• বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ভিন্নধারার কেকের ঠিকানা- ‘কারুযাত্রা’

  নিশীতা মিতু

০৩ জানুয়ারি ২০২২, ১২:১৮
ইফরীত জাহিন
ইফরীত জাহিন

কী করা উচিত এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার কাছে কী করতে ভালোবাসেন। নিজের পছন্দমতো ছিমছাম জীবন কাটানোই যার স্বপ্ন। বলছিলাম স্বাধীনচেতা এক তরুণী ইফরীত জাহিনের কথা। অনলাইন প্রতিষ্ঠান ‘কারুযাত্রা’র কর্ণধার তিনি। নিজের হাতে তৈরি কেক বিক্রি করেন ইফরীত। উদ্যোক্তা এই তরুণীর সঙ্গে আড্ডা হয় ‘অধিকারের’। জানা হয় তার ব্যবসা সম্পর্কিত নানা কথা-

একটি বাটিতে ডিম, চিনিসহ কিছু উপাদান মেশাতে মেশাতেই গল্প করছিলেন ইফরীত। ছোটবেলায় টিভি দেখে সবাইকে বলে বেড়াতেন ডাক্তার হবেন। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নিজের পছন্দ-অপছন্দ বুঝতে শিখলেন। ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছেটাও বাদ দিলেন। ইফরীত বলেন, দেশীয় সামাজিক অবস্থা আর পরিবারের কারণে পড়াশোনা করেছি বিজ্ঞানের বিষয় গণিত নিয়ে। তবে গণিত আমার যতটা না প্রিয় ছিল, তার চেয়ে বেশি প্রিয় ছিল ক্রাফট আর সৃজনশীল কাজ।

বর্তমানে ব্যবসাই করছেন ইফরীত। সুযোগ হলে কী চাকরিতে ঢুকে পড়বেন, জানতে চাই তার কাছে। ইফরীত বলেন, আমার আর অন্য কোনো দিকে যাওয়ার ইচ্ছে নেই। আসলে ইচ্ছে নেই বলাটা ঠিক হবে না, ইচ্ছে চলে গেছে।

উত্তর শুনে কিছুটা অবাক হলাম বটে। চাকরির ইচ্ছে কেন চলে গেলো জানার আগ্রহ হলো। কেকের ব্যাটার ছাঁচে ঢালতে ঢালতে আলতো হেসে ইফরীত বললেন, পড়াশোনা শেষ করে ব্যবসা শুরুর আগে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ করেছিলাম। আরও দুটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে একটি প্রজেক্টে দেড় বছর কাজ করেছি। এই সময়ে পাওয়া অভিজ্ঞতাগুলো থেকে আন্দাজ করেছি চাকরি আমার দ্বারা সম্ভব নয়। ছুটি মেলে না, জুনিয়রদের মতামতের তেমন দাম দেওয়া হয় না- এমন পারিপার্শ্বিক আরও কিছু কারণে চাকরি করার শখ মিটে গেছে।

অনলাইন ব্যবসা জগতে আসলেন কী করে? জানতে চাই ইফরীতের কাছে। তিনি বলেন, আমি অনেক আগে থেকেই ফ্রিল্যান্সার হিসাবে অনেক ছোটখাটো কাজ করেছি। ফটোগ্রাফি ছিল এর একটি। পাশাপাশি পেপার ক্রাফট নিয়ে কাজ করতাম। নিজের ছোট একটা পেজ ছিল। এসব ছিল খুচরো অভিজ্ঞতা। এরপর অনার্স ফাইনাল কাছাকাছি চলে আসায় সব বাদ দিয়ে পড়াশোনায় মন দেই। ভালো ফল নিয়ে বের হই।

এরপর শুরু হলো করোনা। বাসায় বসে থেকে ভাবছিলাম কী করা যায়। যেই ব্যবসা করতে চেয়েছি সেটা কি শুরু করা যায়? লোগো, নাম, থিম সবই আগে থেকে ঠিক ছিল। বাড়তি পাওনা হিসেবে ছিল অগাধ সময়। প্রথমে নিজের ফেসবুক প্রোফাইল থেকেই ব্যবসার শুরুটা করি। একদিনেই ভাবনার চাইতে বেশি সাড়া পেয়ে যাই। এক্ষেত্রে আমি বলবো, সৌভাগ্যবশত আমার বন্ধুতালিকা বেশ সাপোর্টিভ হওয়ায় এটি সম্ভব হয়েছে। তাদের উৎসাহে আর নিজের সাহসেই যাত্রা শুরু করে ‘কারুযাত্রা’।

২০২০ সালের জুন মাস থেকে কাজ করছেন ইফরীত। তৈরি করেন সুগার আর্ট কেক, ডেজার্ট আইটেম, ক্রাফট আইটেম, গিফটস। ইফরীত বলেন, বর্তমানে মূলত কেক আর্ট নিয়ে কাজ করছি। প্রিমিয়াম টেস্টের কেক আর তার সঙ্গে প্রিমিয়াম আর ইউনিক ফিনিশিং এর ডিজাইন। এছাড়াও আছে কাপকেক, ফ্লোরাল কেক, ব্রাউনি ইত্যাদি।

কারুযাত্রার কিছু কেক

কারুযাত্রার সবচেয়ে ব্যতিক্রমী পণ্য হলো বাংগী দিয়ে বানানো কেক আর কাচা আমের মুজকেক। দুটি পণ্যই কেকপ্রেমীদের প্রশংসা কুঁড়িয়েছে। কেবল এই দুটি পণ্যই নয়, সব পণ্যেই নিজস্বতা রাখতে চেষ্টা করেন ইফরীত। এমনভাবে কেক তৈরি করেন যেন তা দেখলেই বোঝা যায় কারুযাত্রার পণ্য।

ইফরীত বলেন, আমি মনে করি দুনিয়ার সবার কাজ সবার থেকে ভিন্ন। ডিজাইন কপি করলেও কেউ আসল ডিজাইনারের মতো পোশাক তৈরি করতে পারে না। একইভাবে আমার বানানো কেকগুলোর এক একটিও আমার নিজস্ব পরিচিতি বহন করে। কেক দেখেই বলে দিতে পারবেন যে এটা কারুযাত্রার পণ্য।

করোনার মধ্যেই ব্যবসা শুরু করেন ইফরীত। অনলাইন ব্যবসা হওয়াতে ক্ষতির চেয়ে লাভবান বেশি হয়েছেন তিনি। নিজের ব্যক্তিগত জীবন আর ব্যবসায়িক জীবনকে আলাদা রাখতে পছন্দ করেন ইফরীত। ক্রেতার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে বিশ্বাসী নন তিনি। এর ফলে কাজে যে অসুবিধা হচ্ছে তা কিন্তু নয়। পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে ক্রেতার সঙ্গে সমন্বয়ের দিকটি সামলে নিচ্ছেন তিনি।

কাজের শুরুর দিকে মায়ের উৎসাহ পেলেও মেলেনি বাবার উৎসাহ। অবশ্য দেড় বছর পর সেই প্রেক্ষাপট পুরোটাই বদলে গেছে। এখন বাবা নিজেই ইনভেস্টে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এমনটিই জানালেন ইফরীত। তবে কারুযাত্রার পথচলায় বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানাতে চান স্বামী কাজী আবদুল্লাহ সালেহীনকে। ইফরীত বলেন, কারুযাত্রা শুরুর একদম প্রথম ১২ হাজার টাকার ইনভেস্টমেন্ট দিয়েছিল আমার স্বামী। ও ই আমাকে কাজ শুরু করার ক্ষেত্রে সবচে বেশি উৎসাহ দিয়েছিল। এমনকি কারুযাত্রার প্রথম ক্রেতাও ছিল সে। বাটার কুকিজ কিনেছিল সালেহীন। আমাকে বলেছিল যে প্রফেশনালভাবে প্যাকেজিং করে ডেলিভারি করি। সেভাবেই করেছিলাম। এই অভিজ্ঞতাটা বেশ সুন্দর ছিল।

কখনো কি মনে হয়েছে থেমে যাবেন? জানতে চাইলে ইফরীত বলেন, শুরুর দিকে যখন অর্ডার কম আসতো, নিজেও তেমন ভালো কাজ পারতাম না তখন হতাশ হয়ে ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সালেহীন আমাকে একবারও থামতে দেয়নি। যতবার হতাশ হয়েছি ততবার আমাকে পজিটিভ কিছু কারণ দেখিয়ে আবার কাজে উৎসাহিত করেছে। আর তাই ওর কাছে আমি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।

আপাতত কারুযাত্রাকে নিয়ে ইফরীতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো নিজের একটা ওয়ার্কশপ করা। আর সুদূর প্রসারী চিন্তা হলো একটা ওপেন স্টুডিও করা যেখানে ক্রেতার সামনেই পণ্য তৈরি করা হবে বা ফিনিশিং দেওয়া হবে। কথাগুলো শুনতে শুনতে ইফরীতের কেকও বানানো হয়ে গেল। একজন সন্তান তার মায়ের জন্য কেক নেবেন, সেটিই বানাচ্ছিলেন এতক্ষণ। এখন ডেলিভারির পালা। এমন সুন্দর সুন্দর অনুভূতির সাক্ষী হোক ইফরীতের কারুযাত্রা এই কামনায় আড্ডা শেষ করলাম।

ওডি/নিমি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড