• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন

শরণার্থীদের ঘরে ফেরার অধিকার

নভেম্বরেই প্রত্যাবাসন শুরু রোহিঙ্গাদের

  এস এম সোহাগ ৩০ অক্টোবর ২০১৮, ১৬:২৬

শরণার্থী
নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের বৈঠক সম্পন্ন (ছবি : সম্পাদিত)

সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের ফল হিসেবে যে একদল দুর্ভাগার আবির্ভাব ঘটে বিশ্বে তার নাম শরণার্থী। তারা মানব সভ্যতার অংশীদার, তবে তা নেহায়েতই তাদের জীবনের অভিশপ্ত একটা দুঃস্বপ্ন। সেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানরা বেলজিয়াম আক্রমণ করলে প্রায় আড়াই লাখ বেলজিয়াম অধিবাসী গৃহহারা হয়। আবার সোভিয়েত জার্মান আক্রমণ করলে প্রচুর জার্মান, বিশেষত ইহুদিরা দেশত্যাগ করে। শুধু সোভিয়েতেই আশ্রিত ছিল বিভিন্ন দেশের প্রায় ৬০ লাখ লোক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন দেশে আশ্রিত সর্বহারা শরণার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় এক কোটি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিভিন্ন দেশে আশ্রিত সোভিয়েত ইউনিয়ন, পোল্যান্ড, যুগোস্লাভাকিয়া, জার্মান শরণার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ছয় কোটি। এসব শরণার্থীর পুনর্বাসিত করতে লেগেছিল পরবর্তী প্রায় ১০ বছর। জীবন বাঁচাতে জার্মানি ও অস্ট্রিয়া থেকে অসংখ্য ইহুদিরা বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশে আশ্রয় নেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিরা আসতে থাকে ফিলিস্তিনে। দাবি করে তাদের জন্য স্বতন্ত্র দেশ ইসরায়েলের। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের ওপর বিভিন্ন সময় আক্রমণ করে ইহুদিরা। ১৯৪৮-এ ইহুদিদের সৃষ্ট দাঙ্গায় কয়েক লাখ ফিলিস্তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে ফিলিস্তিন, মিসর ও সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভের সঙ্গে ফিলিস্তিনি মুসলিমদের ওপর অত্যাচার যেমন বাড়তে থাকে, তেমনি চলতে থাকে তাদের ভূমি দখল। যার ফলে বাড়তে থাকে বাস্তুহারা ফিলিস্তিনির সংখ্যা। বর্তমানে সিরিয়া, মিসর, লেবাননসহ বিভিন্ন আরব দেশে আশ্রয় পাওয়া ফিলিস্তিনি শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ।

ছবি : সম্পাদিত

অর্থাৎ, বিশ্বে যুদ্ধ-বিগ্রহ, হত্যাযজ্ঞের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরণার্থী সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সে দিক দিয়ে শরণার্থী শিবিরের সংখ্যাও নেহাৎ কম নয়। ইরাক ও জর্দানে সিরিয় শরণার্থী, সুদানে দারফুর শরণার্থী, কেনিয়ার দাদাব শরণার্থী, ফিলিপাইনে ভিয়েতনামী শরণার্থী, ভারতে শ্রীলঙ্কান তামিল শরণার্থী, ইরানে আফগান শরণার্থী, ইসরায়েলে ফিলিস্তিনী শরণার্থীসহ অসংখ্য ছড়ানো ছিটানো শরণার্থীদের বাস পুরো দুনিয়া জুড়ে। এদের নেই কোনো নিজস্ব পরিচয়, নেই ন্যূনতম মৌলিক সুবিধা।

প্রত্যেক মানুষের নিজ দেশে নিজ গৃহে বাস করার অধিকার আছে, আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো সেসব অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেও তাদের বাস্তব প্রভাব একেবারেই শূন্যের কোঠায়। ১৯৫১ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক শরণার্থীদের মর্যাদা বিষয়ক সম্মেলনে অনুচ্ছেদ ১-এ-তে সংক্ষিপ্ত আকারে শরণার্থীর সংজ্ঞা তুলে ধরা হয়। একজন ব্যক্তিও যদি গভীরভাবে উপলদ্ধি করেন ও দেখতে পান যে, তিনি জাতিগত সহিংসতা, ধর্মীয় উন্মাদনা, জাতীয়তাবোধ, রাজনৈতিক আদর্শ, সমাজবদ্ধ জনগোষ্ঠীর সদস্য হওয়ায় তাকে ঐ দেশের নাগরিকের অধিকার থেকে দূরে সরানো হচ্ছে; সেখানে ব্যাপক ভয়-ভীতিকর পরিবেশ বিদ্যমান এবং রাষ্ট্র তাকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে; তখনই তিনি শরণার্থী হিসেবে বিবেচিত হন।

১৯৬৭ সালের সম্মেলনের খসড়া দলিলে উদ্বাস্তুর সংজ্ঞাকে বিস্তৃত করা হয়। আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক সম্মেলনে যুদ্ধ এবং অন্যান্য সহিংসতায় আক্রান্ত ব্যক্তি কর্তৃক নিজ দেশত্যাগ করাকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই সংজ্ঞায় শরণার্থীকে প্রায়শই ভাসমান ব্যক্তিরূপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সম্মেলনে গৃহীত সংজ্ঞার বাইরে থেকে যদি যুদ্ধের কারণে নির্যাতন-নিপীড়নে আক্রান্ত না হয়েও মাতৃভূমি পরিত্যাগ করেন অথবা জোরপূর্বক নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত হন- তাহলে তারা শরণার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন।

ছবি : সম্পাদিত


শরণার্থী প্রত্যাবাসন :

এমেনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়,রাইট অফ রিটার্ন আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন, মানবাধিকার আইন, জাতীয়তা আইন এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের আইনের সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত একটি অধিকার। এটি মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র (আর্টিকেল ১৩), মানবিক আইনের অধীনে সশস্ত্র সংঘাতের সময়ে শরণার্থীদের অধিকার রক্ষা করার ক্ষেত্রে, রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও কর্তব্যগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী মূল মানবাধিকার কনভেনশনগুলোতে এবং ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক হয়রানি থেকে রেহাই পেতে প্রত্যেকের অধিকার আছে অন্য কোনো রাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় পাবার। 

শরণার্থী বা উদ্বাস্তু সম্পর্কিত বিশেষ আন্তর্জাতিক আইনটির নাম 'কনভেনশন রিলেটিং টু দ্য স্ট্যাটাস অব শরণার্থী ১৯৫১'। এই আইনের ৩৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো দেশ শরণার্থীদের এমন কোনো পার্শ্ববর্তী দেশে বহিষ্কার কিংবা ফেরত পাঠাতে পারে না, যেখানে তাদের ধর্ম, বর্ণ, কিংবা কোনো দলের সদস্য হওয়ার কারণে জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই আইনের ৩১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, অবৈধভাবে প্রবেশের দায়ে কোনো শরণার্থীকে গ্রেফতার করা যাবে না। শুধু তাই নয়। একই আইনের ১২ থেকে ৩০ নম্বর অনুচ্ছেদে শরণার্থীদের অধিকারের কথা বলা হয়েছে, যেখানে আশ্রয়প্রদানকারী দেশের নাগরিকদের মতোই বেশ কিছু ক্ষেত্রে অধিকার পাবার স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। 

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন :

বাংলাদেশ বারবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দাবি করে আসলেও মিয়ানমার এ কথা কানে তুলছে না। এমনকি জাতিসংঘসহ অনেক মানবাধিকার সংস্থাও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মত দিচ্ছে না এই মুহূর্তে। জাতিসংঘের সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর 'জাতিগত গণহত্যার' অভিযোগ আনা হয়েছে এবং সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ ও পাঁচজন জেনারেলকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) বিচারের মুখোমুখি করানোর আহ্বান জানানো হয়।