• বৃহস্পতিবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২১, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮  |   ২৪ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

মনোহারী গয়নার ঠিকানা অনামিকার ‘বর্ণাঙ্কন’

২১ নভেম্বর ২০২১, ১০:৫০
বর্ণাঙ্কন
বর্ণাঙ্কনের কর্ণধার অনামিকা দত্ত

সতেজ একজন নারী অনামিকা দত্ত। কথা থেকে শুরু করে আচরণ সবটা জুড়েই দেখা মেলে চঞ্চলতার। মুখের মিষ্টি হাসি যেন তার প্রিয় অলঙ্কার। চট্টগ্রামের এই নারী পেশায় একজন উদ্যোক্তা। হাতে তৈরি গয়নার সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন গয়না নিয়ে কাজ করছেন। তার সঙ্গে আড্ডায় জানা গেল ব্যবসার নানা দিক থেকে শুরু করে জীবনের অজানা অনেক কথা।

আগেই বলেছিলাম চট্টগ্রামের নারী অনামিকা। জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা থেকে বিয়ে— সবটা একই জায়গায়। সেন্ট স্কলাস্টিকা স্কুলের ছাত্রী ছিলেন তিনি। নানা ধর্মের মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধে মিলিয়েই কেটেছে শৈশব।

অনামিকা স্মৃতিচারণ করে বলেন, নিরিবিলি একটা ভাড়া বাসায় থাকতাম আমরা। বই পড়তাম, গান শুনতাম। অনার্স, মাস্টার্স করেছি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে। সেখানেও ভালো কিছু বন্ধু পেয়েছি। শাহরুখ আর মাধবন ছিল স্বপ্নপুরুষ, ক্রিকেটে অজয় জাদেজা। ভালোবাসতাম মাধুরী, ঐশ্বর্য, দিব্যা ভারতীকে। সুনীল, শীর্ষেন্দু, সমরেশ, সত্যজিৎ পড়ে অনেক মধুর সময় কাটিয়েছি।

কথার ধরনেই বোঝা গেলে চমৎকার এক শৈশব আর কৈশোর পার করেছেন অনামিকা। কেবল পাঠ্য বই নয়, সেখানে রয়েছে নায়ক, নায়িকা, ক্রিকেটার কিংবা বিখ্যাত অনেক লেখকের অবস্থান। ব্যাংকে চাকরির মাধ্যমে পেশাজীবন শুরু করেছিলেন তিনি। প্রথম সন্তানের জন্মের সময় আর কাজ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। নানা শারীরিক জটিলতায় বেড রেস্টে থাকতে হয়েছিল। পরবর্তীতে দুয়েকবার কাজে ফেরার চেষ্টা অবশ্য করেছিলেন কিন্তু সব মিলিয়ে আর করা হয়ে ওঠেনি। বর্তমানে তাই কাজ বলতে নিজের ব্যবসাকেই পুরোটা সময় দেন অনামিকা।

২০১৯ সাল থেকে কাজ করছেন অনামিকা। তার উদ্যোগের নাম ‘বর্ণাঙ্কন’। ভাইপো বর্ণিল আর বড় ছেলে অঙ্কনের নাম মিলিয়ে এই নাম দিয়েছেন তার দাদা (বড় ভাই)। অনেকটা শখের বশেই ব্যবসায় আসেন অনামিকা। একটু একটু করে পা ফেলেছেন। তবে এখন চিত্রপট পুরোই ভিন্ন। অনামিকা বলেন, দেখি না কী হয়— এমনটা ভেবে একপা দুপা করে এগিয়েছি। আর এখন তো নিশ্বাসই ফেলতে পারি না। বিশেষত গত বছরখানেক ধরে গ্রাহকের বিশ্বাস ও ভালোবাসায় আমি ধন্য।

সনতান ধর্মালম্বীদের জন্য বেশিরভাগ গয়না তৈরি করেন অনামিকা। গয়নায় দেখা মেলে দেব-দেবীদের। আর তাই ভক্তি ভরে এসব গয়না কেনেন ক্রেতারা। ফ্যাশনও হলো আবার ধর্মের প্রতি সম্মানও প্রদর্শন হলো। বর্ণাঙ্কনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো অনন্য ডিজাইন, চমৎকার নকশা, দৃষ্টিনন্দন গয়না, সুলভ মূল্য, গ্রাহকদের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং তাদের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি সংবেদনশীলতা।

বর্ণাঙ্কনের কিছু গয়না

বর্ণাঙ্কনের আজকের অবস্থানের জন্য ক্রেতাকে কৃতজ্ঞতা জানান অনামিকা। তার মতে, কোনো বিজ্ঞাপন ছাড়াই সন্তুষ্ট ক্রেতাদের কারণেই আজকের অবস্থান। তারাই প্রচারের কাজ করেছেন, এখনও করছেন। এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গকেও ধন্যবাদ দিতে চান অনামিকা। তিনি বলেন, ফেসবুকের কারণেই আজ আমি এবং লক্ষ কোটি ব্যবসায়ী অনলাইনে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারছি। ক্রেতাদের সাথে বিক্রেতার এই সংযোগের মাধ্যম না থাকলে ঘরে বসে এত কিছু করা সম্ভব হত না।

ব্যবসার ক্ষেত্রে ক্রেতার সঙ্গে সমন্বয়কে কেমন চোখে দেখেন, জানতে চাই অনামিকার কাছে। তিনি বলেন, আমি মনে করি, প্রতিটি ক্রেতাই আমার জন্যে একজন লক্ষ্মী। আমি তাদের প্রত্যেককেই ভালোবাসি এবং তাদের কাছে সুলভ মূল্যে সবচে ভালো জিনিসটা পৌঁছে দিতে চাই। তাদের কাছে পছন্দসই পণ্য ঠিক সময়ে পৌঁছে দেওয়া আমার কাছে ধর্ম। যদি তারা জিনিসটা পছন্দ না করেন, তাহলে সেটা আমি বদলে দেওয়ার চেষ্টা করি। ভেঙে গেলে মেরামত করে দিতে চেষ্টা করি। এমনকি পরিচিতদের কাছে টাকা না নিয়েই আমি অনেক সময় পণ্য পাঠিয়ে দিয়েছি। তবে দুঃখও পেয়েছি যখন দেখেছি আমার গ্রুপে থেকে আমার পণ্য নকল করে অন্য পেজে চালানো হয়েছে। মন খারাপ হয়েছে যখন গ্রাহক আমার সততা ও আন্তরিকতায় সন্দেহ করেছেন কিংবা আমার সীমাবদ্ধতা বুঝতে চাননি। যদিও এর হার খুবই কম, শতকরা ১ শতাংশও হবে না। গ্রাহকদের কল্যাণেই আমি আজ এতদূর আসতে পেরেছি, এবং আশা করি সামনে এগিয়ে যাব তাদেরই আশীর্বাদে।

প্রথমদিকে অনামিকার ব্যবসায় আসার বিষয়টি মোটেও পছন্দ করেননি তার বাবা। মাস্টার্স পাশ করা মেয়ে এসব কাজ করবেন— এমনটা তিনি ভাবেননি, চানওনি। পরে অবশ্য যখন আস্তে আস্তে যাত্রা শুরু করে পরিধি বাড়িয়েছেন, তখন তিনি সমর্থন করেছেন।

অনামিকা বলেন, আমার স্বামীর কথা আলাদা করে বলতেই হবে। সে একই সঙ্গে আমার অ্যাকাউন্টেন্ট, স্ট্র্যাটেজিস্ট, প্যাকার এবং কখনো কখনো ডেলিভারিম্যান (যদিও এখন তার প্রয়োজন আর হয় না)। ও সবসময় পাশে ছিল বলেই আমি এখানে আসতে পেরেছি। মাঝেমধ্যে রাগারাগিও হয়, কিন্তু সেটা তো প্রত্যেকটা ব্যবসা আর সংসারেরই অংশ। ইদানীং ছেলেদেরও টুকটাক কাজে লাগাই। আমার ভাইঝি মৌলিও আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করে। শুরুর দিকে ওর কাছ থেকেও আমি কিছু জিনিস শিখেছি। তবে পরে আমি কলকাতায় বেশ কিছু গয়না বানানোর কোর্স করেছি।

তিনি আরও বলেন, সব মিলিয়ে এটা একটা পারিবারিক উদ্যোগই বলতে পারেন। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ঘরদোরের অবস্থা খুব বেগতিক। এছাড়া আমার অনেক আত্মীয়, বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষীর সহায়তা, পরামর্শ, অনুপ্রেরণাও আমায় এই জায়গায় আসতে সাহায্য করেছে। এর মধ্যে আমি বিশেষ করে অনলাইন গ্রুপ দশভুজা এবং আমার প্রিয় ছোটবোন ঈশিতা পায়েল, যার অনলাইন শাড়ির পেজ চৌরঙ্গী, এদের কথা বলতে চাই। এদের কারণেই বর্ণাঙ্কন অনেক বড় পরিচিতি পেয়েছে। এমনকি এটিএন এর সাংবাদিক মুন্নি সাহাও এবারের পুজোয় বর্ণাঙ্কনের গয়না পরেছেন। তবে আমি আন্তরিকভাবে মনে করি, এসবই হয়েছে আমার স্বর্গত মায়ের আশীর্বাদে যা ছাড়া আমি এক পাও এগুতে পারতাম না।

নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে অনামিকা বলেন, নিজের কাজটা ভালোবাসুন। চোখ-কান খোলা রাখুন। গ্রাহকদের বন্ধু ভাবুন। শুধু লাভ নয়, গ্রাহকদের সঙ্গী হয়ে ওঠার চেষ্টা করুন। তাদের ভালোবাসলে তারাও ভালোবাসা ফিরিয়ে দেবেন। ঠকিয়ে বেশিদূর যাওয়া যায় না। দরদামের জন্যে ইনবক্সে লুকোচুরি না করে পণ্যের সাথেই মূল্য লিখে দিন। ধৈর্য ধরুন আর নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন।

ভারতীয় উপমহাদেশের অলঙ্কারের ঐতিহ্যবাহী যতরকমের সেরা কাজ আছে সব বাঙালি নারীদের হাতে তুলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন অনামিকা। পাশাপাশি, ব্র্যান্ড হিসেবে বর্ণাঙ্কন যেন আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সেই চেষ্টাও করে যাচ্ছেন। হয়তো সেদিন বেশি দূরে নয়। উদ্যোক্তা এ নারীর জন্য ‘দৈনিক অধিকার’ এর পক্ষ থেকে রইল শুভকামনা।

বর্ণাঙ্কনের ফেসবুক পেজের লিঙ্ক- বর্ণাঙ্কন

ওডি/নিমি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: inbox.odhikar@gmail.com

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড