• মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

মোহনীয় আমার দেশ, মোহনীয় সাজেক ভ্যালি

  লাইফস্টাইল ডেস্ক

১৪ জানুয়ারি ২০২০, ১৫:৩০
সাজেক
মেঘে ঢাকা সাজেক; (ছবি- লেখক)

আমি ঘুরতে পছন্দ করা মেয়ে। সুযোগ পেলে ঘোরার সুযোগ হাতছাড়া করি না সাধারণত। দেশের ভেতর বেশ কিছু জায়গা ঘোরা হয়েছে, কিন্তু সাজেক যাইনি। না, সুযোগ আসেনি যে তা না। বরং ইচ্ছা করেই যাইনি। ইন্টারনেটের দুনিয়ায় এর অসাধারণ ছবিগুলো দেখে মনে মনে ঠিক করেছিলাম এইরকম রোমান্টিক জায়গায় বরের সঙ্গেই প্রথম পা দেব। তাই বিয়ের আশায় দিন গুণছিলাম। এই প্ল্যান শুনে আমার হবু জামাইও রাজি হয়ে গেলেন। ইন্টারনেট ঘেঁটে ধীরে ধীরে অনেক তথ্য কালেক্ট করতে থাকলাম এবং বিয়ের কিছুদিন বাদেই ব্যাগ গুছিয়ে সোজা রওনা দিলাম স্বপ্নের সাজেক ভ্যালির উদ্দেশে।

যাত্রা

সাজেক যেতে হয় খাগড়াছড়ি শহর হয়ে। প্রথমেই আমরা আল্লাহর নাম নিয়ে ঢাকার কলাবাগান থেকে বাসে রওনা হলাম খাগড়াছড়ির উদ্দেশে। আমাদের বাস ছিল সেন্টমার্টিন হুন্দাই। ফেরার সময়ও একই বাসেই ফিরেছি। এসি বাস। এদের সার্ভিস বেশ ভালো। আমরা রাত ১০টা ৫০ এর টিকেট কেটেছিলাম। 

খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছলাম ভোর ৫টার একটু আগেই। টিকেট ছিল জন প্রতি ১ হাজার ২০০ টাকা। এদের দুপুর আড়াইটাতেও ঢাকায় ফেরার বাস আছে। তাই কেউ চাইলে সাজেক থেকে ফিরে ঐদিনই দুপুরে ঢাকার জন্য রওনা হতে পারবেন। আর কোনো কোম্পানির সম্ভবত দুপুর এ কোনো বাস নেই।

চান্দের গাড়ি

তখনও আকাশে আলোর রেখা ফোটেনি। খাগড়াছড়ি শহরের শাপলা চত্বরে নেমে অপেক্ষায় থাকলাম চান্দের গাড়ির জন্য। বলা বাহুল্য আমরা শুধু হাজব্যান্ড-ওয়াইফ ছিলাম, কোনো গ্রুপ ছিল না। তাই আমাদের নিজ দায়িত্বে গ্রুপ তৈরি করে নিতে হয়েছে। চান্দের গাড়িতে ১২-১৪ জন বসা যায়। খাগড়াছড়ি-সাজেক আসা-যাওয়া (দুই রাত সাজেক এ থাকা) + সাজেক এবং খাগড়াছড়ি শহরের সকল ঘোরার স্থান পরিদর্শন বাবদ এক গাড়ির ভাড়া ১২ হাজার ৫০০ টাকা (ফিক্সড করে দেওয়া)। তাই আপনি যদি শেয়ারে যেতে পারেন তাহলে জন প্রতি খরচ খুবই কম পড়বে। 

সিএনজিতেও যাওয়া যায় বাট ভিউ দেখার সুযোগ + সিকিউরিটি হিসাব করলে চান্দের গাড়ি বেস্ট। যারা গ্রুপ ছাড়া যাচ্ছেন বা সংখ্যায় কম তারা ওইখানে নেমেই একটু খোঁজাখুঁজি করে গ্রুপ করে নিতে পারবেন।

চান্দের গাড়ি সাজেক রওনা হয় আর্মি এস্কর্টের সঙ্গে। সাধারণত সকাল ৮টার দিকেই রওনা হয়ে যায়। সাজেক পৌঁছাতে পৌছাতে দুপুর ১২টা বা তার একটু বেশি বেজে যাবে। আর ফেরার সময় সাজেক থেকে সকাল ১০টায় এস্কর্ট। খাগড়াছড়ি পৌঁছাতে দুপুর সাড়ে ১২টা প্রায়।

মেঘের মাঝে উড়ন্ত যাত্রা

যারা রোলার কোস্টারে ওঠেননি জীবনে, কিন্তু সেটিকে চেনেন বা জানেন, তারা চান্দের গাড়ি ভ্রমণ শেষে বুক ফুলিয়ে বলুন ‘রোলার কোস্টারের দাদার গাড়িতে চড়ে এলুম!’ অসম্ভব উত্তেজনার ছিল সেই যাত্রা! যা কখনোই ভোলার না। যেতে যেতে অসংখ্য আদিবাসী শিশু মুখে হাসি নিয়ে হাত নেড়ে আপনাকে স্বাগত জানাতে থাকবে। ওরা এত সরল আর অমায়িক! আর ফেরার দিন তো মেঘের ভেতর দিয়ে এসেছি। মেঘ আস্তে আস্তে ভিজিয়ে দিচ্ছিল যেন পুরো দেহ... আহ! মধু মধু! সেই ভ্রমণ!

রিসোর্ট

সাজেকে ৯৯ শতাংশ রিসোর্টই বাঁশ/কাঠের তৈরি। ভিউ চিন্তা করলে সবারই মোটামুটি একই ধাঁচের। আমরা দুইদিন দুইটি রিসোর্টে ছিলাম। প্রথম দিন মেঘপুঞ্জির ‘তারাশা’ কটেজে এবং দ্বিতীয় দিন আর্মিদের ‘রুনময়’ রিসোর্টে। সব রিসোর্টের চেক ইন টাইম দুপুর ১২টা আর চেক আউট সকাল ১০টা।

রিসোর্ট নিয়ে আরও কথা

তারাশা- মেঘপুঞ্জির সবচেয়ে বড় কটেজ ‘তারাশা’। আমাদের প্রথম প্ল্যানে তারাশা ছিল না, কিন্তু ওদের ওয়েবসাইটের ভিডিও দেখে রুনময়তে একদিন কমিয়ে তারাশাতে থাকার সিদ্ধান্ত নিই। তবে সত্যি বলতে কটেজে গিয়ে ভিডিওর মতো অত মুগ্ধ আমি হতে পারিনি। কটেজ বেশ নিরিবিলি এবং এন্ট্রি রেস্ট্রিকটেড। কিন্তু কটেজগুলো ভিডিওতে যেমন দূরে দূরে মনে হয়েছিল বাস্তবে সেগুলো অনেক কাছে। রুমে ঢুকে চারপাশের পর্দা সরালে ভেতরের সব দেখা যায় (নিচ তলা যেহেতু) তাই পর্দা সরিয়ে রাখা যায়নি। 

আর যদি আপনি শীতকালে যান তাহলে বাঁশের ঘরে যেমন শীত পড়তে পারে তেমন আইডিয়া নিয়ে যাবেন। নইলে অতি ঠান্ডায় ঘোরার আনন্দ এক নিমেষেই মাটি হয়ে যাবে। মেঘপুঞ্জির সবচেয়ে ভালো একটা দিক হলো ওদের সারাদিন ইলেকট্রিসিটি থাকে তাই এইটা নিয়ে কোনো টেনশন নাই।

রুনময়- আমাদের কাছে সবদিক থেকে রুনময় ছিল বেস্ট! (ব্যক্তিগত অভিমত থেকে বলছি) এত কমফোর্টেবলি থাকার জায়গা অ্যান্ড ভিউ দেখে আমরা সত্যি আনন্দিত!

রুনময় দুই তলা। আমরা ছিলাম দোতলার ‘সূর্যাস্ত’ রুমটাতে এবং এটাই আমার কাছে বেস্ট রুম মনে হয়েছে। আর ওদের রুমের আসবাবপত্র, ডেকোরেশন সবই আপনাকে ছুঁয়ে যাবে এবং ঠান্ডাও অনেক কম ছিল যেহেতু এটি হাফ বিল্ডিংয়ের। খুবই কমফোর্টেবল ছিল এই ভীষণ ঠান্ডায়ও। সবকিছু ছিল নিখুঁত পরিষ্কার! তারা যে নিয়মিত পরিষ্কার করে সেটা বোঝা যাচ্ছিল। সবচেয়ে বেস্ট রেস্টরুমটা। আসলে আর্মিদের রিসোর্ট নিয়ে বলার কিছু নেই।

তাদের কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্টও ছিল। খাবারের মান ও স্বাদ ছিল দারুণ। 

আমরা দুইটা রিসোর্টই দুই মাস আগে বুকিং দিয়েছিলাম। নাহলে সিজনাল টাইমে রুম পাবেন না। আর রুনময়তে থাকতে গেলে আর্মি পার্সোনের রেফারেন্স লাগবে অবশ্যই। আর হ্যাঁ, দুইটা রিসোর্ট রুমেই জায়নামাজ পেয়েছিলাম যদিও আমরা জায়নামাজ নিয়ে গেছিলাম।

খাওয়া

কোথাও ঘুরতে গেলে থাকার জায়গার সঙ্গে যেটা চিন্তায় ফেলে দেয় সেটা হলো খাওয়া। আলহামদুলিল্লাহ, পুরো ট্যুরে এই খাবার নিয়ে আমরা সবচেয়ে বেশি হ্যাপি ছিলাম। খাগড়াছড়িতে নেমে সকালের নাস্তা করেছি ‘হোটেল মনটানাতে’। অসম্ভব ভালো ছিল। তাই ফেরার সময়ও এইখানে লাঞ্চ করতে ভুলিনি।

আরও পড়ুন- একদিনের ট্যুরে ঘুরে আসুন চাঁদপুর

সাজেকে রিসোর্টের মতোই খাবারের দোকানের অভাব নেই। অনেক রেস্টুরেন্ট পাবেন। আমরা ‘সিনারি হোটেলে’ খেয়েছি। এদের খাবার অনেক ভালো ছিল, তাই আর অন্য দোকানে যাইনি। সাজেকের চাও মজার। এমনকি পান খেতে গিয়ে দেখলাম সেটাও বেশ মিষ্টি! (মশলা ছাড়াই) সুতরাং খাবার কষ্টে পড়বেন না কেউ আশা করি। রেগুলার আইটেমের পাশাপাশি ‘ব্যাম্বু চিকেন’ আর ‘বারবিকিউ’ টেস্ট করতে ভুলবেন না যেন।

কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি 

সাজেকের কোথাও গিজার নেই। তাই শীতকালে গেলে গরম পানি দিয়ে গোসল করার কথা মাথা থেকে ঝাড়ুন। আল্লাহু আকবর বলে আমার মতো গোসল দিয়ে উসাইন বোল্টের গতিতে দৌড়ে বাইরের রোদে এসে দাঁড়াবেন। আর না হয় একেবারে বাসায় ফিরে গোসল দেবার কথা ভাববেন!

সাজেকে মোবাইল নেটওয়ার্ক সবচেয়ে ভালো পাবেন- রবি, এয়ারটেল আর টেলিটকের। জিপি, বাংলালিংক একেবারেই পাবেন না! তাই এই কোম্পানির সিম সঙ্গে নেবেন। তবে ভুতুড়ে ব্যাপার কি না জানি না, রুনময় রিসোর্টে থাকাকালীন আমার বাংলালিংক সিমের নেটওয়ার্ক শো করেছিল!

সাজেকে অন্তত দুই রাত থাকুন। এত তাড়াহুড়ায় আর যাই হোক সাজেক ঘোরা হবে না মনমতো।

অনেকে ভোরেই কংলাক পাহাড় দেখতে যায়। এটা এক দিন করে বাকি এক দিন সকাল ১১টা পর্যন্ত কটেজে থাকবেন। নাহলে কটেজ থেকে মেঘের উড়াউড়ি দেখা মিস হয়ে যাবে। (সাজেকে ঢুকে হাতের ডান দিকের কটেজগুলোয় মনে হয় সবচেয়ে ভালো মেঘ দেখা যায়)।

পাহাড়ি এলাকা, হাটাহাটি করতে আমাদের সমতলের মানুষদের একটু কষ্ট হবে, কিন্তু তাও হাঁটুন। দেখবেন কত ভালো লাগবে। হেলিপ্যাডের দিকে আগাতে থাকলে ধীরে ধীরে কোলাহল কমতে কমতে একেবারে নাই হয়ে যাবে। তখনই সাজেক তার আসল সৌন্দর্য দেখাবে আপনাকে।

সবচেয়ে বেশি যেই ব্যাপারটি কষ্ট দিয়েছে তা হলো ঘুরতে যেয়ে আমাদের ফেলে আসা হাজার হাজার প্লাস্টিক, ময়লার স্তূপ! নিজের বিবেককে কাজে লাগিয়ে ঘোরাঘুরি করুন। ওয়েস্টবিন না পেলে একটু খুঁজে দেখুন। কাছেই পেয়ে যাবেন। তাও প্লিজ যেখানে সেখানে ময়লা ফেলবেন না।

মোহনীয় আমার দেশ, মোহনীয় সাজেক ভ্যালি। হ্যাপি ট্রাভেলিং। 

লেখক- সানজানা রুহানী তাম্মিম

ওডি/এনএম 

দেশ কিংবা বিদেশ, পর্যটন কিংবা অবকাশ, আকাশ কিংবা জল, পাহাড় কিংবা সমতল ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা অথবা পরিকল্পনা আমাদের জানাতে ইমেইল করুন- [email protected]
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড