• শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ২১ °সে
  • বেটা ভার্সন

শরণার্থীর জন্মে মানবাধিকারের মৃত্যু

বিশ্বে দৈনিক শরণার্থী হচ্ছে প্রায় ৪৯ হাজার মানুষ

  অধিকার ডেস্ক    ২৬ অক্টোবর ২০১৮, ২১:৩৪

শরনার্থী
জন্মই যখন যাদের আজন্ম পাপ, শৈশব যাদের কাটে গোলাবারুদ আর কার্তুজের খোলসে নয়তো রাসায়নিক তেজস্ক্রিয়তার চাদরে। ছবি : সম্পাদিত

নিজের ঘরের মধ্যে ঘুমিয়ে আছে সুহিল, ১০ বছরের এক শিশু, পিতামাতাসহ পুরো পরিবার ঘুমন্ত বিভিন্ন ঘরে। মধ্যরাতে বিকট শব্দে চোখ মেলে সুহিল দেখল এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য। জীবন শুরু করার প্রথমেই সে এমন এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে যা সারাজীবনে কারও দুঃস্বপ্নও না। রাসায়নিক হামলায় সে এখন ক্যান্সারের রোগী যার প্রতিমাসে ক্যামো নিতে হয়। 

সিরিয়ার এই শিশুটি চোখ মেলে নিজেকে দেখল ধ্বংস্তূপের মধ্যে, তার ছোট্ট কপাল বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছে, হাত-পা নাড়াতে পারছে না, কোনো মতে সেদিন সুহিল বেঁচে গেলেও তার পরিবারের কেউ প্রাণে রক্ষা পায়নি। সবাইকে হারিয়ে আহত সুহিলের স্থান বর্তমানে তুরস্কের জাতিসংঘ শরণার্থী শিবিরের শিশুসদন কেন্দ্রে। জাতিসংঘ একটি শিশুর নিজগৃহে প্রাণ রক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে না পেরে ব্যর্থ হয়েছে।

ক্যামো নেয়ারত সুহিল। ছবি : ওয়াশিংটন পোস্ট

মানুষের সার্বভৌম অধিকার যখন খর্ব হয় তখন অন্য অধিকার অলীক। বেঁচে থাকতে হয় অন্য দেশের কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে করুণার জীবন নিয়ে। মানব অধিকার বিশ্বে একটা অলীক ধারণা। সেই অধিকার প্রতিষ্ঠায় যত আইন করা হোক না কেন তা যদি নিশ্চিত না করা যায় তাহলে তা কখনোই কাগুজে বিষয় ছাড়া আর কিছুই না। শরণার্থী অধিকার নিয়ে ৩ পর্বের আলোচনায় আজ থাকবে শরণার্থী কি, কেন শরণার্থী হচ্ছে আর ২০১৪-২০১৭ পর্যন্ত বিশ্বে শরণার্থীর সংখ্যা।

বিশ্বব্যাপী মানবসৃষ্ট সংকটের প্রধানতম একটি শরণার্থী সংকট, দেশে দেশে গৃহযুদ্ধ, দাঙ্গা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নিত্য এই সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। যে দেশ থেকে শরণার্থী হয়ে যে দেশে আশ্রয় নিচ্ছে উভয় দেশই মানবাধিকার রক্ষায় একটা বিশাল চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন হয়।

প্রত্যেক নাগরিকের নিজ দেশে থাকার অধিকার সার্বভৌম অধিকার, জাতিসংঘ এই আইন রক্ষায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, নামমাত্র এই প্রতিষ্ঠানের আইন ভেঙে প্রতিনিয়ত সহিংসতার শিকার হয়ে লাখো কোটি শরণার্থী তৈরি হচ্ছে। বিভীষিকাময় জীবনের দিকে রোজ প্রায় ৫০ হাজার লোক জড়িয়ে যাচ্ছে। আদিযুগেও যতটা ঝুঁকিতে মানুষ না ছিল বর্তমানে মানুষ তারচেয়েও বেশি ঝুঁকিতে। নিজগৃহ ত্যাগ করতে হচ্ছে। নিজ দেশ ত্যাগ করতে হচ্ছে। দেশ ছেড়ে যেতে হচ্ছে অন্যত্র, অনেক সময় একেবারে একা।

ছবি : রয়টার্স

মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের আশ্রিত প্রায় ১১ লাখ জনগোষ্ঠীকে দেখভাল করতে গিয়ে উন্নয়নশীল দেশটি একদিক থেকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে অন্যদিক থেকে বিপজ্জনক রোহিঙ্গাদেরকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। 

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জেলার নাম কক্সবাজার, যা বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত। যেখানে পাহাড় কেটে, বন উজাড় করে মানবতা রক্ষার্থে বাংলাদেশের জন্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক সংকটকে ত্বরান্বিত করে অস্থায়ী শরণার্থী শিবির গড়ে তোলা হয়েছে। অস্থায়ী শিবির ক্রমেই যেন স্থায়ীত্বে রুপ নিচ্ছে, জাতিসংঘের গতকালকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন ইঙ্গিতই দেয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন না করা গেলে বাংলাদেশ যে আশু ভবিষ্যতে ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে তা নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যায়।

মানুষ! সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমত্তার প্রাণী যারা টিকে রয়েছে এখনও যেখানে অনেক প্রাণীই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে সময়ের আড়ালে। মানুষ এমন এক প্রাণী যারা নিজেদের অস্তিত্বকে বিলীন হওয়া থেকে বিস্তৃত করতে পেরেছে, করেছে নিজেদের সবচেয়ে শক্তিশালী, নিয়েছে বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ যা ছিল একসময়ে বন্যপ্রাণীর দখলে। যখন মানুষ টিকে থাকতে পশুর সঙ্গে লড়াই করেছে, শক্তির সঙ্গে বুদ্ধির লড়াইতে বুদ্ধির জয় হয়েছে। মানুষ টিকে গিয়েছে, বুদ্ধির সাহায্যে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই যারা এখনও সব প্রাণীর থেকে এগিয়ে।

আদিযুগে যে মানুষ পশুর সঙ্গে লড়াই করেছে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এখন সেই আধুনিকযুগে এসে মানুষকে টিকতে হচ্ছে মানুষের সঙ্গে লড়াই করে। বুদ্ধির পরাজয় ঘটেছে এই আমলে, এখানে পেশীবলে ব্যর্থ মানুষই বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছে। মানুষের কাছে হেরে পশুরা যেমন জঙ্গলকে নগর গড়ার সুযোগ দিয়ে স্থানান্তরিত হয়েছে, সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ায় সেই মানুষের মধ্যে দুর্বলরা নিজেদের আবাস ছেড়ে দিচ্ছে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে না পেরে।

 

ছবি : রয়টার্স

শরণার্থী কি, কেন মানুষ হচ্ছে শরণার্থী :

শরণার্থী এমন একজন ব্যক্তি যিনি নিজের দেশ থেকে পালিয়ে যান কারণ স্বদেশে তার জীবন গুরুতর ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার ঝুঁকি এতটাই বেশি যে তারা তাদের দেশ ছেড়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই কারণ তাদের নিজস্ব সরকার তাদের বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারবে না। শরণার্থীদের রক্ষায় আন্তর্জাতিক সুরক্ষা অধিকার আছে।

চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদ অনুযায়ী মানুষের আদিরূপ প্রাণী, অর্থাৎ পশু। পশু থেকে আজকের মানুষ, বিবর্তনের পর্যায় পার হতে হতে অতি আধুনিক মানবসভ্যতার এই অবস্থানে মানুষ আসতে পেরেছে সামাজিকতা আর একত্রে থাকার উপায় অবলম্বন করেই। কিন্তু এত বিবর্তনেও মানুষের মধ্যে পশুত্ব আজও বিদ্যমান, পশুত্বের চেয়েও যা জঘন্য। 

যারা ক্ষমতা আর অস্ত্রশক্তিকে মহান তাদের কাছে সেই মানুষই পরাজিত হয়ে চলে যাচ্ছে নিজের, পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি, স্মৃতি আর সব অস্তিত্বকে ত্যাগ করে জীবন টিকিয়ে রাখতে। ঠিক যেন হায়েনার দাপটে নিরীহ প্রাণীগুলো এক জঙ্গল ছেড়ে অন্য জঙ্গলে আশ্রয় নিত তেমন দুর্বল মানুষেরা টিকে থাকতে নিজগৃহ ছেড়ে, নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমাচ্ছে। জঙ্গলের পশুর স্থানান্তরের কোনো পরিচয় না থাকলেও বুদ্ধিমান শ্রেষ্ঠ মানুষেরা ঠিকই নিজেদের জন্যে একটা পরিচয় দাঁড় করিয়েছে, যার নাম শরণার্থী! 

এই নিষ্পাপ শিশুরা শরণার্থী বুঝে ওঠার আগেই এতিম হয়ে বাকি জীবন মানবতা ঘৃণা করে বেড়ে উঠলে তাতে দোষের হবে না।

ছবি : সম্পাদিত

মানবসভ্যতা আধুনিক হতে হতে মানবতা যে হারিয়ে গেছে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই শরণার্থী শব্দেই প্রমাণিত। প্রতিদিন বিশ্বের কোথাও না কোথাও কোনো মানুষ তার নিজের, পূর্বপুরুষের আশ্রয় ছেড়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে অন্যত্র, স্বেচ্ছায় না; জীবন বাঁচাতে তাদের হতে হচ্ছে অন্য দেশের শরণার্থী। শিশু থেকে বৃদ্ধ, আধুনিক মানবসৃষ্ট অস্ত্রের থেকে বাঁচতে তাদেরকে শরণার্থীর মতো অভিশপ্ত জীবনের পথ বেছে নিতে হচ্ছে।

এমেনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ‘শরণার্থী, আশ্রয়-প্রার্থী ও অভিবাসী’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে তারা শরণার্থী বিষয়টিকে খুব ভালোভাবে তুলে ধরেছে।
বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষই বড় হয়ে ওঠার জায়গা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সম্ভবত কিছু মানুষ জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে শুধুমাত্র পার্শ্ববর্তী গ্রাম বা শহরে চলে যাচ্ছে কিন্তু কিছু লোকের জন্য, তাদের দেশকে সম্পূর্ণরূপে ছাড়তে হচ্ছে। কখনো কখনো স্বল্প সময়ের জন্য, আবার কখনো কখনো চিরকালের জন্য।

বিশ্বজুড়ে মানুষ প্রতিদিন নানা কারণে স্বদেশ ত্যাগ করছে, যারা স্বেচ্ছায় করে তারা শরণার্থী না। শরণার্থী হলো তারা যারা প্রাণ রক্ষার্থে সবকিছু ছেড়ে এমন কোথাও যাচ্ছে যেখানে তাদের কিছুই নাই। এই স্থানান্তরের অনেক কারণ আছে, জাতি, ধর্ম, যৌনতা বা রাজনৈতিক কারণে হতে পারে তবে সবচেয়ে বেশি শরণার্থী সৃষ্টি করছে যুদ্ধ বা সহিংসতা।

ছবি : ইউএনএইচসিআর

কারণ যাই হোক, শরণার্থী একটি অভিশাপ, মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব যেমন মানুষকে সৃষ্টির সেরা বানিয়েছে তেমনই এই মানুষের এই সহিংসতা তাদের করেছে পশ্বাধম। শরণার্থী হয়ে মানুষ হয়ে পড়ে নিঃসঙ্গ, আত্মীয় বন্ধু কিংবা পুরো পরিবার হারিয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকাকে কি মানব জীবন বলে! এটা একভাবে খাঁচাবন্দি পশুর জীবন, যারা ছাড়া পেলে মারা পড়ার আশঙ্কা থাকে। 

বিশ্বজুড়ে শরণার্থীর সংখ্যা : 

১৯৫১ সালে জাতিসংঘ শরনার্থীদের জন্য একটি সংস্থার যাত্রা শুরু করে জেনেভায় সদরদপ্তর করে। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ২০১৭ সালে বিশ্ব শরণার্থী দিবসটিতে একটি নতুন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যা বলেছে যে,শুধুমাত্র সিরিয়া, মিয়ানমার, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো এবং সুদানে সংঘর্ষের কারণে এক বছরে ২ কোটি ৯০ লাখ নতুন শরণার্থী সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া এ বছরে পুরো বিশ্বে দৈনিক ৪৪ হাজার ৫০০ নতুন শরণার্থী সৃষ্টি করেছে, যা বছর শেষে মোট সংখ্যায় দাঁড়ায় ৬ কোটি ৮৫ লাখে। বাস্তুচ্যুত এই দুর্ভাগাদের ৩শ ভাগের মাত্র ১ ভাগ অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ লোকের স্বদেশ প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়েছিল। ‘দা ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ 

'ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম’ এর ২০১৬ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ৬ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ বাধ্য হয়েছে নিজেদের দেশ ছেড়ে যেতে। তাদের মধ্যে ২ কোটি ২৫ লাখ মানুষ শরণার্থীর জীবন কাটাচ্ছে। এক কোটি মানুষ রাষ্ট্রহীন অবস্থায় জীবনযাপন করছে। অধিকাংশ মানুষ এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় পাড়ি দিচ্ছে। জাতিসংঘের মতে, ৫৫ শতাংশ শরণার্থী আসছে সিরিয়া, আফগানিস্তান ও দক্ষিণ সুদান থেকে।