• রোববার, ৩১ মে ২০২০, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

হেনস্তার শিকার হওয়া শিশুদের লক্ষণ

  লাইফস্টাইল ডেস্ক

২৮ মার্চ ২০২০, ১৬:৩১
বুলিং
ছবি : সংগৃহীত

বুলিং বা আগ্রাসী মনোভাব বা আচরণের সঙ্গে আমরা সকলেই কম বেশি পরিচিত। শৈশবে স্কুলে যাওয়ার পর সিনিয়রদের কিংবা নিজের ক্লাসের সহপাঠীদের আগ্রাসী সব আচরণ, শাস্তি, উদ্ভট কাজের আদেশ, মারধর, হুমকি এসবই বুলিং এর অন্তর্গত। 

তবে বর্তমান আধুনিক সময়ে বুলিং বা হেনস্তা করার মাত্রা এবং ধরণ ও পাল্টিয়েছে। তাই আপনার সন্তান যদি তাঁর স্কুলে এরকম আচরণের সম্মুখীন হয়ে থাকে তবে সেটি নিয়ে তাঁর আচরণের পরিবর্তন মনোভাব এসব বিষয়ে খেয়াল রাখাটা খুবই জরুরি। চলুন তাহলে আজ আমরা আমরা বুলিং বা হেনস্তার শিকার হওয়ার পরের কিছু লক্ষণ সম্পর্কে জেনে নেই।

সকালে স্কুলে যেতে অনীহা: বুলিং এর প্রাথমিক জায়গা হচ্ছে এই স্কুল বা বিদ্যালয়। প্রথম প্রথম স্কুলের যাওয়ার জন্য যেমন শিশুদের আগ্রহ থাকে, তেমনি কিছু অপ্রিয় স্মৃতির কারণে আস্তে আস্তে শিশুদের মধ্যে স্কুলে যাওয়ার আনন্দ ও কমে যেতে থাকে। 

যদি সকালে স্কুলে যাওয়ার ব্যাপারে আপনার সন্তানের মধ্যে অনীহা দেখে থাকেন তাহলে বুঝে নিতে হবে সব কিছু স্বাভাবিক ভাবে চলছে না। যদি আপনার ছোট সন্তান প্রায়ই স্কুলে না যাওয়ার জন্য পেট ব্যথা মাথা ব্যথা অজুহাত দিতে থাকে কিংবা স্কুলের মিস্ট্রেস প্রায়ই বাচ্চাকে তাড়াতাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য ফোন দিয়ে থাকেন তাহলে সন্তানের প্রতি আপনার গভীর মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। 

শৈশব এবং কৈশোর এই সময়ে বাচ্চারা বেশিরভাগ সময়েই স্কুল ফাঁকি দিতে চায়। তাই এসময়ে স্কুলের শিক্ষকদের সাথে সন্তানের উপস্থিতির ব্যাপারে প্রতিনিয়ত খোঁজ খবর রাখুন।

টেক্সাস এর হিউস্টন অঙ্গরাজ্যের একজন স্কুল বুলিং বা আগ্রাসী আচরণের বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শদাতা ডোনা ক্লার্ক লাভ সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে নজর দেওয়ার জন্য মতামত দেন। তিনি বলেন, ‘ সোমবার দিনটিতেই সন্তানেরা স্কুল ফাঁকি দিতে চায়’।

তিনি আরও বলেন, ‘শিশুরা ছুটির দিনকে বেশী মাত্রায় প্রাধান্য দিয়ে থাকে। কারণ এসময় তারা বাসায় নিজেদের নিরাপদ মনে করে। এই ছুটি কাটিয়ে পরবর্তীতে সোমবারে স্কুলে যাওয়াটা তাদের কাছে এক কঠিন পরিস্থিতির মতই’।

বার বার মাথাব্যথা ও পেট ব্যথা: দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা ও মানসিক অত্যাচার বা বুলিং এর প্রাথমিক লক্ষণ হল এগুলো। সেই সাথে এগুলোকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে স্কুলে যাওয়া থেকে বিরত থাকা যায় এবং যেকোনো সামাজিক যোগাযোগ থেকে বিরত থাকা যায়। 

ন্যাশনাল বুলি প্রিভেনশনস সেন্টারের ‘প্যারেন্ট অ্যাডভোকেসি কোয়ালিশন ফর এডুকেশনাল রাইটস (পিএসিইআর)’ এর একজন সহযোগী বেইলি লিন্ডগ্রেন বলেন, ‘যদি আপনার সন্তান প্রতিদিনই এই মাথা ব্যথা বা পেট ব্যথার কথা বলতে থাকে তাহলে এখনি তার সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করুন’।

এ ব্যাপারে কথোপকথন চালানোর জন্য কি ধরণের প্রশ্ন করতে হবে বা করলে ভালো হবে সে ব্যাপারেও মতামত জানিয়েছেন তিনি।

‘ইদানিং তুমি বেশিই অসুস্থ বোধ করছো? তুমি কি আমাকে এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু বলতে পার’? এ ধরণের খোলামেলা প্রশ্ন কোনো মুখোমুখি অবস্থানের তৈরি করে না। যার কারণে শিশুর অনীহার কারণগুলো সহজেই বের করা যায়।

বন্ধু পরিবর্তন: কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্কে ভাঙ্গন কিংবা বন্ধুর পরিবর্তন মূলত বুলিং এর কারণকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। ক্লার্ক লাভ বলেন, ‘সন্তান যদি তার বন্ধুদের সাথে সময় কাটানোর ব্যাপারে অপারগতা প্রকাশ করে তাহলে বুঝতে হবে সেই ফ্রেন্ড সার্কেল বা বন্ধুদের গ্রুপে সে বুলিং বা মানসিক শারীরিক অত্যাচার এর শিকার হচ্ছে’। বিশেষ করে মেয়েদের গ্রুপে এই ঘটনা বেশি ঘটে থাকে। কিন্তু শিশুরা সহজে সেগুলোকে বুলিং বা অত্যাচার হিসেবে ধরতে পারে না।

এক্ষেত্রে অভিভাবকরা গোপনীয়তা বজায় রেখে একটি কাজ করতে পারেন। সেটি হল আপনার সন্তানের বন্ধুদের গ্রুপকে অন্য বাবা-মা বা অভিভাবকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। এরে করে সহজেই আপনি বুঝতে পারবেন কখোন আপনার সন্তান গ্রুপ থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে কিংবা অন্য গ্রুপ তাকে ডাকছে।

ঘুমে সমস্যা: স্কুলে কালকের দিনটা কেমন যাবে, কিংবা বন্ধুদের সাথে খেলতে গেলে কি হতে পারে এসব নিয়ে যদি কোন শিশু উদ্বিগ্ন থাকে, চিন্তায় থাকে তাহলে তার ঘুমের সমস্যা হবে। অথবা সে সারারাত এপাশ ওপাশ করবে। 

ড. লিন্ডগ্রেন বলেন, ‘সকালে ঘুম থেকে উঠার পর যদি আপনি দেখেন আপনার সন্তান এখনো ক্লান্ত কিংবা খুব বেশী চিন্তিত কিন্তু সে কারণ আপনাকে জানাচ্ছে না তাহলে বুঝতে হবে রাতে ঘুমাতে তার সমস্যা হচ্ছে’। মানসিক অত্যাচার বা চাপের কারণে মনো দৈহিক যে পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যায় তা অন্যভাবেও প্রকাশ পেতে পারে। যেমন: অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বা অসচেতনতা। 

তীব্র মানসিক প্রতিক্রিয়া: স্কুল সংক্রান্ত কোন আলোচনা কিংবা সামাজিক বা পারিবারিক কোন অনুষ্ঠানের কথোপকথনের সময় যদি আপনার সন্তান অতিমাত্রায় আবেগ জড়ানো ভাষায় উত্তর দিয়ে থাকে বা কান্না কর থাকে তাহলে বুঝতে হবে তাদের মধ্যে এ ধরনের অনুষ্ঠান নিয়ে ভীতি কাজ করছে।

ক্লার্ক লাভ বলেন, ‘কম-বয়সী বাচ্চাদের মধ্যে স্কুল সংক্রান্ত আলোচনায় এ ধরণের আচরণ বেশী পরিলক্ষিত হয়’। তিনি আরও বলেন, ‘যখন এই শিশুগুলো বড় হয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য হাই স্কুলে ভর্তি হবে তখন তারা শুক্রবার এবং শনিবারের রাতের জন্য আবেগপ্রবণ হয়ে উঠবে’। অথবা তাদের মধ্যে একধরণের চাপা অভিমান বা উদ্বিগ্নতা কাজ করবে কিংবা কোন বিশেষ কাজে তাদের মনোযোগ এর ঘাটতি দেখা যাবে।

পরিবারের সঙ্গে কথা বলার অনিচ্ছা: লিন্ডগ্রেন বলেন, ‘স্কুল থেকে ফেরার পর যদি আপনার সন্তান আপনার সাথে কথা না বলে সরাসরি নিজের রুমে চলে যায় কিংবা স্বাভাবিক ভাবে আগে অনেক কথা বললেও হঠাৎ করে কথা বলা বন্ধ করে দেয় তাহলে এখনি তার এই আচরণের পেছনে কারণ জানার চেষ্টা করতে হবে’।

নিজের ভাই-বোনের সাথে বুলিং এর অত্যাচার এর অভিনয় করাটাও এ সমস্যার অন্যতম লক্ষণ। কোন কোন সময়ে বাচ্চারা তাদের ভাই-বোনের সাথে এই চরিত্রের অভিনয় করে ভয় কাটিতে উঠতে চায়। যাতে করে সে সকলের সাথে আবার স্বাভাবিক ভাবে মিশতে পারে।

ইলেকট্রনিক ডিভাইস এর প্রতি আগ্রহ-অনাগ্রহ: স্কুলে কিংবা সামাজিক কোন অনুষ্ঠানে যদি আপনার সন্তান বুলিং বা দুয়ো শুনে থাকে এবং সেটা যদি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে আপনার সন্তানের মধ্যে দুই ধরণের লক্ষণ দেখতে পারবেন। এক সে খুব বেশী মাত্রায় মোবাইল, কম্পিউটার, ল্যাপটপের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়বে কিংবা সেগুলো ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকবে। 

যদি সে বেশি মাত্রায় ব্যবহারকারী হয়ে থাকে তাহলে তাকে সেটি ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করাটা হিতে বিপরীত ফলাফলের সূচনা করবে। আবার সন্তান যদি ডিভাইস ব্যবহারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে তখন তাকে সেগুলো ব্যবহারে আর অনুপ্রাণিত করা যায় না।

শিশুরা যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রথম প্রবেশ করে এবং নিজেদের আইডি তৈরি করে তখন কিছু নিয়ম-নীতি প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছে লিন্ডগ্রেন। তিনি বলেন, ‘কোন সন্তান/শিশু যদি অনলাইন জগতে হেনস্তার শিকার হয় তাহলে সে সহজে তা অভিভাবকের কাছে জানাবে না। কারণ সে ভয়ে থাকে যদি তার মোবাইল/ ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে নেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘আপনার সন্তানকে বুঝাতে হবে যে আপনি তার ডিভাইস নিচ্ছেন না বরং সমস্যা সমাধানে তাকে সাহায্য করতে চাচ্ছেন’।

ছেড়া জামা-কাপড় ও শারীরিক আঘাত: অভাবনীয় কায়দায় ছেড়া জামা-কাপড়, শারীরিক আঁচড়, আঘাতের চিহ্ন এসব যদি আপনার সন্তানের মধ্যে দেখতে পান তাহলে সেটি খেলার মাঠের নির্যাতন বা হেনস্তার লক্ষণ। যখন তাদের পিতা-মাতা তাদেরকে এ ব্যাপারে সরাসরি প্রশ্ন করেন তখন তারা হয় উত্তর দিতে অপারগতা প্রকাশ করে কিংবা সঠিক ব্যাখ্যাটা দিতে চায় না। এক্ষেত্রে কোন চাপ প্রয়োগ না করে সাধারণ প্রশ্ন করাটাই মঙ্গলজনক। যেমন: স্কুলে আজকে কি কি হয়েছে? কেমন গেল আজকের দিন? কিংবা যা হয়েছে তা তোমার কাছে কেমন লেগেছে?

নতুন বাচ্চাদের ব্যাপারে সতর্কতা: সাপোর্ট ছাড়া যেসকল বাচ্চারা স্কুলে থেকে থাকে তাদের হেনস্তার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। লাভ ক্লার্ক বলেন, ‘স্কুলের নতুন বাচ্চাদের জন্য পরিচয় পর্ব কিংবা সাথী খুঁজে দেওয়ার কোন অনুষ্ঠান না থাকাটা আমাকে ব্যথিত করে’। 

যদি আপনার সন্তান নতুন কোন স্কুলে ক্লাস শুরু করতে যায় তবে তার আগে স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করুন কথা বলে জানার চেষ্টা করুন যে তারা আপনার সন্তানের জন্য কোন বন্ধু বা সহপাঠীর ব্যবস্থা করে দিতে পারবে কি না। নতুন স্কুলে যদি আপনার সন্তান কথা বলার মত বা চলার মত একজনকেও খুঁজে পায় তাহলে সে সহজেই স্কুলের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে।

মানসিক বিপর্যয়ের প্রকাশ: ক্লার্ক লাভ এর মতে শিশুদের মধ্যে তারাই আসল ভিকটিম যারা নিজেদের আত্মরক্ষা বা নিজেদের জায়গায় সোজা হয়ে দাঁড়াতে ব্যর্থ এবং সবসময় মাথা নিচু করে হাঁটে এবং যে কারো সাথে কথা বলতে অপারগ থাকে। আর এইসব বাচ্চাদের মধ্যেই প্রতিনিয়ত হেনস্তার শিকার হওয়ার আলামত থাকে।

আরও পড়ুন : পোষা প্রাণী থেকেও কি ছড়াতে পারে করোনা ভাইরাস?

যদি আপনার সন্তানের মধ্যে এমন কোন আচরণ দেখতে পান তাহলে তাকে প্রতিদ্বন্দিতামূলক কাজ বা চর্চা থেকে দূরে রাখুন। যেখানে তাকে কারো মোকাবেলা করতে হবে না বা পাল্লা দিয়ে চলতে হবেনা। যেমন- কারাতে বা জুডো চর্চা। এখানে কেউ কাউকে মোকাবেলা করে না।

তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে তারাই তাদের প্রতিপক্ষ এমন পরিবেশ দরকার’। এবং এভাবেই শিশুরা তাদের নিজেদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারবে’।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড