• রোববার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

আনুশার হাতে গড়া ‘ময়নার গয়না’

০৮ অক্টোবর ২০২১, ১৩:১৫
ময়নার গয়না
‘ময়নার গয়নার’ কর্ণধার আনুশা মেহরিন

বাসার ছাদে ব্যস্ত সময় পার করছেন আনুশা। চারপাশে ছোট-বড় গাছ, ফুল মিলিয়ে সবুজের সমারোহ। ঝরে পড়া পাতা আর ফুল সাজিয়ে সেট তৈরি করছেন আনুশা। তার মধ্যে একটি গলার মালা রেখে তুলছেন ছবি। ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়েই হাসলেন। বললেন, বিকালের এই আলোতে প্রোডাক্টের ছবি তুলতে বেশ ভালো লাগে। আর প্রপস হিসেবে ছাদবাগানের ফুল, পাতা আমার সবচেয়ে প্রিয়।

ছবি তোলা শেষে দুটো চেয়ার টেনে বসলাম, দুই কাপ কফিতে চুমুক দিতে দিতে আড্ডা দেওয়া শুরু করলাম আনুশার সঙ্গে। আনুশার পুরো নাম আনুশা মেহরিন। হাতে তৈরি গয়নার অনলাইন প্রতিষ্ঠান ‘ময়নার গয়নার’ কর্ণধার তিনি।

বয়স খুব বেশি নয় আনুশার। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে। কথা থেকে শুরু করে কাজে সব ক্ষেত্রেই প্রাণোচ্ছল তিনি। বর্তমানে ঢাকার বাসিন্দা হলেও আনুশার জন্ম, বেড়ে ওঠা সবটাই চট্টগ্রামে।

২০১৯ সালে তার উদ্যোগ ‘ময়নার গয়না’র শুরু। মেটাল, বিভিন্নরকম বিডস, প্রাকৃতিক পাথর, মুক্তা ইত্যাদি দিয়ে গয়না তৈরি করেন তিনি। হাতে তৈরি গয়নার প্রতি ভালোবাসা থেকে কাজের সূত্রপাত। শুরুর গল্প শুনতে চাই তার কাছে।

আনুশা বলেন, ঠিক মনে নেই, তবে সম্ভবত ২০০৯ এর দিকে বিভিন্ন ক্রাফটিংয়ের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। তখন থেকেই আনাড়ি হাতে টুকটাক জুয়েলারি ক্রাফটিং করার চেষ্টা করতাম। নানান কারণে পরে আর আগানো হয়নি, তবে জুয়েলারি ক্রাফটিংয়ের প্রতি ভালোবাসা আর আগ্রহে ভাটা কখনোই পড়েনি। বহুবার বড় পরিসরে কাজ করার চিন্তা করেও বারবার পিছিয়ে গিয়েছি। ক্রাফটিং শুরুর প্রায় ১০ বছর পর আমি অনেক সাহস সঞ্চয় করে হাতে বানানো গয়না নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে কাজ করা শুরু করি। খুব অল্প কাজ করে আমি আশাতীত সাড়া পাই যা আমাকে উদ্বুদ্ধ করে আরও বড় পরিসরে কাজ করতে।

অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ময়নার গয়নাতে মূল্যের বৈচিত্র্য বেশি লক্ষ্য করা যায়। এখানে দামী গয়না যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে একদম নামমাত্র মূল্যের গয়না। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আনুশা বলেন, ময়নার গয়নার শুরু থেকেই আমার একটা লক্ষ্য ছিল, তা হলো এটা যেন একটা স্টুডেন্ট ফ্রেন্ডলি জায়গা হয়। যারা ছাত্রাবস্থায় নিজেদের হাতখরচ বাঁচিয়ে কিংবা নিজের সামান্য আয়ে কেনাকাটা করে, তাদেরও যেন ময়নার গয়নায় এসে মনে হয় যাক নিজের পছন্দের কিছু তো অন্তত কিনতে পারছি। ময়নার গয়নায় যেমন হাই রেঞ্জের গয়না পাওয়া যায়, তেমনি ভিন্নধর্মী ডিজাইনের কিছু গয়নার দাম ৫০ টাকা থেকেও শুরু হয়। আমার কাছে মনে হয় এটাই ময়নার গয়নার একটা বড় বৈশিষ্ট্য আর ক্রেতাদের ভালোবাসা পাওয়ার একটা বড় কারণ, সাধ আর সাধ্য মিলে গিয়ে যেখানে পাওয়া যায় নিজের পছন্দসই গয়না।

'ময়নার গয়নার' কিছু গয়না

করোনা ব্যবসায় কেমন প্রভাব ফেলেছে জানতে চাইলে আনুশা বলেন, করোনার জন্যে বেশ কয়েক মাস ময়নার গয়নার কার্যক্রম বন্ধ ছিল, ক্রেতাদের ক্রয় অভ্যাসের ওপর করোনা একটা প্রভাব ফেলেছে, আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর অফিস বন্ধ থাকায় ক্রেতাদের মধ্যে বিলাসদ্রব্যের আবেদন কিছুটা হলেও কমে গিয়েছে। সব মিলিয়ে তাই বলা যায় করোনাকালীন সময়টা অন্যান্য অনেক উদ্যোগের মতো ময়নার গয়নার জন্যেও খুব একটা ভালো যায়নি।

আনুশা মনে করেন, পণ্য কিংবা সেবা যেকোনো ব্যবসায় ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সমন্বয় থাকাটা অত্যন্ত জরুরী। একজন ক্রেতা তার মূল্যবান অর্থ ব্যয় করে একটি পণ্য কিনছেন কিংবা সেবা কিনছেন, আবার একজন বিক্রেতাও নিজের অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে সেই পণ্য কিংবা সেবা বিক্রয় করছেন। আর ক্রয়-বিক্রয়ের এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো পক্ষকেই ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। তাই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আর সম্মানের জায়গা থেকে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়কেই একে অপরের সাথে ব্যবহার করাটা জরুরি।

ব্যবসার ক্ষেত্রে পরিবার থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা পেয়েছেন আনুশা। মা-বাবার অনুপ্রেরণা, যথাসম্ভব সাহায্য করা বিষয়গুলো সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি যোগায় বলে মনে করেন তিনি। বিশেষ করে কৃতজ্ঞতা জানান বাবাকে।

আনুশা বলেন, ব্যবসার যেকোনো খুঁটিনাটি ব্যাপার আমি বাবার সঙ্গে আলোচনা করি ও তার পরামর্শ নিই। সম্পূর্ণ ভিন্নরকম একটি বিষয়ে পড়াশোনা করে ব্যবসা নিয়ে এগিয়ে যেতে যাওয়ার পেছনে তিনিই আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।

ময়নার গয়না নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বেশ আবেগী হয়ে গেলেন আনুশা। বললেন, রাখে। ময়নার গয়না আমার কাছে একটা শ্বাস নেয়ার জায়গা, নিজের স্বপ্নগুলো পেলেপুষে বড় করবার জায়গা যা আমাকে সত্যিকার অর্থেই বাঁচিয়ে রাখছে। ব্যক্তিগত টানাপোড়নে কাজ থামিয়ে দিতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু ক্রেতাদের ময়নার গয়নার পণ্যগুলোর প্রতি ভালোবাসা আর আস্থার জায়গাটা আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।

আনুশার ব্যবসার মূলমন্ত্র কী? আনুশা বলেন, আমার মূলমন্ত্র হলো যথাসম্ভব কম প্রফিট মার্জিন রেখে ইউনিক প্রোডাক্ট বেশি সেল করা, আকাশচুম্বী লাভ না করে আমার ব্যবসাকে আরও মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়াতেই আমার আনন্দ। জানি না সম্ভব কি না, তবে স্বপ্ন দেখি একটা সময় গিয়ে ময়নার গয়নার একটা দোকান হোক যেখানে ক্রেতারা তাদের পছন্দের গয়নাটি নিজের হাতে নেড়েচেড়ে জেনেবুঝে কিনতে পারেন।

দিনের আলো নিভু নিভু করছে। সেই ক্ষীণ আলোতেই আনুশার চোখে মুখে উচ্ছলতা দেখতে পারছি। তিনি তার ময়নার গয়না নিয়ে এগিয়ে যাক অনেকদূর। এই কামনায় আড্ডা শেষ করলাম।

ওডি/নিমি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: inbox.odhikar@gmail.com

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড