• বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বিশ্বজুড়ে প্রজননহারের বিস্ময়কর পতন!

প্রজনন হারের এই হ্রাস কি সফলতার নির্দেশক নাকি অশনি সংকেত?

  এস এম সোহাগ

০৯ নভেম্বর ২০১৮, ১৭:২৫
প্রজনন হারের পতন
এভাবে জন্মহারের পতন ঘটলে দাদা-দাদি থাকবে, থাকবে না নাতি-নাতনি, জন্মহারের সামঞ্জস্যতা সমাজের ভারসাম্য রক্ষার্থে অতি প্রয়োজন। ছবি : সম্পাদিত

বিশ্বজুড়ে নারীদের সন্তান জন্মদানের হার চমকপ্রদভাবে হ্রাস পাওয়ার তথ্য এক গবেষণায় বের হয়ে এসেছে। গবেষণা প্রতিবেদনটিতে বলা হচ্ছে, পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক দেশে প্রজনন হারের এমন হ্রাস ঘটেছে যা দেশগুলোতে জনসংখ্যার আকারের সামঞ্জস্য রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। ‘বিবিসি নিউজ’

গবেষকরা প্রাপ্ত এই তথ্য-উপাত্তকে ‘বিরাট বিস্ময়’ মনে করছেন। সমাজে ‘নাতিনাতনির তুলনায় অধিক দাদা-দাদির’ এই অবস্থার মারাত্মক প্রভাব পড়বে বলে সতর্ক করেছেন তারা।

প্রজননহারের এই পতন কতটা বিশাল?

বিশ্বে স্বনামধন্য মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেট প্রকাশিত নিবন্ধে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ১৯৫০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রতিটি দেশের জন্মহার প্রবণতা বিবেচনায় নিয়ে এ গবেষণা করা হয়েছে।

ছবি : সম্পাদিত 

১৯৫০ সালে গড় প্রতি নারী জীবদ্দশায় ৪ দশমিক ৭ শিশুর জন্ম দিতেন সেখানে সেই হার হ্রাস পেয়ে ২ দশমিক ৪ এ নেমে এসেছে ২০১৭ সালে। 

কিন্তু এই চিত্র দেশ-জাতিভেদে বিশাল তারতম্য বজায় রেখেছে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজারে যেখানে গড় প্রতি নারী ৭ দশমিক ১ সন্তানের মা হচ্ছেন সেখানে সাইপ্রাসের ভূমধ্য দ্বীপাঞ্চলের নারীরা গড় প্রতি মাত্র ১ সন্তানের মা হচ্ছেন।

প্রজননহার কতটা বৃদ্ধি আবশ্যক?

যখনই একটি দেশের গড় প্রজনন হার প্রায় ২ দশমিক ১ এর নিচে নেমে আসে তখন জনসংখ্যা সঙ্কুচিত হতে শুরু করে (এই "শিশুর বক্ষ" চিত্রটি উল্লেখযোগ্যভাবে উচ্চতর যেসব দেশে শিশুমৃত্যুহার উচ্চতর)।

১৯৫০ সালে গবেষণার শুরুতে এই অবস্থানে দেশের সংখ্যা শূন্য ছিল। 

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যারুমনের পরিচালক অধ্যাপক ক্রিস্টোফার মুরে ‘বিবিসি নিউজ’কে বলেন, ‘অর্ধেকেরও বেশি দেশে জন্ম দেয়ার হার একেবারে তলানিতে পৌঁছে গিয়েছে, যেখান থেকে জনসংখ্যা প্রতিস্থাপন প্রায় অসম্ভব। সুতরাং যদি কিছু না ঘটে তাহলে ওসব দেশে জনসংখ্যার হার কমতেই থাকবে।’

ছবি : সম্পাদিত 
 

তিনি আরও বলেন, ‘এটা একটা তাৎপর্যপূর্ণ ট্রাঞ্জিশন। এটা বিস্ময়কর, এমনকি আমার মতো মানুষও অবাক, ধারণা করা যায় যে, বিশ্বের অর্ধেক দেশের মানুষের জন্যই একটি অবাক করার মতো বিষয় হবে।’

প্রজননহার হ্রাসে কোন কোন দেশ আক্রান্ত?

ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলোতে জন্মহার মারাত্মভাবে কমে গেছে। এরমানে এই না যে, এসব দেশের জনসংখ্যার আকৃতি পতিত হচ্ছে, অন্ততপক্ষে আকৃতিতে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রভাব পড়বে না যতক্ষণ পর্যন্ত প্রজনন হার, মৃত্যুহার ও অভিবাসীদের মিশ্রণ থাকবে। 

প্রজনন হারের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রায় একটা প্রজন্ম লেগে যেতে পারে। কিন্তু, অধ্যাপক মুরে বলেন, ‘আমরা শীঘ্রই একটি বিন্দুতে স্থানান্তরিত হব, যেখানে সমাজ হ্রাসপ্রাপ্ত জনসংখ্যার সাথে জড়িত থাকবে।’

ছবি : সম্পাদিত 

 

পৃথিবীর বাকি অর্ধেক রাষ্ট্রগুলো এখনও যথেষ্ট সন্তান জন্ম দিচ্ছে, কিন্তু যখন থেকে এই দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হতে শুরু করবে তখন থেকে প্রজনন হারের হ্রাস ঘটতে শুরু করবে।  

প্রজনন হারের হ্রাস কেন ঘটছে? 

প্রজনন হারের পতন শুক্রাণুগুলোর হ্রাসকৃত সংখ্যা বা প্রজননের চিন্তাভাবনা করার সময় সাধারণত যে কোনো বিষয়কে চিহ্নিত করে না। এর পরিবর্তে ৩ টি মূল কারণ রয়েছে : 

*শিশু মৃত্যুহারের হ্রাসের ফলে মায়েরা কম সন্তান জন্ম দিচ্ছে।

*গর্ভনিরোধে অধিক ব্যবহার।

*শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের অধিক অংশগ্রহণ।

ছবি : সম্পাদিত 

প্রজনন হারের হ্রাসের গল্পটি অনেক দিক থেকেই একটা সফলতার চিত্র।

এর প্রভাব কী হতে পারে? 

মাইগ্রেশন ছাড়া, দেশ বার্ধক্যগ্রস্ত এবং সঙ্কুচিত জনসংখ্যার সম্মুখীন হবে। অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট অব পপুলেশন এজিংয়ের পরিচালক ড. জর্জ লিসন বলেন, অন্তত সমগ্র সমাজ ব্যাপক জনসংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া পর্যন্ত এটি একটি খারাপ জিনিস হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে না।

তিনি ‘বিবিসি’কে বলেন, ‘জনসাধারণের প্রতিটি একক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর জনতাত্ত্বিক প্রভাব নির্ভর করে, জানালা খুলে রাস্তার মানুষের দিকে তাকিয়ে দেখেন, বড়িঘর, ট্র্যাফিক, ব্যয় এসবই জনতত্ত্বের ওপর নির্ভর করে’। 

‘আমরা যা পরিকল্পনা করি তা কেবলমাত্র জনসংখ্যার দ্বারা চালিত নয়, বরং বয়স কাঠামোর দ্বারাও চালিত এবং এটি পরিবর্তন হচ্ছে। তাই মূলত আমরা এ নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাই না', তিনি যুক্ত করেন।

তিনি মনে করেন যে, কর্মক্ষেত্রগুলো পরিবর্তন করতে হবে এবং ৬৮ বছর বয়সে অবসর গ্রহণ যা যুক্তরাজ্যের বর্তমান সর্বাধিক সময়সীমা তা অসহনীয় হবে একটা সময়ে।

ছবি : সম্পাদিত 

বৈশ্বিক রোগ বিশ্লেষণের অংশ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে অভিবাসন বাড়ানোর কথা বিবেচনা করা উচিত, যা তাদের নিজস্ব সমস্যা তৈরি করতে পারে বা নারীদের আরও সন্তান জন্মদানে উৎসাহিত করার নীতিগুলো চালু করতে পারে, যা প্রায়শই ব্যর্থ হয়।

লেখক অধ্যাপক মুরে প্রতিবেদনটিতে বলেছেন, ‘বর্তমান প্রবণতাগুলোতে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাবে যখন খুব কম শিশু থাকবে তখন বিশ্বব্যাপী সমাজকে সহনীয় পর্যায়ে টিকিয়ে রাখা খুব কঠিন হবে।’

‘এমন একটি সমাজের পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করুন যা অগাধ সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর, যেখানে দাদাদাদির তুলনায় নাতিনাতনির সংখ্যা নগণ্য।’ 
‘আমি মনে করি, জাপান এই বিষয়ে খুব সচেতন, তারা হ্রাসপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর মুখোমুখি হচ্ছে। কিন্তু পশ্চিমে এটি অনেক দেশকে আঘাত করতে পেরেছে বলে আমি মনে করি না, কারণ কম প্রজননকে অভিবাসন দিয়ে পূরণ করা হচ্ছে।’

‘কিন্তু বৈশ্বিক পর্যায়ে অভিবাসন কোনো সমাধান হতে পারে না। কিন্তু পরিবর্তনগুলো সমাজকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে, তবে এটি আমাদের প্রজাতির প্রভাবকে পরিবেশগত সুবিধাও দিতে পারে।

চীনের কি অবস্থা? 

১৯৫০ সাল থেকে চীনের বিশাল জনসংখ্যা বৃদ্ধি দেখা গেছে, প্রায় ৫০ কোটি অধিবাসী থেকে প্রায় ১৪০ কোটি জনসংখ্যায় পৌঁছে গিয়েছে। কিন্তু এটিও প্রজনন হারের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, যা ২০১৭ সালে মাত্র ১ দশমিক ৫ এ স্থির ছিল এবং সম্প্রতি দেশটির বিখ্যাত এক শিশু নীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছ।

ছবি : সম্পাদিত 

উন্নত দেশগুলোর ২ দশমিক ১ প্রজনন হারের প্রয়োজন হয় কারণ বয়ঃসন্ধিকালে সব শিশু বেঁচে থাকে না তাই নারীর তুলনায় পুরুষের বেঁচে থাকার বেশি সম্ভাবনা থাকে।

কিন্তু প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে চীনে ১০০ মেয়ে জন্মায় যেখানে ১১৭ জন ছেলে জন্মায়, যা ‘যৌন-নির্বাচনী গর্ভপাতের ফলে উল্লেখযোগ্য এমনকি কন্যাশিশু হত্যার সম্ভাবনা থাকে। এর অর্থ হচ্ছে স্থিতিশীল জনসংখ্যার জন্য আরও বাচ্চাদের জন্ম নিতে হবে।’

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড