• মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭  |   ২১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ওবামার স্মৃতিকথায় কংগ্রেসের ভূয়সী প্রশংসা

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১৮ নভেম্বর ২০২০, ১৯:০০
করোনা
ছবি : সংগৃহীত

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আত্মজীবনীমুলক বই ‘এ প্রমিজড ল্যান্ড’ প্রকাশিত হয়েছে মঙ্গলবার। প্রকাশ হতেই বইটি ভারতে বেশ তোলপাড় ফেলেছে। ওবামা তার এই স্মৃতিকথায় মূলত ভারতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বকে প্রশংসায় ভাসালেও বিজেপিদলীয় প্রধানমন্ত্রী মোদিকে নিয়ে একটি শব্দও লেখেননি।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক অনলাইন প্রতিবেদন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০১০ সালের নভেম্বরে ভারতে তার সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে ১ হাজার ৪০০ শব্দের যে চ্যাপ্টারটি ওবামা লিখেছেন, সেখানে তিনি তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

মনমোহন সিংকে তিনি ‘ভারতীয় অর্থনীতির রূপান্তরের প্রধান কারিগর’ এবং ‘জ্ঞানী, চিন্তাশীল এবং অসামান্য সৎ’ একজন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কংগ্রেসের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধীর ব্যক্তিত্ব তাকে কতটা মুগ্ধ করেছিল সে কথাও লিখেছেন ওবামা।

একই সঙ্গে কংগ্রেসের বর্তমান কাণ্ডারি রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক ধীশক্তি নিয়ে তার মনে তখন যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল তাও অকপটে লিখেছেন।

বইটি বিক্রির শুরুর আগেই ফাঁস হওয়া কপির সূত্রে তাদের নেতার ‘নার্ভাস এবং কিছুটা অপরিণত’ ব্যক্তিত্ব নিয়ে দুইবারের এই মার্কিন প্রেসিডেন্টের তুলে ধরা পর্যবেক্ষণে কংগ্রেস নেতা-কর্মীদের মাঝে যে ক্ষোভ শোনা যাচ্ছিল, মনমোহন সিং এবং সোনিয়া গান্ধীকে নিয়ে তার পর্যবেক্ষণে তা অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে।

বিশেষ করে, ৯০২ পৃষ্ঠার বইতে যে নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে বারাক ওবামা যে একটি শব্দও লেখেননি তা নিয়ে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের বেশ কয়েকজনই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে ছাড়েননি।

মনমোহন সিং সম্পর্কে ওবামা

বারাক ওবামা লিখেছেন, মুখোমুখি কথা হওয়ার সময় মনমোহন সিং তার কাছে ভারতে মুসলিমবিরোধী মনোভাবের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাবের বিস্তার এবং তার ফলে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপির শক্তি এবং প্রভাব বৃদ্ধি’ নিয়ে তিনি শঙ্কিত।

ওবামা আরও লিখেছেন, ২০০৮ সালে ভারেতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ের একটি পাঁচ তারকা হোটেলে যে সন্ত্রাসী হামলায় ১৬৬ জন নিহত হয়েছিল এর পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেয়ার প্রচণ্ড চাপ তৈরি হলেও তাতে সায় দেননি মনমোহন সিং। তার সেই ‘সংযমের রাজনৈতিক মূল্য তাকে দিতে হয়েছে’।

মনমোহন সিং ওবামাকে বলেছিলেন, ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, অনিশ্চিত অস্থির সময়ে ধর্মীয় এবং জাতিগত ঐক্যের কথা বললে বিষক্রিয়া হতে পারে। রাজনীতিকরা খুব সহজেই তার ফায়দা লুঠতে পারে। শুধু ভারত নয়, অন্য দেশের বেলাতেও তা সত্যি হতে পারে।’

ওবামা লিখেছেন মনমোহনের কথায় একমত ছিলেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি চেক রিপাবলিকে ভেলভেট বিপ্লবের পর দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট ভাকলাভ হাভেলের সঙ্গে আলাপাচারিতার প্রসঙ্গ টানেন। প্রাগে ওই বৈঠকের সময় হাভেল ‘ইউরোপে উদারপন্থার বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

২০০৮ থেকে ১৬ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট ওবামা আরও লিখেছেন, ‘বিশ্বায়ন এবং অর্থনৈতিক সংকট যদি অপেক্ষাকৃত ধনী দেশগুলোতে এমন অসহিষ্ণুতার জন্ম দিতে পারে— যেমন যুক্তরাষ্ট্রে টি পার্টির মত আন্দোলনের উত্থান— তাহলে ভারতের মত দেশ তা থেকে কীভাবে রক্ষা পাবে?’

দিল্লিতে ওবামার সফরের প্রথম রাতে নৈশভোজে মনমোহন সিং ‘আকাশে যে কালো মেঘের আভাস তিনি দেখছেন তা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছিলেন।’ যুক্তরাষ্ট্রের ২০০৭ সালে গৃহঋণ সংকটের পরিণতিতে বিশ্বজুড়ে যে গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কট শুরু হয় তা নিয়েও কথা বলেছিলেন মনমোহন. সিং।

প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে বৈরিতা নিয়েও নিজের উদ্বেগের কথা ওবামাকে বলেছিলেন তিনি।

ওবামা লিখেছেন, ‘সেই সঙ্গে ছিল পাকিস্তান সমস্যা। ২০০৮ সালে মুম্বাইতে সন্ত্রাসী হামলার তদন্তে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতায় পাকিস্তানের অব্যাহত ব্যর্থতায় দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা বেড়েছে। তদন্তে সহযোগিতার অভাবের একটি কারণ হয়ত ছিল লস্কর-ই তইবা নামে যে সন্ত্রাসী সংগঠনটি এই হামলার জন্য দায়ী তার সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগের সম্ভাবনা।’

মনমোহন সিংকে ওবামা বর্ণনা করেছেন ‘ভারতের অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রধান কারিগর’ এবং ‘জ্ঞানী, চিন্তাশীল এবং অসামান্য সৎ’ একজন মানুষ হিসেবে।

ওবামার মতে, ‘সিং এমন একজন পেশাদার; যিনি মানুষের আস্থা অর্জনে তাদের আবেগ নিয়ে খেলা করেননি। বরং তাদের জীবনযাত্রার মান বাড়িয়ে এবং দুর্নীতি থেকে নিজেকে দূরে রেখে আস্থা অর্জন করেছিলেন।’

ওবামা লিখেছেন, ‘যদিও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সিং সতর্ক ছিলেন কারণ তিনি হয়ত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে ঐতিহাসিকভাবে সন্দিহান আমলাদের কর্তৃত্বকে খুব বেশি খাটো করতে চাননি, কিন্তু যতদিন আমাদের দুজনের যে সম্পর্ক ছিল তার ভিত্তিতে এ কথা বলতে আমার কোনো দ্বিধা নেই যে তিনি ছিলেন অসামান্য জ্ঞানী এবং অত্যন্ত সজ্জন একজন মানুষ।’

সোনিয়া গান্ধীকে নিয়ে

তৎকালীন কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সোনিয়া গান্ধীকে ওবামা বর্ণনা করেছেন, ‘শাড়ি পরা ষাটোর্ধ্ব অত্যন্ত আকর্ষণীয় একজন নারী; যার ঠাণ্ডা কালো চোখে জানার অনেক ইচ্ছা এবং যার উপস্থিতি একটি রাজকীয় আবহ সৃষ্টি করে।’

ওবামা লিখেছেন, ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত একজন গৃহবধূ ও মায়ের পক্ষে আত্মঘাতী হামলায় নিহত স্বামীর শোক কাটিয়ে নেতৃস্থানীয় জাতীয় রাজনীতিক হয়ে ওঠা প্রমাণ করে ভারতে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির শক্তি কতটা।

ওবামা লিখেছেন, ‘এক নৈশভোজের সময় সোনিয়া গান্ধী কথা বলার চেয়ে শুনেছেন বেশি। রাষ্ট্রীয় নীতি বিষয়ক কোনা প্রসঙ্গ উঠলেই নিজে কথা না বলে তা ঠেলে দিয়েছেন মনমোহন সিংয়ের দিকে। এবং বারবারই তিনি আলোচনায় ছেলেকে সম্পৃক্ত করতে চাইছিলেন। তার ক্ষমতার উৎস ছিল তার ক্ষুরধার বুদ্ধিমত্তা।’

রাহুল গান্ধীকে নিয়ে

রাহুল গান্ধী সম্পর্কে বারাক ওবামা লিখেছেন, ‘মনে হয়েছে তিনি স্মার্ট, আন্তরিক। মায়ের কাছ থেকে তিনি তার সুদর্শন চেহারা পেয়েছেন। আধুনিক অগ্রসর রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি তার চিন্তা-ভাবনা জানাচ্ছিলেন। মাঝেমধ্যে ২০০৮ সালে আমার নির্বাচনী প্রচারণা সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করছিলেন।’

সাবেক এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিখেছেন, ‘কিন্তু তার (রাহুলের) ভেতর যেন কিছুটা উদ্বেগ, কিছুটা অপরিপক্বতার ছাপ ছিল। ব্যাপারটি এমন যে তিনি যেন একজন ছাত্র যিনি কোর্সওয়ার্ক শেষ করেছেন এবং চাইছেন শিক্ষক যেন তার কাজ পছন্দ করেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ও কাজের ব্যাপারে তার যেন পুরোপুরি উৎসাহ নেই।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালীয় জাতীয় দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমসে বারাক ওবামার নতুন স্মৃতিকথামূলক বই ‘এ প্রমিজ ল্যান্ডের একটি আগাম পর্যালোচনায় রাহুল গান্ধী সম্পর্কে তার এই পর্যবেক্ষণ দেখে অনেক কংগ্রেস কর্মী-সমর্থক এবং দলের একজন সিনিয়র নেতা টুইটারে ওবামাকে ‘আন-ফলো’ করেছেন বলে জানান দিয়েছেন।

ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে

আধুনিক ভারত নিয়ে বারাক ওবামা লিখেছেন, ‘একটি সার্থক গল্প কারণ বার বার সরকার পরিবর্তন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রচণ্ড বিভেদ, নানারকম সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং বিদ্রোহী তৎপরতা এবং দুর্নীতির নানারকম কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও ভারত রাষ্ট্র অক্ষত।’

কিন্তু তিনি এই লিখেছেন, ভারত একটি গণতান্ত্রিক এবং মুক্ত অর্থনীতির রাষ্ট্র হলেও ‘গান্ধী যে সাম্য এবং শান্তির সমাজ চেয়েছিলেন তার সঙ্গে আজকের ভারতের মিল খুব কম। বৈষম্য বাড়ছে এবং সহিংসতা ভারতীয় সমাজের অংশ হিসাবে রয়ে যাচ্ছে।’

বারাক ওবামা লিখেছেন, ২০১০ সালে নভেম্বরের রাতে মনমোহন সিংয়ের বাসভবন থেকে বেরিয়ে তিনি ভাবছিলেন ৭৮ বছরের এই মানুষটি যখন ক্ষমতা ছাড়বেন তখন এই দেশের অবস্থা কী দাঁড়াবে।

‘রাহুল কী সফলভাবে সামলাতে পারবেন, মায়ের যে রাজনৈতিক অভিলাষ তিনি কি তা পূরণ করতে পারবেন? বিজেপি যে বিভেদমুলক জাতীয়তাবাদের ধারণা তুলে ধরতে চাইছে তা সামলে তিনি কি কংগ্রেস পার্টির প্রাধান্য ধরে রাখতে পারবেন?’— এমন সব প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল ওবামার মনে।

তিনি লিখেছেন, ‘আমার সন্দেহে মনমোহন সিংয়ের কোনো দোষ ছিল না। তিনি তার ভূমিকা পালন করেছিলেন, শীতল যুদ্ধ পরবর্তী উদারপন্থী গণতন্ত্রের সব সূত্রই তিনি অনুসরণ করেছিলেন, সংবিধান সমুন্নত রেখেছিলেন, অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছিলেন, পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষার পরিধি বাড়িয়েছিলেন।’

তবে ওবামা লিখেছেন তিনি নিজেও প্রায়ই ভাবেন যে ‘সহিংসতা, লোভ, দুর্নীতি, জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার মত প্রবৃত্তিগুলোকে কি গণতন্ত্র আসলেই স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে?’

‘মনে হয় এসব প্রবৃত্তি সুপ্ত থাকে, যখনই অর্থনীতিতে সংকট আসে, জনসংখ্যার পরিবর্তন হয় এবং যখন কোনো রাজনৈতিক নেতা মানুষের ভীতি এবং অসন্তোষকে কাজে লাগাতে চায়, তখনই ঐসব প্রবৃত্তি মাথা চাড়া দেয়।’

ওবামার বইতে মোদি নেই

নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট হিসাবে বারাক ওবামা আবারও ভারত সফরে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার বইতে নরেন্দ্র মোদির কোনো প্রসঙ্গ তিনি টানেননি।

বিবিসির দিল্লি প্রতিনিধি বলছেন, ‘একটি কারণ আত্মজীবনীমুলক বইটির প্রথম খণ্ডটি শেষ হয়েছে ২০১১ সালে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার ঘটনা দিয়ে। দ্বিতীয় খণ্ডে হয়ত মোদিকে নিয়ে ওবামার পর্যবেক্ষণ দেখা যাবে।’

কিন্তু তার বইতে বারাক ওবামা যে নরেন্দ্র মোদির কোনো নাম করেননি, তা নিয়ে কংগ্রেস নেতা শশী থারুর একের পর এক টুইট করেছেন। তিনি লিখেছেন, যেখানে ওবামা মনমোহন সিংয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ সেখানে ৯০২ পৃষ্ঠার বইয়ে একবারও তিনি নরেন্দ্র মোদির নাম নেননি।

তিনি বলেছেন, রাহুলকে নিয়ে লেখা এক বাক্য নিয়ে বিজেপির লোকজন নৃত্য করছেন, কিন্তু ওবামার বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে মনমোহন পরবর্তী বিজেপির ভারত সম্পর্কে কী পর্যবেক্ষণ অপেক্ষা করছে তার ইঙ্গিত স্পষ্ট।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: +8801703790747, +8801721978664, 02-9110584 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড