• বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন

'বিবিসি বাংলা'র চোখে কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা লোপের ক্রোধ

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১০ আগস্ট ২০১৯, ০৯:২৮
কাশ্মীরি জনগণ
কাশ্মীরি জনগণের বিক্ষোভ। (ছবিসূত্র : দ্য কাশ্মীর টাইমস)

ভারতের মোদী সরকার রাতারাতি সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপের মাধ্যমে ভূস্বর্গ খ্যাত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নিয়েছে। মূলত এরপর নানা শঙ্কা উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে কেটে গেছে দিন কয়েক। গত শুক্রবারেও (৯ আগস্ট) গোটা রাজ্যে চলছিল কারফিউ; যে কারণে স্তব্ধ হয়ে আছে জনজীবন।

গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরের পথে পথে শুধু সেনাদের টহল আর তল্লাশি, বন্ধ হয়ে রয়েছে দোকানপাট। কাজে যেতে পারছেন না সাধারণ মানুষ, এমনকি ঘর থেকে বাইরে বেরুতেও দেওয়া হচ্ছে না তাদের।

ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই রাজ্যটি তাদের সংবিধান-প্রদত্ত স্বীকৃতি হারানোয় যে ক্ষোভে ফুঁসছে; তা আর বুঝতে বিশেষ অসুবিধা হয় না। যদিও ভারত সরকার তাদের আরও বেশি সুবিধা প্রদানের জন্যই এমনটা করেছে বলে দাবি বিজেপির।

বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধুই যে অন্য রাজ্যের লোককে কাশ্মীরে এসে জমি-বাড়ি ক্রয় এবং বিয়ে সংক্রান্ত ইস্যু; তা কিন্তু নয়। 

তাহলে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের সিদ্ধান্তে সাধারণ কাশ্মীরিরা এত ক্ষুব্ধ কেন?

কাশ্মীরে পুলিশ

কাশ্মীরের সড়কে টহলরত পুলিশ সদস্য। (ছবিসূত্র : দ্য কাশ্মীর টাইমস)

এবার সে খোঁজ নিতেই 'বিবিসি বাংলা'র প্রতিবেদক ভ্রমণ করেছেন রাজ্যটিতে। সেখানে গিয়ে প্রথমে জানা যায় তা হলো, 'কাশ্মীর আর বাকি ভারতের মধ্যে এতদিন বিশ্বাস বা ভরসার যে নড়বড়ে সেতুটা ছিল, এখন থেকে সেটাও আবার ভেঙে গেল!'

রাজ্যটির রাজপুরা জেলার ব্যবসায়ী ইরফান জাভিদ মনে করেন, 'ভারতই আগে সেই সেতুটা ভেঙে দিয়েছে। তাই এবার কাশ্মীরের রাজনৈতিক নেতৃত্বে বিচ্ছিন্নতাবাদীরাই আসুক বা মূল ধারার ভারতপন্থি রাজনীতিবিদরা আসুক; আমাদের এখন খুব ভেবেচিন্তে স্থির করতে হবে যে, কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ কাদের হাতে যাবে।'

কাশ্মীর ইউনিভার্সিটির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মুদাসসর নাজির বলেন, 'দেশভাগের আগে কাশ্মীর কিন্তু স্বতন্ত্র একটি রাষ্ট্র ছিল এবং তাদের স্বাধীন মুলুক ছিল। সাতচল্লিশের পর সেই দেশটিকেই ভারত আর পাকিস্তান নিজেদের মধ্যে আধাআধি করে ভাগ করে নেয়।'

অবসরপ্রাপ্ত এ অধ্যাপক আরও বলেছিলেন, 'তখন ভারত যে শর্তে কাশ্মীরকে নিয়েছিল তারই ভিত্তি বা আধার ছিল এই ৩৭০ ধারা। তাহলে আমাকে এখন বলুন, সেই আমলের ভারতীয় নেতারা কী দেশদ্রোহী ছিলেন নাকি এখনকার সময়ের নেতারা?'

রাজপুরার ব্যবসায়ী ইরফান জাভিদ সেই সঙ্গেই নিজের মত যোগ করেছেন। তিনি বলেন, 'সংবিধানের ৩৭০ ধারা যে শুধু কাশ্মীরের জন্য ছিল তা কিন্তু নয়। গত সত্তর বছর ধরে, জম্মুর হিন্দুরা বা লাদাখের বৌদ্ধরাও পর্যন্ত এই স্বীকৃতি বা অধিকার ভোগ করে আসছেন।'

ইরফান জাভিদ আরও বলেন, 'তাছাড়া বিশেষ মর্যাদা তো ভারতের আরও বিভিন্ন রাজ্যেও আছে, কিন্তু এটা শুধু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ বলেই নাগরিকদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হলো।'

তিনি বলেন, 'একটা কথা মনে রাখবেন, কাশ্মীরিরা নিজের রুটিকে ভাগ করে খেতে জানে, কিন্তু কে নিজের জমি ও মাকে অন্যের সঙ্গে ভাগ করতে চাইবে বলুন?"

কাশ্মীরের সৌন্দর্য

কাশ্মীরের গ্রামাঞ্চল। (ছবিসূত্র : জুমিয়া ট্রাভেলস)

প্রতিবেদনে বলা হয়, শ্রীনগরের বেশকিছু এলাকায় এখনো হাতেগোনা কিছু হিন্দু কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবার বসবাস করছেন। তারা আবার ৩৭০ ধারা বিলোপের সিদ্ধান্তে তেমন অখুশি বলে মনে হচ্ছে না। প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় বেশ সাবধানী শোনায় তাদের গলা।

কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সংযোগ মিশ্রা যেমন বলছিলেন, 'কী আর বলব বলুন, পরিস্থিতি তো নিয়ন্ত্রণেই আছে; মানুষ ঠিক সঙ্কটে তা বলা যাবে না। তবে হ্যাঁ, আমাদের ওপরও অনেক চাপ যাচ্ছে, কেননা কেউই তো ঠিক এটার জন্য প্রস্তুত ছিল না!'

সংযোগ মিশ্রা বলেন, 'আমার স্কুলে ছোট বাচ্চারা ক্লাসে আসতে ভয় পায়, কখনোই এগুলো হওয়া উচিত নয়। সরকার একটা পদক্ষেপ নিয়েছে, তাছাড়া জনগণ ওঁত পেতে আছে। এখন পরিস্থিতি যেকোনো দিকেই গড়াতে পারে, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।'

শ্রীনগরের বাদামিবাগ এলাকা থেকে একটু সামনে এগিয়ে বাসস্ট্যান্ডের কাছে পৌঁছতেই সাংবাদিক দেখে এগিয়ে আসেন ট্যাক্সি ইউনিয়নের বেশ কয়েকজন নেতা।

তাদের প্রেসিডেন্ট গওহর বাট রাজ্যের বিখ্যাত 'কেওয়া চা' পান করিয়ে প্রতিবেদককে বোঝাতে থাকেন, 'আমরা যেখানে বসে আছি তার ঠিক পেছনের বিল্ডিংটাই কাশ্মীরে জাতিসংঘের মনিটরিংয়ের কার্যালয়। এবার আপনি আমাকে বলুন, কাশ্মীর যদি ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গই হয়, তাহলে এই জাতিসংঘের ভবনটা এখানে কী করছে?'

কাশ্মীরে বিক্ষোভ

সড়কে কাশ্মীরি জনগণের বিক্ষোভ। (ছবিসূত্র : আল-জাজিরা)

তার মতে, 'সোজা কথা হলো, জাতিসংঘের দৃষ্টিতেও এটা একটা বিতর্কিত ভূখণ্ড! "এটা না ভারতের, না পাকিস্তানের, না আবার চীনের। আমাদের তো তারা সবাই গোলাম বানিয়ে রেখেছে।' 

গওহর বাটের এই কথায় সমস্বরে গলা মেলান ভিড় করে থাকা জনতা। আসলে গত সত্তর বছরে কাশ্মীরিদের স্বাধীনতা বা 'আজাদি'র স্বপ্ন কখনো পুরোপুরি নিভেছে, তা কিন্তু বলা যাবে না।

আরও পড়ুন :- 'কণ্ঠস্বর রোধের পর আমাদের জমিও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে'

গত সোমবার (৫ আগস্ট) ভারতীয় পার্লামেন্টে মোদী সরকারের ঘোষণা তাদের সেই আজন্ম-লালিত স্বপ্নের ওপরও একটা বড় ধরনের আঘাত। যা মুসলিম-প্রধান এই রাজ্যটির বেশির ভাগ মানুষই মেনে নিতে পারছেন না।

ওডি/কেএইচআর

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড