• বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

চোখের শুষ্কতা : সচেতন হওয়ার সময় এখনই

  ইশরা তুজ জোহরা মারুফা

১০ নভেম্বর ২০২১, ১২:৩৮
চোখের শুষ্কতা
চোখের শুষ্কতার একটি লক্ষণীয় উপসর্গ হলো চোখ লাল হয়ে থাকা (ছবি : সংগৃহীত)

চোখের পানি শুকিয়ে যাওয়ার সমস্যায় ভোগেন অনেকেই। অ্যালার্জি, মৌসুমি সর্দি বা কন্টাক্ট লেন্স থেকে এ শুষ্কতা ও চুলকানি হয়ে থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে ড্রাই আই বা চোখের শুষ্কতা বলে। আমদের চোখের প্রায় ৭৫ শতাংশই পানি। আর এ পানি শুকালে চোখের নানা সমস্যা দেখা দেয়।

আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ অফথালমোলজির মতে, এটি তখনই হয় যখন আমাদের চোখ পিচ্ছিল বা ভেজা রাখতে চোখ পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি তৈরি করতে পারে না। আমেরিকান জার্নাল অফ অফথালমলোজি এক গবেষণায় বলেছে, আমেরিকানদের মধ্যে আনুমানিক ১৬ মিলিয়ন মানুষ চোখের শুষ্কতার রোগে আক্রান্ত। যদিও এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

শুষ্ক চোখের বেশকিছু লক্ষণ রয়েছে যা দেখা গেলে খুব দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। আসুন জেনে নিই শুষ্ক চোখের লক্ষণগুলো সম্পর্কে-

১.অস্পষ্ট দৃষ্টি

শুষ্ক চোখের একটি সাধারণ উপসর্গ হলো অস্পষ্ট দৃষ্টি। সকালে ঘুম থেকে উঠে দৃষ্টিশক্তি পরিষ্কার থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে শুষ্কতা বাড়ে ফলে ঝাপসা দেখা যায়। সল্ট লেক সিটির ইউনিভারসিটি অফ উটাহ মরান আই সেন্টারের চক্ষুবিদ্যা ও ভিজুয়্যাল সায়েন্সের সহযোগী অধ্যাপক অ্যামি লিন এর মতে- যখন চোখের পানির আস্তরণটি শক্তিশালী ও মসৃণ থাকে তখন এর মাধ্যমে খুব ভালো দেখতে পাওয়া যায়।

ডেনভারের ইনসাইট ভিশন গ্রুপের অপ্টোমেট্রিস্ট এবং ইলিনয় কলেজ অফ অপ্টোমেট্রির সাইট রেসিডেন্সি ডিরেক্টর টম ক্রুস বলেন, শুষ্ক চোখে থাকা কর্নিয়াল ক্যালাস দৃষ্টিকে বাধাগ্রস্ত করে। আমাদের চোখে পানির একটা পাতলা আস্তরণ থাকে। পানি, তেল, পিচ্ছিল মিউকাস আর জীবাণুরোধী অ্যান্টিবডি দিয়ে তৈরি এই চোখের পানি। যেখানে আলো এসে চোখে যাওয়ার আগে প্রথম আঘাত করে। যখন এ স্তরে কোনো ব্যাঘাত ঘটে তখন শুষ্ক চোখের ক্ষেত্রে এ অবস্থায় দৃষ্টিশক্তিও নষ্ট হতে পারে।

২. চোখ লাল থাকা

চোখের শুষ্কতার আর একটি লক্ষণীয় উপসর্গ হলো চোখ লাল হয়ে থাকা। চোখের সাদা অংশে থাকা রক্তনালীগুলো ফুলে ওঠার ফলে চোখকে লাল দেখায়। চোখে যদি কোনো সংক্রমণ বা অ্যালার্জি না থাকে তবে বুঝে নিতে হবে চোখের শুষ্কতার কারণে এমনটা হয়েছে।

টাম্পার ড্রাই আই অ্যান্ড কর্নিয়া ট্রিটমেন্ট সেন্টারের মেডিকেল ডিরেক্টর স্টিভেন মাসকিন চোখ লাল হয়ে থাকা সম্পর্কে বলেন, সঠিক তৈলাক্তকরণ উপাদান ব্যতীত চোখের পলক ফেলার সময় কর্নিয়ার সাথে চোখের সাদা অংশের ঘর্ষণে জ্বালাতন অনুভূত হয়। যদি চোখে পানির অভাব থাকে, তবে চোখের পৃষ্ঠের কোষগুলোতে ব্যথা হয় কারণ তা সুরক্ষিত নয়। মূলত মেইবোমিয়ান গ্রন্থি ঠিকমতো কাজ না করার কারণে চোখের এই লালচে ভাব ও প্রদাহ হতে পারে। অর্থাৎ চোখের পাতার আস্তরণে থাকা ক্ষুদ্র তেল গ্রন্থিগুলো সঠিক পরিমাণে তৈলাক্তকরণ উপাদান নিঃসরণ করতে পারছে না। তাই চোখ লাল দেখায়।

৩. চোখ থেকে অতিরিক্ত পানি পড়া

জেনে অবাক হবেন যে চোখ থেকে অতিরিক্ত পানি পড়াও শুষ্ক চোখের একটি উপসর্গ। এ সম্পর্কে ডাঃ ক্রুস বলেন, এর কারণ হতে পারে যখন আপনার কর্নিয়া অনুভব করে যে এটি চোখের শুষ্কতার কারণে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি তৈরি করতে পারছে না তখন এটি টিয়ার গ্রন্থিগুলোকে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সঙ্কেত পাঠায় ফলে অতিরিক্ত পানি গড়িয়ে পড়ে।

চোখ থেকে পানি গড়িয়ে গালে পড়ার অর্থ হলো টিয়ার ফিল্ম চোখকে যথেষ্ট আর্দ্র করতে পারছে না। তাই শরীর শুষ্ক চোখকে আর্দ্র করতে জরুরি ভিত্তিতে অশ্রু উৎপাদন করে। এর ফলে চোখের পানি বেড়ে গিয়ে গড়িয়ে পড়ে।

জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ মেডিসিন উইলমার আই ইনস্টিটিউটের চক্ষুবিদ্যার এমডি অধ্যাপক এসেন আকপেক বলেন, যাদের চোখ থেকে অতিরিক্ত পানি পড়ে তারা বাষ্পীভূত শুষ্ক চোখের সমস্যায় ভোগেন। চোখে যখন তেলের স্তর অপর্যাপ্ত থাকে তখন পানির স্তরটি দ্রুত বাষ্পীভূত হয়, যার ফলে চোখ থেকে অতিরিক্ত পানি পড়ে।

৪. চোখ ভারী বা ক্লান্তি অনুভব করা

আমেরিকান চক্ষুবিশেষজ্ঞ আরতি শাহ বলেন, চোখের শুষ্কতার জন্য যে কারণগুলো দায়ী এর মধ্যে অন্যতম হলো চোখ ভারী হয়ে আসা বা ক্লান্তি অনুভব করা।

ডাঃ আকপেক এর মতে, আমাদের চোখের তরল বা পানির পৃষ্ঠে যখন পানির পরিমাণ অপর্যাপ্ত হয়ে যায় তখন চোখ বার বার পলক ফেলে চোখের পৃষ্ঠকে রক্ষা করার চেষ্টা করে ফলে চোখে ক্লান্তি অনুভূত হয়।

৫.আলোক সংবেদনশীলতা

চোখের শুষ্কতায় চোখ আলোর প্রতি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। ডাঃ শাহ বলেন, যখন চোখের তরল পৃষ্ঠে অস্পষ্টতা বা ভাঙ্গন দেখা দেয় তখন চোখ আলোর প্রতি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। কারণ আলো চোখের ভেতরে পৌঁছানোর পূর্বে চোখের পানির স্তরে প্রথমে আঘাত করে। যদিও পানির স্তরকে হতে হয় মসৃণ ও সমান কিন্তু চোখের শুষ্কতার জন্য মাঝেমধ্যে এটি অসমান ও অমসৃণ হয়ে পড়ে। এই সমস্যাকে ফটোফোবিয়াও বলা হয়। ফটোফোবিয়া আক্রান্ত রোগীরা হঠাৎ আলোতে আসলে চোখ বন্ধ করে ফেলেন।

৬.চোখে কিছু পড়ার অনুভূতি

যখন চোখের পানি আদ্রতা ধরে রাখতে পারে না তখন চোখ ন্যাচারাল লুব্রিকেশন বা প্রাকৃতিক মসৃণতা হারায়। ফলে চোখে কিছু পড়েছে এমন ধরণের অস্বস্তিকর অনুভূতি হয়। যেমনটা চোখে বালু পড়লে মনে হয়। ডাঃ লিন বলেন, আক্ষরিক অর্থে আপনার চোখ ও কোষের শুষ্কতা চোখে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। তবে আশার কথা হলো এতে বড় ধরণের কোনো ক্ষতি হয় না। যখন ক্ষত সেরে যায় তখন চোখ আরও আদ্র হয়ে ওঠে।

৭.পলক ফেলতে অসুবিধা

ডাঃ শাহ’র মতে, চোখের শুষ্কতার কারণে ন্যাচারাল লুব্রিকেশনের অভাব হয়। এতে চোখ মসৃণতা হারায় ফলে আপনি চোখের পাতা ফেলার সময় অস্বস্তি অনুভব করতে পারেন। তিনি এই অবস্থাকে ওয়াটার স্লাইডের সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেমন আপনি একটি শুকনো ওয়াটার স্লাইডে বসলে বাধাগ্রস্ত হবেন ঠিক তেমনটাই অনুভূত হয় যখন চোখে পর্যাপ্ত পরিমাণে লুব্রিকেশন না থাকে।

৮. জ্বালাপোড়া

চোখের আরামের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ লুব্রিকেশন দরকার। এইভাবে চোখকে আদ্র রাখার জন্য মেইমবাম অর্থাৎ চোখের তৈলাক্ত পদার্থ নিঃসরণ হয়। যখন মানুষ গভীর মনোযোগের সঙ্গে কাজ করে তখন পর্যাপ্ত পরিমাণে চোখের পলক ফেলে না। অথবা চোখের পলক ফেলার সময় ঠিকমতো চোখ বন্ধ করে না। এটাও একটা কারণ যে চোখের শুষ্কতায় ভোগা রোগীরা চোখে বা চোখের পাতায় জ্বালাপোড়া অনুভব করে।

ডাঃ মাস্কিন বলেন- যখন আপনার চোখের পানি সহজেই বাষ্পীভূত হয়ে যায়, তখন চোখ শুষ্ক হয়ে পড়ে ফলে চোখে জ্বালাপোড়া অনুভূত হয়।

৯.কাঁদতে না পারা

কান্নার সময় চোখ দিয়ে পানি না আসা শুষ্ক চোখের একটি উপসর্গ। চোখের পানির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাওয়া হরমোনের পরিবর্তন ও ওষুধের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া থেকেও হতে পারে। চোখের পানি শুকিয়ে যাওয়ার সমস্যায় ভোগেন অনেকেই। সম্ভবত জর্জেন সিনড্রোম যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় ব্যাঘাত ঘটায় যার ফলে চোখ, মুখ ও যৌনাঙ্গে শুষ্কতা দেখা দেয়।

চোখের শুষ্কতা এড়াতে ঘরের বাতাস যাতে আদ্র থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তাছাড়া ডিজিটাল ডিভাইস যেমন টেলিভিশন, কম্পিউটারের ও মোবাইল ব্যবহারের সময় চোখের পলক ফেলুন। এক্ষেত্রে, কিছু সময় পর পর কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে রাখুন, এতে চোখ আরাম পাবে। চোখের শুষ্কতার লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করুন। চোখের সুরক্ষায় যত্নশীল হোন।

ওডি/নিমি

স্বাস্থ্য-ভোগান্তি, নতুন পরিচিত অসুস্থতার কথা জানাতে অথবা চিকিৎসকের কাছ থেকে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরামর্শ পেতেই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যার পরামর্শ দেবার প্রচেষ্টা থাকবে আমাদের।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড