• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০, ১৩ কার্তিক ১৪২৭  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

পদত্যাগ করছেন বরিস জনসন!

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩:০৪
পদত্যাগ করছেন বরিস জনসন!
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন (ছবি : বিবিসি নিউজ)

ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সংক্রান্ত জটিলতার মধ্যেই করোনার সেকেন্ড ওয়েভ, ব্রিটেনের মতো বড় একটি কল্যাণভিত্তিক রাষ্ট্রকেও জটিল পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। একইভাবে ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন ও করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের টানাপড়েনের জেরে দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়ছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও।

পরিস্থিতি ক্রমেই তার পদত্যাগ অনিবার্য করে তুলছে। হ্রাস পেয়েছে তার জনপ্রিয়তাও। ব্রিটেনের রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা আঁচ করতে পেরে বরিস নিজেই এখন নিজের পদত্যাগের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করছেন।

এক ব্রেক্সিট ইস্যুকে কেন্দ্র করে ব্রিটেনের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সফলতম টোরি প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনকে বিদায় নিতে হয়েছে। তারপর ক্যামেরনের স্থলাভিষিক্ত হওয়া থেরেসা মেকেও শেষ পর্যন্ত ক্যামেরনের পথেই হাঁটতে হয়। সামনে বরিস জনসন যদি পদত্যাগ করেন, তবে ব্রেক্সিট ইস্যু নিয়ে এটি হবে টানা তৃতীয় কোন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বিদায়।

ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিয়ে ১৯৭৫ সালে ব্রিটেনে অনুষ্ঠিত গণভোটের পর তৎকালীন লেবার নেতা, প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসনকে যেভাবে পদত্যাগ করতে হয়েছিল, বরিস জনসনকেও সে পথে সহসাই হাঁটতে হতে পারে। দুই দফায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা হ্যারন্ডকে দ্বিতীয় দফায় দায়িত্ব নেবার মাত্র এক বছরের মাথায় পদত্যাগ করতে হয়। বরিসও তার প্রধানমন্ত্রীত্বের এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে।

গত এক বছরে ব্যক্তিগত জীবনের নানা কেলেঙ্কারির কারণে বরিস তার জনপ্রিয়তা হারিয়েছেন। নিজে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছেন। এরপর নতুন প্রেমিকার গর্ভজাত সন্তানের পিতাও হয়েছেন তিনি। এটি তার প্রেমিকার প্রথম সন্তান হলেও বরিসের ষষ্ঠ সন্তান। এরইমধ্যে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, পরিবার সামলাতে গিয়ে অর্থনৈতিক টানাপড়েনে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যেই আবার ব্রিটেনজুড়ে করোনা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে বরিসকে।

আরও পড়ুন : নর্দমা পরিষ্কারে নেমে মিলল চোখ ছানাবড়া দৈত্যাকার ইঁদুর! (ভিডিও)

সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাড়িয়ে আছে ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের ইস্যু। গত বছর নির্বাচনি বৈতরণী পেরুবার সময় বরিস জনসন যেভাবে অনেকটা ‘তুড়ি মেরে করে দেবার মত সহজ এক ব্রেক্সিটের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ব্রিটিশ জনগণকে, পরিস্থিতি এখন আর সে জায়গাটিতে নেই। আইরিশ সীমান্ত নিয়ে বিরোধসহ নানা কারণে চুক্তিসহ ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে বরিসের জন্য।

এর মধ্যে আবার করোনা মহামারি ব্রিটেনের অর্থনীতিকে বড় ধরনের ধাক্কার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। দুয়ারে দাঁড়িয়ে করোনার সেকেন্ড ওয়েভ। সেই অত্যাসন্ন সেকেন্ড ওয়েভের সামনে ব্রিটিশ সরকার অনেকটাই অপ্রস্তুত। সমন্বয়হীনতার জেরে অনেকটা অসহায় পরিস্থিতি।

ব্রিটিশ সাংবাদিক ও সাবেক এমইপি (মেম্বার অব ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট) পেট্রিক ও ফ্লায়েন তার সাম্প্রতিক এক লেখায় বলেছেন, বরিস জনসনকে পরিস্থিতির কারণে এখন হয়তো বিশ্লেষকদের ধারণার থেকেও আগে পদত্যাগ করতে হতে পারে।

কাছের মানুষদের উদ্ধৃতিকে পুঁজি করে চলতি সপ্তাহে নিজের দুঃখ বেদনার নতুন গল্প নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে হাজির হয়েছেন বরিস জনসন। তিনি বলেছেন, আগে যখন তিনি কনজারভেটিভ পার্টির একজন আইনপ্রণেতা ছিলেন, তখন কেবল পত্রিকাতে কলাম লিখেই বছরে সাড়ে ৩ লাখ পাউন্ডের বেশি রোজগার করতেন। বক্তৃতা দিয়ে রোজগার হত বিশাল বাড়তি অর্থ। এখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেতন পান বছরে মাত্র দেড় লাখ পাউন্ড।

আরও পড়ুন : ট্রাম্পের বাড়ি গেলেই ময়লা কাপড় সঙ্গে নেন নেতানিয়াহু!

তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কেবল একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সুবিধা পান। আর্থিক অনটনে তার সর্বশেষ শিশুসন্তানের দেখভালের জন্য একজন কর্মীও রাখতে পারছেন না তিনি। মোদ্দাকথা, অর্থাভাবে ভাল নেই বরিস জনসন, এই দাবি তার কাছের বন্ধুদের।

নিজের ছয় সন্তানের মধ্যে চার সন্তানকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করতে হয় বরিস জনসনকে। সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে সাম্প্রতিক ব্যয়বহুল ডিভোর্সও তাকে আর্থিকভাবে আরও বিপর্যস্ত অবস্থার মুখোমুখি করেছে। ওই প্রতিবেদনে বরিস জনসনের ব্যক্তিগত, দল ও সরকারের কাছের মানুষদের উদ্বৃত করে বলা হয়েছে, বরিস সবমিলিয়ে এখন ক্লান্ত, বিপর্যস্ত। আর্থিকভাবে খুব দুরবস্থায় আছেন তিনি।

করোনায় মৃত্যুর দুয়ার থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরলেও বিশ্রামের সময় পাননি। তাই, শারীরিকভাবেও তিনি ভালো নেই। তার চেহারাতে সেই ভালো না থাকার ছাপ খুব স্পষ্ট। তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এখন আর শারীরিকভাবে ফিট ও নন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বরিসের আর্থিক, শারীরিক ও মানসিকভাবে ভাল না থাকবার খবরটি তার আসন্ন বিদায়ের প্রেক্ষাপটেরই অনেকটা পরিচ্ছন্ন পুর্বাভাস। ইউগভের জরিপে দু সপ্তাহ আগেই উঠে এসেছে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বরিস ব্রিটিশ জনগণের কাছে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন।

আরও পড়ুন : ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি হামলা বন্ধে নতুন পথে আরব-ইউরোপ

ঐ জরিপের ফলাফলে বলা হয়, ৩৫ শতাংশের বেশি ব্রিটিশ জনগণ মনে করেন লেবার লিডার স্যার কির ষ্টামার বরিসের চেয়ে ভাল সরকার প্রধান হতে পারেন, যেখানে বরিসের পক্ষে জনমত নেমে এসেছে ত্রিশ শতাংশে। বাঙালি ও এশিয়ান কনজারভেটিভ সমর্থকদের যে ছোট শ্রেণি,সেখানেও বরিস জনপ্রিয়তা ও নেতা হিসেবে ভোটারদের আস্থা দুটোই হারিয়েছেন।

নিজ দলের দুই সর্বশেষ সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিট ক্যামেরন ও থেরেসা মের বিদায়ের কল কাঠিটি দলের ভেতর থেকে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ নিয়ে যিনি নাড়াচাড়া করছিলেন,তিনি এই বরিস জনসন। থেরেসার সরকারকে অস্থিতিশীল করতে সরকারে ও দলে থেকে যা যা করার; তার সবই বরিস করেছেন। তার মতো করে প্রধানমন্ত্রীত্বের জন্য রাতারাতি অবস্থান আর আগের বক্তব্য পাল্টে মরিয়া কসরত করতে এর আগে কখনও দেখা যায়নি।

লন্ডনের মেয়র থাকা অবস্থায় লন্ডনকে সাধারণ মানুষের জন্য আন-এফোর্ডেবল করে তুলেছিলেন বরিস, এ অভিযোগ তার সমালোচকদের। সে সময় একটি সাক্ষাতকারে বরিস ১৭ বার বলেছিলেন, তিনি পরবর্তীকালে আইনপ্রণেতা পদে প্রার্থী হবেন না। এর একমাস পরই তিনি অক্সব্রীজ এলাকা থেকে এমপি নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হন। এই প্রধানমন্ত্রীর অনেক ব্রিটিশ সমালোচক এখন তাকে ব্রিটিশ ডোনাল্ড ট্রাম্প বলে ব্যাঙ্গ বিদ্রূপ করেন।

আরও পড়ুন : যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনায় ইসরায়েলের ফাঁদে পা দিচ্ছে আরেক মুসলিম রাষ্ট্র

স্ত্রী মেরিনা উইলারের সাথে ২৫ বছরের সংসার ভেঙ্গে বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া শেষ করেছেন বরিস। কিন্তু তার বহুল প্রতিশ্রুত ইউরোপ থেকে ব্রিটেনের বিচ্ছেদের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া এখনো অসম্পন্ন। নিজের চেয়ে ২৩ বছরের ছোট বান্ধবী কেরি স্যামন্ডসের সন্তানের বাবা হলেও সংবাদমাধ্যমগুলোতে তাদের বিয়ের যে ডামাডোল বাজছিললো, সেগুলো এখন ম্রিয়মাণ।

প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় বরিস ক্লারাকে বিয়ে করলে জন্ম দিতে পারতেন নতুন এক ইতিহাসের। কারণ গত ২৫১ বছরে ব্রিটেনের ইতিহাসে কোন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন নি। পদ ছাড়বার আগে সে রেকর্ড আর বুঝি ভাঙা হল হল না বরিস জনসনের। তবে ব্রিটেনের রাজনীতির ইতিহাসে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের ঘন ঘন পরিবর্তন, ব্যক্তিগত জীবন, পলিটিক্যাল এন্টারটেইনার হিসেবে নানা কর্মকাণ্ড ও মন্তব্য দিয়ে নানা মাত্রার রেকর্ড এরই মধ্যে গড়েছেন বরিস জনসন।

৮০০ বছর ধরে ব্রিটেন লিখিত সংবিধান ছাড়াই চলছে। ব্রেক্সিট ও করোনার পাশাপাশি সামাজিক, ভূ-রাজনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক অনেক অ-নিষ্পন্ন বিষয় এখন ব্রিটিশ জনগণের সামনে। ব্রিটেনের তাই এখন শক্তিশালী একটা সরকার খুব দরকার। তার জন্য অনিবার্য হয়ে উঠেছে সক্ষমতা সম্পন্ন একজন দক্ষ প্রধানমন্ত্রীর।

jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: +8801703790747, +8801721978664, 02-9110584 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড