• সোমবার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৩, ১৬ মাঘ ১৪২৯  |   ২৫ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

অভিনয় তার রক্তে এবং রন্ধে 

অবিরত-অবিচল অভিনেতা আরিফ হক 

  সুলতানা রাজিয়া

২৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:৩১
অবিরত-অবিচল অভিনেতা আরিফ হক 
আরিফ হক (ফাইল ছবি)

একটি সিনেমার পোস্টার দেখতে দেখতে ছেলেবেলায় একবার বাবার হাত ধরে হাঁটছিলেন। সেই পোস্টার দেখে এতটাই মোহিত হয়ে গেলেন যে কখন বাবার হাত ছেড়ে দিয়েছেন টেরই পাননি। হঠাৎ একটি পিলারের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে সম্মিত ফিরে এলো তার। তাকিয়ে দেখেন বাবা অনেক সামনে চলে গেছেন।

সিনেমা বা সিনেমা সম্পর্কিত বিষয়গুলো তার হৃদয়ে কতখানি জায়গা দখল করে ছিল সেই ছেলেবেলাতেই, সেটিরই একটি উদাহরণ এটি, আরও অনেক গল্প তার জীবনে জমা, সিনেমা, থিয়েটার আর অভিনয় নিয়ে। অভিনয়ের তাড়না আর অনেক সংকুলান পথ পাড়ি দিয়ে সাফল্য ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেওয়া প্রেরণা তাকে এগিয়ে চলার প্রত্যয় যোগায় নিজের মাঝে।

বলছিলাম, একাগ্রতায় সাফল্যের কিনারা পাড়ি দেওয়া অনন্য উদাহরণ তৈরি করা সর্ব মহলে স্বীকৃত “বলিষ্ঠ” অভিনেতা আরিফ হকের কথা। মিডিয়াতে তাকে নিয়ে চল আছে, তিনি দাপটে অভিনেতা। খোজ নিয়ে জানা গেছে তার বাবা থিয়েটার এর দাপটে অভিনেতা এবং নাট্য পরিচালক লালিম হক, তাই তার পিতাকে যারা চেনেন তারা অবাক হন না, বাপের পোলা, অভিনয়ের গোলা হবে এটাই স্বাভাবিক। তার রক্তে অভিনয়।

কিন্তু জীবনের নানা গল্প থাকে। তিনি নিজেই অনেক বানানো, লেখা গল্পের, লেখা স্ক্রিপ্টের নায়ক হলেও, তার নিজের জীবন কম নাটকীয় নয়।

তিনি তার জীবনের নানা বাকে যাতনায় পুড়ে, নিজেকে গড়ে, অভিনেতা হয়েছেন। তিনি রীতিমতো সাধনা করেছেন ভাষা আর অভিনয় নিয়ে। তারই ফলস্বরূপ তার অভিনয় দেখলে রন্ধে রন্ধে যে অভিনয় ঢুকে বসে আছে অথবা এভাবে বলা যায় অভিনয় ধারণ করে তিনি বসবাস করেন।

সম্প্রতি মাসুম রেজার নাট্যরূপ ও ফাহিম মালেক ইভানের নির্দেশনায় শিল্পকলার এক্সপেরিমেন্ট হলে দেশ নাটকের নতুন প্রযোজনা “পারাপার” পরিবেশিত হয়। এই নাটকে আরিফ হক ডালিম চরিত্রে যা করে দেখালেন এটি প্রশংসার বন্যায় ভাসাচ্ছে তাকে, চারিদিকে।

‘পারাপার’ এ তার চরিত্র রূপায়ন সচক্ষে না দেখলে বোঝা ভার তিনি কোন জাতের অভিনেতা, বাংলাদেশের যে কোনো অভিনেতার সাথে তিনি টক্কর দিতে সক্ষম এমনটাই দাবি করেছেন উক্ত নাটকের অনেক দর্শক।

টিভির পর্দায় আরএফএলের ‘আঞ্চলিকতা মানেই সংকীর্ণতা নয়’ শিরোনামের বিজ্ঞাপনটি দেখেছেন নিশ্চয়ই। সেখানে বাসে বসা একজন ব্যক্তিকে মোবাইল কানে নিয়ে বলতে শোনা যায়, ‘হ্যালো আকাসের মা, শুইনছো গো। কথা বইলছো না ক্যানে? আকাস কি ইসকুলে গেছে?’ কথার শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘ক্যানে? কথা বইলতে লইজ্জা কিসের?’ যা নাড়া দেয় সবার বিবেককে। পর্দায় আকাশের বাবা হিসেবে অভিনয় করা এই ব্যক্তিটিও আরিফ হক। নিজের প্রবল মানসিক শক্তি, কিছু করার চেষ্টা আর নিজের লক্ষ্যের প্রতি একাগ্রতায় যিনি হয়েছেন একজন অভিনেতা।

ঢাকায় জন্মগ্রহণ করলেও আরিফের বেড়ে ওঠা ভারতে। হিন্দিতে কথা বলার কারণে বাংলাও বলতে জানতেন না তিনি। তাহলে কীভাবে এলেন বাংলাদেশের অভিনয় জগতে? কীভাবেই বা আয়ত্ত করলেন বাংলা ভাষা? কেমন ছিল অতীতের দিনগুলো? সব প্রশ্নের জবাব খুঁজতে কিছুটা সময় আড্ডা দেওয়া হয় এই অভিনেতার সঙ্গে। জানা যায় তার কষ্টে কাটানো শৈশব, স্বপ্নময় কৈশোর আর চ্যালেঞ্জিং যৌবন নিয়ে। অভিনয়ের বীজ শৈশবেই নিজের মধ্যে রোপণ করে নিয়েছিলেন আরিফ। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন, বড় হয়ে নায়ক হবেন। হয়েছেনও, হচ্ছেনও। অবিরত।

আমরা প্রত্যক্ষ করছি জীবন সংগ্রামে বারবার যাতনায় পোড়া, আবার জ্বলে উঠা, কিন্তু সিদ্ধান্তে এবং লক্ষ্যে অবিচল অভিনেতা হওয়ার প্রত্যয় ধারণ করা একজন আরিফ হকের এগিয়ে চলা।

অভিনয় জগতে আরিফ হকের পদার্পণ ভারতের রামলীলা মঞ্চের মাধ্যমে। প্রথমে রাক্ষসের চরিত্র, পরের বছর নারী চরিত্র, এরপর পুরুষের চরিত্র- এভাবেই এগিয়ে গেছেন কাজে। এরপর চলে আসেন বাংলাদেশে। দেশে ফেরার পর প্রধান ও মূল সমস্যা দেখা দেয় ভাষা নিয়ে। বাংলা বুঝতে পারলেও বলতে বা লিখতে পারতেন না তিনি। কিন্তু অভিনয় করতে হলে ভাষা জানা জরুরি। আর তাই শুদ্ধভাবে বাংলা শিখতে শুরু করেন আরিফ। এরপর থিয়েটারে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে দেশের অভিনয় প্রাঙ্গণে পদার্পণ করেন তিনি।

পেশায় একজন অভিনেতা হলেও আরিফ হকের পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায়। আঁকাআঁকি ভালো লাগায় এবং এ কাজে দক্ষতা থাকায় তিনি পড়াশোনার ক্ষেত্রে এই বিষয়টিকে বেছে নেন। সাফল্যের সঙ্গেই শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করেন আরিফ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীনই জাতীয় ইংরেজি দৈনিকে কভার আঁকার সুযোগ পান। চারুকলা বিষয়ক কাজে এক সময় ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু কোথায় যেন একটা টান পড়ে। মন বারবার চলে যায় ছোটবেলার ধ্যান অভিনয় জগতে।

এরপর ২০১২ সালে অদ্ভুত এক কাণ্ড করে বসেন আরিফ। ছেড়ে দেন চাকরি। মন ও মননে জায়গা দেন কেবল ‘অভিনয়’ শব্দটিকে। অভিনয় জগতে হুট করে এসেই চট করে জায়গা করে নেননি আরিফ। সময় নিয়েছেন, ধীর পায়ে এগিয়েছেন। নিজের কাজের দক্ষতা, সর্বোচ্চ দেয়ার চেষ্টা তাকে অল্প অল্প করে পরিচিত করেছে দর্শকদের কাছে।

অভিনয়ে উত্তম কুমারকে আদর্শ মানেন আরিফ। কেন ভালো লাগে উত্তম কুমারকে? জানতে চাইলে আরিফ বলেন, আমি তো একসময় বাংলা জানতাম না। তাই, উত্তম কুমারের সিনেমাও দেখা হতো না। বাংলা শেখার পর তার সিনেমা দেখা শুরু করি। বাংলা শিখতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম যে প্রমিত বাংলায় কথা বলতে গেলে মুখ বিকৃত হয় প্রচুর। মুখ বিকৃত হলে তো অভিনয় ভালো লাগবে না। তখন আমি এই বিষয়টি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করি। আবিষ্কার করি উত্তম কুমার আর সালমান শাহ্- এই দুজন অভিনেতা মুখ বিকৃত না করে সবচে ভালো এক্সপ্রেশন ও ডায়ালগ ডেলিভারি দিতে পারেন। সবমিলিয়ে বলতে গেলে, অভিনয় শিখতে গিয়ে আমার মনে প্রশ্ন আসে কার থেকে শিখবো, কাকে ফলো করবো? তখন আমি উত্তম কুমারকে শিক্ষক হিসেবে পাই এবং তখন থেকেই তাকে ভালো লাগা।

বাংলা ভাষাকে নিয়ে প্রচুর সময় কাটান আরিফ। জোরে জোরে উচ্চারণ করে এখনও স্ক্রিপ্ট পড়েন নিয়মিত। কঠিন শব্দগুলোকে বারবার উচ্চারণের মাধ্যমে সহজ করে নেন। বাবার কাছে প্রমিত বাংলা শেখা এই অভিনেতা এখনও বাংলায় কথা বলার ক্ষেত্রে কখনো স্ত্রী, কখনো কন্যার উপদেশ নিয়ে থাকেন।

পরিচালক মীর আহসানের চিলে কোঠা দিয়ে বাংলাদেশে অভিনয় শুরু করেন আরিফ হক। বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি অভিনয় করেছেন বেশকিছু চালচিত্রসহ অসংখ্য নাটকে। তার কাজের পরিধি আর সেগুলোর গল্প লিখলে একটি বইয়ের আকার ধারণ করবে বলে অনেকের ধারণা। আজ এটুকুই থাক।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড