• বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

দেশে বিশ্বমানের ক্যান্সার চিকিৎসার স্বপ্ন দেখছেন তৌছিফুর রহমান 

  আল শাহরিয়ার

২৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:৪৫
দেশে বিশ্বমানের ক্যান্সার চিকিৎসার স্বপ্ন দেখছেন তৌছিফুর রহমান 

সোহরাওয়ারর্দী মেডিক্যাল কলেজের সুসংগঠিত একাডেমিক শৃঙ্খলায় বেড়ে উঠা তার মেডিক্যাল ছাত্রজীবন, মানুষ, মানবতা, সেবার ব্রত তার চলার পথের নিত্য সঙ্গী। দেশ, সমাজ, মানুষের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, দৃঢ় মনোবল, পেশাগত দক্ষতা তাকে করেছে অনন্য।

বলছিলাম বাংলাদেশে বিশ্বমানের ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন আঁকা তরুণ ও মেধাবী ডাক্তার তৌছিফুর রহমানের কথা।

তার স্বপ্ন, বাংলাদেশে বিশ্বমানের ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পন্ন হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা যার মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বল্প খরচে দুস্থ অসহায় থেকে শুরু করে সব ধরনের ক্যান্সার রোগীদের অত্যাধুনিক চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাওয়া। সেই সাথে, নিজেকে একজন সফল ও দক্ষ ক্যান্সার রোগ বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও একাডেমিসিয়ান হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা।

মোঃ তৌছিফুর রহমান, জন্ম কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর থানাধীন পোড়াদহ ইউনিয়নের চিথলিয়া গ্রামে। গ্রামের স্কুলেই পড়াশুনা ও বেড়ে ওঠা। পিতা বরেণ্য শিক্ষাবিদ পোড়াদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক অধ্যাপক মোঃ তবিবুর রহমান। এই শিক্ষানুরাগী ১৯৫৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.কম পাস করে এসেই পোড়াদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, অত্র অঞ্চলের মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের জন্য এবং ১৯৬৫ সালে প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। আলমডাঙ্গা ডিগ্রী কলেজে ৩৩ (তেত্রিশ) বছর অধ্যাপনা শেষে ১৯৯৮ইং সালে অবসর গ্রহণ করেন। পরিবারের ১১ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট হওয়ার সুবাদে তৌছিফুর রহমান বাবার অবসরকালীন সময়টাতে দেখেছে খুব কাছ থেকে। নৈতিক ও একাডেমিক শিক্ষাগুরু হিসাবে বাবার কাছেই তার হাতেখড়ি।

পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি, অষ্টম শ্রেণিতে মেধাবৃত্তি, এস.এস.সি টেস্ট পরীক্ষায় স্কুলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ নাম্বার প্রাপ্তি, তৎকালীন সময়ে তার অধ্যয়নরত বিদ্যালয় থেকে একমাত্র তার জি.পি.এ ৫ প্রাপ্তি, এইচ এস সি তেও জি.পি.এ-৫ এ তার পড়ুয়া জীবনে বাড়তি পালক যুক্ত করেছে। এরপর তার চেষ্টা আর অধ্যবসায়ের ফলস্বরূপ শহীদ সোহরাওয়ারর্দী মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান তিনি। ২০১৩ইং তারিখে এম.বি.বি.এস শেষ করার পর একই মেডিকেল কলেজে ১ বছর ইন্টার্নশিপ শেষ করে মেডিসিনে পোস্ট-গ্রাজুয়েশন ট্রেনিং এবং বারডেম হাসপাতাল থেকে সার্টিফিকেট কোর্স ইন ডায়াবেটলজী (সি.সি.ডি) সম্পন্ন করে মেডিসিন ও ডায়াবেটিক রোগীর চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেন।

এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এম.ডি অনকোলজি কোর্সে ভর্তি হবার সুযোগ পেয়ে ৫ বছরের কোর্স সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করেন। তারপর ক্যান্সারের উপরে উচ্চতর গবেষণা সম্পন্ন করেন।

তার নিজ জেলা কুষ্টিয়ায় ক্যান্সার চিকিৎসায় সর্বোচ্চ ডিগ্রী এম.ডি অনকোলজি অর্জন করার কৃতিত্ব তারই প্রথম। তিনি ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ হিসাবে স্কয়ার রেডিওথেরাপি ও অনকোলজি বিভাগ স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেড, পান্থপথ শাখায় ঢাকায় কর্মরত ছিলেন দীর্ঘদিন।

বর্তমানে তিনি কেন ক্যান্সার চিকিৎসাকে পেশা হিসাবে বেছে নিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে ডাক্তার তৌছিফুর রহমান বলেন, আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার কারণ, চিকিৎসক হিসাবে বিনা চিকিৎসায় ক্যান্সার রোগীদের মৃত্যু দেখেছি। এরপর আমি সিদ্ধান্ত নিই, ক্যান্সার রোগীদের সু-চিকিৎসার ব্যবস্থা করবো। সাধারণত আমাদের দেশের চিকিৎসকরা ক্যান্সার এর উপর ডিগ্রি অর্জন করতে আগ্রহী হন না কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে বাংলাদেশের রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত ও নিগৃহীত ক্যান্সার রোগীরা। কারণ আমাদের দেশে ক্যান্সার রোগীর তুলনায় চিকিৎসক এবং চিকিৎসা অবকাঠামো দুটোই অপ্রতুল।

তিনি আরও বলেন, আমি চেয়েছি ওই সকল মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে এবং ক্যান্সার চিকিৎসার বিশ্বমানের সু-ব্যবস্থা আমাদের দেশের জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দিতে। এই কাজটি আমার জন্য খুবই চ্যালেঞ্জিং হলেও দেশের মানুষের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। তাছাড়া ক্যান্সারে আক্রান্ত প্রতিটি মানুষের জীবনে রয়েছে আলাদা আলাদা গল্প ও অনুভূতি। আমি তাদের জীবনের গল্পটি শুনতে চাই, তাদের কষ্ট লাঘব করতে চাই। অত্যাধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির ব্যবহারে সম্পূর্ণ নিরাময় করতে চাই।

ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিগুলো নিয়ে তিনি বলেন, ক্যান্সার সাধারণ বয়স্ক রোগীদের মধ্যে বেশি হয়। গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় এই রোগের ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে। তাছাড়া পারিবারিক ইতিহাস, শারীরিক পরিশ্রমের ঘাটতি/অভাব, ধূমপান, রাসায়নিকযুক্ত খাবার, প্ল্যাস্টিকের প্যাকেটজাত খাবার, সংরক্ষণকৃত খাবার ইত্যাদি কারণেও ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে গেছে বহুগুণে।

এই চিকিৎসক বলেন, ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসায় প্রথম বাধা হচ্ছে সচেতনতার অভাব। যেহেতু ক্যান্সার এক ধরনের ব্যথাহীন টিউমার, তাই প্রথম অবস্থায় রোগীরা সচেতন থাকেন না এবং দেরি করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। তাছাড়া অনেকে কবিরাজ, ঝাড়ফোক, হোমিওপ্যাথিক ইত্যাদি অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা শুরু করেন। সুতরাং দেখা যায় আমাদের কাছে বেশিরভাগ রোগী আসেন রোগ শরীরে ছড়িয়ে পড়ার পর। এমতাবস্থায় চিকিৎসা করে ভালো ফলাফল পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। দ্বিতীয় বাধা হচ্ছে, ব্যয়বহুল চিকিৎসা পদ্ধতি। আমাদের দেশের হতদরিদ্র মানুষের কাছে ক্যান্সারের চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় চিকিৎসা ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। আশার কথা হচ্ছে ক্যান্সারের অনেক ঔষধই আমাদের দেশীয় কোম্পানিগুলো নিয়ে আসছে। যার খরচ অনেক কম।

তারপরও এক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ জরুরি। সামর্থবান লোকেরা দেশের বাইরে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য চলে যাচ্ছে, মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে আর দুস্থ মানুষগুলো এক রকম বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন যার কোনটাই দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। তৃতীয় বাধা হচ্ছে, ক্যান্সার সম্পর্কে কুসংস্কার। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় অনেকেই মনে করেন যে, No Answer to Cancer যদিও কথাটা সত্য না। প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার ধরা পড়লে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। এক সময় বলা হতো, “যার হয় যক্ষ্মা তার নাই রক্ষা”। সুতরাং সু-চিকিৎসার মাধ্যমে ক্যান্সার রোগটিও একদিন সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য রোগে পরিণত হবে বলে আমি আশাবাদী।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ২০১৪ সালে খালেদা ইফায়েত নূরীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন এবং তাদের ঘর আলো করেছে তাদের একমাত্র কন্যা সন্তান তাশরিফা ইফতিন তৌশি।

ডাঃ তৌছিফ বলেন, আমার এ অর্জনের পথ সহজ ছিল না। এ দীর্ঘ সময়ে আমাকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়েছে এবং তাদের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। এজন্য আমি স্ত্রী খালেদা ইফায়েত নূরী ও কন্যা তাশরিফা ইফতিন তৌশির কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ, যারা আমাকে সব সময়ে সহযোগিতা করেছে। পিতা মরহুম অধ্যাপক মোঃ তবিবুর রহমান, মাতা মোছাঃ মর্জিনা খাতুন, বড় মা মরহুম সালেমা খাতুন, বড় ভাই মোঃ তৌহিদুর রহমান ও তৈয়বুর রহমানসহ পরিবারের অন্যান্য সকলের কাছে কৃতজ্ঞ।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড