• মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০১৯, ১১ আষাঢ় ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

ঘুরে এলাম থ্রি গরজেস ড্যাম

  টুম্পা প্রামাণিক

১৫ এপ্রিল ২০১৯, ২০:৩৬
ইয়াংজি
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওয়াটার ড্যাম। (ছবি : লেখক)

৭ই এপ্রিল সকালটা একটু অন্যরকমভাবেই শুরু হলো। ভোর পাঁচটা থেকেই ফোন দিচ্ছে দ্বীন মুহাম্মদ প্রিয় ভাই। এত সকালে কার-ই বা ইচ্ছে করে ঘুম থেকে উঠতে। কিন্তু  আগে থেকেই ঠিক করা- সবাই মিলে ঘুরতে যাব। সবাই বলতে চীনে পড়তে আসা কয়েকজন বাংলাদেশি। সবাই একসাথে হবার জন্য বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। এ রাজি হয় তো ওর পরীক্ষা। এই সপ্তাহে সে কোনোভাবেই সময় বের করতে পারবে না। এমন করতে করতে দীর্ঘ কয়েকদিনের চেষ্টায় সবাই মিলে ঘুরতে যাচ্ছি আজ।

দেশ হিসেবে চীন যেমন বিশাল, তেমনি এর ঘুরে বেড়ানোর মতো জায়গাও প্রচুর। আমাদের গন্তব্য হচ্ছে ইয়াং জি নদীর ওপর নির্মিত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ হাইড্রোলিক পাওয়ার থ্রি গরজেস ড্যাম ও শিপ লিফট। শুনেছি জায়গাটা অনেক সুন্দর। যেই যায় সেই খুব প্রশংসা করে এই জায়গার। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে তৈরি হয়ে নিলাম দ্রুত। একত্রিত হবার জন্য নির্ধারিত স্থানে এসে দেখি অনেকে এখনও পৌঁছায়নি। সকাল আটটার মধ্যেই আমাদের পৌঁছাতে হবে বাসস্ট্যান্ডে। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না, সবাই চলে এসেছে। হুট করে মনে হলো একটুকরো বাংলাদেশ যেন। সবাই মিলে বাংলায় কথা বলতে কী যে আনন্দ হচ্ছে।

চীন

যা দেখতে ছুটে যাচ্ছি। (ছবি : লেখক) 

১৫ জন বাঙালিসহ মোট ১৭ জনের দলটা নাস্তা সেরে নিলাম রাস্তার পাশের এক দোকানে। আহামরি কিছু না। পরোটা আর ডিম দিয়ে বানানো রোল। নাস্তা খেতে খেতে খেয়াল করলাম একেকজনের চোখমুখ আনন্দে চকচক করছে। ঘুরতে যেতে পারছি এজন্য নাকি বাংলায় কথা বলতে পারছি; কোন কারণে কে জানে! খাওয়া সেরে রওয়ানা দিলাম বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশে। বিদেশের মাটিতে ১৫ জন বাংলাদেশি হাঁটছি আর মনের মধ্যে টগবগ করছে কত রং বেরঙের অনুভূতি।

আগের দিন রাতে ট্রাভেল এজেন্সির কাছে আমাদের পাসপোর্টের কপি দেওয়া হয়ে গেছে। আগে থেকে পারমিশন না নিয়ে এই ড্যামে যাওয়া যায় না। সেখানে বিদেশি হলে তো নিয়মের আরও কড়াকড়ি। প্রথমে ব্যাপারটা অতটা বুঝতে পারিনি। একদম শেষ মুহূর্তে আমাদের কাগজপত্র জমা দিয়েছিলাম। যার ফলে অনুমতিপত্র পেতে সকাল হয়ে গেছে। আমাদের যাত্রা আরও ঘণ্টাখানিক পর শুরু হবে। নতুন সিদ্ধান্ত হলো। এই একটা ঘণ্টা কী করা যায়। বাসস্ট্যান্ডের পাশেই একটা পার্ক আছে।

চীন

পাহাড়ে চড়ার সিঁড়ি। (ছবি : লেখক) 

সবাই মিলে পার্কে ঢুকলাম হুড়মুড় করে। সকালের শিশির ধোয়া ঘাসের ওপর বসে পড়লাম হাত পা ছড়িয়ে। জমিয়ে আড্ডা হলো। আমরা যেখানটায় বসেছি তার পাশেই একটা ব্রিজ। ব্রিজটা দেখে হাতিরঝিলের কথা মনে পড়ে গেল।  সবুজ ঘাসের ওপর শিশির কণা চিকচিক করছে সূর্যের আলোয়। বাংলাদেশের কথা মনে পড়ছে। সেই ছোট্টবেলার আলের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্যটা হুট করে ভেসে উঠল চোখের সামনে।

কখন যে এক ঘণ্টা কেটে গেল টেরই পেলাম না। আমরা বাসস্ট্যান্ডে দিকে হাঁটা দিলাম। বাসে উঠে বসতেই ট্র্যাভেল গাইড কিছুক্ষণ নির্দেশনা দিয়ে গেল চাইনিজ ভাষায়। সবার হাতে একটা আইডি কার্ড ধরিয়ে দিল। বারবার সতর্ক করে বলল এটা হারিয়ে গেলে ২০ ইউয়ান জরিমানা গুণতে হবে। তার এত সিরিয়াস ভাব দেখে আমার বেশ হাসি পেয়ে গেল। 

বাস যাত্রাটা দুই ঘণ্টার। অনেকক্ষণ সবাই মিলে গল্প করছিলাম। কিন্তু বাসে অন্য আরও যাত্রী ছিল। তাদের অসুবিধা হবে দেখে আমরা ইচ্ছে করেই চুপ করে গেলাম। কানের মধ্যে হেডফোন গুঁজে দিলাম। অর্ণবের কণ্ঠে বেজে চলেছে মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাইনা ......

চীন

ইয়াং জি নদীর সামনে দাঁড়িয়ে গেলাম পোজ দিয়ে। (ছবি : লেখক) 

বাইরে বেশ রোদ উঠেছে। চারিদিকের বিচিত্র প্রকৃতি দেখতে দেখতে চোখ বুজে আসছিল। হুট করে বাস থেমে গেল। পৌঁছে গেছি। বাস থেকে নেমে গা হাত পা ঝেড়ে নিলাম।  

প্রবেশ গেটে বেশ কড়াকড়ি ব্যবস্থা। একদম বিমানবন্দরের মতো করে চেকিং করা হলো সবাইকে। চেকিং শেষ হলে সবার হাতে একটা করে টিকিট ধরিয়ে দেয়া হলো। ড্যাম এরিয়ার মধ্যে বাইরের কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে পারে না। আমরা আরেকটি বাসে চড়ে বসলাম। আধা কিলোমিটার যাবার পর নেমে পড়তে হলো।

নেমেই তো আমাদের চক্ষু চড়কগাছ। জায়গাটা আসলেই সুন্দর। প্রথমে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো পুরো ড্যামের মডেল দেখাতে। একটা জায়গা কেন এত সুন্দর হবে! এমনটাই ভাবনায় আসছিল আমার।

চীন

১০৩ মিটার পার্থক্য কী সুন্দর দেখা যাচ্ছে। (ছবি : লেখক) 

চীনের সবচেয়ে বড় নদী ইয়াং জি। নদীকে ঘিরে কীভাবে শিপিং ও ড্যামের পানির পরিচালনের বর্ননা দিলেন আমাদের গাইড। পাহাড়ে উঠানোর জন্য যান্ত্রিক সিঁড়ি দেখে আমরা তো অবাক। শপিং মলের বাইরে এরকম জিনিস দেখব কল্পনাও করিনি কখনো।

যান্ত্রিক সিঁড়িতে চেপে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে লাগলাম। এখান থেকে পুরো জায়গাটা ভালো দেখা যায়।  কীভাবে জাহাজে মাল ভরা হচ্ছে আগে দেখিনি কখনো। পাহাড়ে উঠতে উঠতে দেখলাম শত শত গাড়ি বোঝাই করা হচ্ছে জাহাজে।

চীন

সবার একটা ছবি থাকা উচিত। (ছবি : লেখক) 

চূড়ায় পৌছানোর পর দেখতে পেলাম এক অপরূপ দৃশ্য। ড্যামের একপাশের পানির লেয়ারের থেকে আরেকপাশের পানির লেয়ারের ১০৩ মিটার পার্থক্য বোঝা যাচ্ছে খুব সহজেই। পুরো শহর জুড়ে ইয়াং জি নদী আর তাকে গ্রাস করে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ২ কিলোমিটারের একটা দেয়াল। বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ড্যাম বলে। আর যেখানে নদীর সাধারণ চলাচল বন্ধ করে বানানো হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিপলিফট।

রোদ পড়ে পানির মধ্যে যে অপূর্ব দৃশ্যের সূচনা হয়েছিল। হৃদয়ে গেঁথে থাকবে আজীবন। 

ওডি/এসএম  

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড