• রবিবার, ২৪ মার্চ ২০১৯, ১০ চৈত্র ১৪২৫  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন

চিনি না খেলেই উধাও ক্যানসার : সত্য নাকি গুজব?

  ডা. মোঃ সাইফুল ইসলাম ১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১০:১২

ক্যানসার
ছবি : প্রতীকী

প্রায় এক সপ্তাহ থেকে একটি তথ্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দৈনিক, অনলাইন নিউজ পোর্টালে ছড়াতে দেখছি। সংগত কারণেই সেগুলোর নাম প্রকাশ করছি না। তবে মাত্র ‘‘দুটি কাজেই উধাও ক্যানসার!’’ লিখে খোঁজ করলেই পেয়ে যাবেন তথ্যটি। সেখানে তারা বলছেন চিনি খাওয়া ছেড়ে দিলেই ক্যানসার থেকে বাঁচা যাবে। কারণ চিনি না পেলে ক্যানসার কোষগুলো প্রাকৃতিকভাবেই বিনাশ হয়ে যাবে!  

চিনি সম্পর্কে আমাদের মাঝে অনেক বিভ্রান্তিকর তথ্য রয়েছে। এমন কি বলা হয়ে থাকে অতিরিক্ত চিনি খেলে হতে পারে ক্যানসার। আর তাই চিনিকে আমাদের খাবারের শত্রু হিসেবেও গণ্য করা হয়।

আসলেই কি চিনি ক্যান্সারের কারণ অথবা ক্যানসার কোষের পুষ্টির যোগান আসে এই চিনি থেকে? চিনি কি ক্যানসার কোষের প্রিয় খাবার? অথবা চিনি ক্যানসার কোষের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়? তাই চিনি খাওয়া ছাড়লেই বেঁচে যাবেন ক্যানসার থেকে? চলুন একটু জানার চেষ্টা করি।

চিনির অনেকগুলো প্রকারভেদ রয়েছে। তবে সরল অণুর চিনি হচ্ছে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ। সরল চিনির অণু একত্রে চেইন বা শিকল আকারে অনেক বড় অণু গঠন করতে পারে। বিশালাকার এই শিকলগুলো হচ্ছে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা। চিনির সবচেয়ে পরিচিত রূপ হচ্ছে টেবিল সুগার বা চিনি যা আমরা খাই। টেবিল চিনি হচ্ছে এক ধরনের সরল চিনি যা পানিতে দ্রুত দ্রবীভূত হয় এবং মিষ্টি স্বাদযুক্ত করে। এই চিনির সঠিক নাম হচ্ছে সুক্রোজ। সুক্রোজ সাধারণত গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজের দানা দিয়ে তৈরি। টেবিল চিনি প্রাকৃতিক উৎস যেমন - আখ থেকে পরিশোধনের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। অ-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যেও প্রচুর পরিমাণ চিনি থাকতে পারে। যেমন- মধুর প্রায় সবটুকুই গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ।

চিনির শিকল অনেক দীর্ঘ হতে পারে। এই শিকল যত দীর্ঘ হয় এগুলোর মিষ্টি স্বাদ তত কমতে থাকে। এছাড়াও দীর্ঘ শিকলযুক্ত চিনি পানিতে দ্রবীভূত হতে চায় না। এই শিকলগুলোকে বলা হয় পলিস্যাকারাইড। পলিস্যাকারাইড হচ্ছে শর্করা জাতীয় খাদ্যের উপকরণ। ভাত, রুটি, পাস্তা, শাকসবজি, আলু যদিও মিষ্টি স্বাদযুক্ত নয় কিন্তু সেগুলোতে প্রচুর পরিমাণে শর্করা রয়েছে।

আমরা নানাভাবে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যের সাথে প্রচুর পরিমাণে চিনি খেয়ে থাকি। কারণ আমাদের শরীর কাজের জন্য মারাত্মকভাবে এই চিনির ওপর নির্ভরশীল। আমাদের শরীরের প্রতিটি অংশ জীবন্ত কোষ দ্বারা তৈরি। এই কোষগুলো শ্বাস-প্রশ্বাস, অনুভূতি, চিন্তা-ভাবনাসহ নানাবিধ কাজে সহায়তা করে।

যদিও বিভিন্ন অংশের কোষের কাজ ভিন্ন ভিন্ন হয়, তবুও একটি বিষয় সবগুলো কোষের ক্ষেত্রেই সাধারণ। তা হচ্ছে কোষগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় শক্তির। আর কোষের শক্তির যোগান দেয় গ্লুকোজ। মূলত প্রতিটি কোষের মৌলিক জ্বালানি হচ্ছে গ্লুকোজ।

যদি আমরা গ্লুকোজযুক্ত খাবার খাই তাহলে এই গ্লুকোজ রক্তপ্রবাহের সাথে বিভিন্ন কোষে পৌঁছায়। আমরা যদি কোনো শর্করা জাতীয় খাদ্য যেমন- পাস্তা খেয়ে থাকি তাহলে আমাদের লালা গ্রন্থির এনজাইম সেগুলোকে ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত করে। যদি কোনো সময় আমাদের খাদ্যে শর্করা না থাকে, তাহলে চর্বি ও প্রোটিনকে রূপান্তর করে কোষগুলো গ্লুকোজ গ্রহণ করে। কারণ কোষগুলোর বেঁচে থাকার জন্য গ্লুকোজের প্রয়োজন।

এখন ক্যানসার নিয়ে একটু ধারণা নেওয়া যাক। ক্যানসার হচ্ছে কোষের রোগ। ক্যানসার কোষ সাধারণত দ্রুত বড় হয়, খুবই দ্রুত গতিতে পুনরূৎপাদিত হতে পারে এবং এদের প্রয়োজন হয় প্রচুর শক্তির। আর এই শক্তির যোগান যেহেতু দেয় চিনি বা গ্লুকোজ তাই এদের জন্য প্রয়োজন প্রচুর গ্লুকোজ। চিনি ছাড়াও ক্যানসার কোষের জন্য আরও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের প্রয়োজন হয়। যেমন- অ্যামাইনো এসিড ও চর্বি। অর্থাৎ জানা গেল, ক্যানসার কোষ শুধু চিনিই গ্রহণ করে না।

আমাদের মিডিয়ায় যে তত্ত্বটি ছড়িয়ে পড়েছে তা হচ্ছে, যেহেতু ক্যানসার কোষের জন্য প্রচুর চিনির প্রয়োজন। সুতরাং যদি চিনি খাওয়া ছেড়ে দেওয়া যায়, তাহলে ক্যানসার কোষ জন্ম বন্ধ হয়ে যাবে এবং প্রাকৃতিকভাবেই ক্যানসার ভালো হয়ে যাবে। এমনকি ক্যানসারের জন্মই হবে না!

দুর্ভাগ্যজনক হলেও এই বিষয়টি এত সহজ নয়। কারণ শরীরের প্রতিটি সুস্থ কোষের জন্যই গ্লুকোজের প্রয়োজন। আর এখনও তেমন পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়নি যে, শুধুমাত্র সুস্থ কোষগুলোই গ্লুকোজ গ্রহণ করবে এবং ক্যানসার কোষ তা গ্রহণ করবে না।

আমেরিকান ইন্সটিটিউশন ফর ক্যানসার রিসার্চর এর তথ্যমতে, চিনির সাথে সরাসরি ক্যান্সারের কোনো সম্পর্ক নাই। তবে অতিরিক্ত চিনির কারণে শরীরের ওজন ও চর্বি বৃদ্ধি পায়। অতিরিক্ত চর্বির কারণে বেশকিছু ক্যান্সারে ঝুঁকি বাড়ে।

তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত রোগীকে চিনি জাতীয় খাদ্য কম খাওয়ানোও উচিত হবে না। কারণ ক্যানসার রোগীর চিকিৎসার সময় তাদের ওজন হ্রাস পায়, শরীরের ওপর মারাত্মক ধকল পড়ে। সুতরাং পুষ্টিহীনতার জন্য তাদের সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্থ হতে পারে। এমনকি জীবননাশেরও কারণ হতে পারে।

বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে পাঠকরা একটু সচেতন হলেই ভুল তথ্যের প্রচার বন্ধ হতে পারে। আজকাল প্রথম সারির মিডিয়াগুলোও কোনো প্রকার তথ্য যাচাই না করেই জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। সুতরাং সঠিক তথ্যের জন্য চোখ কান খোলা রাখতে হবে।

তথ্যসূত্র : ক্যানসার রিসার্চ ইউকে, এআইসিআর ডট অর্গ।
 

স্বাস্থ্য-ভোগান্তি, নতুন পরিচিত অসুস্থতার কথা জানাতে অথবা চিকিৎসকের কাছ থেকে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরামর্শ পেতেই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার পরামর্শ দেবার প্রচেষ্টা থাকবে আমাদের।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড