• সোমবার, ২৭ মে ২০১৯, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬  |   ৩৬ °সে
  • বেটা ভার্সন

স্কুটি চেপে স্বপ্ন ছড়ান যারা

  সৈয়দ মিজান ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১৯:২৭

সাকিয়া ও মানসী
বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় পা ফেলেছেন এই দুই ভ্রমণকন্যা। (ছবি : সংগৃহীত)

সাকিয়া হক এবং মানসী সাহা দুজন সেই ছোট্টবেলা থেকেই বন্ধু। একই স্কুল, কলেজে পড়াশোনা করেছেন। একই সাথে ডাক্তারি পড়া শুরু ঢাকা মেডিকেল কলেজে। দুজনই বড় হয়েছেন খুলনায়। ঢাকায় আসার পর খুব বেশি বন্ধু-বান্ধবও ছিলনা তাদের। ডাক্তারি পড়াশোনার চাপে কোথাও ঘুরতে যাবার অভ্যাস বা সঙ্গী কোনোটাই গড়ে ওঠেনি কারোরই। কিন্তু মনের মধ্যে কেমন দুর্বার একটা ইচ্ছে পুষে রাখতেন একদিন সত্যিই ঘুরে বেড়াবেন। এভাবেই হয়তো চলত দিন। কিন্তু একদিন সব ইচ্ছের বাঁধ ভাঙলো। শুরু হলো ঘুরাঘুরি হুট করেই। গল্পের শুরুটা ২০১৬ সালে হলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তারা ঘুরে ফেলেছেন পুরো বাংলাদেশ। দেশের সবকটি জেলাতেই পা পড়েছে সাকিয়া হক এবং মানসী সাহার। শুধু জেলায় জেলায় ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়েন নি। ঘুরছেন দেশ থেকে দেশেও।

সাকিয়া মানসী

শুধুমাত্র নারীদের নিয়েই ভ্রমণ করেন ট্রাভেলেটস অফ বাংলাদেশ। (ছবি : ট্রাভেলেটস অফ বাংলাদেশ ফেসবুক পেজ)

শুরুর গল্পটা খুব যে সহজ ছিল তা না। মেডিকেলে পড়ার চাপ, বাড়ির অনুমতি, নানান প্রতিবন্ধকতা ঘিরে ধরত চারপাশ থেকে। ঘুরি ঘুরি করেও আর ঘোরা হয়ে উঠতো না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভ্রমণ সংক্রান্ত পেজ আর গ্রুপগুলোতে ঢুঁ মারতেন নিয়মিতই। বাইরের দেশের ভ্রমণ গ্রুপগুলোতে বাংলাদেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর সুন্দর সুন্দর ছবি দিয়ে ভিনদেশিদের আমন্ত্রণ জানাতেন বাংলাদেশ ঘুরে যেতে। অনেকে সেখানে মন্তব্য করত বাংলাদেশে ঘুরতে আসবে। সাকিয়া আর মানসীর বেশ ভালোই লাগতো ব্যাপারগুলো। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। ততদিনে সাকিয়া হক টুকটাক ঘুরাঘুরি শুরু করে দিয়েছেন। বরিশাল, কুয়াকাটা, কক্সবাজারের মতো কয়েকটি জায়গায় ঘুরে বেড়ানো হয়ে গেছে। মানসী সাহার মনেও ইচ্ছে জাগছিল কোথাও ঘুরতে যাবেন। হঠাৎই তাদের কাছে একটা ফোন আসে। এক ভিনদেশি নারী কণ্ঠ। সুইজারল্যান্ড থেকে কোরিনার নামের এক মেয়ে আসবে বাংলাদেশ ঘুরতে। তার গাইড হবার জন্য প্রস্তাব দেয়া হয় দুইজনকে। দুজনই এক কথায় রাজি হয়ে যান। এর আগে ভ্রমণ অভিজ্ঞতা না থাকলেও দেশটা ঘুরে দেখতে পাবেন পুরো এক মাস এই লোভ কী সহজে ছাড়া যায়? তার ওপর যাদের মনের মধ্যে ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছে আঁকুপাঁকু করে সারাক্ষণ তাদের বেলাতো নয়ই।

সাকিয়া মানসী

নারীর চোখের বাংলাদেশের প্রতি পর্বই শুরু হয় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার থেকে। (ছবি : ট্রাভেলেটস অফ বাংলাদেশ ফেসবুক পেজ)

শুরু হলো কোরিনার সাথে ভ্রমণ। শুরু হলো টাঙ্গুয়ার হাওর ঘোরার মাধ্যমে। সোনারগাঁ, বরিশাল, সুন্দরবন, বাগেরহাটের মতো জায়গাগুলোতে প্রথম পা পড়েছে কোরিনার সাথে সাথেই। পুরো ত্রিশ দিন তাকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে নিজেরাও বেশ পেকে গেছেন ভ্রমণ বিষয়ে। অনেক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন দুজনে। কোরিনাকে নিয়ে বাসের ছাদে করেও যাবার অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেই সময়েই। কোরিনার চলে যাবার পর হুট করে দুজনই আবিষ্কার করলেন ঘুরাঘুরিটা আসলে নেশার মতো। ঘুরতে না পারলে কেমন অস্বস্তি হয়। কেমন যেন একরাশ খারাপ লাগা ঘিরে থাকে চারপাশে। পড়ালেখার চাপে ঠিকমতো ঘুরাঘুরিও হয়ে উঠছিল না। নিজেদের ক্যামেরায় তোলা ছবি ফেসবুকের ভ্রমণ গ্রুপগুলোতে দিয়ে একটা নিরীহ স্বান্তনা খুঁজতেন দুজনই।

সাকিয়া মানসী

মুজিবনগর শূন্য কিলোমিটার। (ছবি : ট্রাভেলেটস অফ বাংলাদেশ ফেসবুক পেজ)

ফেসবুকে হুট করেই পরিচয় হয় জুবায়ের কবির তুষারের সাথে। সংগঠক মানুষ তিনি। তাদের ছবি তোলার আগ্রহ দেখে তিনি তাদের বললেন শুধু নারী ভ্রমণকারীদের তোলা ছবি নিয়ে একটা প্রদর্শনী করার। দুই বান্ধবীর কাছে ব্যাপারটা একই সাথে অদ্ভুত এবং হাস্যকর ঠেকে। তারা সত্যি সত্যিই এটিকে হেসে উড়িয়ে দেন। কিন্তু নাছোড়বান্দার মতো জুবায়ের কবির তুষার ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দিতে থাকেন। এক সময় তাদেরও মনে হতে থাকে একবার চেষ্টা করেই দেখা যাক না। মেডিকেলের পড়ার ফাঁকে সময় বের করবেন কীভাবে তা নিয়েও বেশ চিন্তা করতে হয়েছে তাদের। কীভাবে কী করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তারা প্রদর্শনী করলেই মানুষ তাদের কেনইবা ছবি দিবে? তাদের তো কোন প্লাটফর্ম নেই। এক্সিবিশন করার আগে দরকার একটা প্লাটফর্ম।

সাকিয়া মানসী

এভাবেই প্রতিটি জেলায় স্কুলের মেয়েদের সচেতন করতে ছুটে যাচ্ছেন তারা। (ছবি : ট্রাভেলেটস অফ বাংলাদেশ ফেসবুক পেজ)

বেশ কয়েকজন বান্ধবীকে নিয়ে ফেসবুকে গ্রুপ খুললেন একটা। ট্রাভেলেটস অফ বাংলাদেশ নাম দিলেন। বাংলা করলে যার অর্থ দাঁড়ায় বাংলাদেশের ভ্রমণ কন্যা। দেখতে দেখতে তাদের এই গ্রুপটা ভ্রমণপ্রিয় নারীদের যোগদানের মাধ্যমে বিশাল একটা গ্রুপ হয়ে গেল। সবার অনেক আগ্রহ ঘুরতে যেতে। প্রতিদিন কেউ না কেউ নক করতো কবে ঘুরতে যাওয়া হবে সেটা নিয়ে। কিন্তু দুজনের কারোরই সময় হচ্ছিলো না। চলছিল ফাইনাল পরীক্ষা। এদিকে ঘুরতে যাবার চাপ বাড়ছিল। অবশেষে মিললো ফুসরত। পরীক্ষার মাঝে একটা দীর্ঘ সময় ফাঁকা পাওয়া গেল। ২০১৬ সালের নভেম্বরের ২৭ তারিখ যাত্রা শুরু হলেও ট্রাভেলেটস অফ বাংলাদেশের মেয়েরা প্রথম ঘুরতে গিয়েছিল ২০১৭ সালের জানুয়ারির ২০ তারিখ। ১৯ জন ভ্রমণকন্যা ঘুরতে গেলেন ঢাকার পাশের জেলা নরসিংদীতে। সেই থেকে শুরু। এরপরের মাসেই ৫১ জন নারী মিলে ঘুরতে গিয়েছিলেন মৈনটঘাট। শুরুর দিকে ঢাকার আশেপাশে ঘুরতে গেলেও সারাদেশেই যাচ্ছেন তারা ভ্রমণ দল নিয়ে। সম্প্রতি ৫১ তম ভ্রমণ ইভেন্ট শেষ হয়েছে তাদের। দিনে দিনে বাড়ছেই তাদের গ্রুপে মেম্বারের সংখ্যা। মাত্র দুইজন থেকে বর্তমানে তাদের ফেসবুকে সদস্য সংখ্যা ২৮ হাজারের বেশি।

সাকিয়া মানসী

আরেকটি সফল আয়োজন শেষে। (ছবি : ট্রাভেলেটস অফ বাংলাদেশ ফেসবুক পেজ)

সাকিয়া আর মানসী দুজনই জানালেন তাদের ভ্রমণগুলো এমনভাবে আয়োজন করেন যাতে সবারই ভাল লাগে। অন্য কেউ আয়োজন করলে নিজে যেতেন কীনা সেই প্রশ্নটি মাথায় রেখেই ভ্রমণ সাজান ট্রাভেলেটস অফ বাংলাদেশের ভ্রমণকন্যারা। শুরুর পর থেকে তাদের আর পেছনে তাকাতে হয়নি। জয়রথ ছুটছেই। প্রথমবার সফল আয়োজনের পর দ্বিতীয়বারেও আরও বড় পরিসরে আয়োজন করেছেন ভ্রমণকন্যাদের ছবি নিয়ে ফটো এক্সিবিশন। পেয়েছেন অনেক অনেক মানুষের ভালোবাসা। শুধু ভ্রমণ করেই তারা থেমে থাকেননি। দেশবাসীকে চমকে দেবার মতো বেশ কিছু কাজও করেছেন তারা।

সাকিয়া মানসী

নারীর চোখে বাংলাদেশ প্রোগ্রামের জন্যই শিখেছেন স্কুটি চালানো। (ছবি : ট্রাভেলেটস অফ বাংলাদেশ ফেসবুক পেজ)

সাকিয়া আর মানসী দুজনই ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের ৬৪ জেলা। হুট করে দেখা স্বপ্নটা বাস্তব হয়ে গেছে এটাই যেন বিশ্বাস হয় না দুই ভ্রমণ কন্যার। এখনও তাদের কাছে মনে হয় কতকিছু করা বাকী! বাকী কিছু কাজ সম্পন্ন করতেই স্কুটিতে করে ঘুরছেন জেলায় জেলায়। কর্ণফুলি প্রেজেন্টস নারীর চোখে বাংলাদেশ নামক একটি প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছিলেন সেই ২০১৭ সালে। ১০টি পর্বে ৬৪ জেলায় গিয়ে স্কুল পড়ুয়া মেয়েদের নানা বিষয়ে সচেতনা তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য। এ কাজে পেয়েছেন বেশ সাফল্যও। মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যা, আত্মরক্ষার কৌশল, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের ইতিহাস সহ নানান বিষয়ে তাদের সচেতন করেন তারা। প্রতিবারই বাইকের পেছনে সংগঠনের দুজন সদস্যকে নিয়ে যান সঙ্গে করে।

সাকিয়া মানসী

দারুচিনিদ্বীপে ভ্রমণ কন্যারা। (ছবি : ট্রাভেলেটস অফ বাংলাদেশ ফেসবুক পেজ)

এতকিছুর মধ্যেও পড়ালেখাতেও সময় দিয়েছেন ঠিকমতো। দুজনই হয়েছেন ডাক্তার। দিনে দিনে ব্যস্ততা বাড়ছে, সেই সাথে বাড়ছে স্বপ্নের পরিধিও। দেশ থেকে দেশে ছুটে যাবার ইচ্ছেও জাগে কখনো কখনো। সাকিয়া হক এরই মধ্যে ঘুরেছেন ৯টি দেশ আর মানসী সাহা ৫টি। একেকটি লক্ষ্য শেষ হতে না হতেই তাদের সামনে আরও একটি লক্ষ্য হাজির হয়ে যায়। পেছনের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতায় খুব একটা পোড়েন না দুই বন্ধু। শুধু সামনেই এগিয়ে যেতে চান একসাথে জীবনের শেষদিন অবধি।

ওডি/এসএম

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড