• বৃহস্পতিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪৩০  |   ২০ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে আমদের সুখ-দুঃখের কথা : পর্ব-৩

  রহমান মৃধা

১২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৩:৪৩
আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে আমদের সুখ-দুঃখের কথা : পর্ব-৩
আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে সৌন্দর্যের মাঝে ফাইজারের প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের সাবেক পরিচালক রহমান মৃধা (ছবি : সংগৃহীত)

হঠাৎ একদিন ল্যাঙ্কবী দ্বীপে যে দ্বীপ মূলত মালয়েশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন, অতীতে সেখানে ঘুরেছি এবং দেখেছি সে প্রায় পঁচিশ বছর আগের দেখা দ্বীপটি। ল্যাঙ্কবী দ্বীপের উপর আমার একটা লেখা রয়েছে যা অতীতে পাবলিশ হয়েছে নানা পত্রিকায়।

ভ্রমণ শেষ হবার তিনদিন আগে আমরা পিপি দ্বীপ ভ্রমণে আসি। পিপি অ্যাইল্যান্ডে দেখার মতো রয়েছে কয়েকটি ছোট বড় ব্লু লাগুন যা সত্যিই চমৎকার। আগেই বলেছি প্রকৃতিকে যদি ভালোবাসা না যায় তবে জানিনা অর্থ এবং সময় নষ্ট করা ঠিক হবে কিনা! ভালোবাসা ধরা বা ছোঁয়া যায় না তবে তা অনুভব করা যায়। আমার মনে হয় প্রকৃতি যেমন দেখা যায় তেমন অনুভব করা যায়--শুধু অনুভবে হৃদয় অনুভব করে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে।

পিপি দ্বীপ ভ্রমণ শেষে ফিরতে পথে প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টি শুরু হয় সাগরের মাঝে। সবাই একটু ভয়ে আছি তারপর প্রচণ্ড গরম। পরে চড়া বৃষ্টিতে ভিজে হোটেলে ঢুকতেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে গেল। সূর্যকে আজ আর দেখা যাবে না। হোটেলে ঢুকেই তাড়াহুড়ো করে গোসল শেষ করলাম সবাই। ডিনার খেতে যাব। হঠাৎ মারিয়ার প্রচণ্ড জ্বর।

দুইদিন আগে থেকেই তার মাথা ব্যথা, গলা ব্যথা করছে, আমরা ভেবেছি প্রচণ্ড গরম তারপর অনিয়মিত বৃষ্টি, ঠাণ্ডা লাগতে পারে। সাধারণত এসময় আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে বৃষ্টি হবার কথা নয়। কারণ এখন এখানে শীত, কিন্তু দুঃখের বিষয় জলবায়ুর এমনভাবে পরিবর্তন হয়েছে বোঝা কঠিন কখন কী হয়। আমরা নিজেরাই যখন নিজেদের শত্রু হয়েছি তখন কার কী আসে যায় পৃথিবী ধ্বংস হলে!

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে আমদের সুখ-দুঃখের কথা : পর্ব-৩

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে সৌন্দর্য (ছবি : সংগৃহীত)

আজ সকালে মারিয়া কিছুটা ভালো ফিল করছে। বললাম চলো নিচে গিয়ে ব্রেকফাস্ট করি, আজ আর বাইরে যাবো না। আমার বাংলাদেশে কয়েকটি ছোট ছোট প্রজেক্ট রয়েছে তার মধ্যে যেমন অতীতে বলেছি যেমন হাসির মা যিনি একজন সর্বহারা মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্র থেকে তেমন কিছু পায়নি। আমরা অনেক মিলে তাকে একটি ঘর তৈরি করতে সাহায্য করছি, ছোট একটি শিশুর অপারেশনের কাজ চলছে ঢাকা হাসপাতালে সে বিষয় একটু নজর দেওয়া এবং নবগঙ্গা নদীর ধারে একটি সুন্দর পার্ক এবং নদীর ঘাটটিকে মেরামত করা ইত্যাদি।

ফাঁকে ফাঁকে কাজগুলোর অগ্রগতি জানতে চেষ্টা করছি যখনই একটু সময় হচ্ছে। তারপর প্রতিদিনই চেষ্টা করেছি কোথায় কী করছি, দেখছি, যতটুকু পারছি সবার সঙ্গে শেয়ার করছি আমার মতো করে, কারণ নতুন প্রজন্ম বিশ্বকে দেখতে পাবে তাদের মতো করে, গড়তে পারবে একটি সুন্দর পৃথিবী- এ বিউটিফুল ওয়ার্ল্ড ট্যু লিভ।

জনাথান জেসিকা পিপি দ্বীপে আরও দুদিন ছিল। আজ হোটেলে আমি এবং মারিয়া, সকালের ব্রেকফাস্টে সবে বসেছি। মারিয়া সকালে গরম কিছু খেতে পছন্দ করে না শুধু এক পিচ ব্রেড এবং চিজ সাথে এককাপ চা, সামান্য মধু হলেই সে খুশি। আমি কলা এবং পরাটা নিয়ে বসেছি। হঠাৎ মারিয়া বললো তার একটু মাথা ঘুরছে এবং একটু বমি বমি ভাব এসেছে। আমি তার ঘাড়ের ওপর হাতটি দিয়ে সবে বলছি মারিয়া এখন কেমন লাগছে?

মারিয়ার মুখে কথা নেই, মনে হলো সে আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে গেল শান্ত হয়ে। আমি মারিয়া মারিয়া করছি কোন কথা নেই, নিঃশ্বাস বন্ধ, পালস নেই এমতাবস্থায় আমি চিৎকার করে বলছি, প্লিজ সামবডি কল অ্যা অ্যাম্বুলেন্স।

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে আমদের সুখ-দুঃখের কথা : পর্ব-৩

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের মার্কেটে রহমান মৃধার মেয়ে জেসিকা মৃধা (ছবি : সংগৃহীত)

সবাই অবাক! জানিনে কে কী করছে! কে কী ভাবছে! তবে আমার ভাবনায় শুধু একটিই প্রশ্ন স্রষ্টার কাছে — আমাকে তুমি একটুও সুযোগ দিলে না? আমাকে একটু চেষ্টা করতে দাও, তুমি না বলেছ চেষ্টা যে বা যারা করে তাদের আশা তুমি পূরণ করো! হঠাৎ হবে ত্রিশ বা পঁয়ত্রিশ বছরের একটি হ্যান্ডসাম ছেলে, বেশ দূরের একটি টেবিল থেকে দ্রুত গতিতে এসে মারিয়ার হাত ধরে পালস এবং ঘড়ির কাটা দেখছে একই সাথে মারিয়াকে আমার সাহায্যের অপেক্ষা না করে দুই হাত দিয়ে উঁচু করে কিছুটা দূরে ফ্লোরের উপর শুইয়ে দিয়ে হাতের পালস নির্ণয় করতে করতে বলল আমি নিজেই ডাক্তার, আমার বাড়ি জার্মানিতে। এরই মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স এসে হাজির হয়ে গেছে। দ্রুতগতিতে তারা মারিয়াকে নিয়ে চলে গেল।

আমি দৌড়ে হোটেলের রুমে গিয়ে মারিয়া এবং আমার পাসপোর্ট নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। অত্যন্ত দ্রুত সময়ে তারা জেনেছে মারিয়ার প্লেটলেট ৬০ হাজারের নিচে। ইদানীং এশিয়ায় ডেঙ্গু মশার কারণে এমনটি ঘটনা এসব দ্বীপে বেশ আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। তারপর প্রতিদিনই কম বেশি বৃষ্টির কারণে মশার দাপট বেশ বেশি যা আমরা লক্ষ্য করেছি। নানা রকমের পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং রক্ত পরীক্ষার পর দেখা গেল ডেঙ্গু নয়। তাহলে কী? এ প্রশ্নের উত্তর দ্রুত জানা দরকার। এদিকে আমি SOS এ যোগাযোগ করেছি। পুরো ঘটনা বলার পর পরই তারা সত্তর মারিয়াকে শহরের বড় হাসপাতালে মুভ করার নির্দেশ দিয়েছে। আমি নিজে এসময় সত্যিই খুব অসহায় হয়ে পড়েছি।

জনাথান আজ পিপি দ্বীপ থেকে মুভ করবে পুকেটে এবং জেসিকা দুটোর বোটে আও নং বিচে ফিরবে। তাকে আনতে যাবার কথা ছিল আমাদের, অথচ কী হতে কী হয়ে গেল! জেসিকাকে নেটের সমস্যার কারণে পাওয়া যাচ্ছে না। জনাথানকে টেকস্ট করে বিষয়টি জানিয়েছি। সে তার পুকেট ভ্রমণ ক্যানসেল করে দুই ভাইবোন দুটোর দিকে হাসপাতালে এসেছে। জনাথান ও জেসিকা যখন হাসপাতালে মারিয়া তখন চোখ খুলেছে সবকিছু বিষয়ে সে অবগত তবে খুবই দুর্বল।

প্রশ্ন এখনO কি কারণে প্লেটলেট (trombocyter) লো? আমাদের সুইডেনের মেডিকেল জার্নাল আমরা সরাসরি দেখতে পারি, যেমন কবে কখন কী রোগ হয়েছিল, কেন এবং কী ওষুধ ব্যবহৃত হয়েছে। হাসপাতালের ওয়াইফাই ব্যবহার করে মারিয়ার পাসওয়ার্ডে তার মেডিকেল জার্নালে ঢুকে দেখি ২০১৬ সালে একটি অ্যানালাইসিসে ধরা পড়েছে তার শরীরের প্লেটলেট লো। যার ফলে শরীরে কোনো রকম ইনফেকশন দেখা দিলে শরীর দুর্বল হয়। এদিকে থাইল্যান্ডে গরমের কারণে শরীর ডিহাইড্রেটেড হওয়া এবং তিন দিন ধরে জ্বর সব মিলে এমনটি হতে পারে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সন্দেহ করছে।

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে আমদের সুখ-দুঃখের কথা : পর্ব-৩

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে সৌন্দর্য (ছবি : সংগৃহীত)

কর্তৃপক্ষের প্রথম সন্দেহ ডেঙ্গু, এখন বলছে ডিহাইড্রেটেড হওয়া এবং তিন দিন ধরে জ্বর সব মিলে এমনটি হতে পারে!

আমি বললাম জ্বর হবার কারণ কী তাহলে? ডাক্তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে টিম গঠন করে তাড়াতাড়ি করে কোভিড টেস্ট করে জানতে পারলো মারিয়ার করোনা হয়েছে। এতক্ষণে বিষয়টি পরিষ্কার, কেন শরীরে ইনফেকশন আর কেনই বা প্লেটলেট লো?

আরও পড়ুন : আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে আমদের সুখ-দুঃখের কথা : চতুর্থ এবং শেষ পর্ব

আরও পড়ুন : আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে আমদের সুখ-দুঃখের কথা : পর্ব-২

আরও পড়ুন : আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে আমদের সুখ-দুঃখের কথা : পর্ব-১

এখন নতুন সমস্যা সেটা হলো আমাদের ফ্লাইট ব্যাক ট্যু সুইডেন-এ, ডিসেম্বরের তিন তারিখে। হোটেল থেকে পিক আপ করবে সকাল ৬ টায়, ফ্লাইট সকাল ১১টায়। কী হবে এখন যদি আগামীকাল বিকেলের মধ্যে মারিয়া সুস্থ না হয়? তাহলো সে ফ্লাই করতে পারবে না।

চলবে…

লেখক : রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট) ফাইজার, সুইডেন।

[email protected]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড