• সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১ আশ্বিন ১৪২৬  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন

সর্বশেষ :

নিজ দেশে ফিরে যেতে রোহিঙ্গাদের দুই শর্ত||এ পি জে আব্দুল কালামের স্মৃতিতে ভূষিত প্রধানমন্ত্রী  ||উদ্বেগ থাকলেও ভারতের ওপর বিশ্বাস রাখতে চাই : পররাষ্ট্রমন্ত্রী ||ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি ঢাকতেই ছাত্রদলের কাউন্সিল বন্ধ : রিজভী ||কাশ্মীরে জঙ্গি অনুপ্রবেশের অভিযোগে সীমান্তে‌ হাই অ্যালার্ট||ভারতের পর এবার বিশ্বকে পরমাণু যুদ্ধের হুঁশিয়ারি পাকিস্তানের||সোমবার আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নেবেন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক||মেক্সিকোয় কুয়া থেকে ৪৪ মরদেহ উদ্ধার করল বিজ্ঞানীরা||অন্যায় করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না : কাদের    ||সৌদির তেল স্থাপনাতে হামলায় ইরানকে দায়ী করল যুক্তরাষ্ট্র

‘মাই ইডিশ মমি’ : নাৎসিদের হাতে নিষিদ্ধ হয়েছিল যে গান!

  সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি

০৩ জুন ২০১৯, ১২:৩২
সোফি টাকার
সোফি টাকার; (ছবি- সংগৃহীত)

গান তো কতভাবেই মানুষকে প্রভাবিত করে। কখনো কষ্টের সাগরে নিমজ্জিত করে, কখনো মন ভালো করে দেয়, কখনো আবার ভীতু কোন মানুষকেও করে তোলে অসম্ভব সাহসী আর প্রতিবাদী। 

কিন্তু ইডিশ গান ‘ মাই ইডিশ মমি’ যে এভাবে মানুষকে নাড়া দেবে, আর শেষ অব্দি নাৎসি সেনাদের লক্ষ্যে পরিণত হবে সেটা মনে হয় ভুলেও কেউ কখনো ভাবতে পারেনি। সময়টা ছিল ১৯২০। সেসময় সোফি টাকার নামের এক শিল্পী নিজের আবেদনময়ই সব গানের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। ভিড়ের মধ্যে দর্শকের মন মাতাতে শরীরের নানা অঙ্গভঙ্গী করে গান করতেন এই গায়িকা। কিন্তু ১৯২৫ সালের সময় সেটা। মঞ্চে উঠে আর কিছু নয়, নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে যায় সোফির।

সেই রাতেই নতুন এক গান তৈরি করেন টাকার। মানুষকে আবেদনের আর প্রেমের গান না শুনিয়ে শোনান নিজের ইহুদী মায়ের মৃত্যুর গান। মায়ের মৃত্যুতে কষ্ট পেয়েছিলেন সোফি। সেই কষ্টই ফুটে ওঠে এই গানে। ইংরেজি আর ইডিশ- দুই ভাষাতেই সাড়া জাগায় গানটি। গানটি শুনে চোখের পানি ফেলেননি এমন খুব কম মানুষই সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। নিমিষেই সবার মন জয় করে নেই এই গান। হয়ে যায় এক জাতীয় সঙ্গীত।

১৯২৮ সালে কলোম্বিয়ার জন্য গানটি রেকর্ড করা হলে লক্ষাধিক কপি বিক্রি হয়ে যায়। দুই ভাষাতেই গানটি ১৯২০-১৯৩০ সালের মধ্যে পুরো পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দেয়। সেসময় দেশ ছেড়ে চলে আসা সমস্ত মানুষের মৃত মায়ের প্রতি ভালোবাসা ফুটে ওঠে এই গানে। ইহুদীদের কণ্ঠে আর বেশি ফুটে ওঠে ‘মাই ইডিশ মমি’ বা আমার ইডিশ মা। আমেরিকার অভিবাসীদের জন্য গানটি বেদনাদায়ক ও আকর্ষণের ব্যাপার তো ছিলই। সেসময় নাৎসি জার্মানির কর্মকান্ড ও হলোকাস্টের বেলায়ও অনেক বড় ভূমিকা রাখে এই গানটি। 

তৎকালীন জীবনী লেখক লড়েন রেবেকা স্ক্লারফের লেখায় জানা যায় যে, গায়িকা সেসময় সবার মনের বেদনাকে এই গানের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে চাইলেও পরবর্তীতে ঘর থেকে অনেক দূরে থাকা ইহুদী ও অভিবাসীদের জন্য এটি তিক্ত এক অভিমান আর কষ্টের নাম ছিল। 

গানটির লাইন ছিল এমন- 

My yiddishe momme I need her more than ever now 
My yiddishe momme I'd like to kiss that wrinkled brow 
I long to hold her hands once more as in days gone by 
And ask her to forgive me for things I did that made her cry

(আমার ইডিশ মা, আমার তাকে এখন আর বেশি করে দরকার
আমার ইডিশ মা, তার ভাঁজ পরা ভ্রূতে আমি চুমু খেতে চাই
সময় যত চলে যায় আমি তার হাত আর বেশি ধরে রাখতে চাই
এবং তাকে কাঁদিয়েছি বলে আমি ক্ষমা চাই)

গানটির লেখক ও সুরকার ছিলেন যথাক্রমে জ্যাক ইয়েলেন এবং লিউ পলক। সোফি ও ইয়েলেন দুজনেই ছিলেন ১৯ শতকের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে আসা ইহুদী। সেসময় ১৮৮১ থেকে ১৯২৪ সালের মধ্যে প্রায় আড়াই মিলিয়ন মানুষ অত্যাচার আর বৈষম্য থেকে বাঁচতে এবং জীবন রক্ষা করতে ইউরোপে চলে এসেছিলেন। 

তারা তাদের সাথে নিয়ে এসেছিলেন ইডিশ গান, কবিতা আর ভাষাকে। রাতারাতি নিউ ইয়র্কে ইডিশ পত্রিকা, বই আর থিয়েটারের জন্ম হয়। ইডিশদের অনেক প্রতিভা এই স্থানে বিকশিত হয়। টাকার ছিলেন তেমনই একজন। ইয়েলেনের সাথে পরিচয়ের আগে থেকেই টাকার বেশ নামডাক করে ফেলেছিলেন।

ওদিকে ইয়েলেনেরও লেখা কিছু বিখ্যাত গান ছিল। টাকারের শিকড়কে স্বীকৃতি দিতেই ‘মাই ইডিশ মমি’ গানটির জন্ম হয়। গানটি প্রথম গাওয়ার সময় তাকারের মা অসম্ভব অসুস্থ ছিলেন। এর কিছুদিন পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ততদিনে গানটি অসম্ভব বাজারে খুব ভালো বিক্রি হয়। 

১৯৩০ সালে এই গানের প্রভাবে প্রভাবিত হয়েই ‘ম্যায়নে ইডিশ মমি’ নামক একটি মিউজিক্যাল ফিল্ম নির্মাণ করা হয়। সেই প্রথম ইডিশ ভাষা কোন কথা বলতে পারা পর্দায় ব্যবহার করা হয়। 

১৯৩১ সালে টাকার ইউরোপে নিজের শো করেন। তবে সেখানে সবাই যে গানটিকে খুব একটা পছন্দ করেছিলেন তা নয়। ফ্রান্সে একটি শো করাকালীন সময়ে সেখানকার জনতার মধ্যে অ্যান্টি-সিমেটিক বা ইহুদী-বিদ্বেষী ধারণা তৈরি হয় এবং ইহুদীরা চিৎকার চেঁচামেচি করে। কোন বড় সমস্যা হয়ে যাবে এই ভয়ে দ্রুত টাকার নিজের গান পাল্টে নেন। তবে সেটা কেবল অন্যরকম কিছুর শুরু ছিল। ১৯৩৩ সালে হিটলার ক্ষমতায় এলে নাজিরা ‘মাই ইডিশ মমি’ গানটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং নষ্ট করে ফেলে। 

“আমি স্তম্ভিতের মতো বসে ছিলাম এবং মাননীয় হিটলারের কাছে চিঠি লিখেছিলাম। এখন পর্যন্ত, আমি কোন জবাব পাইনি।” টাকার পরবর্তীতে লিখেছিলেন। 

পরবর্তীতে এই জনপ্রিয় গানটি হলোকাস্টের সময় নির্যাতিত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ইহুদী ভুক্তভোগীরা গাইতে শুরু করে। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে নিউ ইয়র্ক টাইমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায় যে ইডিশ গান নিয়ে কর্মরত তৎকালীন কর্মী ছানা ম্লোটেক পূর্ববর্তী এক কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মানুষের কাছ থেকে জেনেছিলেন যে, গানটি এতোটাই প্রভাব ফেলেছিল সেসময় যে জার্মান পাহারাদারেরাও ক্যাম্পের চারপাশে এই গানটি গাইতো এবং কেউ কেউ শুধু গানটির কারণেই আবেগি হয়ে ক্যাম্পে আটকদের বেশি খাবার দিতে নির্দেশ দিত। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও এর পরবর্তী সময়েও টাকার গেয়েছেন। গার্মান আর্মির মানুষেরাও তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন পরে এতো সুন্দর করে গাওয়ার জন্য। এরপর অনেক দিন পার হয়েছে, ধীরে ধীরে ইডিশ ভাষা হারিয়ে গেছে আমেরিকা থেকে। তবে টাকারের ‘মাই ইডিশ মমি’ গানটি এখনও টিকে আছে। বেঁচে আছে সবার মনে।

সূত্র- হিস্টোরি.কম। 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড