• সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৬  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন

আত্মহত্যাই কি ডিপ্রেশনের শেষ পরিণতি? (পর্ব ২)

  জুবায়ের আহাম্মেদ

১০ আগস্ট ২০১৯, ১১:১৪
ডিপ্রেশন

ডিপ্রেশনের বিভিন্ন লক্ষণ সম্পর্কে প্রথম কিস্তিতেই বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হলেও বয়স এবং লিঙ্গভেদে সেসব লক্ষণে পরিবর্তন লক্ষণীয়।  

সাধারণত পুরুষদের মাঝে ডিপ্রেশনের ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত জীবন, হতাশা, অস্থিরতা, ঘুমের ব্যাঘাত এবং স্বাভাবিক কাজের প্রতি অনীহার মাত্রা খুব বেশি বেড়ে যায়। এছাড়াও ছেলেদের মাঝে রাগের মাত্রা খুব প্রবল হতে থাকে এ সময়। অন্যদিকে নারীদের মাঝে অতিরিক্ত ঘুম, অতি ভোজন বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা ডিপ্রেশনের প্রাথমিক লক্ষণ বলে গণ্য করা হয়ে থাকে। সাধারণত গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মের পর নারীদের মাঝে ডিপ্রেশনের হার বেড়ে যায়। প্রতি ৭ জনে ১ জন নারী এই অবস্থায় ডিপ্রেশনে থাকেন বলে নিশ্চিত করেছেন চিকিৎসকরা। 

কিশোর বয়সে ডিপ্রেশনে হতাশা বা একাকীত্ব না, বরং আগ্রাসনই সবচেয়ে বড় লক্ষণ। বয়সের স্বাভাবিক অ্যাডভেঞ্চার প্রবণতা তাদের ঝুঁকিপূর্ণ এবং আগ্রাসী কাজের দিকে টেনে নিয়ে যায়। এছাড়া মাথাব্যথাসহ মেরুদণ্ডের প্রদাহ এই বয়সে ডিপ্রেশনের লক্ষণ বলে গণ্য করা হয়। 

ডিপ্রেশনের প্রকারভেদ 

ডিপ্রেশন বিভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে। ডিপ্রেশনের প্রকার বা ধরণ সম্পর্কে জানা থাকলে আপনি সহজেই এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে পারেন। মূলত ডিপ্রেশনের ধরণ দুটি। মেজর ডিপ্রেশন এবং অ্যাটিপিক্যাল ডিপ্রেশন। 

মেজর ডিপ্রেশন 

অবাক করা তথ্য হলেও সত্য যে, মেজর ডিপ্রেশনে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা মাইনর ডিপ্রেশন থেকে অনেক বেশি। এতে ডিপ্রেশনের লক্ষণ এবং তার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ অনেকটা উপরে থাকে। সঠিকভাবে চিকিৎসা না করানো হলে মেজর ডিপ্রেশনের প্রভাব ছয়মাস থেকে একবছর পর্যন্ত হতে পারে। অনেকক্ষেত্রে রোগী সারা জীবনে মাত্র একবার ডিপ্রেশনে থাকলেও মেজর ডিপ্রেশন হবার প্রেক্ষিতে তার ছাপ আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। এবং এর ফলাফল হিসেবে দীর্ঘস্থায়ী বিক্ষিপ্ততা, মনোসংযোগে ঘাটতিসহ নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়। 

অ্যাটিপিকাল ডিপ্রেশন 

অ্যাটিপিক্যাল ডিপ্রেশন খুবই সাধারণ একটি সাবটাইপ। এতে করে দীর্ঘস্থায়ী কোন প্রভাব পড়ে না। কিন্তু খুব সহজেই এই ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। নিজের দিকে যাচাই করে দেখুন আপনার মানসিক অবস্থা দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে কিনা। সামান্য খুশিতেই আপনি কি উচ্ছ্বসিত হচ্ছেন কিংবা অল্পেই ভেঙ্গে যাচ্ছেন কিনা। এমন লক্ষণ থাকলে আপনি অ্যাটিপিক্যাল ডিপ্রেশনের রোগী। নিজের জীবনকে আপনি নিজেই এসময় ডিপ্রেশনের কবল থেকে মুক্ত করতে সক্ষম। 

ডিপ্রেশন কেন হয় এবং এর রিস্ক ফ্যাক্টর 

মোটিভেশন স্পিকারদের মতে, ডিপ্রেশন কেবলই মানসিক ভারসাম্যহীনতা কিংবা ব্রেনের মাঝে পুষ্টির অভাব। কিন্তু সত্যিকার অর্থে ডিপ্রেশন এর থেকেও বড় কিছু। ডিপ্রেশন মূলত জৈবিক, শারীরিক, মানসিকসহ সব ধরনের চাপের সমষ্টি। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা সিজন্যাল অ্যাফেক্টিভ অর্ডার বা স্যাড এবং বাইপোলার ডিসিশনকে ডিপ্রেশনের সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করি। যা প্রচলিত একটি ভুল। ডিপ্রেশনের বেশ কিছু কারণ এবং রিস্ক ফ্যাক্টর রয়েছে। এসবের জন্য ডিপ্রেশন বাড়তে পারে কিংবা সৃষ্টিও হয়ে থাকতে পারে। 

১। একাকিত্ব 
২। সামাজিক সাহায্য বা যোগাযোগের অভাব
৩। সাম্প্রতিক দুঃসহ কোন ঘটনা
৪। ডিপ্রেশনের পারিবারিক ইতিহাস
৫। বৈবাহিক বা সম্পর্কের মাঝে দ্বন্দ
৬। আর্থিক সমস্যা
৭। শৈশবের কোন দুঃসহ অতীত
৮। অ্যালকোহল বা নেশার উপস্থিতি
৯। বেকারত্ব 
১০। শারীরিক জটিল ব্যাধি যা আপনাকে বিক্ষিপ্ত রাখে 

ডিপ্রেশন কমাতে কী করণীয়? 

১। একাকীত্ব ডিপ্রেশনের ক্ষেত্রে জ্বালানীর মত শক্তি দেয়। তাই সবার আগে বন্ধু বা পরিবারকে বেশি সময় দেয়ার চেষ্টা করুন। কোনভাবেই একা থাকবেন না। আপনার যদিও মন চাইছে একা থাকতে কিংবা কারো সাথে কথা না বলতে, কিন্তু প্রিয় মানুষদের সামনাসামনি দেখা করা বা কথা বলা আপনাকে এই সময়গুলোতে খুব বেশি স্বস্তি দিতে সক্ষম। আপনার কথা যে শুনবে তাকে যে সমস্যার সমাধান দিতে হবে এমন কোন বাধ্যকতা নেই। কিন্তু সে যদি একজন ভাল শ্রোতা হয়ে থাকে, সেটিই আপনাকে সবচেয়ে বেশি ভাল রাখতে সাহায্য করবে। 

২। নিজের অবস্থান বদলের চেষ্টা করুন। স্বাভাবিক জীবনের বাইরে কিছু করার চেষ্টা করুন। প্রতিদিন অল্প হলেও ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ বা জিম করার মাধ্যমে আপনার নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি খুব সহজেই ঘটানো যেতে পারে। গান শুনুন, নিজের মনেই নিজেকে তৃপ্তি দেয়ার চেষ্টা করুন। এতে করে আপনার ডিপ্রেশন কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে। 

৩। খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনা ডিপ্রেশনের ক্ষেত্রে খুব ভাল কাজ দিতে পারে। কফি খাওয়ার অভ্যাস থাওলে তা কমিয়ে দিন। কারণ কফিতে থাকা ক্যাফেইন ডিপ্রেশন উস্কে দিতে সাহায্য করে। এছাড়া অ্যালকোহল এবং চর্বিও জাতীয় খাদ্য ডিপ্রেশনের সময় আপনাকে বিপাকে ফেলতে পারে। ফল খাবার চেষ্টা করুন। সেই সাথে শাকসবজি। এর ফলে আপনার ব্রেইনের ডিপ্রেসিভ অংশ নিজেকে সুস্থ রাখার প্রক্রিয়ায় অংশ নিবে। 

৪। নিজের পৃথিবী ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করুন। ট্রাভেলিং ডিপ্রেশন কাটাবার খুব ভাল একটি উপায়। খুব কম রাস্তার হলেও ঘুরতে বেরিয়ে পড়ুন। স্বেচ্ছাসেবী কাজে অংশ নিন। অন্যের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করুন, যেন আপনার কাজ দেখে আপনি নিজেই গর্ব করতে বা খুশি থাকতে সক্ষম হবেন। প্রথমদিকে এতে খুব কাজ না দিলেও নিজেকে যত ছড়াতে শুরু করবেন আপনি ততই স্বস্তি বোধ করতে থাকবেন। 

চিকিৎসা পদ্ধতি 

সত্যিকার অর্থে ডিপ্রেশনের প্রাতিষ্ঠানিক কোন চিকিৎসা নেই। কার্যকরী উপায়ে তো একেবারেই নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা আপনাকে ঘুমের ওষুধের মাধ্যমে সাময়িক মুক্তি দেবার চেষ্টা করে যা দীর্ঘস্থায়ই ক্ষতিও ঘটাতে সক্ষম। তবে আপনি যদি আত্মহত্যা প্রবণ কোন মানুষ হয়ে থাকেন আপনার অবশ্যই প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার কথা চিন্তা করা দরকার। 

বিভিন্ন থেরাপির মাধ্যমে ডিপ্রেশন থেকে বেরিয়ে আসা যায়। তবে থেরাপিগুলো মূলত ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ এর মতোই আপনার উপর কাজ করে থাকে। অন্যদিকে যেকোন প্রকার এন্টি ডিপ্রেসিভ ওষুধ আপনার দীর্ঘস্থায়ী উপকার করার বদলে নানাবিধ পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় আপনাকে আরো বেশি নাজুক করে দিতে পারে। তাই খুব বেশি অনিয়ন্ত্রিত না হলে প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্রেসিভ চিকিৎসা না নেয়াই উত্তম। 

ডিপ্রেশন মূলত মানসিক ব্যাধি। তাই এর মোকাবেলা করতে হবে আপনার মন মানসিকতার মাধ্যমেই। আত্মহত্যা বা একাকীত্ব কোনভাবেই ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির উপায় নয়। বরং নিজের মানসিক অবস্থার উন্নতি করার চেষ্টাই আপনার ডিপ্রেশন থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ। 

তথ্যসূত্র: হেল্প গাইড 

ওডি/এএন 
 

স্বাস্থ্য-ভোগান্তি, নতুন পরিচিত অসুস্থতার কথা জানাতে অথবা চিকিৎসকের কাছ থেকে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরামর্শ পেতেই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার পরামর্শ দেবার প্রচেষ্টা থাকবে আমাদের।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড