• বুধবার, ২২ মে ২০১৯, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন

বিশ্বজয়ী পতাকা কন্যা

  সৈয়দ মিজান ১৮ এপ্রিল ২০১৯, ২২:৫০

নাজমুন নাহার
নাজমুন নাহার বাংলাদেশের পতাকা নিয়েই ছুটছেন বিশ্বের আনাচে কানাচে। (ছবি : নাজমুন নাহার)

পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে একাই ছুটে বেড়ান বাংলাদেশের এক সাহসী কন্যা। প্রকৃতির প্রেমে পড়েছিলেন সেই ছোটবেলাতেই। উৎসাহ দিয়েছিলেন বাবা। শুরুটা হয়েছিল ২০০০ সালে, পাশের দেশ ভারত ভ্রমণের মধ্য দিয়ে। সেই থেকে শুরু। এখন পর্যন্ত ঘুরেছেন ১২৫টি দেশ। লক্ষ্য আরো বিশাল। পৃথিবীর সব দেশে পড়বে তাঁর পা। সেই লক্ষ্যে ছুটে চলেছেন সর্বক্ষণ।

"আমার অর্থ নেই, সম্পদ নেই, এমনকি আমার স্বর্ণালঙ্কারও নেই কিন্তু আমার ইচ্ছা শক্তিই আমাকে পৃথিবীর পথে প্রান্তরে নিয়ে যাচ্ছে। আমার জন্মই হয়েছে ভ্রমণ করার জন্য। ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি আমার পছন্দ।" এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলছিলেন নাজমুন নাহার। যিনি জাম্বিয়া সরকারের কাছ থেকে পেয়েছেন ‘ফ্ল্যাগ গার্ল’ উপাধি। পৃথিবীর হাজার সাতেক শহর ঘুরেছেন এ অবধি। যত না দেখেছেন তারচেয়ে শিখেছেন অনেক বেশি।

পতাকা কন্যা

বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে ছুটে বেড়ান দেশ থেকে দেশে। (ছবি : নাজমুন নাহার)

তার প্রমাণ পাওয়া গেল তার সাথে কথা বলেই। অদ্ভুত সুন্দর হাসেন মানুষটি। প্রথম সাক্ষাতেই একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে আমাদের অভ্যর্থনা করলেন। আলাপ শুরু করলাম তার সাথে। তখনো বুঝতে পারিনি আলাপ চলবে প্রায় ঘন্টা পাঁচেক। যিনি পৃথিবীর ১২৫টি দেশ ঘুরেছেন তার সাথে গল্প কি আর এত জলদি শেষ হয়!

শুরুতেই জানতে চাইলাম কেন আগ্রহী হলেন বিশ্ব ভ্রমণে? অকপট উত্তর, "ভালবাসা থেকে। প্রকৃতি ভালবাসি আমি। সেই ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব টান অনুভব করি রক্তের ভেতরে। আব্বাও আমাকে বেশ উৎসাহ দিয়েছিলেন। আর এখন তো মনে হয় আমার জন্মই হয়েছে পৃথিবী দেখার জন্য।"

পতাকা কন্যা

আফ্রিকান মানুষদের ভালবাসাও পেয়েছেন অসংখ্য। (ছবি : নাজমুন নাহার)

কথায় কথায় জানা গেল একটু আগেই ফিরেছেন নিজ শহর লক্ষ্মীপুর থেকে। গিয়েছিলেন একটা সংবর্ধনায়। শ্রান্ত ক্লান্ত মানুষটি কথা বলে চলেছেন এক নাগাড়ে। যেন আমাদেরকেও নিয়ে যাচ্ছেন পৃথিবীর আনাচে কানাচেতে। কখনো সেনেগাল, কখনো ঘানা কখনোবা দক্ষিণ আফ্রিকায় মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসার গল্প। আমরা তন্ময় হয়েই শুনছিলাম তার কথা। বিশ্বের এতগুলো দেশ পাড়ি দিয়েছেন বিপদেও তো পড়েছেন নিশ্চয়ই? এমনটাই চাইলাম জানতে। বললেন, "বিপদ তো পদে পদেই ছিল। মৃত্যুও হতে পারতো কয়েকবার। কত ঘটনা বলবো । অনেক অনেক ঘটনা আছে এমন। তবে মানুষের ভালবাসা আর স্রষ্টার করুণায় ফিরেও এসেছি বারবার।"

পতাকা কন্যা

রঙধনু পাহাড়ের সাত রঙের মাঝেও উড়িয়ে এসেছেন লাল সবুজ পতাকা। (ছবি : নাজমুন নাহার)

আলাপে আলাপে জানা গেল এমন অনেক ঘটনাই। গিনি বিসাউ থেকে যাবেন গিনি কোনাক্রি। ৯ ঘন্টার পথ। কিন্তু পথের এমন দশা যে একে পথ না বলাই শ্রেয়। যেমন পাথুরে তেমন ভাঙাচোরা আর রুক্ষ। আর যে গাড়িতে উঠেছেন সেটিকেও ঠিক গাড়ি বলা যাবে কী না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এমন একটি গাড়ি যার দরজা লাগাতেও হয় স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে আবার খুলতেও হয় তা দিয়ে।

এছাড়া বিকল্প কিছুও নেই এ পথে যাবার। যাচ্ছেন তো যাচ্ছেনই। ঘন জঙ্গলের মাঝ দিয়ে পথ। যেন শেষই হতে চায় না। দূর থেকে ভেসে আসে নানা হিংস্র পশুর ডাক। একটু পর পর গাড়ি যাচ্ছে নষ্ট হয়ে। তবুও তিনি ছুটছেন। যত কষ্টই হোক লক্ষ্য অর্জন করা চাই। তিনি একা একজন নারী হয়ে সারা বিশ্ব ঘুরবেন এইতো তার স্বপ্ন। হুট করে আবার গাড়ি নষ্ট হয়ে গেল। এবার একেবারেই নষ্ট হয়েছে। ড্রাইভার অনেক চেষ্টা করেও ঠিক করতে পারলো না।

পতাকা কন্যা

মরুভূমির বুকে পতাকা নিয়ে যেতে শারিরীকভাবে আহতও হয়েছিলেন তিনি। (ছবি : নাজমুন নাহার)

এদিকে রাত হয়ে গেছে। জঙ্গলের মধ্যে যাবারও পথ নেই। সঙ্গে থাকা কয়েকজন স্থানীয় মানুষকে নিয়েও হাঁটা পথ ধরলেন তিনি। ফোনে নেই চার্জ। কারও সাথে যোগাযোগ করার উপায় নেই। এদিকে আবার ক্ষুধা তৃষ্ণায় এতটাই কাতর হয়ে গেছেন যে ঠিকমতো হাঁটতেও পারছিলেন না। হঠাৎই চোখের সামনে একটি ছোট্ট কুঁড়েঘর দেখতে পেলেন। সেই ঘরের বাইরে কয়েকটি পাথর রাখা ছিল সেখানেই গিয়ে শুয়ে পড়লেন।

বাড়িতে একজন মহিলা ছিলেন যিনি বের হয়ে এলেন। কেউ কারও ভাষা বোঝেন না। তবুও অর্থ বিত্তহীন সেই নারীর কোমল হৃদয়ের সন্ধান তিনি পেয়েছিলেন। তিনি তাকে ঘরে নিয়ে বসালেন। যদিও তার ঘরে কোনো খাবার বা পানীয় ছিল না তবুও তার যত্ন নেবার চেষ্টা করলেন। এখানে দীর্ঘ ২৬ ঘন্টা আটকে থাকার পর তাদের গাড়ি ঠিক হয়েছিল। সেই ২৬ ঘন্টায় তিনি শুধু মাত্র এক টুকরো আলু খেয়ে বেঁচে ছিলেন।

এমনই আরেক ঘটনা ঘটেছিল উগান্ডা থেকে রুয়ান্ডা যাবার পথে। সেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টিতে আটকে ছিলেন এক বৃক্ষের নিচে। বেশ ভয়ই পেয়েছিলেন সেদিনটিতে। অবশ্য এর যথেষ্ট কারণও ছিল। যে জায়গায় আটকে ছিলেন সেটার বেশ দুর্নামও ছিল ছিনতাইয়ের।

দেশকে তুলে ধরেত

দেশকে বিশ্ব মাঝে তুলে ধরতে ছুটছেন বিশ্বের নানা প্রান্তে। (ছবি : নাজমুন নাহার)

আবার মজার অভিজ্ঞতার ঝুলিও কম ভরা না তার। বতসোয়ানার ফ্রান্সিস টাউন যাবার কালে মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়েছেন তিনি। পেয়েছেন অসংখ্য স্মৃতিপত্র, স্মারক অনেক জিনিসও। সবচেয়ে বেশি যা পেয়েছেন তা হলো পৃথিবী জুড়েই আছে তার বন্ধু বান্ধব। স্কুল ড্রপার ফ্রিদা, জোহান্সবার্গের উপকারী বন্ধু ইতুমেলেং, জাম্বিয়ান মেয়ে এঞ্জেলিকা, জাম্বিয়ার মার্গারেট, অস্ট্রেলিয়ার স্কা, গাম্বিয়ার সাফিলো-বিন্তা দম্পতি কিংবা সিয়েরা লিয়নের ডোরা। এরকম বহু মানুষ আছে যারা নিয়মিত তার খোঁজ খবর রাখেন।

সবচেয়ে আনন্দ পান যখন দেখেন তাকে দেখে কেউ উৎসাহী হচ্ছে নিজের বন্দীত্ব ভাঙতে। আইভরি কোস্টের মেয়ে ইভানাতো তার কারণে আত্মহত্যার হাত থেকে ফিরে এসেছে। নতুন করে স্বপ্ন দেখছে এখন সে।

নিজেকে মেয়ে না ভেবে মানুষ হিসেবেই ভাবেন বেশি। ভাবনাটার প্রতিফলনও তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। আত্মনির্ভরশীল একজন মানুষ হিসেবে অনুপ্রেরণা খুঁজে পান মাদার তেরেসার জীবন থেকে। জীবন শেষে সব অর্থ সম্পদ বিলিয়ে দিতে চান পথ শিশুদের মাঝে। দিনশেষে তাদের জন্য একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে যেতে চান। গড়তে চান নিজের বিশ্ব ভ্রমণের সংগ্রহ দিয়ে একটা জাদুঘর। শুধু জাদুঘরই থাকবে না। মানুষের জন্য কাজ করবে এমন একটা কিছুই যেন হয় তাই আশা তার।