• বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৬  |   ৩৫ °সে
  • বেটা ভার্সন

যেভাবে এলো জব্বারের বলী খেলা

  অধিকার ডেস্ক

২৪ এপ্রিল ২০১৯, ২২:১২
বলী খেলা
চট্টগ্রামের শত বছরের ঐতিহ্য জব্বারের বলী খেলা। (ছবি : বিবিসি)

'জব্বারের বলীখেলা' নাম শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে দুজন শক্তিমান পুরুষের শক্তির লড়াইয়ের দৃশ্য। হাজার হাজার মানুষের সামনে দুজন মানুষ কুস্তি লড়ছে কে সেরা তাই প্রমাণের জন্য। চট্টগ্রাম অঞ্চলের শত বছরের ঐতিহ্য এই বলী খেলা। জনপ্রিয়তার বিচারে এই খেলার অবস্থান চট্টগ্রামবাসীদের কাছে একদম প্রথমেই। কুস্তি খেলাকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় বলী খেলা। শতবছরের এই ঐতিহ্যের শুরুটা হয়েছিল ১৯০৯ সালে চট্টগ্রামের জমিদার আব্দুল জব্বার সওদাগর এর হাত ধরে। এই বছর অনুষ্ঠিত হবে এই খেলার ১১০ তম আসর।  

প্রতি বছর বৈশাখ মাসে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের লালদীঘির ময়দানে আয়োজন করা হয় এই বিখ্যাত কুস্তি খেলার। এই খেলাকে ঘিরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠেছে আরও কিছু সংস্কৃতি। বিশেষ করে এই খেলাকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। তিনদিন পর্যন্ত চলে এই বৈশাখী আয়োজন।

জব্বারের বলী খেলার শুরুটা বিশিষ্ট ধনী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি জমিদার আবদুল জব্বার সওদাগরের হাত দিয়ে হলেও এত বছর অবধি তা ধরে রেখেছেন তার বংশধরেরাই। আব্দুল জব্বার নিজের নামেই এই খেলার নাম করণ করেছেন। এই খেলা প্রচলন করার পেছনের ইতিহাস ঘাটলে জানা যায়, মূলত তরুণদের শারিরীকভাবে অনেক বেশি সামর্থবান করে গড়ে তুলতে এই খেলার প্রচলন করেন জমিদার আব্দুল জব্বার। যে সময় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে তখনই তিনি তরুণদের শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে দেখেন। তরুণরা যদি সামর্থবান থাকে তবে অনেক কিছুই সম্ভব। তিনি চেয়েছিলেন এই শক্তিমান তরুণরা আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করুক। মূলত এই ধারণা থেকে তিনি এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন বলে জানা যায়। 

এই খেলা নিয়ে গবেষণা করছেন  চিটাগাং সেন্টার ফর অ্যাডভ্যান্স স্টাডিজের সদস্য সচিব ড. শামসুল হোসাইন। তার কাছ থেকে জানা যায়, "কুস্তি এই অঞ্চলের অত্যন্ত প্রাচীন সাংস্কৃতিক উপকরণ। মধ্যযুগে সেনাবাহিনীতে যারা চাকরি নিতো তাদের শারীরিক সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্য তারা কুস্তি করতেন। সেখান থেকেই এর শুরু।"
তিনি আরও জানান, "এর মধ্যে আরেকটি বিষয় ছিল মুসলিম তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো। সেই সময় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামের হিন্দুদের অংশগ্রহণ বেশি ছিল। " 

আব্দুল জব্বার সওদাগরের নাতি শওকত আনোয়ার বাদলের কাছ থেকে জানা যায় আরও বেশ কিছু তথ্য। তার জন্ম ১৯৫৫ সালে। এই প্রতিযোগিতার শুরুটা তিনি দেখতে না পারলেও তার বাবার মুখে এর অনেক গল্প শুনেছেন। তিনি জানালেন,  "আমার দাদার মৃত্যুর পর আমার বাবা এর দায়িত্ব নেন। তিনিই এটার আয়োজন করতেন। আমরা যখন দেখেছি, তখন এই প্রতিযোগিতা এতটা প্রসারিত ছিল না। এটি শুধুমাত্র লালদিঘী এলাকার বলীদের জন্যই আয়োজন করা হতো।"

সেই সময়ের পরিবেশ কেমন ছিল সেই প্রশ্নের উত্তরে তার কাছ থেকে জানা গেল অনেক কথা। তিনি বলেন,  "আমি তখন স্কুলে পড়ি। সে সময় এলাকায় ঢোল বাজত, সাথে থাকতো কুস্তিগীরেরা। আমরা ঢোলের পিছে পিছে ঘুরতাম। এভাবে তারা এসে মাঠে ঢুকত। " 

ঐতিহ্যের মধ্যেও দিনে দিনে এসেছে নানা পরিবর্তন। একসময় এই খেলা কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ে তারপর আবার শুরু হয় নতুন উদ্দ্যোমে সবার প্রচেষ্টায়। প্রথম টেলিভিশন সম্প্রচারের পর জনপ্রিয় হয়ে ওঠে জব্বারের বলী খেলা। ধীরে ধীরে এই খেলার খবর ছড়িয়ে পড়ে দেশ পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও। 

একটা সময় ছিল যখন এই খেলা শুরু হওয়ার মাস দুয়েক আগে থেকেই আশপাশের জেলা থেকে বলীরা এসে জড়ো হতেন চট্টগ্রামে এসে। আব্দুল জব্বার সওদাগরের বাড়িতেই একটা বৈঠকখানা ছিল। সেই ঘরেই থাকতেন। সেখানেই তারা খাওয়াদাওয়া করতেন এবং দিনভর নানা শারীরিক কসরত ও অনুশীলন করতেন, প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি নিতেন। ধীরে ধীরে  সারা দেশ থেকেই কুস্তিগীরেরা আসতে থাকেন এই আয়োজনকে উদ্দেশ্য করে।  
শওকত আনোয়ার বলেন, "আমি যখন লেখাপড়া করি তখন দেখতাম চট্টগ্রামের আশপাশের জেলা - নোয়াখালী, কুমিল্লা এসব জায়গা থেকেও বলীরা আসতে শুরু করলো। এরপর সারা দেশ থেকে আসতে শুরু করে। এমনকি একবার আমার মনে আছে, ফ্রান্স থেকে দুজন কুস্তিগীর এখানে অংশগ্রহণ করেছিলো।"


অনেক প্রতিযোগী এই খেলায় অংশ নেয় প্রতি বছর। এই বছর জব্বারের বলী খেলায় অংশ নিচ্ছে ৬০ জন প্রতিযোগী।  এই প্রতিযোগিতার সবচাইতে বেশি পরিচিত নাম কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার দিদারুল আলম বা দিদার বলী, যিনি সব মিলিয়ে সাতবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। বছর দু'য়েক আগে অবসরে গেছেন তিনি। 

জব্বারের বলীখেলা আয়োজন কমিটির সভাপতি জওহরলাল হাজারী বলেন, "সারা বাংলাদেশে যত কুস্তিগীর আছেন, যাদের প্রতিভা বিকশিত হওয়ার কোন পন্থা নেই, তাদের এখানে আসতে সহযোগিতা করা হয়। তাদের এই প্রতিযোগিতায় কসরত প্রদর্শন করার সুযোগ দেয়া হয়।"

জওহরলাল হাজারী আরও বলেন, চট্টগ্রামের বলী খেলাকে আরও প্রসারের চিন্তা করা হচ্ছে। সে রকম সরকারি আশ্বাস রয়েছে। শহরের স্টেডিয়ামের পাশে প্রশিক্ষণের জন্য একটি কেন্দ্রে স্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সূত্র : বিবিসি 

ওডি/এসএম 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড