• শুক্রবার, ১৪ মে ২০২১, ৩১ বৈশাখ ১৪২৮  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ব্রিটেনের এক চতুর্থাংশ নাগরিকই রাজতন্ত্রের অবসান চায়

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১৫ এপ্রিল ২০২১, ১৫:১৯
ব্রিটেনের এক চতুর্থাংশ নাগরিকই রাজতন্ত্রের অবসান চায়
ব্রিটিশ রাজ পরিবার (ছবি : বিবিসি নিউজ)

প্রিন্স ফিলিপ মারা যাওয়ার পর সারা পৃথিবীর মানুষ শোক প্রকাশ করে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে সার্বিকভাবে রাজ পরিবারের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছেন অনেকে।

যদিও প্রিন্স ফিলিপের মৃত্যুতে শোকাহত ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রতি বহু মানুষের সহানুভূতি থাকলেও ব্রিটেনের সব মানুষই কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজতন্ত্রের পক্ষে নয়।

প্রশ্ন করা হলে অধিকাংশ মানুষই বলেন, তারা একটি রাজ পরিবারের যে ঐতিহ্য এবং প্রতীকী তাৎপর্য সেটিকে গুরুত্ব দেন। এটি না থাকলে তারা দুঃখ পাবেন। কিন্তু ব্রিটিশ জনগণের একটি বিরাট অংশ আবার সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে দেখতে চান।

গতমাসে জরিপ সংস্থা ইউগভ একটি জরিপ চালিয়ে দেখেছে ব্রিটেনের ৬৩ শতাংশ মানুষ চায় ভবিষ্যতেও যেন রাজতন্ত্র অব্যাহত থাকে। কিন্তু প্রতি চারজনের মধ্যে একজন বলেছেন, তারা রাজতন্ত্রের অবসান চান এবং একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে দেখতে চান। এই জরিপে প্রতি দশজনে একজন এ বিষয়ে কোন পক্ষেই মতামত দেননি।

ব্রিটেনের রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের বয়স এখন ৯৪ বছর। গত প্রায় এক হাজার বছর ধরে কোন না কোনোভাবে ব্রিটেনে তাদের শাসন চালু আছে। মাঝখানে একবারই মাত্র এতে ছেদ ঘটেছিল, সপ্তদশ শতকে ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধের পাঁচ বছর।

ব্রিটেনে রাজা বা রানির বেশকিছু সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। যেমন পার্লামেন্টের তৈরি আইনে সই করা, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করা এবং পার্লামেন্টের অধিবেশন ডাকা। কিন্তু রাজতন্ত্রের অনেক ক্ষমতাই এখন খর্ব করা হয়েছে।

রানি এলিজাবেথ একই সঙ্গে কমনওয়েলথের সদস্য ৫৪টি দেশেরও রানি। এই জোট গড়ে উঠেছে একসময়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন দেশগুলোকে নিয়ে।

ডার্বির বাসিন্দা কার্সটেন জনসন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। তিনি বলেছিলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি আমাদের আর রাজতন্ত্রের দরকার নেই। আমি বুঝতে পারি না এটা রেখে লাভটা কি। এটা আসলে ভিন্ন একটা সময় আর উপনিবেশবাদের একটা ঘোর ছাড়া আর কিছুই নয়।

তিনি আরও বলেন, রানি এলিজাবেথ যখন সিংহাসনে আসীন হলেন, আপনি যদি সেই সময়টার কথা ভাবেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার খুব বেশিদিন পরের ঘটনা নয়, তখন কমনওয়েলথ সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা অবস্থায় ছিল। এটি ছিল আসলে অনেকটাই সাম্রাজ্যের ব্যাপার, অন্তত এখনকার তুলনায়।

আরও পড়ুন : ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে ইরান-ইসরায়েলের ছায়াযুদ্ধ

তার মতে, সরকার চালানোর জন্য নির্বাচিত লোকজন আছে, কাজেই রাজতন্ত্র কেন দরকার? কাগজে-কলমে রানিকে সবকিছু সই করতে হয়, কিন্তু আসলে তিনি তো কেবল আলংকারিক প্রধান আর তার পেছনে দেশের খরচও কম নয়।

২০২০ সালে রাজপরিবারের পেছনে ব্রিটেনের করদাতাদের সাড়ে ৯ কোটি ডলার খরচ হয়েছে। রাজপরিবারের পক্ষ থেকেই দেওয়া হয়েছে এই তথ্য। যা এযাবতকালের সর্বোচ্চ ব্যয়।

রাজপরিবারের পেছনে ব্যয় করা এই অর্থকে বলা হয় রাজকীয় মঞ্জুরি। রাণীর কাজ-কর্ম, তার পরিবারের ব্যয়, রাজপরিবারের ভ্রমণ এবং রাজপ্রাসাদগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের খরচ নির্বাহ করা হয় এই তহবিল থেকে।

বাকিংহাম প্রাসাদের সাম্প্রতিক সংস্কার এবং প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কেলের সাবেক নিবাস ফ্রগমোর কটেজের উন্নয়ন কাজও এই তহবিলের অর্থ দিয়ে করা হয়েছে।

করদাতাদের অর্থ দিয়ে কিন্তু রাজপরিবারের দূরসম্পর্কের সদস্যদেরও সহায়তা করা হয়। তাদের উপাধির কারণে তারা কোন একটা কাজ বা দায়িত্ব পান, এক ধরনের সুরক্ষা পান। কার্সটেন জনসনের প্রশ্ন, এসব সদস্যরা আসলে দেশের জন্য কি করেন?

তিনি বলেন, আমি বলছি না যে তারা একেবারেই কিছু করেন না। কিন্তু তারা এমন বিশেষ কি করেন যা অন্য কেউ করতে পারবেন না? কেবল রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত কাউকেই করতে হবে।

কার্সটেন উল্লেখ করেন, রানি এলিজাবেথ অনেকদিন রাজত্ব করেছেন এবং তিনি বেশ মর্যাদার সঙ্গেই কাজটা করেছেন। তাকে একজন চমৎকার মানুষ বলেই মনে হয়। কিন্তু আমি এখন পর্যটক আকর্ষণ ছাড়া রাজতন্ত্রের আর কোন প্রয়োজন দেখতে পাই না। আর যে পর্যটকরা বাকিংহাম প্রাসাদ দেখতে চান, রাজতন্ত্র না থাকলেও তারা সেটা দেখতে যেতে পারবেন।

রানি এবং তার নিজের পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যকে বলা হয় ওয়ার্কিং রয়্যালস অর্থাৎ তারা প্রত্যেকেই কাজ করেন। যুক্তরাজ্যে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তারা বছরে দুই হাজারের বেশি অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তারা নানা ধরনের অনুষ্ঠান এবং দাতব্য কাজের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য শক্তিশালী করা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখায় ভূমিকা রাখবেন বলে আশা করা হয়।

আরও পড়ুন : আমিরাতকে ৩০০ কোটি ডলারের অস্ত্র দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

স্যামি নাইট নামের এক ব্রিটিশ নাগরিক মনে করেন, আমার দৃষ্টিতে রাজপরিবার যেন খুবই সুবিধাভোগী কিছু আমলা, যারা জন্মসূত্রেই তাদের কাজটা পেয়ে গেছেন এবং যাদের সেই পদ থেকে সরানো যাবে না। স্যামির জন্ম কানাডায় এবং বেড়ে উঠেছেন সেখানেই। কিন্তু তিনি এখন ব্রিটিশ নাগরিক। তার বিশ্বাস ভবিষ্যতের যুক্তরাজ্য বা কমনওয়েলথে রাজতন্ত্রের কোন স্থান নেই।

তার মতে, রানি মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজতন্ত্রের মৃত্যু ঘটবে। রাজতন্ত্রের কী হলো সেটা নিয়ে আমি ভাবি না, তবে আমি মনে করি ব্যক্তিগতভাবে রানি একজন অসাধারণ মানুষ। প্রিন্স ফিলিপ যে মারা গেছেন সে জন্য আমি দুঃখিত, কারণ রানি এখন একদম একা।

তিনি আরও বলেন, রানি এবং ডিউক অব এডেনবার্গ যে কাজ করেছেন, আমি তার প্রশংসা করি। তারা অসাধারণ জীবন কাটিয়েছেন। আমার মনে হয় তাদের বয়স হওয়ার পরেও জনসেবায় তারা অসাধারণ আত্মত্যাগ করেছেন। কিন্তু রাজপরিবারের তরুণ সদস্যদের আমি মোটেই পছন্দ করি না। ব্রিটেনে এখন একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগের সময় এসেছে।

রাজ পরিবারের ব্যাপারে চালানো জরিপটির তথ্য যদি বয়স-ভেদে ভাগ করা হয়, তাহলে দেখা যায় বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে একটা বিরাট ফারাক আছে। যাদের বয়স ১৮ হতে ২৪ তাদের মধ্যে রাজতন্ত্রের পক্ষে সমর্থন সবচেয়ে কম। আবার যাদের বয়স ৬৫ বা তার বেশি, তাদের একটা বিরাট অংশই রাজপরিবারকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে।

ব্রিটেনের বিভিন্ন অংশের মধ্যেও রাজপরিবারের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের তারতম্য দেখা যাচ্ছে এই জরিপে। স্কটল্যান্ডের মাত্র অর্ধেক মানুষ রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। ব্রিটেনের কোন একটি অঞ্চলে রাজপরিবারের ব্যাপারে এত কম সমর্থন আর দেখা যায়নি। তবে সবাই রাজতন্ত্র পুরোপুরি বিলোপের পক্ষে নন। অনেকেই আংশিক সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে।

আরও পড়ুন : আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ যুদ্ধের অবসান চান বাইডেন

যুক্তরাজ্যে জনগণের সম্মতির ভিত্তিতেই রাজতন্ত্র তাদের কাজ চালায়, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রিটিশ রাজতন্ত্র নিয়ে অনেক বিতর্ক চলছে। তবে যারা রাজতন্ত্রের অবসান চান, বলতেই হচ্ছে যে তারা এখনো দেশের মোট জনসংখ্যার একটি সংখ্যালঘু অংশ।

ওডি/কেএইচআর

jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড