• সোমবার, ২৭ মে ২০১৯, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬  |   ৩৫ °সে
  • বেটা ভার্সন

একজন 'সিনেমা চিত্র' আঁকিয়ের গল্প

  ইশতিয়াক আবীর ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ১৪:২৬

পাপ্পু
হাতে আঁকা সিনেমার পোস্টারের কদর না থাকলেও হানিফ পাপ্পু ধরে রেখেছেন এই শিল্পকে। (ছবি : হানিফ পাপ্পুর ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

পঞ্চম শ্রেনী পড়ুয়া এক ছাত্র প্রতিদিন তার মামার জন্য দুপুরের খাবার নিয়ে যায়। মামা রফিক উদ্দিন ছবি আঁকেন। মামার ছবি আঁকাআঁকি মুগ্ধ করে তাকে। শখ জাগে রঙ তুলির ভুবনে ডুবে যেতে। মামা রফিকের হাত ধরে ছবি আঁকার সাথে তার পরিচয়। স্কুল থেকে এসে ছবি আঁকা শিখতেন মামার কাছে। সেই থেকে শুরু। গল্পে গল্পে বয়ে গেছে অনেক বেলা। সেই ছোট্ট ছেলেটি পাড় করে এসেছেন জীবনের বহু বহু দশক। অভিজ্ঞতার ঝুলি পড়ছে উপচে। বলছিলাম সিনেমা ব্যানার শিল্পী হানিফ পাপ্পুর কথা। অনেকের কাছে তিনি পাপ্পু ভাই নামে পরিচিত। ছোট বেলার ছবি আঁকার শখকে পেশা হিসেবে নেন পাপ্পু। প্রায় ৫ দশক ধরে আছেন এই শিল্পের সাথে।

১৯৬৮ সালে সেতারা আর্ট পাবলিসিটিতে কাজ শুরু করেন পাপ্পু। ঢাকার বিভিন্ন সিনেমা হলে সিনেমার ব্যানার করতেন তিনি। তবে পুরো দমে কাজ শুরু করেন দেশ স্বাধীনের পর। সেতারা আর্ট পাবলিসিটির নাম পাল্টে নতুন নামে শুরু হয়। এর নাম হয় রূপায়ন আর্ট পাবলিসিটি। সেখানেই চুড়ান্ত কাজ শেখেন রূপায়নের মালিক ও আর্টিস্ট ওস্তাদ গিরিন বাবুর কাছ থেকে।

রঙ তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলতেন সিনেমার দৃশ্যপট। নায়িকার কষ্ট, নায়কের বীরত্ব আর পার্শ্বচরিত্রগুলোর অভিব্যক্তি জীবন্ত করে তুলতেন তুলির ছোঁয়ায়। নিপুণভাবে এঁকে দিতেন নায়ক-নায়িকাদের মুখ, চোখ এবং সিনেমার খণ্ডাংশ। নতুন ছবি মুক্তি পেলেই হাতে আঁকা ব্যানার-পোস্টারে ছেয়ে যেত শহরের অলিগলি।সিনেমা শিল্পের একমাত্র প্রচার মাধ্যম ছিলো ছিল এই ব্যানার পোস্টার শিল্প।

পাপ্পু

সিনেমা চিত্রকে তিনি নিয়ে গেছেন রিকশা পেইন্টিং এ। (ছবি : হানিফ পাপ্পু'র ফেসবুক থেকে সংগৃহীত )

“ওরা ১১ জন’’ ছবির পোস্টার একে পাপ্পুর সিনেমা ব্যানারের যাত্রা শুরু। এরপর একে একে রংবাজ,অবুঝ মন,দুই রাজ কুমার,বেদের মেয়ে জোসনা, সোনার হরিণ সহ অনেক সিনেমার পোস্টারের কাজ করছেন পাপ্পু। তবে অবুঝ মন ও দুই রাজ কুমার সিনেমার ছবির পোষ্টার করে ব্যাপক পরিচিত লাভ করেন। বলা যায় রাতারাতি খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে তার। সব পরিচালকদের সাথেই যোগাযোগ হয় তার। সবাই তার কাজের প্রশংসা করতে শুরু করে। এরপর আর পিছু তাকাতে হয়নি। সত্তুর-আশির দশকে প্রতিমাসে প্রায় লক্ষ টাকা উপার্জন করতেন তিনি। সেই সুসময় বেশিদিন স্থায়ী হলো না। পরিস্থিতি বদলে যেতে সময় লাগেনি বেশি। নব্বই দশকের শেষের দিকে ডিজিটাল হাওয়া বইতে শুরু করে সিনেমা জগতে। সেই হাওয়া লাগে পোস্টার শিল্পেও।

হাতে আঁকা পোস্টারের কদর কমতে থাকে। কম্পিউটারের ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে সিনেমার পোস্টারও আধুনিক হয়ে যায়। এখন আর হাতে আঁকা হয় না পোস্টার আর ব্যানার। ডিজিটালের হাওয়া লেগেছে এই শিল্পে। ডিজিটাল পোস্টার আর প্রিন্টিং পোস্টারের ভিড়ে হারিয়ে গেছে হাতে আঁকা পোস্টারের কদর।

কিন্তু ২০০০ সাল পর্যন্ত হাতে আঁকা ব্যানার পোস্টারের কোন বিকল্প ছিলো না। দুঃসময়ের পুরোপুরি শুরু হয় বিংশ শতাব্দির শুরুর দিকে। ২০০০ সাল পর্যন্ত টিকে থাকা ১২ টি আর্ট পাবলিসিটি প্রতিষ্ঠান দুই বছরের মধ্যে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ঠিক তখনই এই শিল্পে ধ্বস নামে পুরোপুরি। পাপ্পু বলেন “ডিজিটালের সাথে পাল্লা দিয়ে আমরা টিকতে পারছিলাম না।আমাদের কাজ পাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় রূপায়ন আর্ট পাবলিসিটি। একে একে সবাই তখন এই শিল্প ছেড়ে অন্য দিকে চলে যান।"

পাপ্পুও ছবি আকার বাইরে ছিলেন কিছুদিন। কিন্তু রক্তে মাংসে রঙতুলির সাথে মিশে যাওয়া সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারলেন না পাপ্পু। পরম মমতায় আগলে রেখেছেন এই শিল্পকে। আবার সিনেমা ব্যানার আঁকতে শুরু করেন তবে এবার সিনেমার জন্য নয়। জীবিকার তাগিদে আঁকছেন। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে আঁকছেন। এখন আর আগের মত বড় ক্যানভাসে আঁকা হয়না। এখন আঁকেন ছোট ক্যানভাসে।

পাপ্পু

বিদেশের মাটিতেও তিনি নিয়ে গেছেন এই শিল্পকে। (ছবি : হানিফ পাপ্পু'র ফেসবুক থেকে সংগৃহীত )

সিনেমার আর্টকে রিকশা আর্টের ধাঁচে করেন। অবশ্য তার হাত ধরেই সিনেমা ব্যানার আর্ট রিকশা আর্টে প্রবেশ করে এমনটাই দাবী করেন পাপ্পু। এ বিষয়ে তিনি বলেন " ১৯৮০ সালের কিছু আগে নিশান ছবি দিয়ে সিনেমা আর্ট স্টাইলে প্রথম রিকসা আর্ট আমি করি।" সিনেমা আর্ট আর রিকসা আর্টের পার্থক্য নিয়ে জানতে চাইলে পাপ্পু জানান, "সাধারণত ফুল,পাখি,লতাপাতার ডিজাইন দিয়ে যেটা আঁকা হত সেটা হচ্ছে রিকসা আর্ট। তবে আপনারা সেটাকে রিকসা আর্ট বলছেন সেটা সিনেমা আর্ট।" রিকসা আর্টের পাশাপাশি তিনি গায়ে হলুদ,বিয়ে ইত্যাদিতে সিনেমা আর্ট করছেন।

এক সময়ের ব্যস্ত শিল্পী পাপ্পু এখন কাজের খরায় ভুগছেন। তবুও আগলে রেখেছেন এই কারুশিল্পকে। তবুও স্বপ্ন দেখেন এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার।

ডেনমার্কে আয়োজিত ইমেজেস ফেস্টিভ্যাল ২০১৩ তে সিনেমা ব্যানার শিল্পী হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন এই গুণী শিল্পী। বিভিন্ন প্রদর্শনীও করেছেন তিনি। এশিয়ান আর্ট রিয়ানালে,নেটিভ রিদম ২,চিত্রে সুচিত্রা,মুজিব ইন আওয়ার লাইফ,শহরনামা সহ বিভিন্ন প্রদর্শনী করেছেন তিনি। পাপ্পু আশা নিয়ে বলেন, "সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই শিল্পকে বিশ্ব পরিমন্ডলে পৌছে দেওয়া সম্ভব।"

ওডি/এসএম

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৮-২০১৯

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড