদ লেগে আছে। (তরকারিতে ঝাল দিতে বলবেন। পাহাড়ের ঝাল খাবার অন্যরকম মজা)। আর তাদের ওয়াশরুমও বেশ পরিষ্কার।

নাফাকুম

নাফাকুমের ট্রেকিং পথ 

 

ট্রেকিংয়ের সময় তেমন আহামরি কোনো ক্ষুধা লাগে না। অহেতুক ব্যাগে বোঝা বাড়াবেন না। আমরা সকাল সাড়ে পাঁচটায় ট্রেকিং শুরু করেছি। ঘণ্টাখানেক আগানোর পরেই পাশপাশি দুটো দোকান পেয়েছি যেখানে জুমের ধানের পরটা হয়। আরও বিভিন্ন ধরণের খাবার থাকে। সাথে কলা তো আছেই। ওখানে পেট ভরে খেয়ে নিলেই হয়। ট্রেকিংয়ের সময় শুধু অল্প একটু পানি আর পকেটে দুটো চুইংগাম রাখলেই যথেষ্ট।

রেমাক্রিতে মশার তেমন একটা উপদ্রব নেই বললেই চলে। অহেতুক মশার কয়েল বহন করার কোনো অর্থই হয় না। এরপরও মশা থাকলে গেস্ট হাউজের নিচেই দোকান আছে। যাবতীয় দরকারি সবকিছু পাওয়া যায়।

ট্রেকিংয়ের সময় সাপ-জোঁকের কোনো অস্তিত্বই চোখে পড়েনি। হতে পারে শীতকাল বলে উপদ্রব ছিল না। বর্ষায় প্রাদুর্ভাব থাকতে পারে। যারা শীতকালে যেতে চান তারা দুই প্যাকেট স্যালাইন সাথে রাখলেই চলবে। জোঁকে ধরলে জোঁকের গায়ে ছিটিয়ে দিলেই পড়ে যাবে।

যারা যারা আমার মত নাফাকুমকে অসম্ভব রকম দুর্গম মনে করেছেন বা করছেন, তারা এই ধারণাটা থেকে বের হয়ে আসতে পারেন। নাফাকুম অসম্ভব সুন্দর একটা জায়গা। পথটা বেশ দুর্গম, তবে অসম্ভব দুর্গম না। ট্রেকিংটা কষ্টকর সত্যিই, কিন্তু জীবন চলে যাওয়ার মত না।

এরপরও এক্সিডেন্ট একটা সম্পূর্ন ভিন্ন জিনিস। "ওভার এক্সাইটেড" হয়ে কোনোকিছু করতে গেলে বিপদে পড়ে যেতে পারেন। পানিতে লাফ দিয়ে চোরা পাথরে বাড়ি খেয়ে মারা পড়তে পারেন। নিজেকে জোর করে বিপদে ঠেলে দিবেন না। প্রকৃতিকে সমীহ করবেন, তাহলেই বিপদ থেকে বাঁচতে পারবেন।

নাফাকুম

ঘুরে আসতে পারেন নাফাকুম 

 

পুরো ট্রেকিংয়ের জন্য চাইলে একদম খালি হাতেই চলে যেতে পারেন। একদম কিচ্ছু নিতে হবে না। শুধু একটা জিনিস বাদে। সেটা হল "ট্রেকিং শু"। এই একটা জিনিসই আপনাকে রক্ষা করবে হাজারটা বিপদ থেকে। কোনোমতেই লুজ কোনো ট্রেকিং শু নিবেন না, পা পিছলে পড়বেন এবং পায়ের পেছনের দিকে ফোসকা পড়বে৷ আর শুয়ের ভেতরে যখনই নুড়ি পাথর ঢুকবে, সাথে সাথে বের করে ফেলবেন। নাহলে চাপ লেগে লেগে পায়ের তালুতে ফোসকা পড়ে যেতে পারে।

সবশেষে বলি, নাফাকুম একটি ভয়ংকর সুন্দর জায়গা। এই জায়গার সৌন্দর্য রক্ষা করা আমার আপনার সবার দায়িত্ব৷ দয়া করে কেউ কোনো ময়লা আবর্জনা ফেলে জায়গাটাকে নোংরা করবেন না।

এই শীতে ঘুরে আসুন নাফাকুম। ভাল লাগবে। শুভ কামনা থাকলো ট্রাভেলার্সদের জন্য।

ছবি ও লেখা : আসিফ আহমদ