• শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০১৯, ৭ বৈশাখ ১৪২৬  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন

ব্রেকিং :

সন্ত্রাসের কোন ধর্ম নাই

পশ্চিমাদের 'ইসলামোফোবিয়া', শান্তির ধর্মকে সন্ত্রাসে রূপান্তরের আদ্যোপান্ত

আজোভ ব্যাটালিয়ান, মুসলিমদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী সংগঠন

  এস এম সোহাগ ২৩ মার্চ ২০১৯, ১৯:২৯

ইসলামোফোবিয়া
শুধুমাত্র মুসলমান হওয়াতে প্রার্থনারত অবস্থায় নির্বিচারে মানুষ মারাকে এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। ছবি : সংগৃহীত

সভ্যতার শুরু থেকেই প্রতিটি ক্ষেত্রে সমাজের উচ্চ শ্রেণির মানুষের স্বার্থে নির্ধারণ করা কিছু তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে আসছে। যত সভ্য, উদার কিংবা আধুনিক হোক না কেন, মানুষের মধ্যে সমাজের এই শ্রেণি বিদ্বেষ যে পরম সত্য ও বাস্তব তা আমরা ইতিহাস থেকে বরাবরই শিক্ষা নিয়ে থাকি। শিক্ষার কোনো শেষ নেই, এমনটা এজন্যেই বলা হয়ে থাকে হয়তো। স্বল্প কিছু মানুষের আরোপ করা বিশ্বাসগুলো একেকটা শিল্পের মতো, যার থেকে তারা কেবল মুনাফাই শোষণ করে না, কেড়ে নিতে থাকে মানবজীবন এবং মানবতা।

সমসাময়িক বিশ্বে সবচেয়ে বহুল পরিচিত এক তত্ত্ব হলো 'ইসলামোফোবিয়া'। বিশ্বে নানান জাতি, নানান বর্ণ, বিচিত্র সংস্কৃতি আর বিভক্ত ধর্মে পরিচিত মানুষ। যেখানে সবার একটা অভিন্ন পরিচয় আর তা হলো মানুষ, তারচেয়েও মুসলমান মানুষের বড় পরিচয় এখন সন্ত্রাসী হিসেবে, ইসলামবিদ্বেষী মনোভাবে মানুষের পরিচয় ছাপিয়ে তাকে এক ধর্মান্ধ জাতি হিসেবে বিবেচনার শিল্পের প্রচলন এখন দারুণ অবস্থায় পৌঁছেছে। পশ্চিমা স্বার্থে ইসলামোফোবিয়া শিল্পের বাম্পার ফলন দেখা যায় আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যে, এশিয়া থেকে আমেরিকা এবং সর্বশেষ ভৌগলিক অবস্থায় সর্ব দক্ষিণে থাকা অতি শান্তিপ্রিয় ভূখণ্ড নিউজিল্যান্ডে।

চলতি শতকের শুরুর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (ওয়ার অন টেরর) ঘোষণা করে, কি এক অলৌকিক কারনে এই যুদ্ধটা মুসলিম জাতির বিরুদ্ধেই সমাধিক খ্যাতি পেয়ে যায়। এভাবেই আজকের ক্রাইস্টচার্চের বীজ বপন হয়েছিল পেন্টাগনের গোপন কোনো কক্ষে, আধুনিক বিশ্বের মোড়লদের চকচকে হাতে। গেল শতকে ইহুদি হত্যার বিরুদ্ধে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, মানবতার পক্ষে দুটা বিশ্বযুদ্ধে যারা যুদ্ধ করে ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্ব ছিনিয়ে নিয়েছিল, তারা এখন নয়া-ফ্যাসিবাদি, বর্ণবাদীতাকে প্রতিষ্ঠিত করায় মত্ত। ইসলামবিদ্বেষ, সদা সাদা শ্রেষ্ঠ, এই শিল্পকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যার ফলে কিছু মূর্খ বর্বর শিকারির হাতে পাখির মতো প্রাণ হারাতে হয়েছে ক্রাইস্টচার্চের দুই মসজিদে প্রার্থনারত ইসলাম ধর্মের অর্ধশত মানুষকে।

২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের আগে-পরে আল-কায়েদানামক ইসলাম ধর্মের যে উগ্রবাদি সংগঠনের জন্ম হয়, তারপর থেকেই বিশ্ববাজারে বাড়তে থাকে ইসলামোফোবিয়ার চাহিদা, সর্বশেষ বিক্রিটা নিউজিল্যান্ডের মতো নিরাপদ রাষ্ট্রটিতেই হয়। মানুষের মধ্যে যে অসভ্য উগ্রতা শায়িত থাকে, বর্ণবাদের যে ধারণা শৈশব থেকে মানুষকে পণ্যের ন্যায় চিহ্নিত করতে শেখায়, সেই উগ্রতাকে উস্কে দিতে ইসলামোফোবিয়া খুবই কার্যকরি হাতিয়ার হয়ে ওঠে পশ্চিমা শেতাঙ্গ অভিজাত শ্রেণির কাছে।

শান্তিপ্রিয় দেশে এমন নারকীয় ঘটনায় বিমর্ষ করে ফেলে দেশটির সব ধর্মের মানুষকে। ছবি : সংগৃহীত

ইসলামোফোবিয়া শিল্প

কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর) এবং ইউসি বার্কলে সেন্টারের রেস অ্যান্ড জেন্ডারের ২০১৬ সালের এক রিপোর্ট অনুসারে, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩২টি সংগঠন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অথবা ইসলাম ও মুসলিমঘৃণা প্রচারের প্রাথমিক উদ্দেশ্য নিয়ে একটি 'অভ্যন্তরীণ কোর' গঠন করে। 'সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট'

২০০৮ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে এই সংস্থাগুলি ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি পরিমাণে অ্যাক্সেস পেয়েছিল। নাথান লিয়ানের গবেষণা মতে, ইসলামোফোবিয়া ইন্ডাস্ট্রি (২০১২), 'বিশেষজ্ঞদের' একটি আদর্শগত ব্যান্ড এ পরিণত হয়। ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকটি নিউজ এজেন্সি দ্বারা নিয়মিতভাবে মুসলিম এবং ইসলামের সহিংস, নেগেটিভ ও স্টেরিওটাইপ প্রতিচ্ছবি প্রচার করা হতে থাকে।

বিশ্বে প্রতিটা ধর্মের কিছু মানুষের মধ্যেই উগ্রতা থাকে, সহিংসতা থাকে। সেখানে এই বিশেষ দল কেবল ইসলাম আর মুসলিমদের নির্দিষ্ট করে বাছাই করে নিয়েছে, মানুষের কাছে একে সন্ত্রাসের তকমা দেয়াটা সুচারুপূর্ণভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

মুসলিম-বিরোধী মনোভাবের এই পদ্ধতিগত প্রচারে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, অপব্যবহার এবং সহিংসতার প্রতিবেদনগুলি ভয়ঙ্কর ইঙ্গিত দেয়। শুধুমাত্র ২০১৮ সালের জানুয়ারী থেকে জুনের মধ্যেই ইসলামোফোবিয়ার ৬০৮টি ঘটনার কথা জানায় যুক্তরাজ্যভিত্তিক টেল মামা (মুসলিম বিরোধী হামলার পরিমাপ) এর প্রতিবেদনে। পরিস্থিতি এতই গুরুতর যে, গত বছর ইউরোপীয় কমিশন বিচার বিভাগের পরিচালক ইউরোপ মহাদেশজুড়ে ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য একটি টুলকিট চালু করেছে।

ক্রাইস্টচার্চ হামলা বিশ্বকে জাগিয়ে তোলার একটি ডাক মাত্র, দূরবর্তী ডানপন্থী উগ্রবাদী দ্বারা সৃষ্ট বিপদ যে বাস্তব, তার ডাক। ১৫ মার্চ, যখন এক আত্মস্বীকৃত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে সজ্জিত শেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী নিউজিল্যান্ডের দুটি মসজিদে প্রবেশ করে নির্বিচারে গুলি করে প্রার্থণারত ৫০ জন মুসলিমকে হত্যা করে আর সেই নারকীয় দৃশ্য ইসলাম বিদ্বেষী বার্তা অনলাইনে ছড়িয়ে দিয়ে বিপদের জানান দেয়।

ইসলাম, মুসলিমবিদ্বেষী ধর্মান্ধ, বর্ণবাদী অস্ট্রেলিয় এই খুনির ঘৃণা ইসলামোফোবিয়াকে স্পষ্ট করে দেয় বিশ্বের কাছে। যে শিল্পটি বাজারজাতকরণে একটি নৈতিক বাধা কাজ করতো মানুষের মধ্যে, তা ক্রাইস্টচার্চের খুনির বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কেটে যাওয়ার প্রমাণ মিলে। ইসলামোফোবিয়া বিশ্বে এখন স্বচ্ছ, বাস্তব এক সত্য। পশ্চিমা মোড়লরা 'ওয়ার অন টেরর'র নামে মুসলিম বিশ্বকে সামরিকভাবে যুদ্ধের বেশে ধ্বংস করতো, তা এখন সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় করে দিয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়াই অমুসলিমরা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে সামরিক ঢঙ্গে মুসলিমকে মারা শুরু করেছে, ইসলাম আর সংখ্যালঘুদের ওপর যেখানে সেখানে আক্রমণ করছে।