• বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন

ঘুরে এলাম ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’

  আবু নাসের ০৩ নভেম্বর ২০১৮, ১১:২৯

সেন্টমার্টিন
সেন্টমার্টিন এক অপার সৌন্দর্যের আধার (ছবি কৃতজ্ঞতা : আবু নাসের)

সেন্টমার্টিন বা দারুচিনি দ্বীপ থেকেও আমার নারিকেল জিঞ্জিরা নামটা বেশি পছন্দ। নামটা শুনতেই নীল পানির সাগরের আগে চোখে ভেসে উঠে কচি ডাবের মিষ্টি পানি আর সাদা নরম শাঁস। এখানেই এ নামের স্বার্থকতা। সেন্টমার্টিন গিয়ে ডাব না খেলে নারিকেল জিঞ্জিরা নামের শানে নুযুল কোনোদিনই বুঝে আসবে না।

সেই ৬ বছর আগে লাস্ট সেন্টমার্টিন গিয়েছিলাম। এরপর আর যাওয়া হয়নি। বুকের মধ্যে একটা টান সবসময়ই অনুভব করতাম এই জায়গার জন্য। এবারও হয়ত যাওয়া হত না যদিনা কিছুদিন আগে ১লা মার্চ থেকে সেন্টমার্টিন রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ করা হচ্ছে এমন সংবাদ প্রকাশ না পেত। খবরটা শুনে অনেকটা হুট করেই প্ল্যান করে ফেললাম সেন্টমার্টিন যাওয়ার। শীপ চালু হলে ভীড় বেড়ে যাবে, আর ভীড় মানেই বেশি দূষণ, বেশি নোংরা, বেশি খরচ- সবকিছুই বেশি বেশি শুধু সৌন্দর্য ছাড়া, ওটা কেবল কমতেই থাকে যত দিন যায় আর সেজন্য দায়ী আমরাই। গত ১৮ই অক্টোবর রাতে চট্টগ্রাম থেকে রওনা দিলাম টেকনাফের উদ্দেশে। শুরু হয়ে গেলো ৩দিনের রোমাঞ্চকর নারিকেল জিঞ্জিরা ট্যুর। 

১ম দিন: 

সকালে টেকনাফ পৌঁছে সেখানে ঢাকা থেকে আসা আরও চার সফরসঙ্গীর সাথে যোগ দিলাম। হালকা ফ্রেশ হয়ে সকালের নাস্তা সেরে চলে গেলাম ফিশারীঘাট। সেখান থেকে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ট্রলার ও স্পীডবোট ছেড়ে যায়। 

ভাড়া সাধারণত জনপ্রতি ২২০টাকা কিন্তু সেদিন অনেক পর্যটক থেকে ভাড়া নিলো ৩২০ টাকা করে। যাই হোক ১০টার দিকে শুরু হয়ে গেলো বহু আকাঙ্খিত এডভেঞ্চারাস সেই ট্রলার জার্নি। 

হেলেদুলে রোদে পুড়ে আর ইঞ্জিনের শব্দ শুনতে শুনতে প্রায় ৩ ঘন্টা পর পৌঁছালাম সেন্টমার্টিন। অনেকেই ট্রলারে ভয় পান বা যেতে নিরুৎসাহিত করেন কিন্তু আমার কাছে তেমন ভয়ংকর লাগেনি কারন এখন সাগর শান্ত। 

আমরা ২ রাত থাকব বলে প্ল্যান ঠিক করে গিয়েছিলাম তাই বীচের পাশেই খুব সুন্দর একটি হোটেলে রুম নিয়ে নিলাম অনেক্ষণ হাঁটাহাঁটির পর কারণ তখন ম্যাক্সিমাম হোটেলই বন্ধ শীপ চালু হলে খুলবে। খাবার বেলাতেও একই রকম ঝামেলা। বেশিরভাগ খাবারের হোটেল বন্ধ আর আমরা যখন গিয়েছিলাম তখন মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিলো তাই গোডাউন ভর্তি করে মাছ খাওয়ার ইচ্ছেটা অপূর্ণ থেকে গেলো। 

তবে একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম একটা মাছকে অন্য মাছ বলে চালিয়ে দেয় কিছু হোটেল কারণ আমাদের সামুদ্রিক মাছ সমন্ধে জ্ঞান তেমন একটা না থাকায় তারা এই সুযোগটা নেয়। বিকেলে সূর্যাস্ত দেখে বীচ সীট নিয়ে একটা হালকা ঘুম দিলাম তবে ঠান্ডা বাতাসে তা আর আরামদায়ক হলনা। 

তারপর বাজারে গিয়ে তরমুজ সাইজের বিশাল ডাব খেয়ে জেটিতে জোসনা বিলাস করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে রুমে এসে ১১টা পর্যন্ত মোবাইল ব্যাটারী সব চার্জ দিয়ে ঘুম। উল্লেখ্য সেন্টমার্টিনে বিদ্যুৎ নেই। বেশিরভাগ রিসোর্ট/হোটেল জেনারেটরের মাধ্যমে কারেন্ট সাপ্লাই দেয় সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত।

২য় দিন:  

সূর্যোদয় দেখার কথা থাকলেও ঘুম থেকে উঠতে না পারায় মিস হয়ে গেলেও আজ আরও রোমাঞ্চকর ইভেন্ট পায়ে হেটে ছেড়াদ্বীপে যাওয়া। সকালের নাস্তা খেয়ে পশ্চিম বীচ থেকে হাটা শুরু করলাম প্রায় ৩ঘন্টা লাগলো পৌঁছাতে। সেখানে দুপুর পর্যন্ত ঝাপাঝাপি আর স্বচ্ছ পানির নিচে ডুব দিয়ে নানারকম কালারফুল মাছ দেখে আবার ফেরার জন্য রওনা হলাম অন্যদিক দিয়ে যেন পুরো সেন্টমার্টিন চারিদিক দিয়ে রাউন্ড দেয়া হয়ে যায়। রোদে অনেক কষ্ট হলেও হেঁটে ছেড়াদ্বীপ যাওয়া আসার পথে যে সৌন্দর্য দেখেছি তা কখনোই ভোলা যাবেনা। রাতে মাছের বার্বিকিউ দেখে খেতে ইচ্ছে হলেও পূর্ব থেকে অর্ডার না করায় আর অতি উচ্চমূল্যের কারনে তা আর হলো না। রাতে আবার তারাভরা আকাশের নীচে জোসনাবিলাস, আড্ডা, অতপর রাত ১২টায় রুমে ফিরে শান্তির ঘুম।

সেন্টমার্টিন

৩য় দিন:  

শেষদিন ভোর ৫:১৫ তে ঘুম থেকে উঠলাম। ভাবনায় ছিল আজ কোনোভাবেই সূর্যোদয় মিস করা যাবে না। সূর্যোদয় দেখে চলে গেলাম সাইকেল ভাড়া করতে। সাইকেল ভাড়া নিয়ে প্রায় দেড় ঘন্টা সেন্টমার্টিনের পূর্বদিক চষে বেড়িয়ে গাছে দোল খেয়ে আবার ফিরে এলাম রুমে। 

ব্যাগ গুছিয়ে হোটেল ছেড়ে জেটিঘাটে এসে দেখি চারটা ট্রলার অলরেডি ছেড়ে দিয়েছে এখন লোকস্বল্পতায় আর কোন ট্রলার ছাড়বে না। নেক্সট ট্রলার ২টায় ছাড়তে পারে, তখন বাজে কেবল ১০টা। নাস্তা সেরে বোরিং অপেক্ষা ছাড়া সে সময় আর কিছু করার ছিলো না। আর ট্রলার রিজার্ভ করে আসবো সেটাও পসিবল ছিলো না। ট্রলারের এত ভাড়া এই অল্প কয়জনে সম্ভব না। 

সেন্টমার্টিন

হঠাৎ প্রায় দুইঘন্টা পর বেলা ১২টার দিকে একটা স্পীডবোট জেটিতে ঢুকতে দেখে দৌড়ে গেলাম আমি আর আমাদের দলের এক বড়ভাই। কথা বলে স্পীডবোট রিজার্ভ করে ফেললাম কিন্তু তা শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত যাবে। রাজি হয়ে গেলাম। আমরা ৫জন ছিলাম আর আমাদের সাথে ৩ জনের আরেকটি গ্রুপসহ মোট ৮জন লাইফ জ্যাকেট পড়ে উড়তে উড়তে ছুটে চললাম নীল জল পেড়িয়ে শাহপরীর দ্বীপে। 

প্রায় ৩০মিনিটেই পৌঁছে গেলাম শাহপরীর ঘাটে। সবাই এত ইনজয় করেছি যে ট্রলারের জার্নি তখন তুচ্ছ মনে হল, দারুণ ছিলো সেই ৩০মিনিটের স্পীডি জার্নি। শাহপরীর দ্বীপটাও সুন্দর, সময় থাকলে ঘুরে দেখা যেত কিন্তু আমাদের টার্গেট আজ টেকনাফ থেকে মেরিনড্রাইভ হয়ে কক্সবাজার যাওয়া। 

সেন্টমার্টিন

সিএনজি নিয়ে চলে গেলাম টেকনাফ তারপর সেখান থেকে আবার সিএনজি নিয়ে মেরিনড্রাইভ রোড দিয়ে কক্সবাজার। বামপাশে বিকেলের সোনালী রঙ মাখা সমুদ্র আর ডানপাশে বিশাল পাহাড়ের সারি আর মাঝদিয়ে চলে যাওয়া মেরিনড্রাইভ রোড অসম্ভব সুন্দরের হাতছানি। হাতে সময় থাকলে দরিয়ানগরে প্যারাসেইলিং টাও সেরে ফেলতাম। অসম্ভব ভালো লাগার আর স্মৃতিময় ছিলো পুরো ট্যুর।

যাতায়াত ও খরচ:  

ননএসি বাসে চট্টগ্রাম-টেকনাফ ৪০০টাকা/ ঢাকা থেকে টেকনাফ ৯০০টাকা, 

টেকনাফ থেকে ট্রলারে সেন্টমার্টিন ২২০-৩২০টাকা, 

স্পীডবোট টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন রিজার্ভ ৬০০০টাকা(লোকাল গেলে জনপ্রতি ৮০০টাকা), 

হোটেল ১০০০টাকা, 

লাঞ্চ/ডিনার ১৫০টাকা প্যাকেজ(ভাত,মুরগি,সবজি,ভর্তা,ডাল), 

সাইকেল ভাড়া ঘন্টা ৩০-৫০টাকা।

ফেরার পথ ও খরচ:  

সেন্টমার্টিন থেকে শাহপরীর দ্বীপ স্পীডবোট ৪৫০০টাকা

শাহপরীর দ্বীপ থেকে টেকনাফ সিএনজি ৪০০টাকা

টেকনাফ থেকে মেরিনড্রাইভ রোড হয়ে কক্সবাজার সিএনজি ১০০০-১২০০টাকা

কক্সবাজার-চট্টগ্রাম ২৫০টাকা/কক্সবাজার-ঢাকা ৮০০টাকা

কিছু কথা: 

কিছু কিছু খরচ শীপ চালু হওয়ার পর বেড়ে যেতে পারে যেমন: হোটেল ভাড়া, খাবারের দাম, অভ্যন্তরীণ যাতায়াত খরচ ইত্যাদি।

অনুরোধ/পরামর্শ: 

১) ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে সাগরে চলাচল করবেন না আর ভাটার সময় সাগরে নামবেন না।

২) ট্রলারে সেন্টমার্টিন গেলে বা হেঁটে ছেড়াদ্বীপ যাওয়ার ইচ্ছা থাকলে অবশ্যই ছাতা নিবেন আর সাথে পর্যাপ্ত পানি আর শুকনো খাবার নেবেন।

৩) সেন্টমার্টিন যেকোন কিছু খাওয়া বা ভাড়া করার পূর্বে ভালো করে জিজ্ঞেস করে দরদাম করে নিবেন সেখানে পর্যটকদের থেকে প্রায়ই বেশিমূল্য আদায় করা হয়।

৪) স্থানীয়দের সাথে কোন বিরোধে জড়াবেন না এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হয় এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকবেন।

৫) যত্রতত্র ময়লা বা প্লাস্টিকের দ্রব্য ফেলা থেকে বিরত থাকবেন।

৬) দালাল এড়িয়ে চলবেন। বিশেষ করে কিছু ভ্যান চালক আছে যারা অফার দিবে সেন্টমার্টিন এর সব স্পট ঘুরিয়ে দেখাবে, আদতে ভ্যানে করে সেন্টমার্টিন দেখার মত কিছু নেই।

৭) সেন্টমার্টিন থেকে ফেরার সময় কোনো প্রবাল বা পাথর সাথে করে নিয়ে আসবেন না।

আমাদের অসচেতনতার কারণেই আজ সেন্টমার্টিনে রাত্রি যাপন নিষিদ্ধের মত এই কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। পরিষ্কার করতে না পারেন অন্তত নোংরা করবেন না। আমাদের সুন্দর জায়গাগুলো সুন্দর রাখার দায়িত্ব আমাদেরই। 

ভ্রমণ হোক নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন। 
 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড