• রোববার, ০৯ মে ২০২১, ২৬ বৈশাখ ১৪২৮  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

শ্বাস-প্রশ্বাসের লড়াইয়ে কতটা প্রস্তুত পাকিস্তান?

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

৩০ এপ্রিল ২০২১, ১৬:০৫
শ্বাস-প্রশ্বাসের লড়াইয়ে কতটা প্রস্তুত পাকিস্তান?
পাকিস্তানে করোনায় আক্রান্ত যুবককে অক্সিজেন দিয়ে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে (ছবি : বিবিসি নিউজ)

পাকিস্তানে মহামারি করোনার প্রাদুর্ভাবের তৃতীয় ঢেউ তীব্র হওয়ার পরে দেশে ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান রোগীর সংখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চাপের মধ্যে রয়েছে এবং সরকার যে কোনো খারাপ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আক্রান্তদের ভেন্টিলেটর এবং অক্সিজেনের প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ নিচ্ছে।

কিছুদিন আগে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধুরী বলেছিলেন, দেশে অক্সিজেনের যে যোগান রয়েছে তার ৯০ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে। এ দিকে ভাইরাসের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানে অক্সিজেন গ্যাস ও অক্সিজেন সিলিন্ডারের দাম বেড়ে যাওয়া এবং ঘাটতির খবর পাওয়া গেছে।

কেন এবং কীভাবে অক্সিজেন সিলিন্ডারের দাম বাড়ছে?

অক্সিজেন গ্যাস ও সিলিন্ডারের দাম বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে পাকিস্তানের অক্সিজেন প্রস্তুতকারক গনি গ্যাসের কান্ট্রি হেড বিলাল বাট বলেন, এর অন্যতম প্রধান কারণ করোনা মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী অক্সিজেন ব্যবহার ব্যাপক আকারে বেড়ে যাওয়া।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাপীও অক্সিজেন উৎপাদন সংক্রান্ত কাঁচামালের দাম শুধু বৃদ্ধিই নয়, ঘাটতিও দেখা দিয়েছে। আমাদের বুঝতে হবে যে আসলে পাকিস্তানে অক্সিজেন গ্যাসের দাম সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু প্রকৃত ঘাটতি এবং মূল্য বৃদ্ধি অক্সিজেন সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে হয়েছে।

মজুদ এবং অবৈধ মুনাফা

বিলাল বাট বলেছেন, দেশে ঘাটতি এবং অক্সিজেন সিলিন্ডারের দাম বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হলো সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডারের অতিরিক্ত চাহিদা এবং মজুদ করে রাখা।

পরিস্থিতির আরেকটু ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, মনে করুন একটি অক্সিজেন প্রস্তুতকারক কোম্পানির ১০০টি সিলিন্ডার ছিল এবং তার একজন গ্রাহকের জন্য ৩০টি সিলিন্ডার বরাদ্দ করা ছিল, কিন্তু এখন, দেশে মহামারির তীব্রতা বাড়ার পরে, ওই গ্রাহক সম্ভাব্য জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় এবং সমস্যা এড়াতে ৭০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার দাবি করছে, যদিও তাদের এর প্রয়োজন নাও হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বিশ্ব বাজারে অক্সিজেন সিলিন্ডারের দাম পাকিস্তানি টাকায় ৪০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা। কিছুদিন আগেও যা ৩০ হাজার ছিল। এই ক্ষেত্রে, যদি কেউ সিলিন্ডার আমদানি করে, তিনি তার ব্যবসা চালানোর জন্য মুনাফা রেখে এটি আরও বেশি দামে বিক্রি করবেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাধারণ পরিস্থিতিতে সিলিন্ডার কেনা হয় না, গ্যাস কেনা হয়। কিন্তু এখন ভারতে করোনা পরিস্থিতি এবং সেখানে অক্সিজেনের অভাবের পরে পাকিস্তানেও সিলিন্ডার কেনা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, অক্সিজেনের সিলিন্ডারগুলো পাকিস্তানে তৈরি হয় না, এগুলো বাইরে থেকে আমদানি করা হয়।

ভারতের পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ ভোক্তা এবং পাকিস্তানি জনগণের বাড়িতে অক্সিজেন সিলিন্ডার কেনা ও রাখার কারণে বাজারে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এখন অনেকেই সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে ভয়ে বাড়িতে দু’টি, তিনটি সিলিন্ডার কিনছেন। আগে যেখানে কেবল গ্যাস বিক্রি হতো, এখন গ্যাস সিলিন্ডারও বিক্রি হচ্ছে।

ইসলামাবাদের হাসপাতাল, ফার্মেসি এবং ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠানে অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহকারী একটি বেসরকারি কোম্পানির মালিক নাভিদ বিন শামস। তিনি বলেছেন, গত ৪১ বছর ধরে এই ব্যবসার সাথে যুক্ত তিনি। তিনিও দেখছেন জনগণ আতঙ্কিত হয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনছেন এবং তাদের বাড়িতে রাখছেন।

আরও পড়ুন : করোনায় বিধ্বস্ত ভারতে ৯১ লাখ মানুষের কুম্ভে স্নান

তিনি বলেন, যার অক্সিজেনের প্রয়োজন ছিল না, তিনিও দুটি-তিনটি সিলিন্ডার কিনে বাড়িতে রাখছেন।

ছোট পরিবেশকরা পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চায়

নাভিদ বিন শামস দাবি করেছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ছোট পরিবেশকরা সিলিন্ডার মজুদ করে অবৈধভাবে মুনাফা বাড়াতে চায়। তিনি বলেছেন যে, এই সময়ে বাজারে অক্সিজেন সিলিন্ডারের কৃত্রিম ঘাটতি তৈরির সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না।

গনি গ্যাস কোম্পানি বলছে, অক্সিজেন সিলিন্ডারের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হচ্ছে স্থানীয় শহরগুলোতে বেসরকারি সরবরাহকারী ও পরিবেশকদের দ্বারা সিলিন্ডার মজুদ করে অবৈধ মুনাফার প্রবণতা।

অক্সিজেন সিলিন্ডারের দাম কত বেড়েছে?

নাভিদ বিন শামস বলেন, দুই মাস আগে রোগীরা যে ছয় লিটার সিলিন্ডার ব্যবহার করেছিলেন তা বাজারে ৫,৫০০ টাকায় পাওয়া যেত, সেই সিলিন্ডারের দামই এখন ৭,০০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। আগে ১০ থেকে ১১ লিটার অক্সিজেনের সিলিন্ডার যেখানে ১০,০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, এখন তার দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪,০০০ টাকায়।

আবার সিলিন্ডারে অক্সিজেন গ্যাস ভরার ক্ষেত্রে প্রথম ছয় লিটারের জন্য যেখানে আগে খরচ পড়তো ৪০০ টাকা, সেখানে এখন লাগছে ৪৫০ টাকা। অন্যদিকে ১০ থেকে ১১ লিটার সিলিন্ডারে গ্যাস ভর্তি করতে আগে লাগতো ৫০০ টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০০ টাকা।

নাভিদ শামস বলছেন, সরকার অক্সিজেন প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলো থেকে হাসপাতালে ৯০% অক্সিজেন সরবরাহ করছে। আর বাকি ১০% বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বেসরকারি বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে।

সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?

অক্সিজেন গ্যাস এবং সিলিন্ডারের সরবরাহ ঠিকঠাক এবং দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে? এ বিষয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক সহকারী বিশেষ সচিব ড. ফয়সাল সুলতান বলেন, দেশে অক্সিজেনের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সরকার একটি ব্যাপক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এর আওতায় অক্সিজেন প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় দেশে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে।

তারা জানিয়েছে, প্রয়োজনে বিদেশ থেকে গ্যাস ও অক্সিজেন সিলিন্ডারও আমদানি করা যেতে পারে। এ ছাড়া সরকার অক্সিজেনের সঠিক ব্যবহারের জন্য নির্দেশ জারি করেছে। রোগীর জীবন বিপন্ন করে না- এমন ছোটখাটো অস্ত্রোপচার স্থগিত করা হয়েছে।

চিকিৎসা খাতে অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে শিল্প খাতে সরবরাহ আপাতত স্থগিত করার চিন্তাও রয়েছে তাদের।

আগামী দিনে দেশে অক্সিজেন এবং অক্সিজেন সিলিন্ডারের কতটা প্রয়োজন হবে, সে সম্পর্কে সরকারের অনুমান কী?

এ বিষয়ে ফয়সাল সুলতান নামে একজন চিকিৎসক বলছেন, সরকার বিভিন্ন পরিস্থিতিতে চাহিদা ও সরবরাহের বিভিন্ন হিসাব করছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন : ঘাসফুলের রোমান্টিকতায় স্ত্রীকে চমকালেন বাইডেন (ভিডিয়ো)

তবে বৃহস্পতিবার একটি বৈঠকে ৬,০০০ মেট্রিক টন অক্সিজেন এবং ৫,০০০ অক্সিজেন সিলিন্ডার আমদানির অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে ২০টি ক্রায়োজেনিক ট্যাংক আমদানির অনুমতিও দেওয়া হয়।

সামাজিক সংগঠন ও কর্মীদের কর্মকাণ্ড

যাদের অক্সিজেন প্রয়োজন হবে তারা যেন নির্ধারিত মূল্যে অক্সিজেন পান, তা নিশ্চিতে কাজ করছে পাকিস্তানের বিভিন্ন সামাজিক সংস্থাও। অক্সিজেন ব্যাংক নামে এমন একটি উদ্যোগ নিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক এক মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও সমাজকর্মী সালমান সুফি।

টুইটারে তিনি দাবি করেছেন, দেশে অক্সিজেন সিলিন্ডারের জালিয়াতি এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যের পরিপ্রেক্ষিতে তার সংস্থা শিগগিরই সাধারণ জনগণকে অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ নিশ্চিত করতে অক্সিজেন ব্যাংক নামে একটি প্রকল্প চালু করছেন।

তিনি তার টুইটে জনগণকে এই কাজে তাকে সাহায্য করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নাগরিকদের কষ্ট লাঘব করতে এগিয়ে যেতে বলেন সালমান সুফি।

সালমান সুফির এই পদক্ষেপকে ভারত ও পাকিস্তানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা স্বাগত জানিয়েছেন এবং এটিকে একটি মানবিক প্রকল্প বলে অভিহিত করেছে।

এ প্রকল্পের যারা প্রশংসা করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন বলিউড অভিনেত্রী এবং পরিচালক পূজা ভাট। এ কাজের জন্য সালমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি লিখেছেন, ভারতে আমাদের এটা খুবই প্রয়োজন। এর উত্তরে সালমান সুফি তাকে বলেছেন, ভারতে আপনার সাথে এই প্রকল্পটি শুরু করতে পারা আমার জন্য সম্মানের বিষয় হবে।

প্রকল্পের বিষয়ে সালমান সুফি বলছেন, ভারত ও পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি এবং পাকিস্তান যে দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে দেশে অক্সিজেনের অভাব হতে পারে। তাই আমি ভাবি, যাদের অক্সিজেন প্রয়োজন আছে তাদের সাহায্য করার জন্য একটি প্রকল্প চালু করা উচিত।

তিনি বলেন, অবৈধভাবে অক্সিজেন সিলিন্ডার মজুদ করার কারণে অক্সিজেন মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং দেশে অক্সিজেন সরবরাহের একটি শক্তিশালী ব্যবস্থার অভাবে মানুষ জানে না যে তারা কোথায় গেলে অক্সিজেন পাবে।

তিনি আরও বলেন, বেশিরভাগ মানুষ টুইটার এবং হোয়াটস অ্যাপে সাহায্য চাইছেন। একটি জাতি হিসেবে এটি আমাদের জন্য লজ্জাজনক যে এই বিষয়ে আমাদের এখনো কোনো ব্যবস্থা নেই। আমরা একটি ব্যবস্থা করতে চায় যাতে কেউ একটা ফোন দিলেই আমরা তার বাড়িতে অক্সিজেন পৌঁছে দেব। কোনো সিলিন্ডারে অক্সিজেন শেষ হয়ে গেলে তা আবারও ভর্তি করে দেওয়ার দায়িত্বও তার সংস্থা নেবে। এবং সেটি নির্ধারিত দামেই করা হবে।

আরও পড়ুন : করোনায় সাড়ে তিন হাজার মৃত্যু দেখল ভারত

তিনি আরও বলেন, কোভিড-১৯ই একমাত্র রোগ নয়, যার জন্য অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। আমাদের প্রচেষ্টা এমন একটি সিস্টেম তৈরি করা যাতে করোনা চলে গেলেও, অভাবি লোকেরা সহজেই অক্সিজেন পেতে পারেন। পরীক্ষামূলকভাবে করাচি ও লাহোর থেকে প্রকল্পটি শুরু করা হচ্ছে এবং সময়ের সাথে সাথে প্রতিটি শহরে, যেখানে প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে সেখানে এই ব্যবস্থা ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

ওডি/কেএইচআর

jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড